জামা‘আতবদ্ধ থাকার অর্থ: জামা‘আতবদ্ধ থাকার অর্থ তাহলে দু’টো:
(ক) সালাফে ছালেহীন তথা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত এবং ছাহাবায়ে কেরাম, তাবে‘ঈন ও আতবা‘উত তাবে‘ঈন অনুসৃত মানহাজ বা পথ, পদ্ধতি, মূলনীতি ও আদর্শ আঁকড়ে ধরে থাকা। এ অর্থে একজন মুসলিমকে আমরণ জামা‘আতবদ্ধ থাকা অপরিহার্য। এ জামা‘আত থেকে বের হয়ে গেলে একজন ব্যক্তি বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে; এমনকি ইসলাম থেকেও বের হয়ে যেতে পারে।
(খ) সমগ্র মুসলিম বিশ্বের একক খলীফা বা শাসক থাকলে তার অধীনে থাকা অথবা দেশ বিভাজনের পর প্রত্যেকের স্বীয় দেশের মুসলিম শাসকের অধীনে থাকা। আল্লাহ্র নাফরমানী না হলে শাসকের আনুগত্য করা এবং শরী‘আত অনুমোদিত নিয়ম ছাড়া তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা। এ উভয় অর্থে জামা‘আতবদ্ধ থাকা একজন মুসলিমের জন্য ওয়াজিব। তার যেমন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মানহাজ থেকে বের হয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই, তেমনি শাসকের বায়‘আত ছিন্ন করাও বৈধ নয়।
জামা‘আত থেকে বের হওয়ার হুকুম:
সম্মানিত পাঠক! আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে, আমরা ইতোপূর্বে জামা‘আতের দু’টি অর্থ দেখে এসেছি। এই অর্থভেদে জামা‘আত থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুকুম ও স্তর বিভিন্ন রকম হতে পারে। জামা‘আতের প্রথম অর্থে আমরা পেয়েছিলাম, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবায়ে কেরামের গৃহীত ও অনুসৃত পথ ও পদ্ধতি অনুযায়ী যে বা যারা চলবে, সে বা তারাই হচ্ছে ‘জামা‘আত’। এই অর্থে যারা জামা‘আত থেকে বের হয়ে যাবে, তাদেরও স্তর রয়েছে। অবস্থাভেদে কখনও তারা সুন্নাত পরিত্যাগকারী ও বিদ‘আতী হিসাবে গণ্য হবে, আবার কখনও ইসলাম থেকে বের হয়ে কাফেরে পরিণত হবে।
এই অর্থে যে ব্যক্তি জামা‘আত থেকে বের হয়ে যাবে এমন অবস্থায় যে, তার শরী‘আতের কোন দলীলের সাথে সম্পর্ক রয়েছে, তবে সে এর অপব্যাখ্যা করছে; কিন্তু ঐ দলীলের উপর তার প্রকাশ্যে ও গোপনে ঈমান ও আমল রয়েছে এবং গায়েবেও তার বিশ্বাস আছে, তাহলে তার এই অপব্যাখ্যা তাকে ইসলাম থেকে বের করে দিবে না; বরং সে বিদ‘আতীদের তালিকায় থাকবে। তবে অবস্থা অনুযায়ী এসব বিদ‘আতীদের স্তরও উঁচু-নীচু হতে পারে। উল্লেখ্য, এরকম কোন ব্যক্তি যদি গোপনে মুনাফিক্ব হয়, তাহলে সে কাফের হিসাবে গণ্য হবে। কিন্তু মুনাফিক্ব না হয়ে বরং গোপনে আল্লাহ এবং তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ঈমান থাকলে সে কাফের হিসাবে গণ্য হবে না, যদিও অপব্যাখ্যা করে সে ভুল করেছে। এই শ্রেণীর মানুষের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বনু ইসরাঈল ৭২ দলে এবং এই উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হওয়া সংক্রান্ত হাদীছে। লক্ষ্য করুন, খারেজী বা চরমপন্থীরা সবচেয়ে বেশী বিদ‘আত সৃষ্টি করেছে, মুসলিম উম্মাহ্র বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং তাদেরকে কাফের ফতওয়া দিয়েছে, অথচ ছাহাবায়ে কেরাম তাদেরকে কাফের বলেননি, না আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু, না অন্য কোন ছাহাবী। বরং তাদেরকে যালিম ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী মুসলিম হিসাবেই আখ্যায়িত করেছেন। যদিও খারেজীরা মুসলিম নাকি মুসলিম নয়, তা নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। তবে অগ্রাধিকারযোগ্য বক্তব্য হচ্ছে, তারা সীমালঙ্ঘনকারী ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী মুসলিম।
কিন্তু যে ব্যক্তি শরী‘আতের বক্তব্যের অপব্যাখ্যা না করে বরং প্রত্যাখ্যান করে জামা‘আত থেকে বের হয়ে যায় অথবা শরী‘আতের বক্তব্যের এমন অপব্যাখ্যা করে বের হয়ে যায় যে, এর মাধ্যমে শরী‘আতের সুপ্রসিদ্ধ মৌলিক বিষয়গুলোকে অস্বীকার করা হচ্ছে বা যা হারাম হওয়ার ব্যাপারে ইজমা হয়েছে, তাকে জায়েয করা হচ্ছে অথবা যা হালাল হওয়ার ব্যাপারে ইজমা হয়েছে, তাকে হারাম করা হচ্ছে, ঐ ব্যক্তি প্রকাশ্যে এমনটি করলে কাফের হয়ে যাবে আর অন্তরে লুকিয়ে রাখলে বড় মুনাফিক্ব হিসাবে গণ্য হবে। অর্থাৎ এ উভয় অবস্থায় সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। এদিকে ইঙ্গিত করেই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لَا يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ، يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللهِ، إِلَّا