কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ইফকের ঘটনা

উরওয়া ইবনু যুবায়ের, সাঈদ ইবনু মুছায়্যেব, আলকামাহ ইবনু ওয়াক্কাছ, উবাইদুল্লাহ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহুম নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদের ঘটনা সম্পর্কে হাদীছ বর্ণনা করেন। রাবী ইবনু শিহাব যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তাঁদের প্রত্যেকেই হাদীছটির অংশ বিশেষ আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। হাদীছটি স্মরণ রাখা ও সঠিকভাবে বর্ণনা করায় তাঁদের কেউ কেউ অপরের চেয়ে অধিকতর অগ্রগামী ও নির্ভরযোগ্য। ইবনু শিহাব রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, তাঁরা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে আমার নিকটে বর্ণনা করেছেন, আমি তা মনোযোগ সহকারে স্মরণ রেখেছি। তাঁদের একজনের বর্ণিত হাদীছের অংশ বিশেষ অপরের বর্ণিত হাদীছের অংশ বিশেষের সত্যতা প্রমাণ করে। তাঁরা সকলেই আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণনা করেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভ্রমণে যাওয়ার সময় তাঁর স্ত্রীদের মাঝে লটারির মাধ্যমে যার নাম উঠত, তাঁকে সাথে নিতেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এরূপ কোন এক জিহাদে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে লটারি করলে তাতে আমার নাম উঠে। তাই এ সফরে আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথী হলাম। এটা পর্দার বিধি-বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পরবর্তী সময়ের ঘটনা। পর্দা রক্ষার জন্য আমাকে হাওদাসহ সওয়ারীতে উঠানো-নামানো হত। এভাবে আমাদের ভ্রমণ চলতে থাকল। অবশেষে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিহাদ শেষে বাড়ী ফিরলেন। ফেরার পথে মদীনার কাছাকাছি হলে তিনি একদিন রাতের বেলা প্রস্ত্তত হওয়ার নির্দেশ দেন। যাত্রা করার ঘোষণা হলে আমি উঠে (পেশাব/পায়খানার জন্য) পায়ে হেঁটে সেনাছাউনি পার হয়ে গেলাম এবং প্রয়োজন সেরে আমার আরোহীর নিকটে উপস্থিত হয়ে বুকে হাত দিয়ে দেখতে পেলাম, আমার গলার হারখানা ছিঁড়ে কোথাও পড়ে গেছে। আমি ফিরে গিয়ে তা অনুসন্ধান করতে আরম্ভ করলাম। তাতে আমার বিলম্ব হয়ে গেল। যে লোকগুলো সওয়ারীর পিঠে আমার হাওদা উঠিয়ে দিত, তারা এসে আমার উটের পিঠে হাওদা উঠিয়ে দেয়। তারা মনে করেছিল আমি হাওদার ভিতরেই আছি। কারণ, খাদ্যাভাবে মেয়েরা তখন হালকা পাতলা হয়ে গিয়েছিল। তাদের শরীরে তখনো বেশি মাংস বৃদ্ধি পায়নি। তারা খুব অল্প পরিমাণ খাদ্য খেতে পেত। অধিকন্তু আমি তখন অল্প বয়স্কা একজন কিশোরী ছিলাম। তাই তারা শূন্য হাওদা উটের পিঠে উঠানোর সময় বুঝতেই পারেনি, আমি তাতে নেই। এরপর তারা উট হাঁকিয়ে চলে গেল। সেনাদল প্রস্ত্তত হয়ে যাওয়ার পর আমি আমার হার খুঁজে পেলাম এবং ফিরে এসে দেখতে পেলাম, সেখানে কেউই নেই। আমি মনে করলাম, তারা আমাকে দেখতে না পেলে অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করবে। অতএব, আমি যে জায়গাতে ছিলাম (রাত যাপন করছিলাম), সেখানে গিয়ে বসে পড়লাম এবং বসে বসে ঘুম পেলে ঘুমিয়ে পড়লাম। বনী সুলাইম সম্প্রদায়ের যাকওয়ান শাখার ছাফওয়ান ইবনু মু‘আত্তাল রাযিয়াল্লাহু আনহু, যাকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেনাদলের ফেলে যাওয়া দ্রব্যসামগ্রী কুড়িয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেনাদল রওয়ানা হয়ে চলে যাওয়ার পর তিনি সেখানেই ছিলেন। ভোর বেলা তিনি আমার অবস্থানস্থলের কাছে উপস্থিত হয়ে আমাকে নিদ্রিত অবস্থায় দেখে চিনে ফেলেন এবং সজোরে ‘ইন্না-লিল্লা-হি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন’ পড়েন। পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে তিনি আমাকে দেখেছিলেন। তাই আমাকে চিনতে পেরে তিনি ‘ইন্না-লিল্লা-হ’ পড়লে তা শুনে আমি ঘুম থেকে সজাগ হলাম এবং চাদর টেনে মুখমণ্ডল ঢেকে ফেললাম। আল্লাহ্র কসম! আমাদের মাঝে কোন কথাবার্তাই হয়নি। আর আমিও তাঁর নিকট হতে ‘ইন্না-লিল্লা-হ’ ছাড়া আর কোন কথাই শুনতে পাইনি। তিনি আমাকে নেয়ার জন্য আরোহী থেকে নিচে নামেন এবং আরোহী বসিয়ে সেটার পা কষে বাঁধলে আমি আরোহণ করলাম। তিনি তখন সওয়ারী নিয়ে আগে আগে চলতে থাকলেন। অবশেষে ঠিক দুপুর বেলা প্রচণ্ড গরমের সময় আমরা সেনাদলের সাথে মিলিত হলাম। সে সময় তারা একস্থানে অবস্থান করছিলেন। এরপর যাদের নিঃশেষ হওয়ার তারা আমার প্রতি কুৎসা রটনা করে ধ্বংস হল। এ কুৎসা আরোপের পুরোভাগে ছিল মুনাফিক্ব নেতা আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনি সলূল।

