মানুষের অন্তরের গহিনে এমন কিছু স্বপ্ন নিঃশব্দে ঘুমিয়ে থাকে, যার কথা সে কারও কানে তুলে দিতে পারে না। কেননা সে স্বপ্নের আলো বড় স্নিগ্ধ, বড় ভঙ্গুর—লোকচক্ষুর কোলাহলে, পরিহাসের এক ঝাপটা হাওয়ায় তা নিভে যাওয়ার ভয় থাকে। জীবনের প্রভাতবেলায় মনে হয়, পথ বুঝি এক সরল রেখা—স্বপ্ন দেখব, পথে নামব, একদিন কাঙ্ক্ষিত তীরে গিয়ে পৌঁছব। অথচ পথ সামান্য বাঁক নিতেই ধরা পড়ে, স্বপ্নের সরণি কেবল ফুলে বিছানো নয়; সেখানে ওত পেতে থাকে অন্ধকার কূপ, অপবাদের কাঁটা, বাজারের নিষ্ঠুর শৃঙ্খল, কারাপ্রকোষ্ঠের স্তব্ধতা, নিকটজনের হিমশীতল ঈর্ষা আর সবার শেষে দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার সেই নীরব পরীক্ষা, যা মানুষের ধৈর্যকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত নিংড়ে নিতে চায়।
এই জীবন-সত্যেরই এক স্বচ্ছ দর্পণ যেন কুরআনের সূরা ইউসুফ, যার সম্মুখে দাঁড়ালে প্রতিটি ভগ্নহৃদয় মানুষ আপন মুখের ছায়া দেখতে পায়। স্বয়ং আল্লাহ এই আখ্যানের ললাটে এঁকে দিয়েছেন এক অপরূপ নাম ‘আহসানুল ক্বাছাছ’ অর্থাৎ সর্বোত্তম কাহিনি। আর সত্যিই তো, কুরআনের রীতি হলো এক সূরার বুকে নানা নবীর জীবনের খণ্ড খণ্ড ছবি ছড়িয়ে রাখা—কোথাও এক টুকরো আলো, কোথাও এক ফোঁটা ছায়া; কেননা তার অভিপ্রায় নিছক গল্প বলা নয়, বরং প্রতিটি ঘটনার অন্তরাল থেকে পথের দিশা তুলে আনা। কিন্তু সূরা ইউসুফ যেন সেই নিয়মের মাঝেই এক স্নিগ্ধ ব্যতিক্রম। এখানে একটিমাত্র মানুষের জীবন, তাঁর শৈশবের স্বপ্ন থেকে পরিণত বয়সের সিংহাসন পর্যন্ত—আদ্যন্ত, অবিচ্ছিন্ন ধারায়, একখানা সূরার বুকেই ধরা দিয়েছে; যেন এক নিরবচ্ছিন্ন নদী, উৎস থেকে মোহনা অবধি একই খাতে বহমান।
আর এই কাহিনি নেমে এসেছিল এমন এক ম্লান প্রহরে, যখন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন শোকের ভারে নত হয়ে পড়েছিল। সদ্য তিনি হারিয়েছেন তাঁর হৃদয়ের ছায়া প্রিয়তমা খাদীজা রাযিয়াল্লাহু আনহা কে, হারিয়েছেন স্নেহের অভিভাবক চাচা আবূ তালেবকে। চারিদিকে তখন কেবল শত্রুতার কাঁটা, প্রত্যাখ্যানের হিম, আর নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ ছায়া। সীরাতের পাতায় সেই বেদনার কালকে বলা হয় ‘আমুল হুযন’ বা শোকের বছর। ঠিক সেই ক্রন্দনভেজা প্রহরে, আসমান থেকে এক প্রশান্তি ও ধৈর্যের বার্তা হয়ে নেমে এলো ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর এই আখ্যান—এমন এক মানুষের গল্প, যিনি কূপের অন্ধকার তলদেশ থেকে রাজত্বের দীপ্ত শিখর পর্যন্ত উঠে এসেছিলেন কেবল ধৈর্য আর আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থার পাথেয়টুকু বুকে নিয়ে।
