ভূমিকা : কোনো ঘটনা কিংবা বিষয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানতে হলে সেটির সংবাদদাতা কিংবা বর্ণনাকারী কে সেটা জানা যরূরী। যদি সংবাদদাতা সত্যবাদী ও নির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে তার সংবাদ সত্য হওয়ার ব্যাপারে মনের সমর্থন পাওয়া যায়। অপরদিকে সংবাদদাতার মাঝে যদি মিথ্যাবাদিতার স্বভাব থাকে, তাহলে তার কথা গ্রহণ করার ব্যাপারে মনের সমর্থন পাওয়া যায় না। বরং অন্য কারও কাছ থেকে তা শোনার জন্য মনের কামনা থাকে। তদ্রম্নপ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়ে থাকে। হাদীছের বর্ণনাকারী কোনো রাবীর মাঝে যদি সমস্যা পাওয়া যায়, তাহলে তার বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাই রাবী বিষয়ক জ্ঞানার্জন অতীব যরূরী। রাবী সম্পর্কে ইল্ম না থাকলে যে কেউ খুব সহজেই জাল-যঈফ হাদীছের ভেজালে আটকা পড়ে যাবে।
রাবীদের মাঝে কিছু রাবী রয়েছেন, যাদের কাজই নিজ দল বা মতকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে হাদীছ রচনা করে মুসলিম উম্মাহকে ছিন্ন-ভিন্ন করে দেওয়া। এক্ষেত্রে তারা উম্মাহর বড় বড় ব্যক্তিদের বেছে নিয়ে তাদের পক্ষ-বিপক্ষ জাল কথা বানিয়ে ছড়িয়ে দিয়ে মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করেছে। নিচে এমন একজন রাবী ‘লূত ইবনে ইয়াহ্ইয়া’, যার সম্পর্কে এখানে আলোকপাত করা হলো-
নাম : লূত ইবনে ইয়াহ্ইয়া আল-কূফী আল-আযদী আবূ মিখনাফ।[1] তার পুরো নাম হলো-
لُوْطُ بْنُ يَحْيَى بْنِ مِخْنَفِ بْنِ سُلَيْمَانَ بْنِ الْحَارِثِ بْنِ عَوْفِ بْنِ ثَعْلَبَةَ بْنِ عَامِرِ بْنِ ذُهْلِ بْنِ مَازِنٍ.
‘লূত ইবনে ইয়াহ্ইয়া ইবনে মিখনাফ ইবনে সুলায়মান ইবনে হারেছ ইবনে ‘আওফ ইবনে ছা‘লাবা ইবনে আমের ইবনে যুহ্ল ইবনে মাযেন’।[2]
পরিচয় : তার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না। তার কিছু বর্ণনা পাওয়া যায় মাত্র। তিনি একজন শী‘আ ছিলেন।[3] তিনি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ছাত্র ছিলেন বলে অনেকে উল্লেখ্য করেছেন। তিনি যুদ্ধ-বিগ্রহ, ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেছেন।[4]
তার সম্পর্কে ইমামদের বক্তব্য :
১. ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ২৩৩ হি.) বলেছেন, لَيْسَ بِثِقَة ‘আবূ মিখনাফ নির্ভরযোগ্য নন’।[5]
২. ইমাম আবূ হাতেম আর-রাযী রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৩২৭ হি.) বলেছেন, لُوْطٌ بْنُ يَحْيَى أَبُوْ مِخْنَفٍ مَتْرُوْكُ الْحَدِيْثِ ‘লূত ইবনে ইয়াহ্ইয়া আবূ মিখনাফ একজন মাতরূকুল হাদীছ রাবী’।[6]
৩. ইমাম ইবনু ‘আদী রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৩৬৫ হি.) বলেছেন, ‘তিনি কট্টর শী‘আ এবং শী‘আদের ঐতিহাসিক ছিলেন’।[7]
৪. ইমাম কিওয়ামুস সুন্নাহ আল-ইছফাহানী রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৫৩৫ হি.) বলেছেন, ‘আবূ মিখনাফ প্রমুখ রাফেযীরা যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, সেগুলো নির্ভরযোগ্য নয়’।[8]
৫. ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৫৯৭ হি.) বলেছেন,
لُوْطُ بْنُ يَحْيَى أَبُوْ مِخْنَفٍ قَالَ يَحْيٰى لَيْسَ بِثِقَةٍ وَقَالَ مَرَّةً لَيْسَ بِشَيْءٍ وَقَالَ أَبُو حَاتِمٍ الرَّازِيُّ مَتْرُوكُ الْحَدِيْثِ وَقَالَ الدَّارَقُطْنِيُّ ضَعِيْفٌ.
