কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলিম শাসকের (সরকারের) আনুগত্য

ভূমিকা :

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন। সকল বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধান একমাত্র ইসলামেই আছে। মানব জীবনের সকল বিষয়ে সঠিক দিক-নির্দেশনা কেবল ইসলামেই রয়েছে। মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হল, রাষ্ট্র ব্যবস্থা। রাষ্ট্র ব্যবস্থা যাতে সুচারুরূপে পরিচালিত হতে পারে, সে জন্য ইসলাম পরিপূর্ণ দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ইসলাম প্রদত্ত দিক-নির্দেশনা সমূহের অন্যতম বিষয় হচ্ছে, শাসকের তথা সরকারের আদেশ-নিষেধ মান্য করা বা না করার বিধান। বক্ষমান প্রবন্ধে আমরা এ বিষয়টি নিয়ে কিছু আলোচনা পেশ করবো ইনশাআল্লাহ।

মুসলিম শাসকের (সরকারের) হুকুম পালনের বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি :

মৌলিকভাবে ইসলাম শাসকের (সরকারের) আনুগত্য করাকে আবশ্যক করে দিয়েছে। অর্থাৎ ইসলামে শাসকের (সরকারের) হুকুম তথা আদেশ-নিষেধ পালন করা মূলত ওয়াজিব। মহান আল্লাহ বলেছেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا أَطِيْعُوا اللهَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَأُوْلِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ্র, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যকার দায়িত্বশীলদেরকে (শাসকদেরকে)’ (নিসা, ৫৯)। যেহেতু মহান আল্লাহই শাসকের (সরকারের) হুকুম পালন করাকে ওয়াজিব করেছেন, সেহেতু শাসক (সরকার) যদি আল্লাহ্র অবাধ্যতার হুকুম করে, তাহলে শাসকের সে হুকুম পালন করা যাবে না। এ বিষয়টি যেমন সুস্থ বিবেকের দাবী, তেমন শরী‘আতের সুস্পষ্ট নির্দেশ। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوْقٍ فِيْ مَعْصِيَةِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ.

‘আল্লাহ্র অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য চলবে না’।[1]

শাসক বা সরকারের হুকুমের প্রকারভেদ :

আনুগত্যের বিচারে সরকারের হুকুম সাধারণত তিন প্রকার হতে পারে। যথা :

প্রথম প্রকার : সরকারী হুকুম বা আদেশ-নিষেধ এমন বিষয়ে হওয়া, যে বিষয়ে স্বয়ং আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধ রয়েছে। সরকারের এ ধরনের হুকুম পালন করা মুসলমিদের উপর ওয়াজিব সর্বসম্মতিক্রমে। কারণ সরকার এক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্র হুকুম বা আদেশ-নিষেধ বাস্তবায়ন করার হুকুম প্রদান করেছে। তাছাড়া কোন সাধারণ লোকও যদি আল্লাহ কর্তৃক কোন ওয়াজিব বিষয় পালনের নির্দেশ দেয়, তবে তার নির্দেশ পালন করা ওয়াজিব, তাহলে একই বিষয়ে শাসকের বা সরকারের নির্দেশ পালন ওয়াজিব হওয়াটা তো আরো বেশী যুক্তিসম্মত। উদাহরণ স্বরূপ :

(ক) সূদ-ঘুষ বন্ধে সরকারী হকুম।

(খ) মদ নিষিদ্ধ করণে সরকারী হকুম।

(গ) ওযরমুক্ত, বিবেকবান, প্রাপ্ত বয়স্ক প্রত্যেক মুসলিমের উপর ছালাত বাধ্যতামূলক করণে সরকারী হুকুম।

দ্বিতীয় প্রকার : আল্লাহ্র নাফরমানী বা অবাধ্যতাপূর্ণ সরকারী হুকুম, অর্থাৎ সরকার যে হুকুম তথা আদেশ-নিষেধ করেছে, তা মান্য করলে আল্লাহ্র নাফরমানী করা হবে।

ইসলামের দৃষ্টিতে সরকারের এ ধরনের হুকুম মান্য করা কোন মুসলিমের জন্য জায়েয নয়। এক্ষেত্রে সরকারের কথা শোনাও যাবে না, মানাও যাবে না। যেমন :

(ক) সরকার যদি বলে, মসজিদে ছালাতের জামা‘আত নিষিদ্ধ, এ সপ্তাহে জুম‘আর ছালাত নিষিদ্ধ, তাহলে সরকারের একথা শোনা যাবে না, তার এ হুকুম পালন করা যাবে না।

