কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কিতাবুল ইলম: জ্ঞান অর্জনের স্বরূপ (মিন্নাতুল বারী-১০ম পর্ব)

post title will place here

ব্যাখ্যা:

القِرَاءَةُ وَالعَرْضُ عَلَى المُحَدِّثِ

আরয ও কিরাআতের মধ্যে পার্থক্য:

দুটিই শিক্ষকের সামনে পড়ার ধরন। কিরাআত শব্দটি ‘আম বা ব্যাপক অর্থবোধক, যা সকল ধরনের পড়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। আর আরয এক বিশেষ ধরনের পড়াকে বুঝায়, যেখানে ছাত্রের হাতে লিখিত বই থাকে, সেই বই দেখে তিনি পড়েন। আরযের আরো একটি ধরন আছে, যাকে বলা হয় আরয আল-মুনাওয়ালা। যখন শিক্ষকের বর্ণিত সকল হাদীছ কোনো খাতায় বা বইয়ে লেখা থাকে এবং শিক্ষক সেই বইটি ছাত্রকে দিয়ে বলেন, এই বইয়ে আমার বর্ণিত সকল হাদীছ আছে, তুমি এগুলো আমার থেকে বর্ণনা করতে পার। সেক্ষেত্রে শিক্ষকও যেমন সকল হাদীছ শোনান না, ছাত্রও শিক্ষকের সামনে সকল হাদীছ পড়েন না; বরং শুধু মৌখিক অনুমতিতেই হাদীছ বর্ণনা করা হয়।

শিক্ষকের সামনে ছাত্রের পড়া নিয়ে মতভেদ বিশ্লেষণ:

আলোচ্য অধ্যায়ে ইমাম মালেক, ইমাম হাসান আল-বাছরী ও ইমাম সুফিয়ান ছাওরী রাহিমাহুমুল্লাহ-এর মতামত ও যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। যারা হাদীছ বর্ণনার জন্য শিক্ষকের সামনে পড়াকে গ্রহণযোগ্য মনে করতেন। নিম্নে তাদের আলোচ্য দলীলগুলো তুলে ধরা হলো—

দলীল-১: যিমাম ইবনু ছা‘লাবার হাদীছ:

এই হাদীছটি পূর্ণ সনদসহ বিস্তারিত আসবে।

দলীল-২: চুক্তির উপর সাক্ষ্য ও হাদীছ বর্ণনা:

وَاحْتَجَّ مَالِكٌ: بِالصَّكِّ يُقْرَأُ عَلَى القَوْمِ، فَيَقُولُونَ أَشْهَدَنَا فُلاَنٌ وَيُقْرَأُ ذَلِكَ قِرَاءَةً عَلَيْهِمْ وَيُقْرَأُ عَلَى المُقْرِئِ، فَيَقُولُ القَارِئُ: أَقْرَأَنِي فُلاَنٌ.

লিখিত চুক্তি বা দলীলকে আরবীতে (صك) বলা হয়। এর বহুবচন হচ্ছে ছুকূক। আধুনিক ইসলামী ব্যাংকে ছুকূক বন্ডের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যখন কোনো ছক বা চুক্তি লেখা হয়, তখন সেটি সাক্ষীদের সামনে পড়ে শোনানো হয়। সাক্ষীরা শুধু বলেন, হ্যাঁ, এটা আমাদের সামনে লেখা হয়েছিল/আমরা এর সাক্ষী ছিলাম। বিচারক এটিকে পুরো বক্তব্যের সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন, যদিও সাক্ষীরা পুরো চুক্তিটা নিজে মুখে পড়েন না বা বলেন না।

ঠিক অনুরূপই হাদীছ/কিরাআতের ক্ষেত্রে ছাত্র শায়খের সামনে হাদীছ/কুরআন পড়েন, এরপর ছাত্র বলেন,أقرأني فلان/قرأته على فلان ‘অমুক আমাকে পড়িয়েছেন/আমি অমুকের নিকট পড়েছি’। যেমন- দলীল পড়ে শোনানোর ওপর ভিত্তি করে সাক্ষ্য গ্রহণ করা বৈধ, তেমনি শায়খের সামনে পড়া (القراءة على الشيخ)-এর ওপর ভিত্তি করে রেওয়ায়াতকে প্রমাণিত ধরা বৈধ।

