কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ইসলামে ‘জামা‘আত’ বলতে কোন্ দলকে বুঝানো হয়েছে? (পর্ব-৮)

পাঁচ. হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, مَنْ هُمْ أُولِي الأَمْرِ؟ وَقَدْ اِخْتَلَفَتْ الرِّوَايَةُ عَنْ الإِمَامِ أَحْمَدَ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالَى فِي أُولِي الأَمْرِ وَعُنْهُ فِيهِمْ رَحِمَهُ الله تَعَالَى رِوَايَتَانِ: إِحْدَاهُمَا: أَنَّهُمْ العُلَمَاءُ، وَالثَّانِيَةُ: أَنَّهُمْ الأُمَرَاءُ. وَالقَوْلَانِ ثَابِتَانِ عَنْ الصَّحَابَةِ فِي تَفْسِيرِ الآيَةِ. وَالصَّحِيحُ أَنَّهَا مُتَنَاوِلَةٌ لِلصِّنْفَيْنِ جَمِيعًا، فَإِنَّ العُلَمَاءَ وَالأُمَرَاءَ وُلَاةُ الأَمْرِ الَّذِي بَعَثَ اللهُ بِهِ رَسُولَهُ، فَإِنَّ العُلَمَاءَ وُلَاتُهْ حِفْظًا وَبَيَانًا وذبًا عَنْهُ وَرَدًّا عَلَى مَنْ أَلْحَدَ فِيهُ وَزَاغَ عَنْهُ، وَقَدْ وَكَّلَهُمْ اللهُ بِذَلِكَ، فَقَالَ تَعَالَى: {فإن يَكْفُرُ بِهَا هَؤُلَاءِ فَقَدْ وَكَّلْنَا بِهَا قَوْمًا لَيْسُوا بِهَا بِكَافِرِيْنَ} فَيَالَهَا مِنْ وِكَالَةٍ أَوْجَبَتْ طَاعَتَهُمْ وَالاِنْتِهَاءَ إِلَى أَمْرِهِمْ وَكَوْنَ النَّاسِ تَبْعًا لَّهُمْ. وَالأُمَرَاءُ وُلَاتُهْ قِيَامًا وَعِنَايَةً وَجِهَادًا وَإِلْزَامًا لِلنَّاسِ بِهِ، وَأَخْذَهُمْ عَلَى يَدِ مَنْ خَرَجَ عَنْهُ. وَهَذَانِ الصِّنْفَانِ هُمَا النَّاسُ وَسَائِرُ النَّوْعِ الإِنْسَانِيِّ تَبَعٌ لَهَا وَرَعِيَّةٌ. ‘উলুল আমর কারা? ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ হতে এ ব্যাপারে ভিন্ন দু’টি বর্ণনা পাওয়া যায়: ১. উলামায়ে কেরাম ও ২. শাসকগোষ্ঠী। উক্ত আয়াতের তাফসীরে ছাহাবায়ে কেরাম থেকে এ দু’টি বক্তব্যই সাব্যস্ত আছে। কিন্তু বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, আয়াতটি উভয় শ্রেণীকেই অন্তর্ভুক্ত করে। উলামায়ে কেরাম এবং শাসকগোষ্ঠী ঐ বিষয়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, যে বিষয় দিয়ে আল্লাহ তার রাসূলকে পাঠিয়েছেন। কেননা উলামায়ে কেরাম আল্লাহ্র কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিবর্গ, যারা আল্লাহপ্রেরিত বিষয় সংরক্ষণ করেন, বর্ণনা করেন, এর পক্ষে লড়েন এবং যারা এখানে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ও নিজেরা পথভ্রষ্ট হয়, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আল্লাহ তাদেরকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন। এরশাদ হচ্ছে, ‘‘যদি তারা তোমার নবূঅত অস্বীকার করে, তবে আমি তো এমন এক সম্প্রদায় নির্ধারিত করে দিয়েছি, যারা তা অস্বীকার করবে না’’। কী দারুন দায়িত্ব! এই দায়িত্ব কয়েকটা জিনিস অবধারিত করে: তাদের আনুগত্য, তাদের নির্দেশনায় ফিরে যাওয়া এবং জনগণ কর্তৃক তাদের অনুগত হয়ে যাওয়া। অনুরূপভাবে, শাসকগোষ্ঠীও আল্লাহ্র কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিবর্গ, যারা আল্লাহ নির্ধারিত বিষয়ের বাস্তবায়ন ঘটান, এ ব্যাপারে যত্নবান হন, জিহাদ করেন, জনগণকে ঐ ব্যাপারে বাধ্য করেন এবং যারা ঐ বিষয় থেকে বের হয়ে যায়, তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করেন। এই দুই শ্রেণীর মানুষ নেতৃস্থানীয় মানুষ আর বাকীরা হচ্ছে তাদের অনুগামী এবং সাধারণ জনগণ’।[1]