‘লূত ইবনে ইয়াহ্ইয়া আবূ মিখনাফ সম্পর্কে ইয়াহ্ইয়া ইবনে মাঈন বলেছেন যে, তিনি নির্ভরযোগ্য নন। আরেকবার তিনি বলেছেন যে, তার বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা খুবই কম। আবূ হাতেম আর-রাযী তাকে মাতরূকুল হাদীছ বলেছেন। দারাকুত্বনী তাকে যঈফ বলেছেন’।[9] তিনি অন্যত্র তাকে মহামিথ্যুক বলেছেন।[10]
৬. ইবনু তায়মিয়া রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭২৮ হি.) তাকে ‘প্রসিদ্ধ কাযযাব (মিথ্যাবাদী)’ বলেছেন।[11]
৭. হাফেয যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৪৮ হি.) তাকে অনির্ভরযোগ্য এবং মাতরূক রাবী বলেছেন।[12]
৮. ইবনে আররাক রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৯৬৩ হি.) বলেছেন, লূত ইবনে ইয়াহ্ইয়া আবূ মিখনাফ কাযযাব এবং মাতরূক রাবী।[13]
৯. আলবানী রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৯৯৯ ইং) বলেছেন,لُوْطُ بْنُ يَحْيَى وَهُوَ أخْبَارِىٌّ هَالِكٌ ‘লূত ইবনে ইয়াহ্ইয়া একজন ধ্বংসপ্রাপ্ত ঐতিহাসিক’।[14]
সুতরাং এই কাযযাবের সকল বর্ণনা বাতিল এবং মনগড়া হিসাবে বিবেচিত হবে।
মৃত্যু : তিনি ১৫৭ হিজরীতে মারা যান।
একটি উদাহরণ : ইয়াযীদ ইবনে মু‘আবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে তার একটি বহুল প্রচলিত মিথ্যা বর্ণনা নিমণরূপ, যা ইমাম ত্ববারী রাহিমাহুল্লাহ তার গ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন,
قَالَ لُوْطٌ وَاللَّهِ إِنَّهُ لَيَشْرَبُ الْخَمْرَ، وَإِنَّهُ لَيَسْكِرُ حَتَّى يَدَعَ الصَّلاَةَ.
লূত বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! ইয়াযীদ মদ পান করতেন এবং তিনি মাতাল হয়ে যেতেন। এমনকি তিনি (মাতাল হয়ে) ছালাতও ছেড়ে দিতেন’।[15]
এটি জাল বর্ণনা। আমরা লূতের ব্যাপারে ইমামদের মন্তব্য অবগত হয়েছি। সুতরাং তার বর্ণনা যে বাতিল, তা সহজেই অনুমেয়।
উপসংহার : ‘ইয়াযীদ রাহিমাহুল্লাহ মদ পান করতেন এবং মাতাল হয়ে ছালাত বর্জন করতেন’ (না‘ঊযুবিল্লাহ) এটা চরম মিথ্যাচার। আর না জেনে এই রাবীর বর্ণনার ভিত্তিতে ইয়াযীদকে মদপানকারী এবং ছালাত বর্জনকারী বলা কোনভাবেই উচিত নয়। তিনি ছাড়া আরও মিথ্যুক বর্ণনাকারী আছেন, যারা ইয়াযীদের বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যাচার করে মুসলিম উম্মাহকে বিভ্রান্ত করেছেন। যারা এসকল রাবীর বর্ণনা অনুসারে এসব কথা প্রচার করছেন, তাদের উচিত বর্ণনাকারীর অবস্থা অবগত হয়ে কারও ব্যাপারে মন্তব্য করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন- আমীন।
[1]. দারাকুত্বনী, আয-যু‘আফা ওয়াল মাতরূকূন, রাবী নং ৪৫০।
[2]. মু‘জামুল উদাবা, রাবী নং ৯২৬।
[3]. ইবনু সা‘দ, আত্ব-ত্ববাক্বাতুল কুবরা, হা/৪৩০, ১/৪৩৭।
[4]. মু‘জামুল উদাবা, রাবী নং ৯২৬।
[5]. তারীখু ইবনে মাঈন, দূরীর বর্ণনা রাবী নং ১৭৮০।
[6]. ইবনু আবী হাতিম, আল-জারহু ওয়াত-তা‘দীল, রাবী নং ১৪২২।
[7]. ইবনু আদী, আল-কামিল ফী যু‘আফাইর রিজাল, ৭/২৪১।
[8]. কিওয়ামুস সুন্নাহ, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ, ২/৫৬৮।
[9]. ইবনুল জাওযী, আয-যু‘আফা ওয়াল মাতরূকূন, রাবী নং ২৮১৩।
[10]. ইবনুল জাওযী, আল-মাওযূ‘আত, ১/৪০৬।
[11]. মিনহাজুস সুন্নাহ, ৫/৮১।
[12]. মীযানুল ই‘তিদাল, ৩/৪১৯।
[13]. তানযীহুশ শারী‘আহ, ১/৯৮।
[14]. ইরওয়াউল গলীল, হা/২৪৬৭।
[15]. তারীখুত ত্ববারী, ৫/৪৮০, ৪৮১।