দলীল-৩: সনদসহ হাসান বাছরীরাহিমাহুল্লাহ-এর বক্তব্য:

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَلاَمٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الحَسَنِ الوَاسِطِيُّ، عَنْ عَوْفٍ، عَنِ الحَسَنِ، قَالَ: «لاَ بَأْسَ بِالقِرَاءَةِ عَلَى العَالِمِ»

রাবীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

(১) মুহাম্মাদ ইবনে সালাম আল-বায়কান্দী: তার পরিচয় পূর্বে চলে গেছে।

(২) মুহাম্মাদ ইবনে হাসান আল-ওয়াসীতী: ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন তাকে মযবূত বলেছেন। আবূ হাতেম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, কোনো সমস্যা নেই। তবে ইবনু হিব্বান রাহিমাহুল্লাহ অভিযোগ করেছেন যে, তিনি মাওকূফকে মারফূ‘ হিসেবে বর্ণনা করে দিতেন। কিন্তু এই অভিযোগের প্রমাণে ইমাম ইবনু হিব্বান রাহিমাহুল্লাহ শুধু একটি উদাহরণ পেশ করেছেন। অন্যদিকে বেশিরভাগ ইমামই তাকে মযবূত বলেছেন। পাশাপাশি ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ তার থেকে মূল কোনো হাদীছে দলীল গ্রহণ করেননি। এই ধরনের ব্যাখ্যামূলক সহযোগী বর্ণনায় তার রেওয়ায়াত গ্রহণ করেছেন।[1]

(৩) আওফ: আওফের পূর্ণ নাম আওফ ইবনু আবী জামীলা। তিনি বাছরার অধিবাসী এবং সত্যবাদী, গ্রহণযোগ্য ও মযবূত রাবী। তবে ক্বাদারী ও শীআ মতবাদ দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত ছিলেন। তার আলোচনা পূর্বে চলে গেছে।

উক্ত বর্ণনায় ইমাম হাসান রাহিমাহুল্লাহ বাছরী বলেছেন, শিক্ষকের সামনে হাদীছ পড়ে হাদীছ বর্ণনা করায় কোনো সমস্যা নেই। তথা এভাবে হাদীছ বর্ণনা করলে হাদীছ গ্রহণযোগ্য হবে।

দলীল-৪: সনদসহ সুফিয়ান ছাওরী রাহিমাহুল্লাহ-এর বক্তব্য:

وَأَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ الفَرَبْرِيُّ، وَحَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ البُخَارِيُّ قَالَ: حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ مُوسَى عَنْ سُفْيَانَ قَالَ: إِذَا قُرِئَ عَلَى المُحَدِّثِ فَلاَ بَأْسَ أَنْ يَقُولَ: حَدَّثَنِي.

রাবীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

(১) মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ আল-ফিরাবরী: যিনি ছহীহ বুখারী সরাসরি ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ-এর নিকট থেকে পড়েছেন এবং লিখে নিয়েছেন। তার লিখিত ‍নুসখা বা কপিই সমগ্র বিশ্বে প্রচলিত। তার বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ ‘মিন্নাতুল বারী- ১ম খণ্ডে’ আছে।

(২) উবায়দুল্লাহ ইবনে মূসা: তিনি মযবূত জ্ঞানী রাবী, তবে তার মধ্যে শীআ মতবাদের প্রতি ব্যাপক আকর্ষণ ছিল। যার কারণে অনেক ইমাম তার উপর তানক্বীদ করেছেন। তার পরিচয় পূর্বে চলে গেছে।

(৩) সুফিয়ান ইবনে সাঈদ ছাওরী: তার পরিচয় পূর্বে চলে গেছে।

সাধারণত শিক্ষক যখন নিজে মুখে হাদীছ শোনান, তখন ছাত্র বলেন ‘হাদ্দাছানী’ তথা তিনি আমাকে হাদীছ শুনিয়েছেন। উক্ত বর্ণনায় ইমাম সুফিয়ান ছাওরী বলতে চেয়েছেন, ছাত্রও যখন শিক্ষকের সামনে পড়বেন, তখনও তিনি ‘হাদ্দাছানী’ বলতে পারেন। তথা উভয় ধরনের বর্ণনা গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে একই। শিক্ষক বললেও যা, ছাত্র পড়লেও তা।

দলীল-৫: শিক্ষকের শোনানো না ছাত্রের পড়া কোনটা বেশি গ্রহণযোগ্য?