ছয়. ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আয়াতটি যুদ্ধের সেনাপতি আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাফাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়। অতঃপর তিনি বলেন, قَالَ الْعُلَمَاءُ: الْمُرَادُ بِأُولِي الْأَمْرِ مَنْ أَوْجَبَ اللَّهُ طَاعَتَهُ مِنَ الْوُلَاةِ وَالْأُمَرَاءِ، هَذَا قَوْلُ جَمَاهِيرِ السَّلَفِ وَالْخَلَفِ مِنَ الْمُفَسِّرِينَ وَالْفُقَهَاءِ وَغَيْرِهِمْ. وَقِيلَ: هُمُ الْعُلَمَاءُ، وَقِيلَ: الْأُمَرَاءُ وَالْعُلَمَاءُ. وَأَمَّا مَنْ قَالَ: الصَّحَابَةُ خَاصَّةً فَقَطْ، فَقَدْ أَخْطَأَ ‘উলামায়ে কেরাম বলেন, উলুল আমর হচ্ছেন তারা, যাদের আনুগত্য আল্লাহ ওয়াজিব করে দিয়েছেন; তারা হচ্ছেন, শাসকগোষ্ঠী। এটা পূর্বসূরী-উত্তরসূরী জমহূর মুফাসসির, ফক্বীহ প্রমুখের বক্তব্য। কেউ কেউ বলেন, তারা হচ্ছেন উলামায়ে কেরাম। আবার কেউ কেউ বলেন, তারা হচ্ছেন শাসকশ্রেণী ও উলামায়ে কেরাম। তবে যারা বলেছেন যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য শুধু ছাহাবায়ে কেরাম, তারা ভুল করেছেন’।[2]

সাত. আধুনিক যুগের বিখ্যাত মুফাসসির আব্দুর রহমান আস-সা‘দী রাহিমাহুল্লাহ ‘উলুল আমর’-এর ব্যাখ্যায় বলেন, وَهُمُ الْوُلَاةُ عَلَى النَّاسِ، مِنَ الْأُمَرَاءِ وَالحُكَّامِ وَالمُفْتِيْنَ، فَإِنَّهُ لَا يَسْتَقِيْمُ لِلنَّاسِ أَمَرُ دِينِهِمْ وَدُنْيَاهُمْ إِلَّا بِطَاعَتِهِمْ وَالاِنْقِيَادِ لَهُمْ، طَاعَةً لِلهِ وَرَغْبَةً فِيْمَا عِنْدَهُ، وَلَكِنْ بِشَرْطِ أَلَّا يَأْمُرُوْا بِمَعْصِيَةِ اللهِ، فَإِنْ أَمَرُوْا بِذَلِكَ فَلَا طَاعَةَ لِمَخْلُوْقٍ فِيْ مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ ‘তারা হচ্ছেন, মানুষের উপর নিযুক্ত শাসক, বিচারক ও মুফতীগণ। কেননা মানুষের দ্বীন-দুনিয়া কোনোটাই তাদের আনুগত্য ছাড়া সঠিকভাবে চলতে পারে না। তবে তাদের আনুগত্য হবে আল্লাহ্র আনুগত্যের অংশবিশেষ এবং তার প্রতিদানের আশায়। তাদের আনুগত্য করার যরূরী শর্ত হচ্ছে, তারা যেন আল্লাহ্র নাফরমানীর কোন আদেশ না করেন। যদি করেন, তবে স্রষ্টার অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য চলবে না’।[3]