(খ) সরকার যদি কোন মানুষের জান, মাল ও ইযযতের উপর যুলুম করার হুকুম দেয়, তাহলে তার হুকুম মান্য করা হারাম। এক্ষেত্রে তার হুকুম পালন চলবে না।

(গ) সরকার যদি দাড়ি কামানোর নির্দেশ দেয়, কিংবা টাখনুর নীচে কাপড় পরার নির্দেশ দেয়, তাহলে সরকারের এ নির্দেশ পালন করা মুসলিমদের জন্য হারাম।

(ঘ) সরকার যদি মুসলিম নারীদেরকে পর্দা করতে নিষেধ করে, তাহলে সরকারের এ নিষেধ মান্য করা জায়েয নয়।

(ঙ) সরকার যদি পুত্র ও কন্যা সন্তানের উত্তরাধিকার সম্পত্তি সমানভাবে বণ্টনের হুকুম দেয়, তাহলে সরকারের এ হুকুম পালন করা মুসলিমদের উপর হারাম।

এককথায়, আল্লাহ যেটার আদেশ দিয়েছেন, সরকার যদি সেটা থেকে নিষেধ করে অথবা আল্লাহ যেটা থেকে নিষেধ করেছেন, সরকার যদি সেটার আদেশ করে, তাহলে সরকারের আদেশ-নিষেধ পালন করা মুসলিমদের জন্য হারাম। আল্লাহ্র নাফরমানীমূলক সরকারী কোন হুকুম পালন করা যাবে না। কারণ আমাদের রবের আদেশ-নিষেধ সরকারের আদেশ-নিষেধ হতে অনেক বড়, অনেক মূল্যবান।

অতএব, আল্লাহ্র নাফরমানীমূলক সরকারী আদেশ-নিষেধ পালন করা জনগণের উপর হারাম। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ فِيْمَا أَحَبَّ وَكَرِهَ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ.

‘মুসলিম ব্যক্তির উপর তার অভিপ্রেত, অনভিপ্রেত সকল বিষয়ে শাসকের আদেশ-নিষেধ শ্রবণ করা ও মান্য করা ওয়াজিব, যদি না তাকে আল্লাহ্র অবাধ্যতার হুকুম করা হয়। যখন তাকে আল্লাহ্র অবাধ্যতার হুকুম করা হবে, তখন তার পক্ষে শাসকের সে হুকুম শোনা ও মানা চলবে না’।[2] নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوْقٍ فِيْ مَعْصِيَةِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ.

‘আল্লাহ্র নাফরমানী করে কোন মাখলূকের আনুগত্য চলবে না’।[3]

তৃতীয় প্রকার : এ প্রকারটি সরকারের এমন কিছু আদেশ-নিষেধ, যার বিপরীতে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে কোন আদেশ-নিষেধ নেই। অর্থাৎ জনগণের কল্যাণ ও নিরাপত্তায়, রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলায়, দেশের উন্নয়নে সরকার কর্তৃক রচিত এমন কিছু নীতিমালা ও আইন-ক্বানূন, যেসব বিষয়ে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে সরাসরি কোন আদেশ-নিষেধ নেই এবং সেগুলো শরী‘আতের সাথে সাংঘর্ষিকও নয়।

সরকার প্রণীত এসকল নীতিমালা ও আইন-ক্বানূন মান্য করা মুসলিমদের উপর ওয়াজিব। কোন মুসলিম এগুলো না মানলে তার পাপ হবে। কারণ শাসককে মান্য করার বিষয়ে সে আল্লাহ্র আদেশ অমান্যকারী।

যারা সরকারের এজাতীয় আদেশ-নিষেধ তথা নীতিমালা ও আইন-ক্বানূন অমান্য করে চলবে, তাদেরকে যথোপযুক্ত শাস্তি প্রদান করার অধিকার আছে সরকারের। এজাতীয় সরকারী হুকুম বা নীতিমালা ও আইন-ক্বানূনের কিছু উদাহরণ নিমেণ পেশ করা হল :

(ক) ট্রাফিক আইন : ট্রাফিক আইন সরকার রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন, যা শরী‘আহ পরিপন্থী নয় এবং তাতে আল্লাহ্র অবাধ্যতাও নেই। লালবাতি জ্বললে গাড়ি থামাতে হবে। রাস্তার নির্দিষ্ট একটি ধার দিয়ে চলাচল করতে হবে। এজাতীয় ট্রাফিক আইন মান্য করা জনগণের উপর ওয়াজিব। যদি কেউ এ আইন অমান্য করে, তাহলে তার পাপ হবে। কারণ শাসকের আনুগত্যের বিষয়ে সে আল্লাহ্র আদেশ অমান্যকারী।