বর্ণনাকারী উরওয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি জানতে পেরেছি, তার (আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনি সলূলের) সম্মুখে অপবাদের কথাগুলো প্রচার করা হত আর সে তা বাস্তব বলে স্বীকার করত এবং শুনা কথা দ্বারাই তা প্রমাণ করার চেষ্টা করত। উরওয়াহ ইবনু যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু আরো বর্ণনা করেন, কুৎসা আরোপকারী লোকদের মাঝে হাস্সান ইবনু ছাবিত, মিসতাহ ইবনু উসামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা এবং হামনাহ বিনতু জাহ্শ রাযিয়াল্লাহু আনহা ব্যতীত আর কোন নাম উল্লেখ করা হয়নি। তারা গুটি কতেক লোকের একটি দল ছিল। এতটুকু ব্যতীত তাদের ব্যাপারে আমি আর কিছুই জানি না। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআন মাজীদে এ ব্যাপারে বর্ণনা করেছেন। আর আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনি সলূলকে সবচেয়ে বড় অপবাদ রটনাকারী বলে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। উরওয়াহ ইবনু যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এ ব্যাপারে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হাস্সান ইবনু ছাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে গালমন্দ করা অপসন্দ করতেন। তিনি বলেন, হাস্সান ইবনু ছাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু তার একটি কবিতায় বলেছেন, ‘আমার ও আমার বাপ দাদার মান-সম্মান মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মান-সম্মান ও ইযযত রক্ষায় নিবেদিত’।

