ভূমিকা: প্রতিদিন কমপক্ষে ১৭ বার পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের প্রতিটি রাকআতে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বেশি পঠিত বাক্যগুলো হলো সূরা আল-ফাতিহার আয়াতসমূহ। কিন্তু সাত আয়াতের ছোট এই সূরার গভীরতা কতটুকু আমরা উপলব্ধি করি? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এটি কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা। তিনি আরও বলেছেন, এমন সূরা আল্লাহ তাওরাত, ইনজীল, যাবূর—কোনো কিতাবেই নাযিল করেননি। আসুন, এই অসাধারণ সূরা সম্পর্কে একটু গল্প শুনি।
সাত আয়াতের এই সূরাটি কুরআনের শ্রেষ্ঠ সূরা। এমন একটি সূরা, যা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যকে শেখানো পছন্দ করতেন। আবূ সাঈদ ইবনু আল-মু‘আল্লা রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মসজিদে নববীতে তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বর্ণনায় বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, ‘আমি মসজিদ থেকে বের হওয়ার আগে অবশ্যই তোমাকে কুরআনের সবচেয়ে মহান একটি সূরা শিক্ষা দেব’। এরপর তিনি আমার হাত ধরলেন। যখন তিনি বের হতে চাইলেন, আমি বললাম, আপনি তো বলেছিলেন, আপনি আমাকে কুরআনের সবচেয়ে মহান সূরাটি শিক্ষা দেবেন! তখন তিনি বললেন, الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ... অর্থাৎ ‘আল-হামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন’ দিয়ে শুরু হওয়া সূরাটি।[1]
এটি এমন একটি সূরা, নেকীর বিবেচনায় যার মতো মূল্যবান সূরা কোনো আসমানী কিতাবে আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেননি। আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বর্ণনায় উবাই ইবনু কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে ঘটা একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যেখানে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবাই ইবনু কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, ‘আমি কি তোমাকে এমন একটি সূরা শিক্ষা দেব, যার মতো সূরা না তাওরাতে, না ইনজীলে, না যাবূরে, না ফুরক্বানে (কুরআনে) নাযিল হয়েছে?’ তিনি বললেন, জি, হে আল্লাহর রাসূল! তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি ছালাতে কী পড়?’ তিনি বললেন, আমি উম্মুল কুরআন (অর্থাৎ সূরা আল-ফাতিহা) পড়ি। তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ! তাওরাত, ইনজীল, যাবূর কিংবা কুরআনে এর মতো কোনো সূরা নাযিল হয়নি’।[2]
চিন্তা করুন! আল্লাহ যত নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন, যত কিতাব নাযিল করেছেন—তাওরাত, ইনজীল, যাবূর বা কোনো ছহীফাতেই সূরা আল-ফাতিহার মতো সূরা নেই, না শব্দ বিন্যাসে, না অর্থের গভীরতায়, না মর্যাদায়। এটি একটি অনন্য দান, শুধু উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য। কিন্তু আমরা কি কখনও এই সূরার এই মাহাত্ম্য বুঝে মনের গভীর থেকে তেলাওয়াত করেছি? আপনি কি কল্পনা করতে পারেন, একটি সূরা নাযিল করার জন্য আসমানের একটি বিশেষ দরজা খোলা হয়েছিল, একজন