কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বাদশাহ কায়ছারের রাজসভায় আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বক্তব্য

ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আবু সুফিয়ান আমাকে জানিয়েছেন, সে সময় তিনি কুরাইশদের কিছু ব্যক্তির সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে সিরিয়ায় অবস্থান করছিলেন। সে সময় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও কুরাইশদের মধ্যে যুদ্ধ স্থগিত ছিল। আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, কায়ছারের দূত শামের কোন এক জায়গায় আমাদের দেখা পেলে তিনি আমাকে ও আমার সঙ্গী-সাথীদেরকে বায়তুল মাক্বদাসে নিয়ে গেলেন। আমাদেরকে যখন কায়ছারের নিকট নিয়ে যাওয়া হল, তখন তিনি মুকুট পরিহিত অবস্থায় রাজসভায় বসা ছিলেন এবং তাঁর পাশে বসেছিলেন রোম সাম্রাজ্যের বড় বড় নেতা ও পদস্থ কর্মকর্তাগণ। তিনি (কায়ছার) তাঁর অনুবাদককে বললেন, এদেরকে জিজ্ঞেস কর, যে লোক নিজেকে নবী বলে দাবী করছে, (এদের মধ্যে) তাঁর বংশীয় সম্পর্কের নিকটবর্তী কেউ আছে কি না? আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি বললাম, বংশগত দিক দিয়ে আমি তাঁর সর্বাপেক্ষা কাছের। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ও তাঁর মধ্যে কী ধরনের আত্মীয়তার সম্পর্ক? আমি বললাম, তিনি আমার চাচাত ভাই। সে সময় কাফেলায় আমি ছাড়া আবদে মানাফ সম্প্রদায়ের একটি লোকও ছিল না।

অতঃপর কায়ছার বললেন, তাকে কাছে নিয়ে এসো। আর আমার সঙ্গীদের সম্পর্কে নির্দেশ দিলে তাদেরকে আমার পিঠের কাছে কাঁধ বরাবর দাঁড় করিয়ে দেয়া হল। এরপর তাঁর দোভাষীকে তিনি বললেন, তার (আবু সুফিয়ান) সঙ্গীদের বলে দাও, আমি এ ব্যক্তিটিকে (আবু সুফিয়ান) নবী বলে দাবীদার লোকটি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করব। যদি সে (আবু সুফিয়ান) মিথ্যা বলে, তাহলে তোমরা তার প্রতিবাদ করবে। আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহ্র শপথ! যদি এ ব্যাপারে লজ্জাবোধ না করতাম যে, (মিথ্যা বললে) আমার সাথীরা আমাকে মিথ্যাবাদী হিসাবে জানবে, তাহলে আমি সেদিন তাঁর প্রশ্নের উত্তরে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আমার পক্ষ থেকে কিছু মিথ্যা বলতাম। কিন্তু আমি লজ্জাবোধ করলাম যে, আমার সাথীরা তাহলে আমাকে মিথ্যাবাদী ধারণা করবে। সুতরাং আমি সত্য কথাই বললাম। তিনি তাঁর অনুবাদককে বললেন, জিজ্ঞেস কর, তোমাদের মধ্যেকার লোকটির বংশ মর্যাদা কীরূপ? আমি বললাম, তিনি আমাদের মধ্যে উচ্চ বংশীয়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যকার কোন লোক এর আগে কি এ ধরনের দাবী করেছে? আমি বললাম, না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি যে দাবী করছেন, তার পূর্বে কখনো তোমরা কি তাঁকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছ? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ কি বাদশাহ ছিলেন? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, ধনী ও প্রভাবশালী লোকেরা তাঁর অনুসারী হচ্ছে, না দুর্বল ও গরীব লোকেরা? আমি বললাম, বরং দুর্বল ও গরীবরা। তিনি বললেন, এদের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, না কমছে? আমি বললাম, বৃদ্ধি হচ্ছে। তিনি বললেন, তাঁর দ্বীনকে গ্রহণ করার পর কেউ কি বীতশ্রদ্ধ হয়ে তা ত্যাগ করছে? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তিনি কি বিশ্বাসঘাতকতা করেন? আমি বললাম, না। তবে আমরা বর্তমানে তাঁর সাথে একটা চুক্তিতে আবদ্ধ আছি এবং ভয় করছি যে, তিনি হয়তো তা ভঙ্গ করবেন। আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমার পক্ষ থেকে কোন মিথ্যা কথা বলে তাঁকে ছোট করতে ইচ্ছা করলে লোকেরা আমাকে মিথ্যুক মনে করবে, এ কারণে একথাটি ছাড়া আর কোন কথা আমি যোগ করতে পারিনি। তিনি বললেন, তোমরা কি তাঁর বিরুদ্ধে অথবা তিনি তোমাদের বিরুদ্ধে কোন সময় লড়াই করেছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ! তিনি বললেন, তোমাদের ও তাঁর যুদ্ধের পরিণাম কী? আমি বললাম, যুদ্ধের ফলাফল অস্থায়ী; কখনো আমরা বিজয়ী হয়েছি, কখনো তিনি বিজয়ী হয়েছেন। তিনি বললেন, তিনি তোমাদেরকে কী কী বিষয়ে আদেশ করেন? আমি বললাম, তিনি আমাদেরকে আদেশ করেন, আমরা যেন একমাত্র আল্লাহ্র ইবাদত করি ও তাঁর সঙ্গে কোন কিছু শরীক না করি এবং তিনি আমাদের বারণ করেন আমাদের পিতৃপুরুষেরা যেসবের ইবাদত করত তার ইবাদত না করতে। তিনি আমাদেরকে ছালাত আদায়, ছাদাক্বা প্রদান, পবিত্রতা রক্ষা, ওয়াদা পালন ও আমানত আদায় করার আদেশ করেন।