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এরপর আমরা (সব মুসলিম) মদীনায় উপস্থিত হওয়ার পর আমি একমাস পর্যন্ত রোগাক্রান্ত রইলাম। এদিকে অপবাদের বিষয় নিয়ে মানুষদের মাঝে কানাঘুষা হতে লাগল, কিন্তু তখনো পর্যন্ত এসবের কিছুই আমি জানতাম না। তবে আমার মনে সন্দেহ হচ্ছিল এবং তা আরো দৃঢ় হচ্ছিল এ কারণে যে, অসুখের পূর্বে আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট হতে যেরূপ সেণহ ও মায়া-মমতা পেতাম, এবারে তা পাচ্ছিলাম না। তিনি আমার কাছে গিয়ে কেবল ‘তুমি কেমন আছ? বলেই চলে আসতেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ আচরণই আমার মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। তবে আমি কিছুটা সুস্থ হলে একদিন পেশাব/পায়খানা করতে ঘর থেকে বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ জঘন্য কুৎসার ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। পেশাব/পায়খানা করতে আমরা রাতের বেলা বের হতাম। এক রাতে বের হলে আবার পরের রাতে বের হতাম। এ ছিল আমাদের ঘরের পাশে পায়খানা (বাথরুম) নির্মাণের পূর্বের পরিস্থিতি। আমরা সাধারণ আরববাসীদের প্রাচীন অভ্যাসমত পায়খানার জন্য বসত এলাকার বাইরে মাঠ বা ঝোপঝাড়ে চলে যেতাম। আর (অভ্যাস না থাকায়) বাড়ীর পার্শ্বে বাথরুম নির্মাণ করলে আমরা খুব কষ্ট পেতাম। তাই আবু রুহ্ম ইবনু মুত্তালিব ইবনু আবদে মানাফের মেয়ে উম্মু মিসতাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা আবুবকর ছিদ্দীক্ব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খালা ছাখর ইবনু আমের রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর মেয়ে ছিল যার মা এবং মিসতাহ ইবনু উসামাহ ইবনু আববাদ ইবনু মুত্তালিব ছিল যার ছেলে। তিনিও এক সময় আমার সাথে পেশাব/পায়খানা করার জন্য বের হন। আমি ও উম্মু মিসতাহ এক সাথে গেলাম। আমাদের দরকার সেরে বাড়ী ফেরার সময় উম্মু মিসতাহর কাপড় পায়ে জড়িয়ে তিনি পড়ে গেলে বলে উঠলেন, মিসতাহ ধ্বংস হোক! আমি তাকে বললাম, আপনি খুব মন্দ কথা বললেন। আপনি এমন এক লোককে গালমন্দ করছেন, যিনি বদর যুদ্ধে শামিল হয়েছেন। তখন উম্মু মিসতাহ বললেন, সে তোমার ব্যাপারে কী বলেছে, তুমি কি তা শুনতে পাওনি? আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তখন আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, হে উম্মু মিসতাহ! সে আমার ব্যাপারে কী বলেছে? তখন তিনি অপবাদ রটনাকারীদের ক্রিয়াকলাপ ও প্রচারণার ব্যাপারে আমাকে জানান। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এ সংবাদ শুনে আমার অসুস্থতা আরো বেড়ে গেল। অতঃপর আমি যখন ঘরে ফিরে এলাম রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এসে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেমন আছ? আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এরপর আমি আমার পিতা-মাতার নিকটে গিয়ে বিষয়টির ব্যাপারে সঠিক সংবাদ জানতে চাইলাম। তাই আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, আপনি কি আমাকে আমার পিতা-মাতার নিকটে যাওয়ার অনুমতি দিবেন? আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তিনি আমাকে পিতা-মাতার নিকটে যেতে অনুমতি দেন। আমি গিয়ে আমার আম্মাকে বললাম, আম্মা! মানুষেরা কী ব্যাপারে এত কানাঘুষা ও আলোচনা করছে। তিনি বললেন, এ বিষয় নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তা কর না। কারণ সতীন আছে, এমন স্বামী সোহাগিনী সুন্দরী যুবতী মহিলাকে সতীনরা বদনামগ্রস্ত করবে না, এমন ঘটনা খুব কমই হয়ে থাকে। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! মানুষেরা এমন জঘন্য বিষয় রটিয়েছে। তিনি আরো বলেন, কান্না অবস্থায় আমার সে রাত কেটে গেল। এমনকি ভোর হল। এর মধ্যে আমার চোখের পানি বন্ধ হল না এবং ঘুমাতেও পারলাম না। কেঁদে কেঁদে ভোরে উপনীত হলাম। এ সময় অহি আসতে দেরী হচ্ছে দেখে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ আমার বিচ্ছেদের প্রসঙ্গে পরামর্শ চেয়ে আলী ইবনু আবী তালিব ও উসামাহ ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-কে ডেকে পাঠান। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, উসামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের পবিত্রতা ও তাঁদের প্রতি ভালবাসার কারণে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার স্ত্রীর (আয়েশা) ব্যাপারে আমি ভাল ব্যতীত অন্য কিছুই জানি না। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ তো আপনার জন্য সংকীর্ণতা রাখেননি। তাকে ব্যতীত তো আরো অনেক নারী আছে। তবে আপনি দাসী বারীরাকে প্রশ্ন করে দেখুন, সে আপনাকে সত্য কথাই বলবে। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাসী বারীরাকে ডেকে বললেন, ‘হে বারীরাহ! তুমি আয়েশার কোন সন্দেহজনক আচরণ দেখেছ? বারীরাহ বললেন, সে সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্য বিধানসহ প্রেরণ করেছেন! আমি তাঁর মাঝে কোন ধরনের দূষণীয় আচরণ দেখিনি। তবে তিনি অল্প বয়স্কা কিশোরী হওয়ার কারণে শুধু তাঁর এতটুকু দোষ দেখেছি যে, রুটি বানানোর জন্য আটা খামীর করে রেখে ঘুমিয়ে পড়েন আর বকরী এসে তা খেয়ে ফেলে।