তাই ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ঘটনাটি নিছক এক প্রাচীন ইতিহাসের জীর্ণ পুথি নয়; এটা মানুষের আত্মা ও অশ্রুর আলেখ্য, পরিবার ও সমাজের দর্পণ, যৌবন ও সংযমের দ্বন্দ্ব, ক্ষমতা ও ক্ষমার মহাকাব্য। এর প্রতিটি পঙ্ক্তিতে মানুষ খুঁজে পায় নিজেরই প্রতিচ্ছবি, নিজের ভাঙন আর গড়ন, অপেক্ষা আর আর্তি, নীরব কান্না আর নিঃশব্দ সংগ্রাম; আর সব ছাপিয়ে সেই অদৃশ্য পরিকল্পনার সুদূর আলো, যে আলো অন্ধকারের বুক চিরে একদিন ঠিকই ভোর হয়ে ফোটে। এ যেন ভাঙা হৃদয়ের হাতে তুলে দেওয়া এক নিঃশব্দ মানচিত্র, যার প্রতিটি বাঁক ফিসফিস করে বলে যায়, হতাশ হয়ো না, তোমার এই রাত্রিরও এক নির্ধারিত প্রভাত আছে।
সূরা ইউসুফ শুরু হয় একটি স্বপ্ন দিয়ে। ছোট্ট ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাঁর পিতা ইয়াকূব আলাইহিস সালাম-কে বলেন,يَا أَبَتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْكَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَاجِدِينَ ‘হে আমার পিতা! আমি দেখেছি এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চাঁদ—তারা আমাকে সিজদা করছে’ (ইউসুফ, ১২/৪)।
একথা শোনার পর তার পিতা ইয়াকূব আলাইহিস সালাম তাকে একটি গভীর উপদেশ দিলেন,قَالَ يَا بُنَيَّ لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَىٰ إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنسَانِ عَدُوٌّ مُّبِينٌ ‘তিনি বললেন, হে আমার পুত্র! তোমার স্বপ্ন তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা করো না; তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু’ (ইউসুফ, ১২/৫)।
সূরার সূচনাতেই ফুটে ওঠে এক নিবিড় শিক্ষা—জীবনের যে স্বপ্নটি আমরা লালন করি, তাকে কেবল চোখের কোণে একবার ঝিলিক দিয়ে মিলিয়ে যেতে দেওয়া নয়; বরং বুকের গভীরতম প্রকোষ্ঠে গেঁথে নিয়ে তার বাস্তবায়নের প্রতীক্ষায় বেঁচে থাকা। কিছুদিন হৃদয়ে একটি লক্ষ্য লালন করে, তারপর তাকে বিস্মৃতির ধুলায় ঢেকে দেওয়া মানুষের পক্ষে শোভা পায় না। বালক ইউসুফ যখন স্বপ্নে দেখলেন এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য আর চাঁদ তার সম্মুখে নত হয়ে আসছে, পিতা ইয়াকূব আলাইহিস সালাম সে স্বপ্নকে শিশুসুলভ কল্পনা বলে উড়িয়ে দিলেন না; বরং সন্তানকে সাবধান করে তাকে ঠেলে দিলেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেই—এ কথা তোমার ভাইদের কাছে বলো না, পাছে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্তের জাল বোনে (ইউসুফ, ১২/৫)।
এই একটিমাত্র সতর্কবাণীর ভেতরেই লুকিয়ে আছে যুগযুগান্ত পেরিয়ে আসা এক চিরন্তন উপদেশ। আজকের সেই তরুণ, যে তার প্রতিটি পরিকল্পনা, প্রতিটি অর্ধস্ফুট কাঁচা স্বপ্ন মুহূর্তের উচ্ছ্বাসে সমাজমাধ্যমের উন্মুক্ত আঙিনায় ছড়িয়ে দেয়—তার কানেও এই প্রাচীন আয়াত মৃদুস্বরে ফিসফিসিয়ে যায় এক সাবধানবাণী। সব সত্য সকলের কাছে উচ্চারণ করতে নেই, সব স্বপ্ন সব কানে নিরাপদ নয়; প্রতিটি পরিকল্পনাকে প্রকাশের আগে নিভৃতে পরিণত হতে দিতে হয়। স্বপ্ন গোপন রাখা কাপুরুষতা নয়—কখনো কখনো তা-ই প্রকৃত হিকমাহ তথা প্রজ্ঞার নীরব সাধনা। বীজ যে মাটির অন্ধকার বুকে লুকিয়ে থাকে বলেই একদিন মহীরুহ হয়ে আকাশ ছোঁয়; ডিমের খোলসের ভেতরে যে নিস্তব্ধতা জমাট বাঁধে, তারই গর্ভ থেকে একদিন ডানা মেলে উড়ে যায় পাখি। মানুষের বড় স্বপ্নও তেমনি নীরবতার আঁধার গর্ভে ধীরে ধীরে প্রাণ পায়, তারপর সময় হলে আপন আলোয় ফুটে ওঠে।
