কারাগার: যেখানে মুমিন গড়ে ওঠে
ইউসুফ আলাইহিস সালাম নির্দোষ হয়েও কারাগারে গেলেন। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, কারাগার তাকে তিক্ত বা বিরক্ত করেনি। তিনি সেখানে বসে শুধু নিজের দুঃখের গল্প বলেননি; বরং মানুষের উপকার করেছেন, দাওয়াত দিয়েছেন, স্বপ্নের ব্যাখ্যা করেছেন, আল্লাহর একত্বের দিকে ডেকেছেন। কারাগারে দুই যুবক তার কাছে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে এলো, তিনি তাদের স্বপ্নের শুধু ব্যাখ্যাই দিলেন না, তাদেরকে সঠিক পথের দাওয়াতও দিলেন। তিনি নিজের কষ্টকে অজুহাত বানাননি। তিনি বলেননি, আমি নিজেই বিপদে আছি, তোমাদের কী সাহায্য করব? বরং নিজের অন্ধকারেও তিনি অন্যের জন্য আলো হলেন।
পরিস্থিতি খারাপ হলেই চরিত্র খারাপ হতে হবে—এ কথা সত্য নয়। তার পরিচয় পরিবেশ নির্ধারণ করেনি; তাঁর পরিচয় নির্ধারণ করেছে ঈমান, তাক্বওয়া ও চরিত্র। দাওয়াহর জন্য মঞ্চের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন হৃদয়ের আগুন। কারাগারেও দাওয়াহ হতে পারে, সংকটের মাঝেও মানুষকে সত্যের দিকে ডাকা যায়। নিজের দুঃখকে কেন্দ্র করে বসে থাকলে মানুষ ছোট হয়ে যায়, বরং নিজের দুঃখের মধ্যেও অন্যের কল্যাণ ভাবলে মানুষ বড় হয়ে যায়।
মানুষের অকৃতজ্ঞতা:
‘যার সম্পর্কে সে ধারণা করেছিল যে সে মুক্তি পাবে, তাকে সে বলল, তোমার মালিকের কাছে আমার কথা উল্লেখ করো। কিন্তু শয়তান তাকে তার মালিকের কাছে উল্লেখ করতে ভুলিয়ে দিল। ফলে সে কয়েক বছর কারাগারে থাকল’ (ইউসুফ, ১২/৪২)।
ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যখন তারা নিজেরাও অসহায় ছিল। কিন্তু জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরপরই সে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর অনুরোধ ভুলে গেল। কখনো আমরা কারও উপকার করি, সে ভুলে যায়; কারও পাশে দাঁড়াই, সে ফিরে তাকায় না; কারও জন্য অপেক্ষা করি, সে মনে রাখে না; কারও কাছে আশা রাখি, সে ব্যস্ত হয়ে যায়। মানুষ ভুলে যায় এটাই মানুষের স্বভাব।
কিন্তু যে মানুষ ভুলে গিয়েছিল, আল্লাহ তাকে সঠিক সময়ে মনে করিয়ে দিলেন। বাদশাহর স্বপ্নের সময় সেই কারাগারের সঙ্গী আবার ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে স্মরণ করল। তোমাকে মানুষ ভুলে গেলে ভেঙে পড়ো না। আল্লাহ যদি তোমাকে মনে রাখেন, যথাসময়ে পৃথিবীকেও তোমার প্রয়োজন মনে করিয়ে দেবেন।
স্বপ্নের ব্যাখ্যা থেকে রাষ্ট্রনীতি:
বাদশাহ স্বপ্ন দেখলেন। ঘটনাটি কুরআনে এসেছে এভাবে, وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَىٰ سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنبُلَاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ ‘বাদশাহ বলল, আমি দেখছি সাতটি মোটা গরু, যাদের খেয়ে ফেলছে সাতটি শুকনো গরু; আর সাতটি সবুজ শিষ এবং অন্যগুলো শুকনো’ (ইউসুফ, ১২/৪৩)।
রাজদরবারের লোকেরা এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারল না। কিন্তু কারাগারের সেই ভুলে যাওয়া মানুষ হঠাৎ ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে স্মরণ করল। ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ব্যাখ্যা শুধু ‘স্বপ্নের অর্থ’ ছিল না, সেটি ছিল পূর্ণ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। তিনি বললেন, ‘তোমরা ধারাবাহিকভাবে সাত বছর চাষ করবে। তোমরা যা কাটবে, তা শিষের মধ্যেই রেখে দেবে, শুধু অল্প যা খাবে তা ছাড়া। তারপর আসবে সাতটি কঠিন বছর, যা তোমরা আগে থেকে যা সঞ্চয় করেছ, তা থেকে খাবে’ (ইউসুফ, ১২/৪৭-৪৮)।