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই মুহূর্তে উঠে গেলেন এবং মিম্বারে দাঁড়িয়ে মুনাফিক্ব নেতা আব্দুল্লাহ ইবনু উবাইর বিরুদ্ধে সাহায্য কামনা করেন। তিনি বললেন, ‘হে মুসলিমগণ! যে আমার স্ত্রী আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা সম্পর্কে কুৎসা রটিয়ে আমাকে যন্ত্রণা দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে তোমরা কি আমাকে সহযোগিতা করতে পার? আমি তো আমার স্ত্রী আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর ব্যাপারে ভাল ব্যতীত মন্দ কিছু জানি না আর তারা (অপবাদ রটনাকারীরা) এমন এক লোকের (ছাফওয়ান ইবনু মু‘আত্তালের) নাম বর্ণনা করেছে, যার ব্যাপারেও আমি ভাল ব্যতীত খারাপ ধারণা পোষণ করি না। সে তো আমার অনুপস্থিতিতে আমার স্ত্রীদের নিকটে কখনো যায়নি। একথা শুনে বনী আব্দুল আশহাল সম্প্রদায়ের সা‘দ ইবন মু‘আয রাযিয়াল্লাহু আনহু উঠে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এ প্রসঙ্গে আমি আপনাকে সহযোগিতা করব। সে যদি আউস সম্প্রদায়ের মানুষ হয়, তাহলে আমি তার শিরশ্ছেদ করব। আর যদি আমাদের বন্ধু সম্প্রদায় খাযরাজের ব্যক্তি হয় তাহলে তার ব্যাপারে আপনি যা আদেশ করবেন আমি তাই করব। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এ সময় হাস্সান ইবনু ছাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মায়ের চাচাতো ভাই খাযরাজ সম্প্রদায় নেতা সা‘দ ইবনু উবাদাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে তার প্রতিবাদ করলেন। এ ঘটনার আগে তিনি একজন সৎ ও পূণ্যবান ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু সম্প্রদায় প্রীতির কারণে উত্তেজিত হয়ে সা‘দ ইবনু মু‘আয রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে লক্ষ্য করে বললেন, তুমি মিথ্যা বলছ। তুমি তাকে মেরে ফেলতে পারবে না এবং তাকে হত্যা করার ক্ষমতাও তোমার নেই। সে তোমার সম্প্রদায়ের মানুষ হলে তার নিহত হওয়া তুমি অবশ্যই পসন্দ করতে না। তৎক্ষণাৎ সা‘দ ইবনু মু‘আযের চাচাতো ভাই উসাঈদ ইবনু হুযাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু উঠে সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সমর্থনে বললেন, তুমিই বরং মিথ্যা বললে, আল্লাহ্র শপথ! আমরা অবশ্যই তাকে মেরে ফেলব। তুমি মুনাফিক্ব! তাই তুমি মুনাফিক্বের পক্ষ নিয়ে কথা বলছো। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, এ সময় আউস ও খাযরাজ উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরা উত্তেজিত হয়ে জিহাদের ইচ্ছা করে বসে। অথচ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনো মিম্বারে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে শান্ত করলেন এবং নিজেও আর কোন কথা বললেন না। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি সে দিন সারাক্ষণ কেঁদে কেঁদে কাটালাম। অবিরত ধারায় আমার নয়নযুগল থেকে অশ্রু নির্গত হচ্ছিল। এমনকি মনে হচ্ছিল, কান্নায় আমার হৃৎপিণ্ড বিদীর্ণ হয়ে যাবে। আমি ক্রন্দনরত ছিলাম আর আমার পিতা আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমার পার্শ্বে বসা ছিলেন। এ সময় একজন আনছারী মহিলা আমার কাছে আসতে অনুমতি চাইলে আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সেও আমার কাছে বসে কাঁদতে শুরু করল। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমাদের অবস্থা যখন এই ছিল, ঠিক সে সময় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ঘরে এসে হাযির হন এবং সালাম দিয়ে বসে পড়েন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, কুৎসা রটনার পর থেকে আর তিনি কোন দিন আমার নিকটে এসে বসেননি। এদিকে তিনি এক মাস অপেক্ষা করার পরও আমার বিষয়ে কোন অহি আসেনি। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট বসার পর প্রথম কালিমা শাহাদাত পড়লেন, তারপর বললেন, হে আয়েশা! আমি তোমার প্রসঙ্গে এরূপ এরূপ অনেক কথা শুনতে পেলাম। যদি তুমি এ প্রসঙ্গে নিষ্পাপ হও, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা অবশ্যই তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করবেন। আর যদি তোমার দ্বারা কোন পাপ সংঘটিত হয়েই থাকে, তাহলে আল্লাহ্র নিকটে ক্ষমা চাও এবং তওবা কর। কারণ বান্দা পাপ করার পর স্বীকার করলে এবং তওবা করলে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা শেষ করলে সাথে সাথে আমার অশ্রুপাত বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি আমি আর এক বিন্দু অশ্রুও অনুভব করলাম না। আমার আববা আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বললাম, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বললেন, আমার পক্ষ হতে তার উত্তর দিন। আমার বাবা বললেন, আল্লাহ্র শপথ! রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এর কী উত্তর দেব, তা আমি জানি না। তখন আমি আমার মাকে বললাম, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা বললেন, আমার পক্ষ হতে তার উত্তর দিন। মা বললেন, আল্লাহ্র শপথ! রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কী উত্তর দেব তা আমি বলতে পারছি না। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি তখন ছিলাম অল্প বয়স্কা কিশোরী। কুরআন মজীদও বেশি কিছু জানতাম না, কিন্তু সকলের এ অবস্থা দেখে আমিই তখন বললাম, আল্লাহ্র কসম! আমি জানি, আপনারা এ কুৎসার কাহিনী শুনেছেন এবং তা বিশ্বাস করে নিয়েছেন। সুতরাং এখন যদি আমি বলি, আমি নিষ্পাপ, তাহলে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আমি স্বীকার করি, যে ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা ভালভাবেই জানেন, আমি এ বিষয়ে নিষ্পাপ, তাহলে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন। আল্লাহ্র শপথ! আমি ও আপনারা আজ যে অবস্থার শিকার হয়েছি, তার জন্য নবী ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর পিতা ইয়াকূব আলাইহিস সালাম-এর কথার উদাহরণ ব্যতীত আর কোন উদাহরণ আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তিনি বলেছিলেন,