অথচ ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর সেই স্বপ্ন সত্য হওয়ার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না; বরং এক বিস্ময়কর বিড়ম্বনায় স্বপ্ন পূরণের প্রতিটি ধাপ বাইরের চোখে ঠেকেছিল যেন স্বপ্ন ভেঙে পড়ারই একেকটি অধ্যায়। ভাইদের ষড়যন্ত্র, কূপের অন্ধকারে নিক্ষেপ, দাসের বেশে বিকিয়ে যাওয়া, পরের ঘরে প্রতিপালন, নারীর প্রলোভন, মিথ্যা অপবাদের কালিমা, কারাগারের নিঃসঙ্গ প্রহর, প্রিয়জনের বিস্মৃতি, আর তার উপরে দীর্ঘ, অন্তহীন মনে হওয়া প্রতীক্ষা। সব মিলিয়ে মনে হতেই পারে, এ জীবন বুঝি ক্রমাগত নিচের দিকেই গড়িয়ে চলেছে, ধাপে ধাপে আরও গভীর অতলে। কিন্তু আল্লাহর গোপন নকশায় এই প্রতিটি ‘নিচে নেমে যাওয়া’ আসলে ছিল আরও একবার ‘উপরে উঠে আসার’ নিঃশব্দ প্রস্তুতি, প্রতিটি অবরোহণ ছিল পরবর্তী আরোহণের সোপান।
এখানেই সূরা ইউসুফের গভীরতম পাঠ। আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে গড়ে তুলতে চান, তখন তিনি তাকে সদাসর্বদা আরামের মসৃণ সড়ক ধরে এগিয়ে নেন না; বরং কখনো তাকে ভাঙেন, কখনো কাঁদান, কখনো দীর্ঘ প্রতীক্ষায় দাঁড় করিয়ে রাখেন, কখনো অন্ধকারে নিভৃতে একা ফেলে রাখেন, কখনো-বা মানুষের চোখের সামনে অপমানের গ্লানিতে নত করেন—কেবল এজন্যই যে, লোকচক্ষুর কাছে যাকে তিনি ছোট করছেন, নিজের দরবারে তাকেই তিনি বড় করে তুলছেন। বাইরের এই অবনমন আসলে ভেতরের এক নিঃশব্দ উত্তরণ। যে অপমান আজ কাউকে ধুলায় নামায়, কাল সেই পথ ধরেই তার জীবনে নেমে আসে অপ্রত্যাশিত সম্মানের ভোর।
নিকটজনই কখনো নিকটতম শত্রু:
যে আঘাত সবচেয়ে গভীরে বাজে, তা প্রায়ই আসে সবচেয়ে কাছের মানুষের হাত থেকে। এটি সূরা ইউসুফের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক শিক্ষাগুলোর একটি। ইউসুফ আলাইহিস সালাম সবার ছোট হওয়ার পরও তার ভাইয়েরা তাকে ভালোবাসত না; যেখানে স্বাভাবিকভাবে রূপ, গুণ ও ছোট হওয়ার কারণে তার প্রতি সবার স্নেহশীল হবার কথা ছিল। কুরআন তাদের মনের কথা তুলে ধরে,إِذْ قَالُوا لَيُوسُفُ وَأَخُوهُ أَحَبُّ إِلَىٰ أَبِينَا مِنَّا وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّ أَبَانَا لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ ‘তারা বলল, ইউসুফ ও তার ভাই আমাদের পিতার কাছে আমাদের চেয়ে বেশি প্রিয়; অথচ আমরা বাবার বড় সন্তানেরা তো একটি শক্তিশালী দল। নিশ্চয়ই আমাদের পিতা স্পষ্ট ভুলের মধ্যে আছেন’ (ইউসুফ, ১২/৮)।
হিংসা যখন হৃদয়ে ঢোকে, তখন মানুষ সত্যকে ভুলভাবে দেখতে শুরু করে। তারা পিতার স্নেহকে অন্যায় মনে করল, ছোট ভাইয়ের সৌন্দর্য ও সম্ভাবনাকে অপরাধ ভাবল, নিজেদের বঞ্চিত ভাবতে ভাবতে একদিন অন্যায়কে সমাধান মনে করল, অপরাধের রাস্তা বেছে নেওয়াকে নিজেদের জন্য নিরাপদ মনে করল। এরপর তারা বলল, اقْتُلُوا يُوسُفَ أَوِ اطْرَحُوهُ أَرْضًا يَخْلُ لَكُمْ وَجْهُ أَبِيكُمْ ‘ইউসুফকে হত্যা করো অথবা কোথাও ফেলে দাও। তাহলে তোমাদের পিতার মনোযোগ শুধু তোমাদের দিকেই থাকবে’ (ইউসুফ, ১২/৯)।
ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে হত্যার পরিকল্পনা করছে তার নিজ ভাইয়েরা। এখানে জীবনের কঠিন বাস্তবতা প্রকাশিত হয়েছে। মানুষের জীবনে অনেক সময় সবচেয়ে গভীর আঘাত আসে কাছের মানুষ থেকে। যে মানুষকে আমরা নিরাপদ ভাবি, কখনো সে-ই কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সূরা ইউসুফ আমাদের হতাশ হতে শেখায় না। আপনি আপনার জীবনে আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষদের নিকট থেকে শত্রুতার জন্য প্রস্তুতি নেন। তবে এখানে একটি বিষয়—তাদের শত্রুতার বিপরীতে আপনার ব্যবহার কী হওয়া উচিত? সেটাও আমরা ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কাছে শিখব।
তবে যেটা আপনি আপনার জন্য বিপদ ভাবছেন, সেটা আল্লাহ তাআলা আপনার এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে রাখেননি তো? ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইয়েরা ভেবেছিল, তারা তাকে সরিয়ে দিলে গল্প শেষ, অথচ আল্লাহ সেখানে গল্প শুরু করলেন।
কূপ: অন্ধকার সবসময় শেষ নয়
অবশেষে তারা ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে সঙ্গে নিয়ে ছাগল চরাতে গেল এবং কূপের অন্ধকারে ফেলে দিল। আল্লাহ বলছেন,فَلَمَّا ذَهَبُوا بِهِ وَأَجْمَعُوا أَن يَجْعَلُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِّ وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِ لَتُنَبِّئَنَّهُم بِأَمْرِهِمْ هَٰذَا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ ‘তারা যখন তাকে নিয়ে গেল এবং তাকে কূপের অন্ধকারে ফেলার বিষয়ে একমত হলো, তখন আমি তার কাছে অহী করলাম, তুমি একদিন তাদেরকে তাদের এই কাজের কথা জানাবে; অথচ তারা বুঝতেও পারবে না’ (ইউসুফ, ১২/১৫)।
কূপে ফেলে দিয়ে তারা ভেবেছিল, তাকে তাদের ও পিতার মাঝখান থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পেরেছে; বাস্তবে তারা তাকে মিশরের পথে পাঠাচ্ছিল। তারা ভেবেছিল, তারা তার মর্যাদা কমিয়ে দিচ্ছে; বাস্তবে তারা তার ভবিষ্যৎ আলোকিত করার প্রথম বাতিটি প্রজ্বলিত করেছিল।
কূপ একটি অদ্ভুত প্রতীক, তাই না! চারপাশে দেয়াল, সামনে কোনো রাস্তা নেই। চিৎকার করলেও কেউ শুনবে না। তবে সেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে উপরে আকাশ দেখা যায়—আলোকিত, নীল আকাশ, সাদা-কালো মেঘের ভেলায় সজ্জিত আকাশ; যদিও-বা সামান্যই দেখা যায়। হয়তো মাথার উপরে পাখিদের উড়তেও দেখা যায়। জীবনের সবচেয়ে আশাহীন মুহূর্তে দাঁড়িয়ে, আলোহীন গহিন অন্ধকারাচ্ছন্ন বিপদের মাঝে স্থির দাঁড়িয়ে থেকেও আকাশ দেখা ভোলা যাবে না। এই আকাশ থেকেই মুক্তির রাস্তা নির্ধারিত হবে। আকাশের বিশালতা হয়তো বেঁচে ফেরার স্বপ্ন দেখাবে।