আট. আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠ ফক্বীহ শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ছালেহ আল-উছাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَهَذَا يَشْمُلُ العُلَمَاءَ وَالأُمَرَاءَ، فَإِذَا كَانَ هَؤُلَاءِ قَدْ أَمَرَنَا بِطَاعَتِهِمْ فِي غَيْرِ مَعْصِيَةِ اللهِ، فَالوَاجِبُ اِحْتِرَامُهُمْ وَاِحْتِرَامُ أَعْرَاضِهِمْ، وَإِذَا عَلِمْنَا مِنْ أَحَدٍ مِنْهُمْ خَطَأً أَوْ زَلَلًا، فَالوَاجِبُ النَّصِيحَةُ لَهُ حَتَّى يَزُولَ الإِشْكَالُ. فَعَلَى الشَّبَابِ أَلَّا يَتَعَصَّبُوا لِلأَشْخَاصِ، بَلْ يَأْخُذُوا الحَقَّ مِمَّنْ جَاءَ بِهِ كَائِنًا مَنْ كَانَ، وَأَلَّا يَجْعَلُوا الخِلَافَ يَقُودُهُمْ إِلَى اِحْتِقَارِ الآخَرِينَ وَهَتْكِ أَسْتَارِهُمْ وَغِيْبَتِهِمْ، فَإِنَّ هَذَا مِمَّا لَا يَجُوزُ بِحَالٍ ‘এটা আলেম-উলামা ও আমীর-উমারা (শাসকশ্রেণী) উভয় শ্রেণীকে অন্তর্ভুক্ত করে। তারা যখন আমাদেরকে আল্লাহ্র অবাধ্যতা ছাড়া অন্য বিষয়ে আদেশ দিবেন, তখন তাদের সম্মান করা ওয়াজিব। তাদের কারো কোন বিষয়ে যদি ভুল বা পদস্খলনের কথা আমরা জানতে পারি, তাহলে সমস্যা দূরীকরণের লক্ষ্যে তাদেরকে নছীহত করা ওয়াজিব। যুবকদের কারো প্রতি অন্ধভক্তি ও গোঁড়ামি প্রদর্শন করা উচিত নয়। বরং হক্ব গ্রহণ করা উচিত যে সূত্রেই তা আসুক না কেন। মতভেদ যেন তাদেরকে অন্যকে অবজ্ঞা করা, তাদের গোপনীয়তা নষ্ট করা এবং গীবত করার দিকে না ঠেলে দেয়। কারণ এমনটা কোন অবস্থাতেই জায়েয নয়’।[4]

নয়. সঊদী আরবের সাবেক প্রধান মুফতী শায়খ আব্দুল আযীয ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন, فَهَذِهِ الآيَةُ نَصٌّ فِي وُجُوبِ طَاعَةِ أُولِي الأَمْرِ، وَهُمْ الأُمَرَاءُ وَالعُلَمَاءُ، وَقَدْ جَاءَتِ السُّنَّةُ الصَّحِيْحَةُ عَنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تُبَيِّنُ أَنَّ هَذِهِ الطَّاعَةَ لَازِمَةٌ، وَهِيَ فَرِيضَةٌ فِي المَعْرُوفِ، وَالنُّصُوصُ مِنْ السُّنَّةِ تُبَيِّنُ المَعْنَى، وَتُقَيِّدُ إِطْلَاقَ الآيَةِ بِأَنْ المُرَادَ طَاعَتُهُمْ فِي المَعْرُوفِ، وَيَجِبُ عَلَى المُسْلِمِينَ طَاعَةُ وُلَاةِ الأُمُورِ فِي المَعْرُوفِ لَا فِي المَعَاصِي، فَإِذَا أَمَرُوا بِالمَعْصِيَةِ فَلَا يُطَاعُونَ فِي المَعْصِيَةِ، لَكِنْ لَا يَجُوزُ الخُرُوجُ عَلَيْهِمْ بِأَسْبَابِهَا ‘এই আয়াতটি ‘উলুল আমর’-এর আনুগত্য ওয়াজিব হওয়ার উৎকৃষ্ট দলীল। উলুল আমর হচ্ছেন শাসকগোষ্ঠী ও উলামায়ে কেরাম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ছহীহ হাদীছে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই আনুগত্য বাধ্যতামূলক। ভালকাজের ব্যাপারে এই আদেশ পালন করা ফরয। হাদীছের বক্তব্য এই মর্মার্থকে স্পষ্ট করে এবং আয়াতের উন্মুক্ত বক্তব্যকে সীমায়িত করে। সীমায়িত অর্থ হচ্ছে, ভালকাজে উলুল আমরের আনুগত্য করা মুসলিমদের উপর ওয়াজিব; পাপের কাজে নয়। তারা কোন পাপকাজের আদেশ করলে সে ব্যাপারে তাদের আনুগত্য চলবে না। তবে একারণে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চলবে না’।[5]