فَصَبْرٌ جَمِیْلٌ ؕ وَ اللّٰهُ الْمُسْتَعَانُ عَلٰی مَا تَصِفُوْنَ

‘এখন ধৈর্য ধারণ করাই উত্তম; আর তোমরা যা বল, সে প্রসঙ্গে আল্লাহই শুধু সাহায্যকারী’ (ইউসুফ, ১৮)

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একথা বলে আমি মুখ ফিরিয়ে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে পড়লাম। আল্লাহ তো জানেন, আমি সে মুহূর্তেও পবিত্র। আর আমি এও জানতাম, আল্লাহ আমাকে পবিত্র প্রমাণ করবেন। তবে আল্লাহ্র শপথ! আমি কখনো মনে করিনি, আল্লাহ আমার বিষয়ে অহি অবতীর্ণ করবেন, যা পাঠ করা হবে। আমার কোন প্রসঙ্গে আল্লাহ আয়াত অবতীর্ণ করবেন, আমি নিজেকে এতখানি যোগ্য মনে করিনি; বরং আমি এতটুকু আশা করতাম, তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমার পবিত্রতার ব্যাপারে জানিয়ে দিবেন। আল্লাহ্র কসম! রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনো তাঁর স্থান ত্যাগ করেননি এবং বাড়ীর কোন মানুষ তখনও বাইরে যাননি। এ সময় তাঁর উপর অহি অবতীর্ণ শুরু হল। অহি অবতীর্ণ হওয়ার সময় যে বিশেষ কষ্টকর অবস্থা দেখা দিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ঠিক সে অবস্থা দেখা দিল। যে বাণী তাঁর উপর অবতীর্ণ হত, তা গুরুগম্ভীর হওয়ার কারণে এরূপ হত। এমনকি প্রচণ্ড শীতের দিনেও তাঁর শরীর হতে মতির দানার ন্যায় বিন্দু বিন্দু ঘাম গড়িয়ে পড়ত।