পিতার স্নেহ থেকে আঁধার কূপে এসে পড়তে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর খুব বেশিক্ষণ লাগেনি। আপনার আনন্দময় জীবনও হুট করেই বিষাদের কালো ছায়ায় ঘিরে যেতে পারে। কিন্তু সফলতার কথা ভুলে যাওয়া যাবে না। কুরআন আমাদের দেখায়, আল্লাহর কাছে কোনো ‘শেষ’ই শেষ নয়। কূপের অন্ধকারেই আল্লাহ ভবিষ্যতের আশ্বাস দিলেন। ভাইয়েরা তাঁকে অন্ধকারে ফেলল, আর আল্লাহ অন্ধকারের ভেতরেই আলো পাঠালেন। বাহ্যিকভাবে তিনি একা; বাস্তবে তিনি আল্লাহর তত্ত্বাবধানে।
আজ যে যুবক জীবনের কোনো কূপে আটকে আছে—ব্যর্থতা, হতাশা, অপমান, একাকিত্ব, পরিবারগত সংকট, আর্থিক দুরবস্থা, শিক্ষাজীবনের স্থবিরতা—সে যেন মনে রাখে: কূপ গন্তব্য নয়; কূপ কখনো কখনো পথের একটি বাঁক। আল্লাহর পরিকল্পনায় কিছু ঘটনা গন্তব্য নয়; সেগুলো শুধু সেতু। মানুষ তোমাকে কূপে ফেলতে পারে, কিন্তু তোমার তাকদীরের দরজা বন্ধ করতে পারে না।
বাজারের দাম আর আসমানের মূল্য:
কূপ থেকে একটি কাফেলা ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে উদ্ধার করল। কুরআনে এসেছে,وَجَاءَتْ سَيَّارَةٌ فَأَرْسَلُوا وَارِدَهُمْ فَأَدْلَىٰ دَلْوَهُ قَالَ يَا بُشْرَىٰ هَٰذَا غُلَامٌ ‘একটি কাফেলা এলো। তারা তাদের পানি সংগ্রহকারীকে পাঠাল। সে তার বালতি নামাল। সে বলে উঠল, কী আনন্দ! এ তো এক কিশোর!’ (ইউসুফ, ১২/১৯)।
কিন্তু তারা তাকে মুক্ত মানুষ হিসেবে সম্মান দিল না। পৃথিবীর বাজার তাকে বিক্রয়যোগ্য পণ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল। অতি নগণ্য মূল্যে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-কে বিক্রি করা হলো। কুরআনে এসেছে,وَشَرَوْهُ بِثَمَنٍ بَخْسٍ دَرَاهِمَ مَعْدُودَةٍ وَكَانُوا فِيهِ مِنَ الزَّاهِدِينَ ‘তারা তাকে খুব সামান্য মূল্যে কয়েকটি গণনাযোগ্য দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিল। তারা তার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিল’ (ইউসুফ, ১২/২০)।
অথচ সেই মুহূর্তেই, ঠিক সেই অবমূল্যায়নের ভেতর দিয়েই, আল্লাহ তাকে মিশরের ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন। দুনিয়ায় আপনার মূল্য কত, এটা কোনো মানে রাখে না; আসমানের ঊর্ধ্বে যিনি, তাঁর কাছে আপনার মূল্য কত—সেটাই গুরুত্ব বহন করে। সাময়িক অবমূল্যায়ন স্থায়ী মূল্যহীনতা নয়। আজকে আপনি সাধারণ কেউ, তার অর্থ এই নয় যে, আগামীকালও আপনি সাধারণ কেউ থাকবেন।
ইউসুফ আলাইহিস সালাম দাস হিসেবে বিক্রি হলেন। কিন্তু তারপর? আল্লাহ বলছেন, ‘মিশরের যে ব্যক্তি তাকে কিনেছিল, সে তার স্ত্রীকে বলল, তার থাকার ব্যবস্থা সম্মানজনক করো; হতে পারে সে আমাদের উপকার করবে অথবা আমরা তাকে সন্তানরূপে গ্রহণ করব’ (ইউসুফ, ১২/২১)।