দশ. যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ আল্লামা আলবানী রাহিমাহুল্লাহ রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, وَإِنَّمَا الوَاجِبُ هُوَ السَّيْرُ عَلَى السِّيَاسَةِ الشَّرْعِيَّةِ أَلَا وَهِيَ (رِعَايَةُ شُؤُونِ الأُمَّةِ) وَلَا تَكُونُ هَذِهِ الرِّعَايَةُ إِلَّا فِي ضَوْءِ الكِتَابِ وَالسُّنَّةِ وَعَلَى مَنْهَجِ السَّلَفِ الصَّالِحِ وَبِيَدِ أُولِيْ الأَمْرِ مِنْ العُلَمَاءِ العَامِلِينَ وَالأُمَرَاءِ العَادِلِينَ فَإِنَّ اللهَ يَزَعُ بِالسُّلْطَانِ مَا لَا يَزَعُ بِالقُرْآنِ ‘শারঈ রাজনীতির উপর চলা ওয়াজিব। আর তা হচ্ছে, জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে খেয়াল রাখা। কিতাব ও সুন্নাতের আলোকে, সালাফে ছালেহীনের আদর্শ মোতাবেক এবং উলুল আমর তথা উলামায়ে কেরাম ও শাসকশ্রেণীর হাতে ছাড়া এই খেয়াল রাখার বিষয়টি সম্পাদিত হতে পারে না। কেননা আল্লাহ কুরআন দ্বারা যা নিয়ন্ত্রণ করেন না, তা শাসকের মাধ্যমে করে থাকেন’।[6]

এগারো. আধুনিক যুগের অন্যতম ফক্বীহ শায়খ ছালেহ আল-ফাওযান হাফিযাহুল্লাহ বলেন, وَأُوْلِي الأَمْرِ هُمْ العُلَمَاءُ وَالأُمَرَاءُ ‘উলুল আমর হচ্ছেন, উলামায়ে কেরাম ও শাসকগোষ্ঠী’। উভয় শ্রেণীর আনুগত্যের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত মূল্যবান আলোচনা করেছেন।[7]

সুধী পাঠক! উলামায়ে কেরামের আরো বক্তব্য পেশ করে আপনার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। যা পেশ করেছি, তা-ই অনেক। কিন্তু ‘উলুল আমর’-এর ব্যাখ্যা যেহেতু অনেকেই নিজের মত করে করার প্রয়াস পাচ্ছেন, সেহেতু একটু বেশী পরিমাণ উদ্ধৃতি পেশ করার প্রয়োজন বোধ করেছি। যাহোক, উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলো থেকে ‘উলুল আমর’-এর সঠিক অর্থ আমরা বুঝতে পেরেছি। আর ‘আমীর’-এর আনুগত্য সংক্রান্ত হাদীছে আমীর বলতে কাকে বুঝানো হয়েছে, তাও আমরা মুহাল্লাব রাহিমাহুল্লাহ-এর বক্তব্যে দেখে এসেছি। হাদীছে আনুগত্য বলতে যে ‘শাসকগোষ্ঠীর আনুগত্যের’ কথা বুঝানো হয়েছে, তা এর আগে আমরা ইবনু আব্দিল বার্র রাহিমাহুল্লাহ-এর শব্দ চয়ন থেকেই বুঝে এসেছি। তিনি السُّلْطَان শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যা কখনই রাষ্ট্রীয় শাসক ছাড়া অন্য কোন ‘আমীর’কে বুঝায় না। শুধু মুহাল্লাব রাহিমাহুল্লাহ কেন, বরং সকল যুগের সকল মুহাক্কিক্ব আলেম হাদীছগুলোর এই প্রকাশ্য অর্থই নিয়েছেন; আমার সামান্য গবেষণায় এর ব্যতিক্রম কিছু আমি পাইনি। বুঝা গেলো, যেসব হাদীছে ‘আমীর’, ‘আমীরের আনুগত্য’ বা ‘বায়‘আত’-এর কথা এসেছে, সেগুলো সব শাসকশ্রেণীর জন্যই নির্দিষ্ট। তাহলে অন্যান্য আমীরের কী হবে? সুযোগ হলে এই লেখনীর কোন এক জায়গায় সে বিষয়ে কিছু ইঙ্গিত আমি দিবো ইনশাআল্লাহ।

আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এখানে ‘আলেম-উলামা ও শাসকশ্রেণী’ বলতে নির্দিষ্ট কোন আলেম বা শুধু সরকার প্রধানকে বুঝানো হয়নি। বরং হক্বপন্থী সকল আলেম এবং সরকারের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বুঝানো হয়েছে। তবে, তাদের আনুগত্যের মৌলিক দু’টি শর্ত হচ্ছে, (১) তাদেরকে মুসলিম হতে হবে ও (২) তাদের আদেশ-নিষেধের মধ্যে আল্লাহ ও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাফরমানী ও অবাধ্যতা থাকা চলবে না। সুতরাং নির্দিষ্ট নিয়ম ও শর্ত সাপেক্ষে আলেম-উলামা ও শাসকশ্রেণীর আনুগত্য করতে হবে।[8]

জামা‘আতের প্রায়োগিক এই অর্থে জামা‘আতকে আঁকড়ে ধরে থাকা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের একটি অনুসরণীয় আদর্শ। অনুরূপভাবে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করাও তাদের গৃহীত একটি মূলনীতি। ইমাম ত্বহাবী (মৃত্যু: ৩২১ হি.) বলেন, وَلَا نَرَى الْخُرُوجَ عَلَى أَئِمَّتِنَا وَوُلَاة أُمُورِنَا، وَإِنْ جَارُوا، وَلَا نَدْعُو عَلَيْهِمْ، وَلَا نَنْزِعُ يَدًا مِنْ طَاعَتِهِمْ، وَنَرَى طَاعَتَهُمْ مِنْ طَاعَة اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ فَرِيضَة، مَا لَمْ يَأْمُرُوا بِمَعْصِيَة، وَنَدْعُوا لَهُمْ بِالصَّلَاحِ وَالْمُعَافَاة ‘আমাদের ইমাম ও শাসকগণ যুলম করলেও আমরা তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে বৈধ মনে করি না; তাদের জন্য বদদো‘আ করি না এবং তাদের আনুগত্য থেকে হাত ছিনিয়ে নিই না। আমরা তাদের আনুগত্যকে আল্লাহ্র আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত মনে করি, যতক্ষ না তারা (আল্লাহ্র) অবাধ্যতার নির্দেশ দেয়। আমরা তাদের সংশোধনী, কল্যাণ ও নিরাপত্তার জন্য দো‘আ করি’।[9] শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَلِهَذَا كَانَ مِنْ أُصُولِ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ لُزُومُ الْجَمَاعَةِ وَتَرْكُ قِتَالِ الْأَئِمَّةِ وَتَرْكُ الْقِتَالِ فِي الْفِتْنَةِ. وَأَمَّا أَهْلُ الْأَهْوَاءِ - كَالْمُعْتَزِلَةِ - فَيَرَوْنَ الْقِتَالَ لِلْأَئِمَّةِ مِنْ أُصُولِ دِينِهِمْ ‘এ কারণে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের অন্যতম মূলনীতি হচ্ছে জামা‘আতবদ্ধ থাকা, শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করা এবং ফেতনার সময় লড়াই না করা। পক্ষান্তরে মু‘তাযিলাদের মত অন্যান্য প্রবৃত্তিপূজারীরা শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করাকে তাদের ধর্মীয় মূলনীতি মনে করে’।[10]

