মানুষ যখন উপলব্ধি করতে পারে যে, তার প্রতিপালক তাকে কতখানি ভালোবাসেন, তখন তার অন্তরে এক অপূর্ব বোধ জাগ্রত হয়। জাহান্নামের ভয় কিংবা জান্নাতের লোভ—এই দুইয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল ভালোবাসার টানেই বান্দা তখন তার প্রভুর দিকে ফিরে আসতে চায়। তাই আজকের এই নিবন্ধে আমরা কুরআনুল কারীমের আলোকে অনুসন্ধান করব মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাকে কতটুকু ভালোবাসেন, কেমনভাবে ভালোবাসেন।
কুরআনের যে আলোচনা সবচেয়ে দীর্ঘ:
কুরআন মাজীদ মানুষের হেদায়াতের জন্য নাযিল হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই কিতাবে ইসলামের সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করেছেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কিছু বিধানের আলোচনা তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে করেছেন, আর কিছু বিষয়কে বিস্তারিতভাবে বারবার তুলে ধরেছেন।
যেমন ছালাতের কথাই ধরা যাক। কুরআনে বহুবার এসেছে ‘আক্বীমুছ ছালাহ’ অর্থাৎ ‘ছালাত ক্বায়েম করো’। কিন্তু ছালাত কখন আদায় করতে হবে, কত ওয়াক্ত, কত রাকআত—এসবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা কুরআনে নেই; বরং তা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ন্যস্ত করা হয়েছে। যাকাতের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়। হজ্জের তিন প্রকার—তামাত্তু, ইফরাদ ও কিরানের বিস্তারিত বিধানও কুরআনে উল্লেখ নেই। এসব বিধানের ব্যাখ্যা এসেছে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ থেকে।
কিন্তু একটি বিষয় আছে, যা মহান আল্লাহ অসংখ্যবার বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তৃত ব্যাখ্যাসহ কুরআনে আলোচনা করেছেন। আর তা হলো মানবসৃষ্টির ইতিহাস, বিশেষত আদম আলাইহিস সালাম-এর সৃষ্টি এবং ইবলীসের সঙ্গে আল্লাহর কথোপকথন। কুরআনের অন্তত ১১টি স্থানে এই ঘটনা এসেছে। কোথাও বলা হয়েছে মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, কোথাও জমাট রক্ত থেকে, কোথাও শুক্রবিন্দু থেকে। কখনো সৃষ্টির বিভিন্ন ধাপের কথা এসেছে, আবার কখনো এসেছে রূহ ফুঁকে দেওয়ার বিবরণ।
কিন্তু কেন কুরআনে বারবার মানুষের সৃষ্টির বিভিন্ন স্তরের কথা আলোচনা করা হয়েছে? কেন প্রথমবার মানুষকে কীভাবে সৃষ্টি করা হলো এবং মায়ের গর্ভে তাকে কীভাবে গঠন করা হয় তা আল্লাহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করছেন? পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা যখন কোনো বিষয় বারবার উল্লেখ করেন, তখন তা নিশ্চয়ই সাধারণ কোনো বিষয় নয়।
পরিচয়: তুমি ‘মানুষ’ নও, তুমি ‘খলীফা’
কুরআনে প্রথম যেখানে মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, সেখানে আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রথম যে পরিচয় উল্লেখ করেছেন তা ছিল মানুষ যমীনে আল্লাহর প্রতিনিধি। মহান আল্লাহ যখন মানব সৃষ্টির ইচ্ছা পোষণ করলেন, তখন ফেরেশতাদের সম্বোধন করে তিনি বললেন,
‘আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, নিশ্চয় আমি যমীনে একজন খলীফা সৃষ্টি করছি’ (আল-বাক্বারা, ২/৩০)।
লক্ষ করুন, এখানে আল্লাহ ‘মানুষ’ বা ‘ইনসান’ শব্দ ব্যবহার করেননি, যদিও আরবীকে এ শব্দগুলো বিদ্যমান ছিল। তিনি বেছে নিয়েছেন একটি বিশেষ শব্দ ‘খলীফা’, যার অর্থ প্রতিনিধি। প্রতিনিধি কাকে বলে? যিনি তার মালিকের আদেশ বাস্তবায়ন করেন। কিন্তু আপনি কি কখনও ভেবেছেন যে, আপনি আল্লাহর প্রতিনিধি? আচ্ছা, আমি প্রতিনিধি বিষয়টি আরেকটু বুঝিয়ে বলি, মনে করুন! আপনাকে বর্তমান বাংলাদেশের কোনো একটি রাজনৈতিক দল তাদের কোনো বিষয়ে আপনাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করেছে। কিন্তু আপনি যেই রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সেই রাজনৈতিক দলেরই যদি বিরোধিতা করেন, তাদের নিয়ম ভায়োলেট করেন; তাহলে কি তারা আপনাকে তাদের প্রতিনিধি রাখবে? এখানে আরেকটি বিষয়, আপনি যার প্রতিনিধি হবেন তার মর্যাদার উপর ভিত্তি করে আপনার সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হবে, তাই নয় কি? এখন আপনি একটু ভাবুন! আপনি পৃথিবীর স্রষ্টার প্রতিনিধি, এই বিশ্ব জগতের যিনি মালিক তাঁর খলীফা। আপনি কি এটা একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করবেন?