বিশেষ ফেরেশতা পাঠানো হয়েছিল এই সূরা নাযিল করার জন্য? আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর বর্ণনায় গুরুত্বপূর্ণ এই কথাগুলো উঠে এসেছিল, যেখানে জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে বসা ছিলেন। হঠাৎ তিনি ওপর দিক থেকে একটি শব্দ শুনলেন। তখন তিনি মাথা তুলে বললেন, هَذَا بَابٌ مِنَ السَّمَاءِ فُتِحَ الْيَوْمَ لَمْ يُفْتَحْ قَطُّ إِلَّا الْيَوْمَ ‘এটি আসমানের একটি দরজা, যা আজ খোলা হয়েছে, এর আগে কখনো খোলা হয়নি’। এরপর এক ফেরেশতা অবতরণ করলেন। জিবরীল আলাইহিস সালাম বললেন, এ ফেরেশতা আজ পৃথিবীতে নেমেছেন, এর আগে কখনো নামেননি। সেই ফেরেশতা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সালাম দিয়ে বললেন,أَبْشِرْ بِنُورَيْنِ أُوتِيتَهُمَا لَمْ يُؤْتَهُمَا نَبِيٌّ قَبْلَكَ: فَاتِحَةُ الْكِتَابِ، وَخَوَاتِيمُ سُورَةِ الْبَقَرَةِ ‘আপনাকে দুটি নূরের সুসংবাদ দেওয়া হচ্ছে, যা আপনার পূর্বে কোনো নবীকে দেওয়া হয়নি— (১) ফাতিহাতুল কিতাব (সূরা আল-ফাতিহা) এবং (২) সূরা বাক্বারার শেষ আয়াতসমূহ…’।[3]
বিখ্যাত এই সূরার যে মহান বিষয়টি অধিকাংশ সময় আমরা এড়িয়ে গেছি, দিনে-রাতে অসংখ্য বার পড়েও আমরা যা জানিনি, সেটি হচ্ছে এই সূরায় আল্লাহর সাথে বান্দার সরাসরি কথোপকথন। এই সংক্রান্ত ছহীহ মুসলিমে একটি অসাধারণ বর্ণনা আছে আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে, যেখানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, قَسَمْتُ الصَّلَاةَ بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي نِصْفَيْنِ، وَلِعَبْدِي مَا سَأَلَ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি ছালাতকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে দুই ভাগে ভাগ করেছি আর আমার বান্দা যা চাইবে তা-ই পাবে। বান্দা যখন বলে, الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ তখন আল্লাহ নিজে বান্দার ওই কথার উত্তরে বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। এরপর যখন সে বলে, الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ তখন আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার স্তুতি করেছে। যখন সে বলে, مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ আল্লাহ বলেন, আমার বান্দা আমার মহিমা ঘোষণা করেছে। যখন সে বলে, إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ আল্লাহ বলেন, এটি আমার ও আমার বান্দার মাঝে আর আমার বান্দা যা চেয়েছে তা-ই পাবে’। অর্থাৎ সে আমার দাসত্ব করবে এবং আমার কাছেই সাহায্য চাইবে। দাসত্ব আমার জন্য আর সাহায্য তার নিজের জন্য। যখন সে বলে, اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ অর্থাৎ ‘আপনি আমাকে সহজ সরল পথ দেখান। তখন আল্লাহ বলেন, ‘এটি আমার বান্দার জন্য আর আমার বান্দা যা চেয়েছে তা-ই পাবে’।[4]