মানুষ ষড়যন্ত্র করে, কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা বিজয়ী হয়। মানুষ দরজা বন্ধ করে, আল্লাহ দেয়ালের মধ্যেই দরজা সৃষ্টি করেন। যেখানে আপনার চেষ্টা ও শক্তি দুটোই ফুরিয়ে যায়, সেখান থেকে পথ শুরু করার সক্ষমতা আল্লাহ রাখেন। সকল চেষ্টার আগে আপনি যেমন তাঁর উপর ভরসা রাখতে পারেন, তেমনই সকল প্রচেষ্টা বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার পরও আপনি তাঁর উপর ভরসা রাখতে পারেন। পাহাড় ভেঙে যদি জীবনের সকল আলো চাপা পড়ে যায়, তখনও তার আলোর অপেক্ষা করা যায়। জীবন-নৌকা যদি কূলহীন উত্তাল সাগরে ভেসে যায়, তবু তাঁর কাছে মুক্তির আশা করা যায়। দুনিয়াতে কিছু যদি না-ও হয়, অবিচল ও সংশয়হীন সেই ভরসার জন্য পরকালে নেকী তো পাবেনই।
প্রাসাদের দরজা: নতুন পরীক্ষা
কূপ থেকে সুবিশাল প্রাসাদে। রাজকীয় জীবন। বিলাসিতা ও আরামময় নান্দনিক জিন্দেগি। অন্ধকার কূপ এবং পূর্বের পরিবার-বিচ্ছেদের বিপরীতে বর্তমান অবস্থা অনেকটা জান্নাতে থাকার মতো। তবে এই জৌলুসের জিন্দেগিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার দুয়ার উন্মুক্ত করেছিল। তিনি মানবজীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পড়েছিলেন। এমন এক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছিলেন, যা মানুষের হৃদয়, ঈমান ও চরিত্রকে চূড়ান্তভাবে যাচাই করে। যার প্রাসাদে তিনি সুদর্শন তরুণ হয়ে উঠলেন, যার অজস্র অনুগ্রহে তার জীবন পরিপুষ্ট হলো, যিনি ক্ষমতা ও প্রভাবের অধিকারিণী—সেই গৃহকর্ত্রীই একদিন সব দরজা বন্ধ করে তাকে যেনার দিকে আহ্বান জানালেন।
একটু বিশ্লেষণ করি, এখানে কত জটিল এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। ইউসুফ আলাইহিস সালাম ছিলেন পূর্ণ যুবক; স্বাভাবিকভাবেই তার ভেতরে জৈবিক চাহিদা ছিল। যখন তাকে এই কুকর্মের দিকে আহ্বান করা হচ্ছিল, তখন চারদিকে কেউ ছিল না, কোনো সাক্ষী ছিল না, ধরা পড়ারও কোনো ভয় ছিল না। যিনি তাকে আহ্বান করছিলেন, তিনিই তো তাকে রাজকীয় জীবনের ব্যবস্থা করেছিলেন, দাসত্ব থেকে মুক্ত জীবন দিয়েছিলেন। এখন তাকে ‘না’ বলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কতটা কঠিন হতে পারে? নিজেকে সেই স্থানে রেখে একবার কল্পনা করুন।
কিন্তু ইউসুফ আলাইহিস সালাম পেরেছিলেন। তাকে তো পারতেই হতো। যিনি একদিন মিশরের বাদশাহ হবেন, তিনি যদি সামান্য যৌন প্রলোভন থেকেই নিজেকে রক্ষা করতে না পারেন, তবে জনগণের সম্পদ আত্মসাতের লোভ কীভাবে সংবরণ করবেন? যত বড় যাত্রা, পথের নদীও তত বিশাল ও খরস্রোতা। ইতিহাসে তাঁর সেই জবাব অমর হয়ে রইল। কুরআনে এসেছে,وَرَاوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَن نَّفْسِهِ وَغَلَّقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ ‘যে নারীর ঘরে সে ছিল, সে তাকে প্রলুব্ধ করল, দরজাগুলো বন্ধ করল এবং বলল, এসো। সে বলল, আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই’ (ইউসুফ, ১২/২৩)।
তিনি বললেন, مَعَاذَ اللَّهِ তথা ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই’। তিনি শুধু পাপ থেকে পালাননি; তিনি আল্লাহর দিকে পালিয়েছেন। জীবনের কঠিনতম পরীক্ষাতেও রবের আশ্রয় নিতে ভুলেননি। আল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই আমি তার থেকে মন্দ ও অশ্লীলতা সরিয়ে দিলাম। নিশ্চয়ই সে ছিল আমার নির্বাচিত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত’ (ইউসুফ, ১২/২৪)।