ফেরেশতাদেরযুক্তিকেউপেক্ষাকরে মানুষ সৃষ্টি:
আল্লাহর এই ঘোষণার পরই ফেরেশতারা প্রশ্ন করলেন,
‘তারা বলল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যে তাতে (দুনিয়ায়) ফাসাদ করবে এবং রক্ত প্রবাহিত করবে? অথচ আমরা তো আপনার প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করছি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি’ (আল-বাক্বারা, ২/৩০)।
অর্থাৎ প্রতিনিধি করার মাধ্যমে আপনি যদি তার গোলামী বা দাসত্ব চান, তাহলে অমরা ফেরেশতারা তো সেটা করি কোনো প্রকার সীমালঙ্ঘন ছাড়া। এ প্রশ্নের উত্তরে আল্লাহ কী বললেন? তিনি সৃষ্টির কারণ বর্ণনা না করে শুধু বললেন,
‘ইন্নী আ‘লামু মা লা তা‘লামূন’ অর্থাৎ ‘নিশ্চয়ই আমি যা জানি, তোমরা তা জানো না’ (আল-বাক্বারা, ২/৩০)।
সত্যি বলতে আমার কথা ভুল হতে পারে, তবে এই একটি বাক্যেই আমি যে রবের ভালোবাসার গভীরতা উপলব্ধি করেছি, তা হয়তো আপনাকে বুঝাতে পারব না। ফেরেশতাদের মতো নিষ্পাপ, নিরলস ইবাদতকারীর যুক্তিকে উপেক্ষা করে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
জ্ঞানের প্রতিযোগিতা: সম্মানের প্রথম মাপকাঠি
মানুষকে সৃষ্টি করলেন। তারপর কি তিনি আদম আলাইহিস সালাম-কে এই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সৃষ্টিতে রূপান্তরিত করলেন? অথবা ফেরেশতাদেরকে বললেন, আদম আলাইহিস সালাম এই পৃথিবীর এমন সৃষ্টি যাকে আমি এই পৃথিবীর সকল মূল্যবান সম্পদ দিয়ে দিয়েছি, সুতরাং সে তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ? আল্লাহ এসবের কিছুই বলেননি। বরং তিনি তাকে জ্ঞান দিলেন, এটাই তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা প্রমাণ করার সবচেয়ে উপযুক্ত মাধ্যম। তিনি বলেন,
‘আর তিনি আদমকে সমস্ত নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর সেগুলো ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করে বললেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তবে এদের নামসমূহ আমাকে বলে দাও। তারা বলল, আপনি পবিত্র, আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই’ (আল-বাক্বারা, ২/৩১-৩২)।
এখানে আরবী শব্দ ‘আল-আসমা’ ও ‘কুল্লাহা’ উভয়ই ‘সমস্ত’ ও ‘সকল’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আদম আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ এমন কোনো জ্ঞান নাই, যা তাকে শেখাননি। আজ আমাদের ঘরে যে আলো জ্বলছে, যে পাখা ঘুরছে, আকাশে যে বিমান উড়ছে, যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি—এ সবকিছুর মূল ভিত্তি এবং এর পেছনের অন্তর্নিহিত জ্ঞান আল্লাহ সেদিন আদম আলাইহিস সালাম-কে শিক্ষা দিয়েছিলেন।
এরপর তিনি ফেরেশতাদের সামনে সবকিছু পেশ করলেন এবং বললেন, ‘বলো, এদের নাম কী? তোমরা যদি জেনে থাক এগুলো কী, তাহলে সেগুলোর নাম বলো। তারা স্বীকার করলেন তাদের অজ্ঞতা। তারপর আল্লাহ আদম আলাইহিস সালাম-কে আদেশ দিলেন, ‘হে আদম! তুমি বলে দাও’। আদম আলাইহিস সালাম এক এক করে সব নাম বলে দিলেন।