এই হাদীছ আমাদের শেখায় যে, সূরা আল-ফাতিহা কেবল মুখের উচ্চারণ নয়; বরং এটি বান্দার হৃদয়ের দরখাস্ত। যে ব্যক্তি এটি বুঝে পড়ে, তার ছালাত বদলে যায়। সে তখন আর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কাজ করে না; বরং রবের সামনে দাঁড়িয়ে গভীরতম আবেদন জানায় এবং এই বিশ্বাসের সহিত আবেদন জানায় যে, তার পাঠ করা প্রত্যেকটা বাক্যের আল্লাহ উত্তর দেন। এটি যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত, যেখানে এই বিশ্বজগতের মহান মালিক তার গোলাম বা দাসের জবাব দিচ্ছেন। ক্ষুদ্র ও নগণ্য গোলাম প্রশংসা করছে এবং সুমহান আল্লাহ তাঁর গোলামের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন। বান্দা সাহায্য চাইছে এবং আল্লাহ কবুল করছেন। প্রতিটি ছালাতে, প্রতিটি রাকআতে—এই সংলাপ চলছে। কিন্তু আমরা কতবার এই বিশেষ কথোপকথন অনুধাবন করে থাকি? কতবার এই অনুভূতির সাথে এই সূরা তেলাওয়াত করি যে, আল্লাহ আমার কথার প্রত্যুত্তর করছেন। একারণেই সূরা আল-ফাতিহার দৈনন্দিন জীবনের উপকারিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— এটি মানসিক চাপ, উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করে। এর রহমতভিত্তিক আয়াতগুলো মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু। ফলে দ্রুতগতির ও চাপপূর্ণ জীবনে এটি এক গভীর আবেগগত আশ্রয় হয়ে ওঠে। যখন সে অনুধাবন করে যে, সে আল্লাহর সাথে কথা বলছে, তখন সংকটের সময় এ সূরা পাঠ অন্তরে প্রশান্তি আনে।
এই সূরা সম্পর্কে হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ একটি চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ ১০৪টি কিতাব নাযিল করেছেন। সব কিতাবের জ্ঞান চারটিতে (তাওরাত, ইনজীল, যাবূর, কুরআন) আছে। চারটির জ্ঞান কুরআনে আছে। কুরআনের জ্ঞান মুফাছ্ছালে আছে। মুফাছ্ছালের জ্ঞান উম্মুল কুরআনে (ফাতিহায়) আছে।
আর সূরা ফাতিহার সারমর্ম হলো إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ‘আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য চাই’ এই আয়াতে।
সূরা আল-ফাতিহা ছালাতের রুকন, এটি ছাড়া ছালাত ছহীহ হয় না। সূরা আল-ফাতিহার সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফযীলত হলো- এটি ছালাতের একটি মৌলিক রুকন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, এটি ছাড়া ছালাত পূর্ণ হয় না। হাদীছে এসেছে, لَا صَلَاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ‘যে ব্যক্তি ফাতিহাতুল কিতাব (সূরা আল-ফাতিহা) পাঠ করেনি, তার কোনো ছালাত নেই’।[5] এই হাদীছ সূরা আল-ফাতিহার শারঈ মর্যাদাকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। ছালাত ইসলামের স্তম্ভ আর সেই ছালাতের অন্তরে আছে সূরা আল-ফাতিহা। একজন বান্দা প্রতিদিন বহুবার সূরা আল-ফাতিহা পড়ে যেন নিজের ঈমান, আনুগত্য ও হেদায়াতের আবেদনকে নবায়ন করে।
সূরা আল-ফাতিহার চিকিৎসাগত উপকারিতা শারীরিক ও আত্মিক উভয় ক্ষেত্রেই বিস্তৃত। একারণেই একে কখনো ‘আশ-শিফা’ বা ‘আরোগ্য’ বলা হয়। এটি একটি শক্তিশালী রুকইয়া; সুরক্ষা ও চিকিৎসা দুটোর ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে। ইসলামী চিকিৎসা পদ্ধতিতে এটি নানা রোগে পাঠ করা হয় এবং তা চিকিৎসা গ্রহণের বিকল্প নয়, বরং এটি আল্লাহর উপর আস্থা রেখে একটি সহায়ক আত্মিক