(খ) পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ আইন : সরকার পরিবেশ রক্ষার্থে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। সরকারের এ নিষেধাজ্ঞা শরী‘আহ বিরোধী নয় এবং তাতে আল্লাহ্র অবাধ্যতাও নেই। অতএব, জনগণের উপর তা মান্য করা ওয়াজিব।

(গ) সরকারী অফিস আদালত সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য সময় নির্ধারণ আইন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় আরো বিভিন্ন আইন-ক্বানূন, যা শরী‘আহ পরিপন্থী নয় এবং তাতে আল্লাহ্র অবাধ্যতাও নেই।

সরকারের এ জাতীয় হুকুম পালন যে ওয়াজিব তার দলীল সমূহ :

(১) মহান আল্লাহ্র বাণী,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا أَطِيْعُوا اللهَ وَأَطِيْعُوا الرَّسُوْلَ وَأُوْلِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ.

‘হে মুমিনগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ্র আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যকার দায়িত্বশীলদেরকে (শাসকদেরকে)’ (নিসা, ৫৯)

(২) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

السَّمْعُ وَالطَّاعَةُ عَلَى الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ فِيْمَا أَحَبَّ وَكَرِهَ مَا لَمْ يُؤْمَرْ بِمَعْصِيَةٍ فَإِذَا أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ.

‘মুসলিম ব্যক্তির উপর তার অভিপ্রেত, অনভিপ্রেত সকল বিষয়ে শাসকের আদেশ-নিষেধ শ্রবণ করা ও তা মান্য করা ওয়াজিব, যদি না তাকে আল্লাহ্র অবাধ্যতার হুকুম করা হয়। যখন তাকে আল্লাহ্র অবাধ্যতার হুকুম করা, তখন তার পক্ষে শাসকের সে হুকুম শোনা ও মানা চলবে না’।[4]

উক্ত হাদীছটিতে শাসকের হুকুম দ্বারা এমন হুকুম উদ্দেশ্য, যে বিষয়ে শরী‘আতের তথা আল্লাহ ও তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন আদেশ-নিষেধ নেই। আর এটা বোঝা যায় দু’দিক থেকে। যথা :

প্রথম দিকটি হল : হাদীছটিতে বলা হয়েছে, শাসকের হুকুম মান্য করা প্রজার উপর ওয়াজিব, হুকুম তার পসন্দ হোক কিংবা অপসন্দ হোক। আর একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, যদি কেউ আল্লাহ ও তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন হুকুমকে অপসন্দ করে, তাহলে সে মুসলিম থাকবে না। অথচ নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদীছটিতে শাসকের হুকুম অপসন্দ হওয়া সত্ত্বেও তাকে মুসলিম আখ্যা দিয়েছেন এবং তাকে তার অপসন্দনীয় সরকারী হুকুম পালন করতে বাধ্য করেছেন।

অতএব, বোঝা গেল, এখানে শাসকের হুকুম দ্বারা এমন হুকুম উদ্দেশ্য, যে বিষয়ে আল্লাহ ও তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন আদেশ-নিষেধ নেই এবং তা শরী‘আতের উদ্দেশ্য পরিপন্থীও নয়।

দ্বিতীয় দিক হল : হাদীছটিতে শাসকের হুকুম মান্য করতে বলা হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার হুকুম আল্লাহ্র অবাধ্যতামূলক হবে।

এর দ্বারা একথা সহজেই বোধগম্য যে, আল্লাহ ও তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হুকুমে আল্লাহ্র অবাধ্যতা থাকার প্রশ্নই আসে না। বরং আল্লাহ ও তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সকল হুকুম আল্লাহ্র আনুগত্যের নিমিত্তেই।

অতএব, বোঝা গেল, হাদীছটিতে শাসকের হুকুম দ্বারা এমন হুকুম উদ্দেশ্য, যে বিষয়ে আল্লাহ ও তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন আদেশ-নিষেধ নেই এবং তা শরী‘আতের উদ্দেশ্য পরিপন্থীও নয়। আর এজন্যই বলা হয়েছে, যদি শাসকের হুকুম আল্লাহ্র অবাধ্যতায় হয়, তাহলে তা মান্য করা যাবে না।

(৩) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

وَمَنْ يُطِعِ الْأَمِيرَ فَقَدْ أَطَاعَنِيْ وَمَنْ يَعْصِ الْأَمِيرَ فَقَدْ عَصَانِيْ.