পাপ থেকে বাঁচতে কেবল নিজের শক্তি ও ঈমানী বলের উপর ভরসা করবেন না—রবের সাহায্য চান। আপনি ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর চেয়ে বেশি পরহেজগার নন; সুতরাং গুনাহ থেকে মুক্ত থাকতে রবের সাহায্য কামনা করা আপনার জন্য জরুরী। তিনি পাপ থেকে তো বেঁচে ফিরলেন, কিন্তু বিপদ থেকে মুক্তি পেলেন না।
অপবাদ: সত্যের ধীর পদধ্বনি
ইউসুফ আলাইহিস সালাম পাপ থেকে পালালেন, কিন্তু অভিযোগ থেকে মুক্তি পেলেন না। ঘটনা এমনভাবে ঘুরে গেল যে, নির্দোষ ব্যক্তিই অভিযুক্ত হয়ে পড়লেন। অথচ দায়মুক্তির প্রমাণও উপস্থিত ছিল, ‘যদি তার (ইউসুফের) জামা সামনের দিক থেকে ছেঁড়া হয়, তবে নারী সত্য বলেছে এবং সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত। আর যদি তার জামা পেছন দিক থেকে ছেঁড়া হয়, তবে নারী মিথ্যা বলেছে এবং সে সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত’ (ইউসুফ, ১২/২৬-২৭)।
জামা পেছন দিক থেকে ছেঁড়া ছিল। সত্যের সাক্ষ্য নিঃশব্দে উপস্থিত ছিল, তবু ক্ষমতার নিচে সেই সত্য চাপা পড়ে গেল। সত্য সবসময় সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী হয় না। যেটাকে আপনি বিপদ থেকে মুক্তির সঠিক সময় ভাবছেন, রবের কাছে সেটা সঠিক সময় না-ও হতে পারে। নিজের চেষ্টার পাশাপাশি রবের নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষা করুন।
মিশরের নারীদের সামনে তার সৌন্দর্য যেন মঞ্চায়িত হলো, প্রলোভনের ঘেরাটোপ আরও আঁটোসাঁটো হলো। নির্দোষ অবস্থায় অপরাধ স্বীকারের জন্য চাপ এলো, আর অবশেষে কারাগারে নিক্ষেপের ফয়সালা এলো। তিনি বলে উঠলেন, ‘হে আমার রব! তারা আমাকে যে পথে ডাকছে, তার চেয়ে কারাগারই আমার কাছে অধিক প্রিয়’ (ইউসুফ, ১২/৩৩)।
নিষ্পাপ অবস্থায়ই তিনি জেলে চলে গেলেন। বিপদ আসার কথা ছিল না, কিন্তু এলো। তবে বিপদ আপনার কাছে বিপদ, কিন্তু আপনার রবের কাছে এই বিপদের সংজ্ঞা কী? যেখানে আপনার মানবীয় ক্ষমতায় আপনি কেবল অন্ধকারই দেখেছেন, সেখানে রবের ফয়সালায় আপনার জন্য কী রাখা আছে, আপনি কি জানেন? রব তো সব কিছু দুনিয়াতেই দিয়ে দেন না। তিনি যদি আপনাকে সামান্য ৬০ বছরের জন্য সুখী না করে চিরদিনের জন্য সুখী করবেন বলে পরপারে আপনার প্রতিদান লিখে রাখেন—সেটা কি আমি বা আপনি জানি?
এখানে আরও একটি কথা, স্বাধীনতা সবসময় মুক্তি নয়, যদি সেই স্বাধীনতা মানুষকে পাপের দাস বানায়। আবার কারাগার সবসময় বন্দিত্ব নয়, যদি সেই কারাগার মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে।
(ইনশা-আল্লাহ! আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
আব্দুর রহমান বিন আব্দুর রাযযাক
* ফারেগ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বানারাস, ভারত; বিএ (অনার্স),
কিং আব্দুল আযীয বিশ্ববিদ্যালয়, জেদ্দা, সঊদী আরব।