চিকিৎসা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাহাবীগণ বাস্তব ঘটনার মাধ্যমে এর কার্যকারিতা প্রদর্শন করেছেন। আবূ সাঈদ আল-খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত একটি ছহীহ হাদীছে এসেছে যে, এক সফরে কিছু ছাহাবী এক আরব গোত্রের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা আতিথ্য চেয়েছিলেন, কিন্তু গোত্রটি তাদের আপ্যায়ন করেনি। এই সময়টুকুর মধ্যেই সেই গোত্রের প্রধানকে সাপ বা বিচ্ছু দংশন করে। তখন তারা ছাহাবীদের কাছে এসে সাহায্য চায়। তখন ছাহাবীদের একজন সূরা আল-ফাতিহা পড়ে ফুঁ দিয়ে রুকইয়া করেন এবং লোকটি এমনভাবে সুস্থ হয়ে যায়, যেন তার কিছুই হয়নি।[6]
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সূরা আল-ফাতিহা আল্লাহর ইচ্ছায় শিফার মাধ্যম হতে পারে। আধুনিক সময়েও অনেক মুসলিম মাথাব্যথা, উদ্বেগ বা অসুস্থতার সময় পানি পড়ে বা আক্রান্ত স্থানে ফুঁ দিয়ে এ সূরা পাঠ করেন।
এর আয়াতগুলো গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, এতে এমন এক আত্মিক থেরাপি আছে, যা মানুষের ভেতরের অশান্তিকে প্রশমিত করে, আল্লাহর প্রশংসা অহংকার ভেঙে দেয় আর হেদায়াতের দু‘আ বিভ্রান্তি নিরাময় করে। শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি এটি দুঃখ, বিষণ্নতা ও অস্থিরতার মতো আবেগিক ক্ষত সারাতেও ভূমিকা রাখে। কারণ এটি মানুষের দৃষ্টি আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরিয়ে দেয়।
সূরা আল-ফাতিহা সম্পর্কে সবচেয়ে চমৎকার কথা বলেছেন ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ; তিনি বলেন, সূরা আল-ফাতিহা, যা ‘ফাতিহাতুল কিতাব’, ‘উম্মুল কুরআন’ এবং ‘সাবউল মাছানী’, এটি হলো পূর্ণাঙ্গ আরোগ্য, উপকারী ওষুধ, সম্পূর্ণ রুকইয়া, দারিদ্র্য থেকে মুক্তি ও সফলতার চাবি, শক্তি সংরক্ষণের মাধ্যম; দুশ্চিন্তা, কষ্ট, ভয় ও দুঃখ দূর করার উপায়। তবে তা তাদের জন্য, যারা এর মর্যাদা উপলব্ধি করে, এর হক্ব আদায় করে, নিজেদের রোগের ওপর যথাযথভাবে প্রয়োগ করে। নিশ্চয়ই সূরা আল-ফাতিহা পৃথিবীর ভাণ্ডারসমূহের সর্বশ্রেষ্ঠ চাবি, যেমন এটি জান্নাতের ভাণ্ডারেরও চাবি। কিন্তু প্রত্যেকেই এই চাবি দিয়ে সঠিকভাবে তালা খুলতে পারে না! যদি ধনভাণ্ডারের অনুসন্ধানকারীরা এই সূরার গোপন রহস্য বুঝতে পারত, এর অর্থগুলো বাস্তবিকভাবে উপলব্ধি করত, এই চাবির উপযুক্ত দাঁত (যোগ্যতা ও প্রস্তুতি) তৈরি করত এবং সঠিকভাবে তা ব্যবহার করতে পারত; তাহলে তারা কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই সেই ভাণ্ডারে পৌঁছে যেত।[7]
ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ তার জীবনের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন তার কিতাবে, যেখানে তিনি বলেন, এক সময় আমি মক্কায় এমন এক অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম, যখন আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। সে সময় আমি কোনো চিকিৎসক বা ওষুধ পাইনি। তাই আমি সূরা আল-ফাতিহা দিয়েই চিকিৎসা করতাম। আমি যমযমের পানি নিতাম, তার ওপর বারবার সূরা আল-ফাতিহা পড়তাম, তারপর তা পান করতাম। এর মাধ্যমে আমি পূর্ণ আরোগ্য লাভ করি। এরপর থেকে আমি বহু রোগের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে শুরু করি এবং এর দ্বারা অত্যন্ত উপকৃত হই।[8]