আমরা যদি একটু সাধারণভাবে দেখি, তাহলে ফেরেশতা ও আদম আলাইহিস সালাম-এর মাঝে নাম বলতে পারা বা না পারার বিষয়টি অনেকটা প্রতিযোগিতার মতো। যদি সাময়িকভাবে আমরা এটাকে প্রতিযোগিতা হিসেবে মেনে নিই, তাহলে এটিই পৃথিবীর ইতিহাসের সর্বপ্রথম প্রতিযোগিতা এবং সেই প্রতিযোগিতা ছিল জ্ঞানের। আদম আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ সম্মানিত করেছেন জ্ঞান দিয়ে। প্রতিযোগিতায় জয়ের মাধ্যমে আদম আলাইহিস সালাম-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়েছে।
এই সত্যটি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। আজ যদি কেউ পৃথিবীতে নেতৃত্ব দিতে চায়, যদি কোনো জাতি সম্মানিত হতে চায়, তাহলে তাকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। মুসলিম উম্মাহ যখন জ্ঞানের শীর্ষে ছিল, তখন তারা অর্ধেক পৃথিবী শাসন করেছে। আজ যাদের হাতে জ্ঞান-বিজ্ঞান, তাদের হাতেই বিশ্বনেতৃত্ব। কারণ সম্মানের প্রথম মাপকাঠি জ্ঞান।
সিজদা:
জ্ঞান দিয়ে সম্মানিত করার পর্ব শেষ হলে আল্লাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দিলেন,
‘আর যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা করো, তখন তারা সিজদা করল; তবে ইবলীস ব্যতীত, সে অস্বীকার করল ও অহংকার করল এবং সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হলো’ (আল-বাক্বারা, ২/৩৪)।
ইসলামের আগের সিজদা ও পরের সিজদা নিয়ে আমি আলোচনা করছি না অথবা ফেরেশতাদের সিজদার হুকুম বিষয়েও আলোচনা করছি না, আমি শুধু এতটুকু বুঝানোর জন্য সামনের কথাগুলো বলব যে, সিজদা গুরুত্বপূর্ণ কিছু। সিজদার গুরুত্ব বুঝতে হলে কিছু কথা স্মরণ করা প্রয়োজন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন বান্দার কাছ থেকে সবার আগে যে হিসাব নেওয়া হবে, তা হলো ছালাতের। ছালাত যার শুদ্ধ হবে, তার বাকি সব হিসাব পরিশুদ্ধ গণ্য হবে। সকল ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ছালাত, আর ছালাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সিজদা, যেখানে বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়।
অন্যদিকে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গুনাহ শিরক, যার অর্থ আল্লাহর ইবাদতে কাউকে অংশীদার করা। সুতরাং বলা যায় যে, ইবাদত যত বড় হবে এবং তা যখন অন্য কারও জন্য করা হবে, তখন সেটা শিরকের মধ্যে তত বড় শিরক।
যদিও এই সিজদা ইবাদতের উদ্দেশ্যে ছিল না। তবে সেই সিজদা ছিল বাস্তবেই গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই সিজদা ছিল সম্মান প্রদর্শনের জন্য।
‘যাকে আমি নিজে দুই হাতে সৃষ্টি করেছি’:
সিজদার এই আদেশে ইবলীস অহংকার করল। সে আল্লাহর আদেশকে উপেক্ষা করল। সে ভাবল, সে তো আগুনের সৃষ্টি, সে কেন মাটির তৈরি আদমকে সিজদা করে সম্মান প্রদর্শন করবে? আল্লাহর আদেশকে লঙ্ঘন করে ধৃষ্টতা প্রদর্শনের পরে আল্লাহ চাইলে তখনই কোনো ফেরেশতাকে আদেশ দিতে পারতেন তাকে বিতাড়িত করতে, কিন্তু আল্লাহ তা করলেন না। কুরআনের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল কিছু মুহূর্ত আছে যেখানে মহান আল্লাহ সরাসরি কারো সঙ্গে কথা বলেছেন। যেমন তিনি মূসা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেই বিরল মুহূর্তগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে আল্লাহ স্বয়ং কোনো মাধ্যম ছাড়া ইবলীসকে সম্বোধন করেছেন। আর এই কথোপকথনের কেন্দ্রবিন্দু কে? মানুষ!