আমি এসব কথা বললে, তিনি অনুবাদককে আদেশ দিলেন, তাকে (আবু সুফিয়ানকে) বল, আমি তোমাদের মধ্যে তাঁর বংশমর্যাদা সম্পর্কে জানতে চাইলে তুমি বললে, তিনি উচ্চ বংশীয়। রাসূলগণ তাঁর সম্প্রদায়ের উচ্চ বংশেই জন্মগ্রহণ করেন। আমি তোমার কাছে জানতে চাইলাম, তোমাদের কেউ কি এর আগে এ ধরনের কথা বলেছে? তুমি বললে, না। তোমাদের মধ্যে ইতোপূর্বে কোন লোক যদি এ ধরনের কথা বলে থাকত, তাহলে আমি বলতাম, ব্যক্তিটি আগের কথারই অনুসরণ করছে। আমি জানতে চেয়েছি যে, তার এ (নবুওয়াত) দাবীর আগে কি তোমরা তাঁকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছ? তুমি বললে, না। এ কারণে আমি বুঝতে পেরেছি যে, যিনি মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা বলেন না, তিনি আল্লাহ্র সম্পর্কে মিথ্যা বলতে পারেন না। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম যে, তাঁর পিতৃপুরুষদের মধ্যে কেউ বাদশাহ ছিলেন কি না? তুমি বললে, না। আমি বলছি, যদি তার পিতৃপুরুষদের মধ্যে কেউ বাদশাহ থাকত, তাহলে আমি বলতাম, সে পিতৃপুরুষদের রাজত্ব উদ্ধার করতে সংকল্পবদ্ধ। আমি তোমার কাছে জানতে চেয়েছি যে, প্রভাবশালী ও বিত্তবান লোকেরাই তাঁর অনুসরণ করছে, না দুর্বল ও গরীব লোকেরা? তুমি বলেছ, দুর্বল ও গরীব লোকেরাই তাঁর অনুসরণ করছে।

আসল কারণ, এ ধরনের লোকেরাই রাসূলদের অনুসারী হয়ে থাকে। আমি তোমার কাছে জানতে চেয়েছি, তাদের সংখ্যা বাড়ছে না কমছে? তুমি বলেছ, তাদের সংখ্যা বাড়ছে। ঈমানের অবস্থা তাই, তা এমনিভাবেই বাড়তে বাড়তে পূর্ণতা লাভ করে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তাঁর দ্বীন গ্রহণ করার পর অপসন্দ করে কেউ কি তা ত্যাগ করেছে? তুমি উত্তর দিয়েছ, না। ঈমানের অবস্থা তাই, তার স্বাদ যখন হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে, তখন কেউই তার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয় না। আমি তোমাকে বলেছি, তিনি কি চুক্তি বা ওয়াদা ভঙ্গ করেন? তুমি বলেছ, না। ঠিকই বলেছ, রাসূলগণ কখনো ওয়াদা বা চুক্তি ভঙ্গ করেন না। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তোমরা কি কখনো তাঁর সাথে যুদ্ধ করেছ বা তিনি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছেন? তুমি বলেছ, হ্যাঁ! তোমাদের ও তাঁর মধ্যকার যুদ্ধের ফল কখনো তাঁর অনুকূলে গিয়েছে, আবার কখনো তোমাদের অনুকূলে এসেছে। এভাবেই রাসূলগণ পরীক্ষিত হন এবং পরিণামে তাঁদেরই জয় হয়। আমি তোমাকে আরো বলেছি যে, তিনি তোমাদেরকে কী কী ব্যাপারে আদেশ করে থাকেন? তুমি বলেছ, তিনি তোমাদেরকে একমাত্র আল্লাহ্র ইবাদত করতে ও তাঁর সাথে কোন কিছুর শরীক না করতে আদেশ করেন।