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কষ্টকর অবস্থার নিরসন হলে তিনি হাসিমুখে প্রথম যে কথা বললেন, তা হল, ‘হে আয়েশা! আল্লাহ তো তোমাকে পবিত্র ঘোষণা করছেন’। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একথা শুনে মা আমাকে বললেন, উঠে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান প্রদর্শন কর। আমি বললাম, আমি উঠব না এবং আল্লাহ ব্যতীত আর কারো প্রশংসাও করব না। তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আমার পবিত্রতা ঘোষণা করে যে দশটি আয়াত অবতীর্ণ করেছেন, তা হল-

إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ مَا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ (11) لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُبِينٌ (12) لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ (13) وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ (14) إِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِأَلْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُمْ مَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمٌ (15) وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هَذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ (16) يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ (17) وَيُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ (18) إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (19) وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ (20)

অর্থাৎ ‘যারা এ অপবাদের ঝড় তুলেছে, তারা তোমাদের মধ্যকারই ছোট একটি দল। এ ঘটনা তোমরা নিজেদের জন্য ক্ষতিকর মনে কর না এবং এটা তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক। এ ক্ষেত্রে যে লোক যতখানি তৎপরতা দেখিয়েছে, সে ততখানি পাপ অর্জন করেছে। আর যে এ প্রসঙ্গে বড় রকমের তৎপরতা চালিয়েছে, তার জন্য আছে বড় রকমের শাস্তি। যে সময় তোমরা এটি শুনলে, তখন তোমরা ঈমানদার নারী-পুরুষ নিজেদের পরস্পরের ব্যাপারে ভাল ধারণা পোষণ করলে না কেন? কেন বললে না, এটা সুস্পষ্ট অপবাদ? তারা কেন তাদের আরোপিত অপবাদের জন্য চারজন প্রমাণ উপস্থিত করল না? যেহেতু তারা সাক্ষী উপস্থিত করতে পারেনি, তাই আল্লাহ্র নিকটে তারাই মিথ্যাবাদী। তোমাদের প্রতি পৃথিবী ও পরকালে যদি আল্লাহ্র রহমত না হত, তাহলে তোমাদের উপর ভয়ানক সাজা উপস্থিত হত। একটু চিন্তা করে দেখ, যখন তোমরা মুখে মুখে এ মিথ্যা কুৎসা চর্চা করছিলে এবং যে বিষয়ে আদৌ তোমাদের কোন জ্ঞান ছিল না, মুখে মুখে তার চর্চা করছিলে এবং এটাকে একটা সাধারণ বিষয় বলে ভাবছিলে, অথচ আল্লাহ্র কাছে তা ছিল খুবই ভয়ানক ব্যাপার। একথা শুনামাত্রই তোমরা কেন বললে না, এ প্রকারের কথা মুখ হতে বের করাও আমাদের জন্য শোভনীয় নয়। সুবহানাল্লাহ! এ তো এক গুরুতর অপবাদ। আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন। যদি তোমরা বিশ্বাসী হয়ে থাক, তাহলে ভবিষ্যতে এরূপ কাজ আর কখনো যেন না কর। তোমাদের জন্যই আল্লাহ তাঁর আদেশসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করেন। আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও মহাকৌশলী। যারা চায় ঈমানদারদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তারা ইহকালের জীবনে ও পরকালেও কঠোর শাস্তির যোগ্য। আল্লাহ সবকিছু অবগত আছেন, কিন্তু তোমরা তা অবহিত নও। তোমাদের প্রতি আল্লাহ্র রহমত যদি না হত (তাহলে যে বিষয়টি তোমাদের মাঝে ছড়ানো হয়েছে, তার কারণে তোমরা জঘন্য পরিণামের সম্মুখীন হতে), কিন্তু আল্লাহ বড়ই দয়ালু ও মেহেরবান (তাই সে পরিণাম আসেনি) (নূর, ১১-২০)

