আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে কারীমে বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَىٰ بِهِمَا فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَىٰ أَن تَعْدِلُوا وَإِن تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا
সরল অনুবাদ: ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হও, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদানকারী হও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হয় অথবা পিতামাতা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়, সে ধনী হোক অথবা দরিদ্র। অতএব, আল্লাহ উভয়ের ব্যাপারে অধিক হক্বদার। তাই ন্যায়বিচার থেকে বিরত হওয়ার জন্য তোমরা খেয়ালখুশির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা সত্যকে বাঁকাও অথবা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত’ (আন-নিসা, ৪/১৩৫)।
তাফসীরে সা‘দীর আলোকেউক্ত আয়াতের শিক্ষা:
১. সর্বাবস্থায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা।
২. আল্লাহর হক্ব আদায় মানে তাঁর নেয়ামত পাপে নয়, বরং আনুগত্যেই ব্যবহার করা।
৩. পরিপূর্ণতা ও সততার সাথে মানুষের হক্ব আদায় করা।
৪. নিজের, পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেও সত্য সাক্ষ্য প্রদান করা।
৫. ধনী-গরীবের ভেদাভেদ না করে সবার সঙ্গে ন্যায়বিচার করা।
৬. আল্লাহ সব জানেন এবং বিচার দিবসে প্রতিফল দিবেন—এ বিশ্বাস হৃদয়ে জাগ্রত রাখা।
৭. ন্যায়বিচারই আসল তাক্বওয়া ও প্রকৃত দ্বীনদারিতার পরিচয়।
৮. নিজের খেয়ালখুশি ও প্রবৃত্তির অনুসরণই ন্যায়বিচারের প্রধান অন্তরায়।
৯. সত্য গোপন, তথ্যের বিকৃতি ও মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা গুরুতর পাপ।
১০. শুধু কথা, কাজ বা আচরণেই নয়; সিদ্ধান্তেও ন্যায়ের প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
শব্দ ও ভাষাগত দিকের অর্থ:
قَوَّامِينَ শব্দটি ‘قَوَّام’ শব্দের বহুবচন। এটি ‘قائم’ (দাঁড়ানো/ক্বায়েম থাকা) শব্দের অতিরিক্ত অর্থবোধক রূপ, এর অর্থ হলো এমন ব্যক্তি, যিনি কোনো কাজ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিপূর্ণ ও উৎকৃষ্টভাবে সম্পাদন করেন। এখানে শব্দটি দ্বারা ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অবিচল, দৃঢ় ও ধারাবাহিকভাবে কাজ করা মানুষকে বুঝানো হয়েছে।
شُهَدَاءَ শব্দটি ‘شهيد’ শব্দের বহুবচন। ‘فعيل’ ওযনে এসেছে, যা স্থায়ী অভ্যাসগত গুণ বুঝায় (যেমন- كريم حكيم)। এর অর্থ এমন লোক, যারা সর্বদা ন্যায়ের সাক্ষ্য দেয় এবং সত্য কথা বলার অভ্যাস যাদের হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে।
القِسْط অর্থ ন্যায়বিচার তথা কথায়, কাজে ও বিচারে ন্যায়পরায়ণ থাকা।
আল্লাহ এখানে ‘كونوا’ (হও) শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা চিরস্থায়ী অভ্যাসের নির্দেশ দেয়। অর্থাৎ এক বা দুই বার নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ন্যায় প্রতিষ্ঠাকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।
আয়াতের ব্যাখ্যা:
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দৃঢ়ভাবে ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং সর্বদা সত্যের সাক্ষ্য দাও। কারও প্রতি শত্রুতা, বিদ্বেষ বা বিরক্তি যেন তোমাদেরকে কখনোই অন্যায়ের দিকে ধাবিত না করে। শত্রু হোক বা বন্ধু, আপনজন হোক কিংবা প্রতিপক্ষ- কাউকেই অবিচারের শিকার করো না; বরং সবার প্রতিই ন্যায়, সত্য ও সাম্যের আচরণ করো। ন্যায়বিচারই যেন তোমাদের স্থায়ী চরিত্রে রূপ নেয় এবং এভাবেই নিজেদের গড়ে তোলো। ইসলাম এমন জীবনব্যবস্থা নয়, যেখানে শত্রুর উপর অত্যাচার ও অন্যায় বৈধ; বরং ইসলাম ন্যায়বিচারকে দিয়েছে সর্বোচ্চ মর্যাদা।
