১. রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসা, এই ভালোবাসা প্রকাশ পাবে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো’ (আল-মায়েদা, ৫/৯২)। আর হাদীছে এসেছে,لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার সন্তান, পিতা-মাতা ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়ে উঠি’।[1]
২. প্রতি মুহূর্তে, বিশেষত শুক্রবারের রাত ও দিনে তাঁর প্রতি অধিক পরিমাণে দরূদ পাঠ করা।
৩. রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম উচ্চারিত হলে তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করার প্রতি আরও জোরালোভাবে সুপারিশ করা হয়েছে। হাদীছে এসেছে,الْبخِيلُ مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ، فَلَم يُصَلِّ علَيَّ ‘সেই ব্যক্তি কৃপণ, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হয়; অথচ সে আমার প্রতি দরূদ পাঠ করে না’।[2]
৪. রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী ও সুন্নাহকে সকল মানুষের মতামতের উপর প্রাধান্য দেওয়া।
৫. যেসব হাদীছ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা। হাদীছে এসেছে,مَنْ يَقُلْ عَلَىَّ مَا لَمْ أَقُلْ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ ‘যে ব্যক্তি আমার নামে এমন কিছু বর্ণনা করে যা আমি বলিনি, তার জন্য জাহান্নামে একটি আসন নির্ধারিত থাকবে’।[3]
৬. সাধ্যানুযায়ী তাঁর সুন্নাতের উপর আমল করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যতটুকু সম্ভব’ (আত-তাগাবুন, ৬৪/১৬)। এই ভয় প্রকাশ পাবে ইবাদত, চরিত্র ও অন্যান্য বিষয়ে ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ অনুযায়ী চলার মাধ্যমে।
৭. রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ মানুষদের মাঝে হিকমত বা জ্ঞান ও বিবেচনার সাথে এবং উত্তম পন্থায় ছড়িয়ে দেওয়া। হাদীছে এসেছে, بَلِّغُوا عَنِّي وَ لَوْ آيَة ‘আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও’।[4]
৮. যখন কেউ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ নিয়ে কটাক্ষ করে বা আক্রমণ করে, তখন মুসলিমের কর্তব্য হলো তাঁর সুন্নাহর পক্ষে দৃঢ়ভাবে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো। আশ্চর্যের বিষয় হলো কিছু লোক যদি তাদের বংশ বা গোত্র নিয়ে কেউ কিছু বলে, তবে তারা ভীষণ রেগে যায়; কিন্তু কেউ যদি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে কিছু বলে, তাহলে তারা চুপ থাকে, কিছুই বলে না। নিঃসন্দেহে এটি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ভালোবাসায় দুর্বলতার স্পষ্ট চিহ্ন।
৯. তিনি যে সকল গায়েবী সংবাদ (অদৃশ্য জগতের খবর) এনেছেন, যেমন- ক্বিয়ামতের পূর্ব লক্ষণ, কবরের আযাব, ক্বিয়ামতের দিনের অবস্থা এগুলো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা।
১০. তিনি যেসব কাজ থেকে নিষেধ করেছেন, সেগুলো থেকে বিরত থাকা। কারণ এটাই জান্নাতে যাওয়ার পথ। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,كُلُّ أُمَّتِى يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلاَّ مَنْ أَبَى قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنْ يَأْبَى قَالَ مَنْ أَطَاعَنِى دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِى فَقَدْ أَبَى ‘আমার উম্মতের সকল মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে, শুধু সে ব্যক্তি ছাড়া যে নিজে তা অস্বীকার করে’। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কে জান্নাতে যেতে অস্বীকার করবে? তিনি বললেন, ‘যে আমার আনুগত্য করে, সে জান্নাতে যাবে আর যে আমার অবাধ্য হয়, সেই জান্নাতে যেতে অস্বীকার করেছে’।[5]
১১. তাঁর ব্যাপারে অতিরঞ্জন না করা এবং তাঁকে আল্লাহর গুণাবলি বা উপাসনার অধিকার প্রদান না করা, তাঁকে ডাকা, তাঁর নামে কসম খাওয়া বা এমন কোনো ইবাদত করা যা কেবল আল্লাহরই হক্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন, قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ ‘বলুন, আমি তো কেবল তোমাদেরই মতো একজন মানুষ’ (আল-কাহফ, ১৮/১১০)।
১২. যখন কোনো বিষয়ে মতভেদ দেখা দেয়, তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া। আল্লাহ বলেন,فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ ‘যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতানৈক্য হয়, তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে ফিরিয়ে দাও’ (আন-নিসা, ৪/৫৯)। অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া। কিন্তু আপনি যখন বাস্তবে কিছু মানুষের অবস্থার দিকে তাকাবেন, তখন আশ্চর্য হবেন। কারো কারো ক্ষেত্রে দেখা যায়, মতবিরোধ হলে সে আচার-সংস্কারের দিকে ফিরে যায়, কেউ নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে। আবার কেউ মানুষের মনগড়া মতামত ও রুচির দিকে ঝুঁকে পড়ে। তবে একমাত্র সঠিক পথ হলো আল্লাহর কিতাব ও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া।
১৩. রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ ও নিষেধের প্রতি পূর্ণ সাড়া দেওয়া এবং এতে কোনো দ্বিধা না করা। আল্লাহ তাআলা বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ডাকা হলে আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দাও, যখন তিনি তোমাদের এমন বিষয়ে আহ্বান করেন, যা তোমাদের জীবন দান করে’ (আল-আনফাল, ৮/২৪)।
১৪. এই বিশ্বাস রাখা যে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তিনিই সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না।
১৫. তাঁর জীবনী অধ্যয়ন করা এবং সেখান থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করা।
১৬. তাঁর ছাহাবীদের ভালোবাসা এবং তাদের প্রতি মিত্রতা রাখা।
১৭. যারা তাঁর সুন্নাহর উপর অটল থাকে, তাদেরকে ভালোবাসা ও তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা।
১৮. যারা বিদআত প্রচার করে এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পথের বিপরীত পথে চলে, তাদের প্রতি ঘৃণা রাখা।
১৯. এই বিশ্বাস রাখা যে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যুর পূর্বে দ্বীনের বার্তা পূর্ণরূপে পৌঁছে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম’ (আল-মায়েদা, ৫/৩)।
২০. রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আহলে বায়তকে (পরিবার ও বংশধরদের) ভালোবাসা ও তাদের সহযোগিতা করা। তবে কোনোভাবেই তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে অতিরঞ্জিত করা যাবে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আলী, ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বা অন্যান্য আহলে বায়তের কাউকে এমন মর্যাদায় উন্নীত করা যাবে না, যা তাদের প্রাপ্য নয়।
মূল: সুলতান ইবনে আব্দুল্লাহ আল-উমরী
অনুবাদ: হুসাইন আহমাদ আল-ইয়াদী
অধ্যয়নরত, কুল্লিয়্যাহ ২য় বর্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫।
[2]. ছহীহুল জামে‘, হা/২৮৭৮।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১০৯।
[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৬১।
[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৭২৮০।