দ্বিতীয় এ অর্থে জামা‘আতবদ্ধ জীবনযাপনের একটি পদ্ধতি সম্পর্কে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, مَنْ رَأَى مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا يَكْرَهُهُ فَلْيَصْبِرْ عَلَيْهِ فَإِنَّهُ مَنْ فَارَقَ الجَمَاعَةَ شِبْرًا فَمَاتَ، إِلَّا مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً ‘যে ব্যক্তি তার আমীরের মাঝে এমন কোন বিষয় প্রত্যক্ষ করে, যা সে অপছন্দ করে, তবে সে যেন ধৈর্যধারণ করে। কেননা যে ব্যক্তি ‘জামা‘আত’ থেকে এক বিঘত সরে গেলো এবং এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো, নিশ্চিত তার জাহেলী মৃত্যু হলো’।[11] অপর বর্ণনায় পাওয়া যায়, مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ شِبْرًا فَقَدْ خَلَعَ رِبْقَةَ الْإِسْلَامِ مِنْ عُنُقِهِ ‘যে ব্যক্তি জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে গেলো, সে ইসলামের রজ্জু তার গর্দান হতে খুলে ফেললো’।[12] ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, أَيْ عَلَى صِفَةِ مَوْتِهِمْ مِنْ حَيْثُ هُمْ فَوْضَى لَا إِمَامَ لَهُمْ ‘অর্থাৎ (তার মৃত্যু জাহেলী মৃত্যু হলো মানে) তাদের বৈশিষ্ট্যের উপর তার মৃত্যু হলো। কেননা তারা ছিল শাসকবিহীন বিশৃঙ্খল’।[13] হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَهِيَ كِنَايَةٌ عَنْ مَعْصِيَةِ السُّلْطَانِ ومحاربته قَالَ بن أَبِي جَمْرَةَ الْمُرَادُ بِالْمُفَارَقَةِ السَّعْيُ فِي حَلِّ عَقْدِ الْبَيْعَةِ الَّتِي حَصَلَتْ لِذَلِكَ الْأَمِيرِ وَلَوْ بِأَدْنَى شَيْءٍ فَكُنِّيَ عَنْهَا بِمِقْدَارِ الشِّبْرِ لِأَنَّ الْأَخْذَ فِيْ ذَلِكَ يَؤُوْلُ إِلَى سَفْكِ الدِّمَاءِ بِغَيْرِ حَقٍّ ‘এখানে ‘এক বিঘত’ দ্বারা পরোক্ষভাবে শাসকের অবাধ্যতা এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রামকে বুঝানো হয়েছে। ইবনু আবী জামরাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এখানে জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বলতে সামান্য কিছুর মাধ্যমে হলেও শাসকের বায়‘আত ছিন্ন করার অপচেষ্টাকে বুঝানো হয়েছে। এক বিঘত দ্বারা পরোক্ষভাবে সেদিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। কেননা এপথে এগুলে তা অন্যায়ভাবে রক্ত ঝরানোর দিকেই নিয়ে যায়’।[14] আমীর ছান‘আনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَقَوْلُهُ: (وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ) أَيْ خَرَجَ عَنْ الْجَمَاعَةِ الَّذِينَ اتَّفَقُوا عَلَى طَاعَةِ إمَامٍ انْتَظَمَ بِهِ شَمْلُهُمْ وَاجْتَمَعَتْ بِهِ كَلِمَتُهُمْ وَحَاطَهُمْ عَنْ عَدُوِّهِمْ ‘জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো মানে এমন জামা‘আত থেকে বের হয়ে গেলো, যারা একজন শাসকের আনুগত্য করার ব্যাপারে একমত হয়েছে; যার মাধ্যমে তাদের বিক্ষিপ্ততা শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়েছে, তাদের মতানৈক্য দূরীভূত হয়েছে এবং যিনি তাদেরকে তাদের শত্রু থেকে রক্ষা করেছেন’।[15]