অনেক সময় মানুষ মনে করে যে, শত্রুর সাথে কঠোর হওয়াই তাক্বওয়ার পরিচয়। কিন্তু কুরআন স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যে, শত্রুর সাথেও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখাই প্রকৃত তাক্বওয়ার অধিক নিকটবর্তী অবস্থা। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও শত্রুর প্রতি সীমালঙ্ঘন করা নিষিদ্ধ। ইমাম যামাখশারী বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ প্রথমে নিষেধ করেছেন যে, বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে অন্যায়ের পথে ধাবিত না করে, এরপর সরাসরি ন্যায় প্রতিষ্ঠার আদেশ দিয়েছেন, তারপর ঘোষণা করেছেন যে, ন্যায়-ই তাক্বওয়ার সবচেয়ে নিকটবর্তী। এর অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত হলো যদি কাফেরদের প্রতিও এমন ন্যায়পরায়ণ হতে বলা হয়, তবে মুসলিম ভাইদের সাথে ন্যায়পরায়ণতা রক্ষা করা তো আরও বেশি অপরিহার্য।
আল্লাহ তাআলা তাঁর ঈমানদার বান্দাদের আদেশ করছেন যে, তারা যেন ন্যায়বিচারের উপর ক্বায়েম থাকে, এটি একটি অতিরিক্ত অর্থবোধক শব্দ, যা মুমিনের চরিত্রের স্থায়ী ভূষণ, এখান থেকে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ কোনো মুমিনের নেই। অর্থাৎ তারা দৃঢ়তার সাথে ন্যায়ের উপর অটল থাকে, ন্যায় থেকে ডানে–বামে কখনোই সরে যায় না। কোনো তিরস্কারকারীর তিরস্কার যেন তাদেরকে আল্লাহর ন্যায়ের পথ থেকে ফিরিয়ে না দেয় এবং কোনো কিছুই যেন তাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা থেকে সরিয়ে না নেয়। বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অপরের কল্যাণকামিতায় তারা যেন পারস্পরের সহযোগী, সহায়ক, সহমর্মী এবং একে অপরের দৃঢ় সমর্থক থাকে।
তিনি বলেন, ‘আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদানকারী হও’, যেমন তিনি অন্যত্র বলেছেন, ‘আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য ক্বায়েম করো’ (আত-তালাক, ৬৫/২)। অর্থাৎ সাক্ষ্য দাও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। যখনই একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সাক্ষ্য প্রদান করা হবে, তখনই সাক্ষ্য হবে সঠিক, ন্যায়সংগত, পরিপূর্ণ সত্য, বিকৃতি-পরিবর্তন ও গোপন করা থেকে মুক্ত। এজন্যই বলা হয়েছে, ‘যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই হয়’ অর্থাৎ এমন হলেও সত্য সাক্ষ্য দাও, যদিও তার ক্ষতি তোমাদের নিজেদের উপর এসে পড়ে। অর্থাৎ সত্য সাক্ষ্য দাও, ছোট কিংবা বড় যে কারো ব্যাপারে, ধনী কিংবা গরীবের ব্যাপারে, পিতা-মাতা ও অন্যদের বিরুদ্ধেও সত্য সাক্ষ্য দাও।
এই মহান আয়াতের উদ্দেশ্য হলো বান্দাদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ় করা, সহযোগিতার বন্ধন শক্তিশালী করা এবং একে অপরকে সত্যের উপদেশ দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায় ও তাক্বওয়ার পথকে সুদৃঢ় করা। একই সঙ্গে অন্যায়, অবিচার, পক্ষপাত ও খেয়ালখুশির অনুসরণ থেকে বিরত থাকার সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করাও এর উদ্দেশ্য। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাক্বওয়ায় পরস্পরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে পরস্পরকে কোনো সহযোগিতা করো না’ (আল-মায়েদা, ৫/২)। এছাড়া তিনি আরও বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে; তবে তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে’ (আল-আছর, ১০৩/১-৩)। অর্থাৎ তারা পরস্পর ধৈর্যের উপদেশ প্রদান করেছে, কিন্তু কখনোই সত্য থেকে বিচ্যুত হয়নি।
এ ক্ষেত্রে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী প্রণিধানযোগ্য, তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় ভালোবাসেন— (ক) তোমরা তাঁর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করো না, (খ) তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো, পরস্পর বিভক্ত হয়ো না এবং (গ) যাদেরকে আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর কর্তৃত্ব দান করেছেন, তাদের প্রতি সত্যের উপদেশ দাও’।[1]
আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর দড়ি দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না। আর তোমাদের প্রতি আল্লাহর সেই অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তোমরা একে অপরের শত্রু ছিলে, তখন তিনি তোমাদের অন্তরে ভালোবাসা ও ঐক্য সৃষ্টি করেছিলেন। ফলে তাঁর কৃপায় তোমরা পরস্পর প্রকৃত ভাইয়ে পরিণত হয়েছিলে’ (আলে ইমরান, ৩/১০৩)।