بِإِحْدَى ثَلَاثٍ: الثَّيِّبُ الزَّانِي، وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ، وَالتَّارِكُ لِدِينِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ ‘এমন মুসলিমের রক্ত বৈধ নয়, যে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো (হক্ব) মা‘বূদ নেই এবং আমি আল্লাহ্র রাসূল। কিন্তু তিনটি কাজের যে কোনো একটি করলে তা বৈধ: বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হলে, জীবনের বিনিময়ে জীবন অর্থাৎ কাউকে হত্যা করলে এবং স্বধর্ম ত্যাগকারী যে (মুসলিমদের) জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়’।[1] হাদীছটির শেষের বাক্যটির জন্যই এখানে এটির অবতারণা। অতএব, যে ব্যক্তি দ্বীন ইসলাম ছেড়ে দিল, নিঃসন্দেহে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল।
আমরা জামা‘আত শব্দের দ্বিতীয় অর্থ দেখেছিলাম, মুসলিমরা যখন একজন শাসকের অধীনে একমত হবে, তাকে শাসক হিসাবে মেনে নিবে, তখন তাদেরকে জামা‘আত বলা হবে। তখন এই জামা‘আতের সাথে থাকা এবং তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া ওয়াজিব হয়ে যাবে। কিন্তু যদি কেউ এই জামা‘আত থেকে বের হয়ে যায়, তাহলে তার হুকুম কী হবে? এই অর্থে কেউ জামা‘আত থেকে বের হয়ে গেলে তার কয়েকটি অবস্থা হতে পারে:
যদি ভুল বুঝাবুঝি করে ক্ষমতার লোভে জামা‘আত থেকে বের হয়ে যায়, তাহলে তারা বিদ্রোহী (اَلْبُغَاةُ)। এদের ফেতনাকে কিভাবে দমন করতে হবে, সেদিকে ইশারা করে আল্লাহ বলেন, وَإِنْ طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِنْ بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِنْ فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ‘আর যদি মুমিনদের দুই দল লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর চড়াও হয়, তাহলে তোমরা আক্রম্নকারী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করবে- যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহ্র নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। অতঃপর যদি দলটি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ইনছাফের সঙ্গে মীমাংসা করে দিবে এবং সুবিচার করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ইনছাফকারীদেরকে পছন্দ করেন’ (আল-হুজুরাত, ৪৯/৯)।
আর যদি ডাকাতি, লুটতরাজ, লুণ্ঠন এবং যমীনে ফাসাদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে জামা‘আত থেকে বের হয়ে যায়, তাহলে তাদেরকে বলা হয় ফাসাদ ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী (اَلْمُحَارِبُوْنَ)। এদের শাস্তি সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ - إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا مِنْ قَبْلِ أَنْ تَقْدِرُوا عَلَيْهِمْ فَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ ‘যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং যমীনে ফাসাদ করে বেড়ায়, তাদের আযাব কেবল এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে কিংবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে। এটি তাদের জন্য দুনিয়ায় লাঞ্ছনা এবং তাদের জন্য আখেরাতে রয়েছে মহা আযাব’ (আল-মায়েদাহ, ৫/৩৩-৩৪)।
যদি কেউ ইসলামের সাথে কুফরী ও শত্রুতা করে এবং ইসলামের শত্রুদের সাথে বন্ধুত্ব রেখে এই জামা‘আত থেকে বের হয়ে যায়, তাহলে তারাই হচ্ছে মুরতাদ; এরা তাদের গর্দান থেকে ইসলামের বন্ধনকে ছিন্ন করে ফেলে।
উপসংহার: এই ছিল জামা‘আত সংক্রান্ত ইসলামের বক্তব্য এবং সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী সেগুলোর সঠিক অর্থ। সুতরাং মুসলিম উম্মাহকে জামা‘আতের সঠিক অর্থ বুঝতে হবে এবং এর যথার্থ প্রয়োগ ঘটাতে হবে। এর বাইরে যে কোন সৎকাজের উদ্দেশ্যে নামে-বেনামে ইসলামসমর্থিত যে কোন ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাকেও ইসলাম উৎসাহিত করে। এমনকি দুই-একজন মিলেও যদি ইসলামের কোন কাজ করে বা অন্য কোন ভাল কাজ করে, তথাপিও তাদের এই একতা নষ্ট করা ঠিক নয়। তবে, কোনভাবেই জামা‘আতের অপপ্রয়োগ যেন না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে জামা‘আতবদ্ধ জীবনযাপনের এবং গোটা মুসিলম উম্মাহ্র মধ্যে ঈমানী ভ্রাতৃত্ব, হৃদ্যতা, আন্তরিকতা ও সহযোগিতা বজায় রেখে চলার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৭৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৭৬।