‘তিনি বললেন, হে ইবলীস! আমি যাকে নিজ দুই হাতে সৃষ্টি করেছি, তাকে সিজদা করতে তোমাকে কে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন?’ (ছোয়াদ, ৩৮/৭৫)।
এখানে আরবী শব্দ ‘বি-ইয়াদাইয়্যা’ অর্থ ‘আমার দুই হাতে’। আল্লাহ বলেননি, ‘যাকে আমি সৃষ্টি করেছি’; তিনি বললেন, ‘যাকে আমি আমার নিজের দুই হাতে সৃষ্টি করেছি’। পৃথিবী ও আকাশমণ্ডল সৃষ্টির সময় আল্লাহ শুধু বলেছিলেন, ‘কুন’ তথা ‘হও’; আর তা হয়ে গেছে। কিন্তু আদম আলাইহিস সালাম-কে সৃষ্টি করার সময় তিনি বললেন, ‘আমি নিজে আমার দুই হাত দিয়ে’। ইবলীস উত্তর দিল, ‘আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে মাটি থেকে’। এর জবাবে আল্লাহ ইবলীসকে চিরদিনের জন্য বিতাড়িত করলেন। শুধু তা-ই নয়, ক্বিয়ামত পর্যন্ত তার উপর লা‘নত ঘোষণা করলেন। আমরা যতবার ‘আঊযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম’ পড়ি, এই ‘রাজীম’ অর্থই বিতাড়িত। ঠিক এই কারণেই তাকে বিতাড়িত বলা হয়, কারণ সে আদম আলাইহিস সালাম-কে সিজদা করেনি।
এটা কি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা? নাকি এর প্রতিটি স্তরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বান্দার প্রতি প্রতিপালকের সেই গভীর স্নেহ, যত্ন ও করুণা? আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে বললেন, আদমকে সিজদা করতে এটা অবশ্যই অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ইবলীস যখন সিজদা করল না, তখন আল্লাহ ইবলীসের সাথে কথা বললেন সিজদা না করার এই বিষয়টি নিয়ে, এটা অবশ্যই সাধারণ কিছু নয়। এরপর যেটা ঘটল আদম আলাইহিস সালাম-কে সিজদা না করার অপরাধে এবং অহংকার করে আল্লাহর আদেশ প্রত্যাখ্যান করার কারণে আল্লাহ তাকে চিরদিনের মতো তাড়িয়ে দিলেন। আল্লাহ তাকে বললেন, ‘তুমি বের হয়ে যাও, নিশ্চয় তুমি বিতাড়িত’, আরও বললেন, ‘নিশ্চয় ক্বিয়ামত পর্যন্ত আমার অভিশাপ রইল তোমার উপর’। আজ অবধি আমরা মুসলিমরা ইবলীসকে বিতাড়িত শয়তান হিসেবে তাকে অভিশাপ দেই।
কিন্তু বিশাল এই ঘটনাপ্রবাহে আদম আলাইহিস সালাম-এর সন্তান হিসেবে আমার-আপনার কি কখনও এ অনুভূতি জেগেছে যে, আদম সন্তানের প্রতি আল্লাহর এক বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা রয়েছে? আপনার পূর্বপুরুষকে কেউ সিজদা না করার কারণে আল্লাহ নিজেই তার সঙ্গে কথা বলেছেন।