অতএব, সব মুসলিমের উপর ওয়াজিব হলো সৎকর্ম ও তাক্বওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং সত্যের উপদেশ দেওয়া। যেন আল্লাহ তাআলার নিম্নবর্ণিত বাণীতে মুসলিম উম্মাহর বৈশিষ্ট্য বাস্তবায়িত হয়, ‘তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব, তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো এবং আল্লাহর উপর ঈমান রাখো’ (আলে ইমরান, ৩/১১০)। তাদের সর্বোত্তম জাতি হওয়ার পেছনে কারণ হলো- তাদের মাঝে ছিল পারস্পরিক উপদেশ, তাক্বওয়ায় সহযোগিতা, ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠা, সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ।
এটাই দায়িত্ব! এ দায়িত্ব অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে, কারণ এটা এক মহা দায়িত্ব। মানুষের আত্মার স্বভাবেই মন্দের প্রতি প্রবণতা রয়েছে আর শয়তান তো মানুষকে সর্বদাই মন্দের দিকে আহ্বান করে। ফলে মানুষ অনেক সময় নিজের খেয়ালখুশি, ব্যক্তিগত স্বার্থ, আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কারণে অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই তাক্বওয়া, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় পারস্পরিক সহযোগিতা, দৃঢ়তা ও অবিচল প্রতিশ্রুতি আবশ্যক।
যখন কোনো জাতি এই মহৎ গুণাবলি ধারণ করবে, এই বৈশিষ্ট্যের আলোকে জীবন পরিচালনা করবে; তখনই তারা প্রকৃত সুখ-সমৃদ্ধি অর্জন করবে, তাদের কল্যাণ ও স্বাচ্ছন্দ্যের দুয়ার উন্মুক্ত হবে, আল্লাহ তাদেরকে শত্রুর উপর বিজয় দান করবেন এবং পৃথিবীতে তাদের শক্তি, মর্যাদা ও কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করে দিবেন। আর যখন সে জাতি যুলম করবে, অন্যায়ের পথে অগ্রসর হবে, সীমা অতিক্রম করবে; তখন তারা আল্লাহর গযব ও শাস্তির মুখোমুখি হবে এবং বিপদ, ফেতনা ও রক্তপাতের কবলে পতিত হবে।
আল্লাহ তাআলা মহাজ্ঞানী ও পরম প্রজ্ঞাময়। তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত হওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কখনো কখনো তিনি যালেমদেরকে অবকাশ দান করেন, কখনো কোনো জাতির মাঝে অন্যায় ও অত্যাচারের মাত্রা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়, তবুও তিনি তাদেরকে সুযোগ দেন। যেমন তিনি বলেন, ‘আমি তাদেরকে অবকাশ দিই, নিশ্চয়ই আমার কৌশল অত্যন্ত দৃঢ়’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৮৩)। এর পূর্বের আয়াতে তিনি আরও বলেন, ‘আমি ধীরে ধীরে তাদেরকে পাকড়াও করব, যেখানে তারা বুঝতেও পারবে না’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৮২)।
অতএব, বুদ্ধিমান ও সৎচিন্তার অধিকারী মানুষ যেন বিরোধীদের অপব্যাখ্যা, ভ্রান্ত প্ররোচনা বা সাময়িক অবস্থা দেখে বিভ্রান্ত না হয়। আল্লাহর দেওয়া এই অবকাশকে তারা যেন ধোঁকা মনে না করে এবং বেপরোয়া হয়ে না যায়। তারা যেন কখনোই এই ধারণা পোষণ না করে যে, এ অবাধ সুযোগের কারণে শাস্তি তাদের স্পর্শ করবে না। বরং আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন, ‘তুমি কখনোই মনে করো না যে আল্লাহ যালেমদের কাজকর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ। তিনি কেবল তাদেরকে সেই দিনের জন্য অবকাশ দেন, যেদিন চোখসমূহ আতঙ্কে স্থির হয়ে যাবে’ (ইবরাহীম, ১৪/৪২)।
অনেক সময় যালেম তার যুলমের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করে, সে দুনিয়ায় শাস্তি না পেলেও আখেরাতে অবশ্যই কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিন্তু প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই মানুষ, যে নিজেই নিজের হিসাব গ্রহণ করে, ছোট-বড় প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করে, তাঁর নির্ধারিত সীমারেখায় অবস্থান করে এবং নিজের খেয়ালখুশির উপর আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়। সুতরাং হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের উপর অটলভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো। ধনী বা গরীব, আত্মীয় কিংবা শত্রু—সবার ব্যাপারেই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করো। গরীব বলে তার প্রতি অতিরিক্ত করুণা দেখিয়ে অন্যায়ে জড়িয়ে পড়ো না, আবার শত্রু বলে তার প্রতি কঠোরতা দেখাতে গিয়ে ন্যায়ের সীমা অতিক্রম করো না; বরং সত্যের উপর দৃঢ় থাকো এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করো, সত্য বলতে গিয়ে নিজের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিলেও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য মুক্তি ও কল্যাণের পথ উন্মুক্ত করে দেন।