قَالَ: وَسَمِعْتُ أَبَا عَاصِمٍ يَقُولُ عَنْ مَالِكٍ، وَسُفْيَانَ القِرَاءَةُ عَلَى العَالِمِ وَقِرَاءَتُهُ سَوَاءٌ.

রাবীর সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

আবূ আছেম আন-নাবীল: তার পূর্ণ নাম যাহহাক ইবনু মাখলাদ। ইবনু জুরাইজ তার লক্বব দিয়েছেন নাবীল। একবার বাছরা শহরে হাতি আসলে সকল ছাত্র দারস ছেড়ে সেই হাতি দেখতে যান, শুধু আবূ আছেম যাহহাক একাই বসে পড়া অব্যাহত রেখেছিলেন। তখন ইবনু জুরাইজ তার নাম দেন নাবীল তথা প্রকৃত বুদ্ধিমান। তারপর তিনি এই নামেই (আবূ আছেম আন-নাবীল) প্রসিদ্ধ হয়ে যান। তিনি সর্বসম্মতিক্রমে মযবূত ও গ্রহণযোগ্য ইমাম।[2]

উক্ত বর্ণনায় স্পষ্টভাবে ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ-এর মত তুলে ধরা হয়েছে। তার মতে, শিক্ষকের নিজে মুখে হাদীছ শোনানো আর ছাত্রের বই থেকে পড়ার মধ্যে মানগত দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই, বরং দুটিই সমান।

তবে বেশিরভাগ উলামায়ে কেরামের মতে, শিক্ষকের হাদীছ শোনানো মানগত দিক থেকে বেশি উঁচু। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ছাত্রের বই থেকে পড়া এবং শিক্ষকের কাছে শোনা এটাই মানগত দিক থেকে বেশি উঁচু। নিম্নে দুই পক্ষেরই দলীল তুলে ধরা হলো—

ছাত্রের পড়া বেশি শ্রেষ্ঠ: এই মতের পক্ষে রয়েছেন ইমাম আবূ হানীফা ও ইবনু আবী যি’ব। তাদের যুক্তি হচ্ছে শিক্ষক যখন নিজে পড়েন, তখন তার মনোযোগ বিভিন্ন দিকে দিতে হয়। সেক্ষেত্রে তিনি নিজে কোনো ভুল করছেন কিনা তা অনেক সময় তার পক্ষে ধরা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে ছাত্র যখন পড়েন, তখন শিক্ষক সম্পূর্ণ ফ্রি, তার উপর কোনো চাপ নেই। তিনি তখন মনোযোগ দিয়ে ছাত্রের পড়ার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা যাচাই করেন, যা হাদীছটিকে আরো নির্ভুল করে বর্ণনা করতে সাহায্য করে।

শিক্ষকের পড়া বেশি শ্রেষ্ঠ: বেশিরভাগ উলামায়ে কেরাম এটির পক্ষে মতামত দিয়েছেন। তাদের দলীল হচ্ছে, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাহাবীদের হাদীছ ও কুরআন শুনিয়েছেন, ঠিক তেমনি তিনি জিবরীল আলাইহিস সালাম-এর কাছ থেকে শুনেছেন। সুতরাং এটিই জ্ঞান বিতরণের মূল ভিত্তি যে, শিক্ষক পড়বেন এবং ছাত্র শুনবেন। আর এটিই সুন্নাত ও এটিই আদি।

উভয়টাই সমান: স্বয়ং আল্লাহর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও জিবরীল আলাইহিস সালাম-কে কুরআন শোনাতেন। ছাহাবীগণও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কুরআন শোনাতেন। সুতরাং শিক্ষাপদ্ধতি হিসেবে দুটিই গ্রহণযোগ্য এবং দুটিই মানগত দিক থেকে সমান।

(ইনশা-আল্লাহচলবে)

-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক

 ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।


[1]. তাহযীবুল কামাল, ২৫/৭১; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৯/৩০৩।

[2]. তাহযীবুল কামাল, ১৩/২৮৬; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৯/৪৮২।

Magazine