বুঝা গেলো, জামা‘আত পরিভাষাটির কাঠামোগত প্রয়োগের ক্ষেত্রে জামা‘আতবদ্ধ থাকার অর্থ হচ্ছে শাসকশ্রেণীর আনুগত্য করা, তাদের বিরুদ্ধে বিপস্নব না করা। আর এ ব্যাপারে সবাই ঐক্যমত পোষণ করেছেন এবং সালাফে ছালেহীনের নীতিও ছিল তাই। ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَأَمَّا الْخُرُوجُ عَلَيْهِمْ وَقِتَالُهُمْ فَحَرَامٌ بِإِجْمَاعِ الْمُسْلِمِينَ وَإِنْ كَانُوا فَسَقَةً ظَالِمِينَ ‘শাসকদের বিরুদ্ধে বিপস্নব করা এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা মুসলিমদের সর্বসম্মতিতে হারাম- যদিও তারা (শাসকশ্রেণী) ফাসেক্ব ও যালেম হয়’।[16] ইবনু বাত্ত্বাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَقَدْ أَجْمَعَ الْفُقَهَاءُ عَلَى وُجُوبِ طَاعَةِ السُّلْطَانِ الْمُتَغَلِّبِ وَالْجِهَادِ مَعَهُ وَأَنَّ طَاعَتَهُ خَيْرٌ مِنَ الْخُرُوجِ عَلَيْهِ لِمَا فِي ذَلِكَ مِنْ حَقْنِ الدِّمَاءِ وَتَسْكِينِ الدَّهْمَاءِ ‘জোরপূর্বক ক্ষমতা দখলকারী শাসকের আনুগত্য করা এবং তার পক্ষে যুদ্ধ করার ব্যাপারে ফক্বীহগণ ‘ইজমা’ পোষণ করেছেন। তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার চেয়ে তার আনুগত্য করাই শ্রেয়। কেননা তার আনুগত্য করলে রক্তঝরা বন্ধ হয় এবং বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ শান্ত হয়’।[17]

 (চলবে)


[1]. ইবনুল ক্বাইয়িম, আর-রিসালাহ আত-তাবূকিয়্যাহ, (মাকতাবাতুল মাদানী, জেদ্দা, তা.বি), পৃ: ৪১-৪২।

[2]. আল-মিনহাজ, ১২/২২৩।

[3]. আব্দুর রহমান ইবনে নাছের আস-সা‘দী, তাইসীরুল কারীমির রহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান, (মুআসসাসাতুর রিসালাহ, প্রথম প্রকাশ: ১৪২০ হি./২০০০ খৃ.), পৃ: ১৮৩।

[4]. ফাতাওয়া ইবনে উছাইমীন, (দারুল ওয়াত্বান-দারুছ ছুরাইয়া, শেষ প্রকাশ: ১৪১৩ হি.), ২৬/২৬৮।

[5]. ফাতাওয়া ইবনে বায, ৮/২০২-২০৩।

[6]. আলবানী, ফিক্বহুল ওয়াক্বে‘, পৃ: ২৯।

[7]. শায়খ ফাওযানের ওয়েবসাইট-এর এই লিঙ্ক থেকে তথ্যগুলো সংগৃহীত:

https://www.alfawzan.af.org.sa/ar/node/2018

[8]. দ্রষ্টব্য: খালেদ আহমাদ শানতূত, আত-তারবিয়্যাহ আস-সিয়াসিয়্যাহ ফিল মুজতামা‘ইল মুসলিম, (মুদ্রণ তথ্য বিহীন), পৃ: ৯২-৯৩।

[9]. ইবনু আবিল ইয (মৃত্যু: ৭৯২ হি.), শারহুল আক্বীদাতিত-ত্বহাবিইয়্যাহ, (তাহক্বীক্ব: আহমাদ শাকের, প্রকাশক: ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সঊদী আরব), পৃ: ৩৭১।

[10]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়াহ, ২৮/১২৮।

[11]. ছহীহ বুখারী, অধ্যায়ঃ ‘ফেতনা’, অনুচ্ছেদ: ‘নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী: আমার পরে তোমরা এমন কিছু দেখতে পাবে, যা তোমরা পছন্দ করবে না’, হা/৭০৫৪ ও ৭১৪৩; ছহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ‘রাষ্ট্র ক্ষমতা ও প্রশাসন’, অনুচ্ছেদ: ‘ফেতনাকালে মুসলিমদের জামা‘আত আঁকড়ে থাকা অপরিহার্য। আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করা ও দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নিষিদ্ধ’, হা/১৮৪৯।

[12]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭১৭০, ২১৫৬১; সুনানে আবু দাঊদ, হা/৪৭৫৮; সুনানে তিরমিযী, হা/২৮৬৩, হাদীছটি ‘ছহীহ’।

[13]. আল-মিনহাজ, ১২/২৩৮।

[14]. ফাতহুল বারী, ১৩/৭।

[15]. সুবুলুস সালাম, ২/৩৭৪।

[16]. আল-মিনহাজ, ১২/২২৯।

[17]. ফাতহুল বারী, ১৩/৭।

Magazine