আর যখন বাবা-মা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে হয়, তখনও সত্য কথা বলো, তাদের প্রতি ভালোবাসা বা খাতিরের কারণে সত্য গোপন করো না। কারণ সত্যই সবার ঊর্ধ্বে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ধনী হোক কিংবা গরীব—তোমরা তাদের সম্পদ বা দারিদ্র্যের বিবেচনায় ন্যায়বিচার থেকে সরে যেয়ো না। কারণ আল্লাহই তাদের অভিভাবক, তিনি তাদের ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে অধিক হক্বদার ও সম্যক অবগত।
‘খেয়ালখুশির অনুসরণ যেন তোমাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা থেকে বিচ্যুত না করে’—এর অর্থ হলো ব্যক্তিগত পক্ষপাত, জাতিগত বিদ্বেষ, রাগ, ঘৃণা ও আত্মিক প্রবৃত্তির মতো মানবিক বৈশিষ্ট্য যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার ত্যাগ করতে বাধ্য না করে। যেমন অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘কোনো জাতির প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো, এটাই তাক্বওয়ার অধিক নিকটবর্তী’ (আল-মায়েদা, ৫/৮)।
এ বিষয়ে এক উজ্জ্বল উদাহরণ নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি যখন খায়বারের ইয়াহূদীদের ফলমূলের হিসাব নিতে গিয়েছিলেন, তখন তারা তাকে ঘুষ দিতে চেয়েছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, আমি এমন এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছি, যিনি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আর তোমরা আমার কাছে অত্যন্ত অপ্রিয়। কিন্তু তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসা কিংবা তোমাদের প্রতি আমার ঘৃণা—কোনো কিছুই আমাকে ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। এ কথা শুনে তারা বলেছিল, এই ন্যায়বিচারের কারণেই আসমান ও যমীন দৃঢ়ভাবে টিকে আছে।[2]
তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো ইয়াহূদীরা ন্যায়বিচারের মূল্য, মানবাধিকার ও সত্যের গুরুত্ব ভালোভাবেই জানে এবং নিজেরা তার সুফলও ভোগ করে; তবুও রাজনৈতিক স্বার্থ, অহংকার ও আধিপত্য বিস্তারের লালসা তাদেরকে যুলম, অন্যায় ও সত্য প্রত্যাখ্যানের পথে অগ্রসর করে। বিশেষ করে যখন তারা আল্লাহকে অস্বীকার করে, সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, তখন সেটিই মানবতার জন্য বড় বিপদের কারণ হয়। এই একই আচরণ হিন্দুদের ক্ষেত্রেও লক্ষ করা যায়। তারা সত্যকে চেনে ও জানে, তবুও সত্যবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতার পথকে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ তারা মনে করে যে, আভিজাত্য ও স্বাতন্ত্র্যই তাদের মর্যাদা ও বিশেষত্বের প্রতীক, যা কেবল তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, জ্ঞান ও সত্যের পরিচয় থাকা সত্ত্বেও যখন কোনো জাতি বা গোষ্ঠী সচেতনভাবে সত্য প্রত্যাখ্যান করে, তখন তাদের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ ভয়াবহ অবস্থা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা।
পশ্চিমা শক্তি ও পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীলতাকে অনেকেই দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের একমাত্র উপায় মনে করে। তারা জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, উগ্রবাদ ইত্যাদি ট্যাগ ব্যবহার করে ইসলামী মূল্যবোধের ইতিবাচক উত্থানকে ঠেকাতে চায়। ক্ষমতার লালসা, নির্দিষ্ট মতাদর্শিক প্রভাব ও সংকীর্ণ স্বার্থ রক্ষার মানসিকতা তাদেরকে নতজানু নীতি অনুসরণের দিকে ধাবিত করে। এই ভীতিনির্ভর মনোভাব ও পরমুখাপেক্ষী চিন্তাধারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌম অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।
আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেছেন, ‘যারা মুসলিমদের বর্জন করে কাফেরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তাদেরই কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে, অথচ যাবতীয় সম্মান শুধু আল্লাহরই জন্য’ (আন-নিসা, ৪/১৩৯)।
‘আর যদি তোমরা সাক্ষ্যকে বিকৃত করো অথবা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও’—এ বিষয়ে মুজাহিদ ও সালাফদের বক্তব্য হলো বিকৃত করা মানে, সাক্ষ্যকে ঘুরিয়ে দেওয়া, পরিবর্তন করা, পরিষ্কার সত্যকে বদলে দেওয়া। আর মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মানে, সাক্ষ্য গোপন করা অর্থাৎ সাক্ষ্য থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়া।
তাদের দায়িত্ব হলো সত্য, পরিষ্কার, সুস্পষ্ট সাক্ষ্য প্রদান করা। তারা যেন সাক্ষ্যকে এমনভাবে অস্পষ্ট করে না বলে, যাতে তা কার্যকর না থাকে কিংবা সন্দেহজনক মনে হয় যেন গ্রহণযোগ্য না হয় অথবা তারা যেন সাক্ষ্য পুরোই গোপন না করে। এ দুটিই খেয়াল ও পক্ষপাতের ফল।
যে সাক্ষ্য দিতে পারে, অথচ গোপন করে সে বড় গুনাহগার। আল্লাহ বলেন, ‘যে সাক্ষ্য গোপন করে, তার হৃদয় পাপী’। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সেরা সাক্ষী সেই, যে প্রয়োজনের সময় অনুরোধের আগেই সাক্ষ্য নিয়ে আসে’।[3] তাই আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত, তিনি তা অনুযায়ী প্রতিফল দিবেন’।
এর পরের আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি, তাঁর নাযিলকৃত কিতাবের প্রতি এবং পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আনো। আর যে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূল এবং আখেরাতকে অস্বীকার করে সে কঠিন বিভ্রান্তিতে পড়ে’।
আল্লাহ মুমিনদেরকে আদেশ দিয়েছেন পূর্ণাঙ্গ ঈমান গ্রহণ করতে। এটি শুধু ঈমানের দাবি নয়; বরং ঈমানকে আরও শুদ্ধ করা, দৃঢ় করা, প্রতিষ্ঠিত করা এবং স্থায়ী করা। যেমন আমরা ছালাতে প্রতিদিন বলি, ‘আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করো’ অর্থাৎ হেদায়াতকে আরও শক্ত করো এবং তাতে আমাদেরকে অটল রাখো।
অতঃপর যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসূলদের প্রতি ও আখেরাতের প্রতি ঈমান অস্বীকার করবে, সে সরল পথ থেকে বহুদূরে সরে যাবে।
উপসংহার
ন্যায়বিচার, সত্যনিষ্ঠা ও তাক্বওয়া—এগুলো একটি জাতির অগ্রযাত্রা ও মর্যাদার প্রকৃত ভিত্তি। কুরআনের এ আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় নিজ স্বার্থ, আবেগ, পক্ষপাত ও ভয়ভীতি যেন কখনো ন্যায়বিচারকে পরাজিত করতে না পারে। ন্যায় প্রতিষ্ঠা শুধু একটি নৈতিক দাবি নয়, এটি আল্লাহ তাআলার সরাসরি নির্দেশ এবং ঈমানের অপরিহার্য শর্ত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে জাতি সত্যকে ত্যাগ করে, অন্যায়কে আলিঙ্গন করে, ক্ষমতার মোহে ন্যায়বিচার ধ্বংস করে তাদের পতন অনিবার্য। আর যারা ন্যায়, সত্য, তাক্বওয়া ও আল্লাহর উপর নির্ভরতা দৃঢ় রাখে আল্লাহ তাদের জন্য সম্মান, সাফল্য ও বিজয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন।
অতএব, আজ আমাদের দায়িত্ব হলো ন্যায়ের উপর দৃঢ় থাকা, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা, খেয়ালখুশি ও পক্ষপাতের অনুসরণ ত্যাগ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানানো। এভাবেই ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র ও উম্মাহ সত্যিকার কল্যাণ, শান্তি ও শক্তির পথে এগোতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ন্যায়বিচারে অটল থাকার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
মুহাম্মদ মুস্তফা কামাল
প্রভাষক (আরবী), বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বরিশাল।
[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৭৯৯।
[2]. আহমাদ, হা/১৪৯৫৩; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ১২৩/৪।
[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৯; ছহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৫০৭৯।