শেষের কথায় সূরা আল-ফাতিহার নামগুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনাটি তার গুরুত্ব একটু হলেও আমাদেরকে উপলব্ধি করাবে বলে মনে করি। ইমাম কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ সূরা আল-ফাতিহার প্রায় ১২টি নাম উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনু কাছীর রাহিমাহুল্লাহও সূরা আল-ফাতিহার কয়েকটি নাম উল্লেখ করেছেন। সংক্ষেপে সবগুলো নাম উল্লেখ করা হলো—
(১) ‘উম্মুল কুরআন’, ‘উম্মুল কিতাব’ ও ‘সাবউল-মাছানী’:
ইমাম তিরমিযী রাহিমাহুল্লাহ আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, الْحَمْدُ لِلَّهِ أُمُّ الْقُرْآنِ وَأُمُّ الْكِتَابِ وَالسَّبْعُ الْمَثَانِي ‘আলহামদুলিল্লাহ (সূরা আল-ফাতিহা) হচ্ছে ‘উম্মুল কুরআন’, ‘উম্মুল কিতাব’, ‘সাবউল-মাছানী’।[9]
(২)আল-কুরআনুল আযীম: আবূ সাঈদ ইবনুল মু‘আল্লা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, هِيَ السَّبْعُ الْمَثَانِي وَالْقُرْآنُ الْعَظِيمُ الَّذِي أُوتِيتُهُ ‘সেটি হচ্ছে ‘সাবউল-মাছানী’ ও ‘আল-কুরআনুল আযীম’, যা আমি প্রাপ্ত হয়েছি’।[10]
(৩)ছালাত: এটি সূরা আল-ফাতিহার আরেক নাম। হাদীছে কুদসীতে আল্লাহ বলেন, قَسَمْتُ الصَّلَاةَ بَيْنِي وَبَيْنَ عَبْدِي نِصْفَيْنِ ‘আমি ছালাতকে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে দুই ভাগে ভাগ করেছি’।[11] এখানে অধিকাংশ আলেম ব্যাখ্যা করেছেন যে, الصلاة দ্বারা সূরা আল-ফাতিহা উদ্দেশ্য। কারণ এর পরপরই আল-ফাতিহার আয়াতগুলো উদ্ধৃত হয়েছে। তাই ছালাত নামটি ব্যাখ্যাগতভাবে শক্তিশালী এবং এর ভিত্তি ছহীহ।
(৪)রুকইয়া: ছহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী আবূ সাঈদ আল-খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু সূরা আল-ফাতিহা পড়ে দংশিত ব্যক্তিকে রুকইয়া করেন। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেন, وَمَا يُدْرِيكَ أَنَّهَا رُقْيَةٌ ‘তুমি কীভাবে জানলে যে, সূরা আল-ফাতিহা রুকইয়া?’[12]
এই নামগুলোর বাইরে আরও কিছু নামের কথা তাবেঈগণ উল্লেখ করেছেন। যেমন-
(ক)আল-হামদুলিল্লাহ: এটি খুবই পরিচিত নাম। কারণ সূরা শুরু হয়েছে, الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ দিয়ে। এটি নাম হিসেবে প্রসিদ্ধ, যদিও এখানে আলাদা মারফূ ছহীহ দলীল উল্লেখ করা হয়নি।
(খ)আসাসুল কুরআন: ইবনু কাছীর রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, رَوَى الشَّعْبِيُّ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّهُ سَمَّاهَا: أَسَاسَ الْقُرْآنِ ‘শা‘বী ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘আসাসুল কুরআন’।[13] এটি মূলত ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর নামে একটি আছার; মারফূ হাদীছ নয়। তাছাড়া শা‘বী থেকে ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর বর্ণনা সবসময় শক্তভাবে অবিচ্ছিন্ন কি-না, তা আলাদাভাবে যাচাইসাপেক্ষ। তাই এটিকে ছাহাবীর উক্তি হিসেবে, সেটাও সতর্কতার সঙ্গে বলা ভালো; নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছ হিসেবে নয়।