এই ঘটনায় যে দিকটি আদম আলাইহিস সালাম-এর প্রতি আল্লাহর স্নেহ ও মর্যাদাকে আরও গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলে, তা হলো আল্লাহ ইবলীসকে বলছেন, তুমি যাকে সিজদা করনি, সে তো সাধারণ কেউ নয়; সে এক অসাধারণ সৃষ্টি। তবে তার অসাধারণত্ব এ কারণে নয় যে, তার অনেক শক্তি রয়েছে কিংবা তাকে অগাধ সম্পদ দেওয়া হয়েছে; বরং তার মর্যাদার কারণ হলো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন।
ইবলীসের চ্যালেঞ্জ ও আল্লাহর উত্তর:
বিতাড়িত হওয়ার পর ইবলীস আল্লাহকে এক ভয়ংকর প্রতিজ্ঞা শোনাল,
‘সে বলল, আপনি যেহেতু আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব। তারপর আমি অবশ্যই তাদের নিকট আসব তাদের সম্মুখ থেকে, তাদের পশ্চাৎ থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৬-১৭)।
ইবলীস আদম আলাইহিস সালাম ও তার সন্তানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। সে শপথ করল, আদম সন্তানের ছিরাতুল মুস্তাক্বীমের পথে ওত পেতে বসে থাকবে; ফজরের ছালাতের পথে, রামাযানের ছিয়ামের পথে, দানের পথে, ইবাদতের প্রতিটি পথে। চারদিক থেকে সে আদম সন্তানকে বাধা দেবে, যেন তারা কোনো ভালো কাজ করতে না পারে।
কিন্তু ইবলীসের এই যুদ্ধ ঘোষণার বিপরীতে আল্লাহ কী বললেন? তিনি এমন কথাই বললেন, যা একজন মালিক তার বিশ্বস্ত বান্দা সম্পর্কে বলতে পারেন। কারণ তিনি তাঁর বান্দার প্রতি আস্থা রাখেন। আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, ইবলীস কখনোই তাঁর একনিষ্ঠ বান্দাদের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। তিনি ইবলীসকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দিলেন এবং পাল্টা বললেন,
‘নিশ্চয়ই আমার (নিষ্ঠাবান) বান্দাদের উপর তোমার কোনো ক্ষমতা থাকবে না; পথভ্রষ্টদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে, তাদের কথা ভিন্ন’ (আল-হিজর, ১৫/৪২)।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ এখানে ‘নেককার বান্দা’ কিংবা ‘মুত্তাক্বী বান্দা’ বলেননি; বরং বলেছেন, ‘আমার বান্দা’। অর্থাৎ যারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে নিজেদের রব হিসেবে মেনে নেয়, যারা অন্তর থেকে নিজেকে তাঁর গোলাম ও অনুগত বান্দা মনে করে, ইবলীস তাদের পথভ্রষ্ট করতে সক্ষম হবে না।
ইবলীসের সঙ্গে এক প্লেটে?
এই সমস্ত আলোচনার পর এক করুণ বাস্তবতা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। যাদের কারণে আল্লাহ ইবলীসকে বিতাড়িত করলেন, যাদের জন্য ক্বিয়ামত পর্যন্ত তার উপর লা‘নত নাযিল হলো, আজ আমরা কার কথা শুনছি?
আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন কিছু মুহূর্ত এসেছে, যখন আমরা ফজরের আযানের পরও বিছানায় শুয়ে থেকেছি, রামাযানে ছিয়াম ভঙ্গ করেছি, কাজের অজুহাতে ছালাত পরিত্যাগ করেছি, কিংবা পরনারীর মোহে বিভ্রান্ত হয়েছি। সেই মুহূর্তগুলোতে আমরা আসলে কার আনুগত্য করেছি? সেই ইবলীসের, যে আমাদের পিতা আদম আলাইহিস সালাম-কে সিজদা করতে অস্বীকার করেছিল।
একটু কল্পনা করুন, কেউ যদি আপনার বাবাকে অপমান করে, আপনি কি তার সঙ্গে এক টেবিলে বসে খেতে পারবেন? কেউ যদি আপনার সন্তানের গায়ে হাত তোলে, আপনি কি তাকে সহজে মেনে নিতে পারবেন? কেউ যদি আপনার মানসম্মান ক্ষুণ্ন করে, আপনার আত্মমর্যাদা কি তা মেনে নেবে? কখনোই না।
তাহলে সেই ইবলীস, যে আদম সন্তানকে সিজদা করতে অস্বীকার করার কারণেই আজ চিরবিতাড়িত, তার ডাকে সাড়া দিয়ে ছালাত ছেড়ে দেওয়া, তার প্ররোচনায় গুনাহে লিপ্ত হওয়া—এসব কি আমাদের সম্মান ও আত্মমর্যাদার সঙ্গে মানানসই? এসব কি আমাদের প্রভুর প্রতি সামান্যতম কৃতজ্ঞতার পরিচয় বহন করে?
‘নিশ্চয় আমি অতি নিকটে’:
আমরা নিজের আত্মসম্মান ও মর্যাদা ভুলে সেই ইবলীসের আনুগত্য করেছি। পাপে লিপ্ত হয়েছি। কিন্তু আমাদের পাপের পাহাড়সম অপরাধ সত্ত্বেও আল্লাহ কি আমাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? তিনি কি রাগান্বিত হয়ে বলেছেন, যাহ! আমি তোদেরকে একেবারেই জাহান্নামে দিয়ে দিলাম? না, কখনোই না। তিনি আমাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত করে দেননি। বরং তাঁর এই নগণ্য বান্দাদের জন্য ক্ষমা ও তওবার দরজা উন্মুক্ত রেখেছেন। সেই আল্লাহ একটি বিস্ময়কর আয়াত নাযিল করেছেন,
‘আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দাও) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই। কাজেই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে’ (আল-বাক্বারা,২/১৮৬)।
আয়াতের গভীরতা অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে একটু কুরআনের অন্য কিছু আয়াত নিয়ে চিন্তা করতে হবে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে মহান আল্লাহ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে করা কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। যেমন- যখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ‘খমর’ বা নেশাদার দ্রব্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তখন আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে নবী! আপনি বলে দিন। যখন হারাম মাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তখন আল্লাহ আবার একইভাবে বলেছেন, হে নবী! আপনি বলে দিন যে বিষয়টি এই রকম। কুরআনে প্রায় সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বাক্যের প্যাটার্ন অনেকটা একই রকম যে ‘হে নবী! আপনি বলে দিন বিষয়টি এই রকম। শুধু একটি স্থানে এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে সেটি হচ্ছে উপরে উল্লেখকৃত আয়াতে। যখন বান্দা আল্লাহর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছে, তখন তিনি বলেননি, ‘হে মুহাম্মাদ! তুমি বলো’; বরং তিনি সরাসরি বললেন, ‘ফা-ইন্নী ক্বারীব’ অর্থাৎ নিশ্চয় আমি (অতি) নিকটে। যেন বিষয়টি অনেকটা এই রকম যে, যখন আমার বান্দা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে তখন আমি নিজেই বলছি যে, আমি আমার বান্দার নিকটে আছি, সে আমার কাছে যা চাইবে আমি সেটা তাকে দিব। বিষয়টি এই রকম যে, মাঝখানে কোনো জিবরীল নেই, কোনো রাসূল নেই, শুধু আল্লাহ আর তাঁর বান্দা।
উপরের বিষয়টি আমাদের আরও গভীরভাবে উপলব্ধি হবে, যদি আমরা এই হাদীছটি পড়ি ও বুঝার চেষ্টা করি, যেখানে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আসমানে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন, কে আছে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব; কে আছে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব; কে আছে আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে দান করব’।[1]