তোমাদের পিতৃপুরুষেরা যেসবের ইবাদত করত, তাও বর্জন করতে বলেন। তিনি ছালাত আদায়, ছাদাক্বা প্রদান, পবিত্রতা রক্ষা, ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং আমানত আদায়েরও আদেশ দান করেন। এসবই নবীদের গুণাবলী। আমি জানতাম, অবশ্যই তাঁর আগমন ঘটবে, কিন্তু তিনি তোমাদের মধ্যে আসবে, সেটা কোন দিন জানতাম না। তুমি যা যা বললে, তা যদি সত্য হয় তবে অচিরেই আমার দু’পায়ের নীচের স্থান তাঁর অধিকারে চলে যাবে। যদি আমি আশা করতে পারতাম যে, তাঁর সাথে দেখা করতে পারব তবে শত কষ্ট স্বীকার করেও তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য গমন করতাম। যদি আমি তাঁর কাছে থাকতাম, তবে তাঁর পবিত্র পদযুগল ধৌত করে দিতাম। আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, অতঃপর তিনি তাঁর পত্রখানি চেয়ে নিলেন। তাঁকে (কায়ছারকে) তা পড়ে শুনানো হল। তাতে লেখা ছিল- পরম করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহ্র নামে। আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরফ থেকে রোমের শাসনকর্তা হেরাক্বল (হিরাক্লিয়াস)-এর প্রতি। যারা হেদায়াতের পথে চলবে, তাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করে শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করুন। আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কার (ছওয়াব) দান করবেন। আর যদি ইসলামের এ দাওয়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে রোম সাম্রাজ্যের সকল প্রজাদের পাপের বোঝা আপনার উপর চাপানো হবে।

قُلْ يَاأَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ

‘হে কিতাবধারীরা! এমন একটি কথার দিকে এসো, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই সমান। তা হল, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করব না, কোন কিছুকেই তাঁর অংশীদার করব না এবং আল্লাহ ছাড়া আমাদের কেউ পরস্পরকে প্রতিপালক হিসাবে গ্রহণ করব না। একথা যদি তারা না মানে তবে বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থাক আমরা মুসলিম’ (আলে ইমরান, ৬৪)

আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তাঁর (কায়ছারের) কথা সমাপ্ত হলে তাঁর পাশে বসা রোমের নেতাগণ আওয়ায করতে শুরু করলেন। অতঃপর উচ্চৈঃস্বরে আওয়ায ও হট্টগোল বৃদ্ধি পেল। তারা কী বলে চীৎকার করছিলেন, তা আমি বুঝতে পারিনি। আমাদের ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করা হলে সেখান থেকে আমাদেরকে বাইরে আনা হল। আমি আমার সাথীদের নিয়ে বের হলে পরে নির্জনে তাদের সাথে মিলিত হলাম ও তাদেরকে বললাম, আবু কাবশার পুত্র (মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনেক শক্তি সঞ্চয় করেছে। রোমের বাদশা পর্যন্ত এখন তাঁকে ভয় করছে। আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহ্র কসম! এরপর হতে আমি নিজেকে ছোট মনে করতে থাকলাম এবং এ সম্পর্কে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেল যে, তিনি অচিরেই বিজয় লাভ করবেন। এরপর আমি অপসন্দ করলেও আল্লাহ আমার মনে ইসলামকে প্রবেশ করিয়ে দিলেন।[1]

শিক্ষা :

১. আল্লাহ কখনও নবীদেরকে অপমানিত করেন না। তাই বাদশাহ কায়ছারের সামনেও আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে সত্য বলতে বাধ্য হয়েছেন।

২. প্রভাবশালী ও বিত্তবান লোকদের চেয়ে দুর্বল ও গরীব লোকেরাই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ করবে বেশি।

৩. একমাত্র আল্লাহ্র ইবাদত করতে হবে ও তাঁর সাথে কোন কিছুর শরীক করা যাবে না।

৪. ছালাত আদায়, ছাদাক্বা প্রদান, পবিত্রতা রক্ষা, ওয়াদা পালন ও আমানত আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য।

৫. ইসলামের বিজয়ে ইসলাম বিরোধীরা সবাই ভীত হবে।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯৪১; (তাওহীদ পাবলিকেশন্স, হা/২৯৪১; ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হা/২৭৩৬, আধুনিক প্রকাশনী, হা/২৭২৫)।

Magazine