আত্মীয়তার বন্ধন এবং দারিদ্র্যের কারণে আবুবকর ছিদ্দীক্ব রাযিয়াল্লাহু আনহু মিসতাহ ইবনু উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আর্থিক সাহায্য দিতেন কিন্তু আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর ব্যাপারে তিনি যা বলেছিলেন, সে কারণে আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু শপথ করে বললেন, আল্লাহ্র শপথ! আমি আর কখনো মিসতাহকে আর্থিক সহায়তা দেব না। তখন আল্লাহ তা‘আলা আয়াত অবতীর্ণ করলেন,

وَ لَا یَاْتَلِ اُولُوا الْفَضْلِ مِنْکُمْ وَ السَّعَۃِ اَنْ یُّؤْتُوْۤا اُولِی الْقُرْبٰی وَ الْمَسٰكِیْنَ وَ الْمُهٰجِرِیْنَ فِیْ سَبِیْلِ اللّٰهِ ۪ۖ وَ لْیَعْفُوْا وَ لْیَصْفَحُوْا ؕ اَلَا تُحِبُّوْنَ اَنْ یَّغْفِرَ اللّٰهُ لَکُمْ ؕ وَ اللّٰهُ غَفُوْرٌ رَّحِیْمٌ

‘তোমাদের মাঝে যারা সম্ভ্রান্ত, মর্যাদাসম্পন্ন ও বিত্তশালী, তাদের এমন কসম করা উচিত নয়, যাতে আত্মীয়-স্বজন ও আল্লাহ্র পথে হিজরতকারীদেরকে সহায়তা করবে না বরং তাদেরকে মাফ করা এবং মন থেকে গ্লানি দূর করে দেয়া তাদের কর্তব্য। শুনো, তোমরা কি পসন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে মাফ করে দিন! প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা’আলা বড় ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (নূর, ২২)

এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠলেন, হ্যাঁ! আল্লাহ্র শপথ! অবশ্যই আমি পসন্দ করি, আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। তাই মিসতাহ ইবনু উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য তিনি যে অর্থ ব্যয় করতেন, তা আবার দিতে আরম্ভ করেন এবং বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমি তাকে এ অর্থ প্রদান কখনো বন্ধ করব না। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা আরো বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রী যায়নাব বিনতে জাহ্শ রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে আমার বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি আয়েশার ব্যাপারে কী জান বা দেখেছ? উত্তরে যায়নাব বলেছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি আমার কান ও চোখকে রক্ষা করেছি। আল্লাহ্র শপথ! আমি আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর ব্যাপারে ভাল ব্যতীত খারাপ কিছু জানি না। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র তিনিই আমার সমকক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, কিন্তু ভীতি দ্বারা আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেন। অথচ তাঁর বোন হামনাহ বিনতু জাহ্শ তাঁর পক্ষ হয়ে এ অপবাদ ছড়াচ্ছিল, আর এভাবে সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের সাথে নিঃশেষ হয়ে গেল। এ হাদীছের রাবী মুহাম্মাদ ইবনু শিহাব যুহরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, রাবীদের পক্ষ থেকে যা আমার নিকটে এসেছে, তা হল এ হাদীছ। উরওয়াহ ইবনু যুবায়ের আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আল্লাহ্র কসম! যে লোককে জড়িয়ে আমার ব্যাপারে কুৎসা রটনা করা হয়েছিল, এসব কথা শুনে তিনি বলতেন, সুবহানাল্লাহ! যে সত্তার হাতে আমার জীবন, তার কসম করে বলছি! আমি কখনো কোন স্ত্রীলোকের বক্ষও খুলে দেখিনি। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, পরে তিনি আল্লাহ্র পথে শাহাদাত লাভ করেছিলেন।[1]

শিক্ষা :

(১) সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হারাম।

(২) কেউ যদি মিথ্যা অপবাদ দেয়, তাহলে বিচলিত না হয়ে ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহ্র সাহায্য কামনা করতে হবে।

(৩) আল্লাহ মুমিনদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেন; তবে কখনও তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন না।

(৪) কোন ব্যক্তি যদি এরকম মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার কাজে লিপ্ত থাকে, তাহলে সে তওবা করবে।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪১৪১ (ই.ফা. হা/৩৮৩২; আ.প্র. হা/৩৮২৯)।

Magazine