(গ)আল-ওয়াক্বিয়াহ: এটি সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা রাহিমাহুল্লাহ-এর নামকরণ। এটি আলেমের ব্যাখ্যামূলক নাম, হাদীছ নয়।
(ঘ)আল-কাফিয়াহ: এটি ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাছীর রাহিমাহুল্লাহ-এর নামকরণ। এটিও হাদীছ নয়।
(ঙ)সূরাতুছ ছলাহ ও আল-কান্য: এ দুটি নাম যামাখশারী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেছেন। এগুলো তাফসীরী/অর্থগত নাম, ছহীহ হাদীছে সরাসরি সাব্যস্ত নাম নয়।
উপরের এই নামগুলো ইবনু কাছীর রাহিমাহুল্লাহ তার তাফসীর গ্রন্থে সূরা আল-ফাতিহার ব্যাখ্যার শুরুতে উল্লেখ করেছেন। এই নামগুলো জানলে আমরা একটা বিষয় উপলব্ধি করি যে, প্রত্যেক নাম সূরা আল-ফাতিহার কী কার্যকারিতার দিকে ইঙ্গিত করছে। যেমন সেটা পুরো কুরআনের সারমর্ম, তাই তার নাম উম্মুল কিতাব। এই সূরার মাধ্যমেই কুরআন শুরু করা হয়েছে, ফলে তার নাম ফাতিহা। এক বাক্যে আমরা বলতে পারি যে, তার প্রত্যেকটি নাম তার গুরুত্বকেই স্পষ্ট করে।
উপসংহার:
আমরা প্রতিদিন কমপক্ষে ১৭ বার সূরা আল-ফাতিহা পাঠ করি পাঁচ ওয়াক্ত ফরয ছালাতে। এর বাইরে সুন্নাত, নফল মিলিয়ে আরও অনেক বার। কিন্তু কতবার আমরা ভাবি যে, আমি এমন একটি সূরা পড়ছি, যার তুলনা কোনো কিতাবে নেই? আমি এমন একটি সূরা পড়ছি, যা আসমানের দরজা খোলার সাথে এসেছিল? আমি এমন একটি সূরা পড়ছি, যেখানে আল্লাহ আমার প্রতিটি আয়াতের জবাব দিচ্ছেন? আমি এমন একটি সূরা পড়ছি, যেখানে সমস্ত জ্ঞানের সারাংশ আছে?
আগামীকাল ফজরের ছালাতে যখন ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ বলবেন; তখন থামুন, উপলব্ধি করুন, আল্লাহ শুনছেন এবং আল্লাহ জবাব দিচ্ছেন। এটি শুধু একটি রুটিন নয়— এটি একটি সংলাপ। একটি সাক্ষাৎ। স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সাক্ষাৎ। মালিকের সাথে গোলামের সংলাপ।
আব্দুর রহমান বিন আব্দুর রাযযাক
ফারেগ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বানারাস, ভারত;
বিএ (অনার্স), কিং আব্দুল আযীয বিশ্ববিদ্যালয়, জেদ্দা, সঊদী আরব।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৭৪।
[2]. তিরমিযী, হা/২৮৭৫, ৩১২৫, শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ ছহীহ বলেছেন।
[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/৮০৬; রিয়াযুছ ছালেহীন, হা/১০২২।
[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯৫।
[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯৪।
[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৩৬।
[7]. যাদুল মাআদ, ৪/৫১২-৫১৪।
[8]. যাদুল মাআদ, ৪/২৫৪।
[9]. সুনান তিরমিযী, হা/৩১২৪; সুনানে আবু দাঊদ, হা/১৪৫৭, ‘ছহীহ’।
[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৭৪, ৪৭০৩, ৫০০৬।
[11]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯৫।
[12]. ছহীহ বুখারী, হা/২২৭৬, ৫৭৪৯।
[13]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ১/১০১।