নির্দোষ প্রমাণের অপেক্ষা: সম্মানের মূল্য
বাদশাহ যখন ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে কারাগার থেকে ডেকে পাঠালেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসেননি। আগে তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্ত চাইলেন,وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ فَلَمَّا جَاءَهُ الرَّسُولُ قَالَ ارْجِعْ إِلَىٰ رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ مَا بَالُ النِّسْوَةِ اللَّاتِي قَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ ‘বাদশাহ বলল, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। যখন দূত তার কাছে এলো, সে বলল, তোমার মালিকের কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস করো সেই নারীদের কী অবস্থা, যারা নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিল?’ (ইউসুফ, ১২/৫০)।
তিনি শুধু মুক্তি চাননি, তিনি সত্যের প্রতিষ্ঠা চেয়েছিলেন। অপবাদ মাথায় নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া তার লক্ষ্য ছিল না। তিনি জানতেন, নেতৃত্বের ভিত্তি শুধু দক্ষতা নয়; নৈতিক স্বচ্ছতাও। এখানে আধুনিক সমাজের জন্য বড় শিক্ষা আছে। আমরা অনেক সময় সুযোগ পেলে চরিত্রের প্রশ্ন ভুলে যাই তথা পদ পেলেই চলবে, খ্যাতি পেলেই চলবে, অর্থ পেলেই চলবে—এমন মনোভাব তৈরি হয়। কিন্তু ইউসুফ আলাইহিস সালাম দেখালেন, সম্মানের আগে সত্য, পদের আগে পবিত্রতা এবং ক্ষমতার আগে চরিত্র।
নফসকে নির্দোষ ঘোষণা নয়: আত্মজ্ঞান ও বিনয়
সত্য প্রকাশের পরে সূরা ইউসুফে একটি গভীর আত্মজ্ঞানমূলক বাক্য এসেছে,وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ‘আমি নিজের নফসকে নির্দোষ ঘোষণা করছি না। নিশ্চয়ই নফস মন্দের দিকে প্রবলভাবে আদেশ করে, তবে আমার রব যার উপর দয়া করেন’ (ইউসুফ, ১২/৫৩)।
এই আয়াত মানুষের আত্মচিন্তার আয়না। মানুষের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু কখনো বাইরের মানুষ নয়, নিজের নফস। যে মানুষ নিজের নফসকে চেনে না, সে নিজেকে নিরাপদ ভাবে; আর যে নিজেকে নিরাপদ ভাবে, সে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। নিজের ভেতরের অহংকার, কামনা, প্রতিশোধস্পৃহা, স্বীকৃতিলিপ্সা, অলসতা, হিংসা, আত্মপ্রবঞ্চনা—এসবও চিনতে হবে। আত্মশুদ্ধির শুরু এখানেই, আমি নিজেকে ফেরেশতা ভাবব না; আমি হব আল্লাহর রহমতের মুখাপেক্ষী।
যোগ্যতা প্রকাশ অহংকার নয়, যদি সমাজের প্রয়োজন থাকে:
যখন বাদশাহ ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর মর্যাদা ও আস্থা স্বীকার করলেন, তখন কুরআন বলে,وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ أَسْتَخْلِصْهُ لِنَفْسِي فَلَمَّا كَلَّمَهُ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ أَمِينٌ ‘বাদশাহ বলল, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো, আমি তাকে আমার বিশেষ কাজে নিয়োজিত করব। যখন সে তার সঙ্গে কথা বলল, সে বলল, আজ তুমি আমাদের কাছে মর্যাদাবান ও বিশ্বস্ত’ (ইউসুফ, ১২/৫৪)।
এরপর ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন,قَالَ اجْعَلْنِي عَلَىٰ خَزَائِنِ الْأَرْضِ ۖ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ ‘সে বলল, আমাকে দেশের ভাণ্ডারসমূহের দায়িত্ব দিন; নিশ্চয়ই আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও জ্ঞানসম্পন্ন’ (ইউসুফ, ১২/৫৫)।
এখানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য আছে। সাধারণভাবে মানুষ নিজের প্রশংসা করবে না। কিন্তু যখন সমাজের প্রয়োজন, নিজের যোগ্যতা অজানা এবং দায়িত্ব গ্রহণ করলে মানুষের উপকার হবে, তখন নিজের সক্ষমতা জানানো অহংকার নয়; বরং দায়িত্ববোধ। আজ আমাদের সমাজে দুই ধরনের সমস্যা দেখা যায়। একদল অযোগ্য হয়েও পদ চায়; আরেকদল যোগ্য হয়েও ভয়ে, সংকোচে, আত্মবিশ্বাসের অভাবে দায়িত্ব নেয় না। সূরা ইউসুফ দ্বিতীয় দলকে বলে, যদি তুমি সত্যিই যোগ্য হও, আমানত রক্ষা করতে পার, জ্ঞান থাকে এবং সমাজের উপকার হয়; তবে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যেয়ো না।
তবে শর্ত দুটি حَفِيظٌ ও عَلِيمٌ অর্থাৎ সততা ও দক্ষতা। শুধু সৎ হলেই হবে না, দক্ষতাও চাই; শুধু দক্ষ হলেই হবে না, সততাও চাই। সৎ কিন্তু অদক্ষ ব্যক্তি অনেক সময় ভালো উদ্দেশ্য নিয়েও ক্ষতি করে, আর দক্ষ কিন্তু অসৎ ব্যক্তি সমাজকে ধ্বংস করে। ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর নেতৃত্বের মূলনীতি হলো নৈতিকতা ও জ্ঞানের মিলন।
সফলতা আল্লাহর পক্ষ থেকে:
ইউসুফ আলাইহিস সালাম দায়িত্ব পেলেন, মন্ত্রী হলেন এবং মিথ্যা অপবাদের কারাগার-জীবন থেকে রাজসিংহাসনের পথে যাত্রা করলেন। আল্লাহর কোন পরীক্ষার মধ্যে কী কল্যাণ নিহিত আছে, তা আমরা কেউ জানি না। নিষ্পাপ অবস্থায় জেলে গিয়ে ইউসুফ আলাইহিস সালাম আল্লাহকে দোষ দেননি এবং রবের সিদ্ধান্তের প্রতি তার কোনো আফসোস ছিল না। তিনি ভবিষ্যৎ জানতেন না, কিন্তু কারণ ছাড়াই বিপদে পড়ে রবের প্রতি শিকায়েত আর সন্দেহের তীর নিক্ষেপ করেননি। কোনো আফসোস ছাড়াই জেলে বসেও তিনি রবের পথেই মানুষকে ডেকেছেন।
আমি-আপনি হলে কী করতাম? হয়তো বলতাম, আল্লাহ! আমি তো নির্দোষ, তাও এই শাস্তি দিচ্ছ কেন? দুর্বল ঈমানের কেউ হলে হয়তো বলত, আমি আল্লাহর কোনো সীমালঙ্ঘন করিনি, তাও তিনি আমাকে শাস্তি দিলেন কেন? তাহলে পরহেজগার থাকার উপকার কী? ইউসুফ আলাইহিস সালাম আমাদের শিখিয়েছেন, কঠিন বিপদের মাঝেও আল্লাহর উপর ভরসা করে মুক্তির অপেক্ষা করা এবং রবকে ডাকতে ভুলে না যাওয়া।
আরেকটি বিষয় হলো কুরআন ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর এই উত্থানকে শুধু রাজনৈতিক উত্থান হিসেবে বর্ণনা করেনি; বরং আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে বর্ণনা করেছে,وَكَذَٰلِكَمَكَّنَّالِيُوسُفَفِيالْأَرْضِيَتَبَوَّأُمِنْهَاحَيْثُيَشَاءُنُصِيبُبِرَحْمَتِنَامَننَّشَاءُوَلَانُضِيعُأَجْرَالْمُحْسِنِينَ ‘এভাবেই আমি ইউসুফকে দেশে প্রতিষ্ঠা করে দিলাম; সে সেখানে যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করত। আমি যাকে চাই, আমার রহমত পৌঁছে দিই। আর সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করি না’ (ইউসুফ, ১২/৫৬)।
মানুষ দেখে যে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম পরিকল্পনা করলেন, ব্যাখ্যা দিলেন এবং পদ পেলেন। আর কুরআন বলে, আল্লাহ তাকে এগুলো দিয়েছেন। এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধ নেই। মানুষ চেষ্টা করে, যোগ্যতা অর্জন করে, সততা ধরে রাখে; কিন্তু দরজা খুলে দেন আল্লাহ। সেটা তিনি চাইলে দুনিয়ায় খুলবেন, চাইলে আখেরাতে। আজকের যুবক যদি সফলতা চায়, তবে তাকে দুই কাজ একসাথে করতে হবে তথা যোগ্যতা অর্জন এবং আল্লাহর রহমতের মুখাপেক্ষিতা। শুধু দু‘আ করে দক্ষতা অর্জন না করলে চলবে না; আবার শুধু দক্ষতা নিয়ে আল্লাহকে ভুলে গেলেও চলবে না।
ক্ষমতা ও ক্ষমা:
বাদশাহর স্বপ্ন এবং ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর তাবীর বা ব্যাখ্যা অনুযায়ী দুর্ভিক্ষ শুরু হলো। মিশরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সরকারের কাছে গুদামজাত খাবার সংগ্রহের জন্য সাধারণ মানুষ আসতে থাকল। সেই সাহায্যপ্রার্থীদের মধ্যে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইয়েরাও ছিল। তিনি তাদের চিনতেও পারলেন,وَجَاءَ إِخْوَةُ يُوسُفَ فَدَخَلُوا عَلَيْهِ فَعَرَفَهُمْ وَهُمْ لَهُ مُنكِرُونَ ‘ইউসুফের ভাইয়েরা এলো এবং তার সামনে প্রবেশ করল। সে তাদের চিনল, কিন্তু তারা তাকে চিনল না’ (ইউসুফ, ১২/৫৮)।
যারা একদিন তাকে অসহায় অবস্থায় কূপে ফেলেছিল, আজ তারা তার সামনে প্রয়োজন নিয়ে দাঁড়িয়েছে। যে হাত তাকে দূরে সরিয়েছিল, আজ সেই হাত খাদ্যের জন্য প্রসারিত। যে মুখ মিথ্যা বলেছিল, আজ সেই মুখ অজান্তে তার কাছেই সাহায্য চাইছে। কিন্তু ইউসুফ আলাইহিস সালাম প্রতিশোধের নেশায় আক্রান্ত হননি এবং ক্ষমতার চূড়ায় দাঁড়িয়েও তিনি প্রতিশোধ নেননি। তার ভাইয়েরা তাকে কূপে ফেলেছিল, তার শৈশব কেড়ে নিয়েছিল, তাকে পিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল, তার জীবনের পথকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল; কিন্তু যখন তারা তার সামনে অসহায় হয়ে দাঁড়াল, তিনি বললেন,قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ ‘সে বলল, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো ভর্ৎসনা নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন, আর তিনি দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু’ (ইউসুফ, ১২/৯২)।
এমন ক্ষমা দুর্বলতার ক্ষমা নয়, এটি শক্তির ক্ষমা। দুর্বল মানুষ অনেক সময় ক্ষমা করে, কারণ তার প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা নেই; কিন্তু ইউসুফ আলাইহিস সালাম ক্ষমা করলেন তখন, যখন তার হাতে ক্ষমতা ছিল। ক্ষমতা থাকা অবস্থায় ক্ষমা করতে পারাটাই প্রকৃত ক্ষমা। আজকের সমাজে আমরা ক্ষুদ্র অপমানও ভুলতে পারি না। সামান্য মন্তব্য, সামান্য সমালোচনা, সামান্য অসম্মানের কারণে আমাদের মনে বছরের পর বছর আমরা বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে রাখি। অথচ ইউসুফ আলাইহিস সালাম জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতকে আল্লাহর দিকে সোপর্দ করলেন। ক্ষমা মানে অন্যায়কে বৈধ করা নয়, বরং ক্ষমা মানে হৃদয়কে প্রতিশোধের কারাগার থেকে মুক্ত করা।
ছবর ও তাক্বওয়া: সফলতার কুরআনিক সূত্র
‘আমি ইউসুফ, আর এ আমার ভাই। আল্লাহ আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন। নিশ্চয়ই যে তাক্বওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধরে, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না’ (ইউসুফ, ১২/৯০)।
স্বপ্ন পূরণ হলে অতীতকে নতুন চোখে দেখা যায়:
সূরার শেষ প্রান্তে এসে সেই প্রথম স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটে। কুরআন বলে, ‘যখন তার ভাইয়েরা পিতা-মাতাসহ তার সামনে এলো, তখন সে তার পিতা-মাতাকে সিংহাসনে তুলে বসালআর তার ভাইয়েরা তার সামনে সিজদাবনত হলো’ (ইউসুফ, ১২/১০০)।
ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন, হে আমার পিতা! এটাই আমার পূর্বের স্বপ্নের ব্যাখ্যা, যা আমার রব তা সত্যে পরিণত করেছেন। তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি আমাকে কারাগার থেকে বের করেছেন এবং আপনাদের মরু অঞ্চল থেকে নিয়ে এসেছেন। লক্ষণীয় যে, তিনি অতীতকে স্মরণ করেছেন; কিন্তু বলেননি যে তার ভাইয়েরা তাকে কূপে ফেলেছিল, বিক্রি করেছিল কিংবা তার প্রতি অন্যায় করেছিল। তিনি শেষ দৃশ্যে অতীতকে অভিযোগের ভাষায় নয়, আল্লাহর অনুগ্রহের ভাষায় পড়লেন। তিনি আল্লাহর লুৎফ, হিকমাহ ও জ্ঞানের কথা বললেন, إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لِّمَا يَشَاءُ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ ‘নিশ্চয়ই আমার রব যা চান, তা সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ (ইউসুফ, ১২/১০০)।
মানুষ যখন পরীক্ষার ভেতরে থাকে, তখন শুধু অন্ধকার দেখে; কিন্তু যখন আল্লাহ পরিণতি দেখান, তখন বুঝা যায় যে, এই অন্ধকারও প্রয়োজন ছিল। কূপ না হলে মিশর ছিল না, মিশর না হলে প্রাসাদ ছিল না, প্রাসাদ না হলে চরিত্রের পরীক্ষা ছিল না, পরীক্ষা না হলে কারাগার ছিল না, কারাগার না হলে স্বপ্নের ব্যাখ্যার দরজা খুলত না এবং আর সেই দরজা না খুললে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও আসত না। জীবনের প্রতিটি বেদনা আলাদা করে দেখলে অসংলগ্ন লাগে; কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনার আলোকে দেখলে বোঝা যায়, সব টুকরো মিলে এক মহৎ নকশা।
সফলতার শেষ ভাষা:
স্বপ্ন পূর্ণ হলো, ক্ষমতার চেয়ারেও বসলেন, পরিবার মিলিত হলো। তারপরও যেন তিনি কামিয়াব নন, এখনও কী যেন বাকি আছে তার! কী আশ্চর্য! দুনিয়া-অর্জনের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে তিনি কী কামনা করছেন? স্বপ্ন পূরণের পরেও তিনি তার প্রতিপালকের কাছে কী চাইছেন?
কুরআনের ভাষায়, ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে রাজত্ব/ক্ষমতা থেকে অংশ দিয়েছেন এবং আমাকে কথার ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছেন। হে আসমান ও যমীনের স্রষ্টা! আপনি দুনিয়া ও আখেরাতে আমার অভিভাবক। আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের সঙ্গে যুক্ত করুন’ (ইউসুফ, ১২/১০১)।
তার শেষ কামনায় ফুটে উঠেছে, দুনিয়ার সফলতাই প্রকৃত সফলতা নয়। আমরা নিজেরা কেউ মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হলে ভাবতাম, আমরা বুঝি সফল। কিন্তু সফল তো সেই, যে আখেরাতে সফল হবে। কেউ যদি দুনিয়ায় কিছুই না পায়, শুধু আখেরাত হাছিল করতে পারে, তাহলেও সে সফল। আর কেউ যদি দুনিয়ায় সব কিছু পেয়েও পরপারে আল্লাহর প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সে বিফল। আর কেউ যদি দুনিয়া ও আখেরাত দুটোই পায়, তবে সে তো অবশ্যই সফল।
মুমিনের সফলতার আসল সৌন্দর্য হলো সে সফলতার পর আল্লাহকে ভুলে যায় না, মর্যাদা পেয়ে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে না। সে জানে, যে আল্লাহ কূপ থেকে রক্ষা করেছেন, তিনিই প্রাসাদেও রক্ষা করবেন; যে আল্লাহ কারাগারে সঙ্গে ছিলেন, তিনিই ক্ষমতার আসনেও সঙ্গে থাকবেন। আজকের যুবক এমন সফলতাই চাইবে, যা তাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না; এমন জ্ঞান, যা অহংকার নয়, বিনয় বৃদ্ধি করে; এমন পদ, যা মানুষকে শোষণ নয়, সেবা করতে শেখায়; আর এমন জীবন, যার শেষ প্রার্থনা হবে—‘তাওয়াফফানী মুসলিমান’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন’। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন- আমীন!
আব্দুর রহমান বিন আব্দুর রাযযাক
ফারেগ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বানারাস, ভারত; বিএ (অনার্স),
কিং আব্দুল আযীয বিশ্ববিদ্যালয়, জেদ্দা, সঊদী আরব।