মা ও সন্তান: একটি হৃদয়স্পর্শী হাদীছ
ছহীহ বুখারীতে উমার ইবনুল খাত্ত্বাব রাযিয়াল্লাহু আনহু এক অসাধারণ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। একবার নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে কিছু যুদ্ধবন্দি আনা হলো। তাদের মধ্যে একজন স্ত্রীলোক ছিল, যার স্তন দুধে পূর্ণ এবং বন্দিদের মধ্যে যে কোনো শিশু পেলেই সে তাকে বুকে জড়িয়ে দুধ খাওয়াচ্ছিল, সম্ভবত তার নিজের সন্তানকে সে হারিয়ে ফেলেছিল। নবীজি ছাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কী মনে কর, এই মহিলা তার সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে?’ ছাহাবীরা বললেন, না, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ক্ষমতা থাকলেও সে কখনো করবে না। তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
‘এ স্ত্রীলোকটি তার সন্তানের উপর যতটা দয়ালু, আল্লাহ তাঁর বান্দার উপর তার চেয়েও অধিক দয়ালু’।[2]
ভাবুন তো, আপনি আপনার সন্তানের সামান্য জ্বরে অস্থির হয়ে যান, তার একটু কষ্টও সইতে পারেন না, আপনার সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করার কথা কল্পনা করতেও আপনার শিরা কেঁপে ওঠে; আর সেই আপনার প্রতি আল্লাহর ভালোবাসা সেই মায়ের ভালোবাসার চেয়েও বহুগুণ বেশি!
কল্পনা করুন, আপনি বিমানে উড়ছেন। হঠাৎ ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেল, বিমান নিচে নামতে শুরু করল, মাটির খুব কাছে এসে আবার ইঞ্জিন চালু হয়ে গেল। আপনি কতখানি আনন্দিত হবেন? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
‘আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন, যতখানি তোমাদের মধ্যে কেউ মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া বাহন ফিরে পেলে আনন্দিত হয়’।[3]
আল্লাহ আপনার তওবায় খুশি হন! আপনার ফিরে আসায় তিনি আনন্দিত হন! এই তো সেই প্রতিপালক, যিনি কুরআনের অসংখ্য আয়াতে বলেছেন,
‘হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেন’ (আয-যুমার, ৩৯/৫৩)।
উপসংহার:
আসুন, আমরা আল্লাহর ভালোবাসার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে। যেহেতু আমাদের কারণেই আল্লাহ ইবলীসকে বিতাড়িত করেছিলেন, আমাদের কারণেই ক্বিয়ামত পর্যন্ত তার উপর লা‘নত নাযিল হয়েছে, আজ থেকে অন্তত এই শপথ হোক যে, আমরা আর সেই ইবলীসের আনুগত্য করব না। তার ডাকে সাড়া দিয়ে ছালাত ত্যাগ করব না, ছিয়াম ভঙ্গ করব না, পাপের পথে পা বাড়াব না।
আমাদের প্রতিপালক আমাদের ভালোবাসেন। তিনি কেবল জাহান্নামের ভয়ই দেখাননি; বরং প্রতিটি স্তরে, খলীফা সৃষ্টিতে, জ্ঞান শিক্ষায়, প্রতিযোগিতার আয়োজনে, সিজদার আদেশে, ইবলীসের সঙ্গে কথোপকথনে এবং ক্ষমার আহ্বানে আল্লাহ প্রমাণ করেছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের কতখানি ভালোবাসেন। এই ভালোবাসা অনুধাবন করেই বান্দার উচিত তার রবের দিকে ফিরে আসা।
আল্লাহ আমাদের সকলকে ইবলীসের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করুন, তাঁর ভালোবাসা অনুধাবনের তাওফীক্ব দান করুন, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত নিয়মিত আদায় করার এবং হক্বের পথে অবিচল থাকার শক্তি দিন- আমীন!
আব্দুর রহমান বিন আব্দুর রাযযাক
* ফারেগ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বানারাস, ভারত;
বিএ (অনার্স), কিং আব্দুল আযীয বিশ্ববিদ্যালয়, জেদ্দা, সঊদী আরব।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১১৪৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৫৮।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৯৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৫৪।
[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৪৭।