‘যে ব্যক্তি শাসকের আনুগত্য করে, সে আমারই আনুগত্য করে। আর যে ব্যক্তি শাসককে অমান্য করে, সে আমাকেই অমান্য করে’।[5]

উক্ত হাদীছটিও অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, এখানে শাসকের হুকুম দ্বারা এমন হুকুম উদ্দেশ্য, যে বিষয়ে আল্লাহ ও তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন আদেশ-নিষেধ নেই এবং শরী‘আতের উদ্দেশ্য বিরোধীও নয়। কারণ যদি শাসকের হুকুম তথা আদেশ-নিষেধ খোদ আল্লাহ ও তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ-নিষেধ হত, তাহলে বলা হত না, ‘যে ব্যক্তি শাসকের আনুগত্য করে...’।

সঊদী আরবের বিখ্যাত ফক্বীহ, আল্লামা ইবনু উছায়মীন রাহিমাহুল্লাহ শাসকের হুকুম তথা আদেশ-নিষেধকে তিন ভাগে বিভক্ত করে বলেছেন,

إِنْ مَا أَمَرَ بِهِ وُلَاةُ الأُمُورِ يَنْقَسِمُ إِلَى ثَلَاثَةِ أَقْسَامٍ:

القِسْمُ الأَوَّلُ: أَنْ يَكُونَ اللهُ قَدْ أَمَرَ بِهِ، مِثْلُ أَنْ يَأْمُرُونَا بِإِقَامَةِ الجَمَاعَةِ فِي المَسَاجِدِ، وَأَنْ يَأْمُرُونَا بِفِعْلِ الخَيْرِ وَتَرْكِ المُنْكَرِ، وَمَا أَشْبَهَ ذَلِكَ، فَهَذَا وَاجِبٌ مِنْ وَجْهَيْنِ: أَوَّلًا: أَنَّهُ وَاجِبٌ أَصْلًا. الثَّانِي: أَنَّهُ أَمَرَ بِهِ وُلَاةُ الأُمُورِ..

القِسْمُ الثَّانِي: أَنْ يَأْمُرُونَا بِمَعْصِيَةِ اللهِ، فَهَذَا لَا يَجُوزُ لَنَا طَاعَتُهُمْ فِيهَا مَهْمَا كَانَ، مِثْلُ أَنْ يَقُولُوا: لَا تُصَلُّوا جَمَاعَةً، اِحْلِقُوا لِحَاكُمْ، أَنْزِلُوا ثِيَابَكُمْ إِلَى أَسْفَلَ، اِظْلِمُوا المُسْلِمِينَ بِأَخْذِ المَالِ أَوْ الضَّرْبِ أَوْ مَا أَشْبَهَ ذَلِكَ، فَهَذَا أَمْرٌ لَا يُطَاعُ وَلَا يَحِلُّ لَنَا طَاعَتُهُمْ فِيهُ، لَكِنْ عَلَيْنَا أَنْ نُنَاصِحَهُمْ وَأَنْ نَقُوْلَ: اِتَّقُوا اللهَ، هَذَا أَمْرٌ لَا يَجُوزُ، لَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَأْمُرُوا عِبَادَ اللهِ بِمَعْصِيَةِ اللهِ..

القِسْمُ الثَّالِثُ: أَنْ يَأْمُرُونَا بِأَمْرٍ لَيْسَ فِيهُ أَمْرٌ مِنْ اللهِ وَرَسُولِهِ بِذَاتِهِ، وَلَيْسَ فِيهُ نَهْيٌ بِذَاتِهِ، فَيَجِبُ عَلَيْنَا طَاعَتُهُمْ فِيهُ؛ كَالأَنْظِمَةِ الَّتِي يَسْتَنُّوْنَهَا وَهِيَ لَا تُخَالِفُ الشَّرْعَ، فَإِنَّ الوَاجِبَ عَلَيْنَا طَاعَتُهُمْ فِيهِمَا وَاتِّبَاعُ هَذِهِ الأَنْظِمَةِ وَهَذَا التَّقْسِيمِ، فَإِذَا فَعَلَ النَّاسُ ذَلِكَ؛ فَإِنَّهُمْ سَيَجِدُونَ الأَمْنَ وَالاِسْتِقْرَارَ وَالرَّاحَةَ وَالطَّمَأْنِينَةَ، وَيُحِبُّونَ وُلَاةَ أُمُورِهِمْ، وَيُحِبُّهُمْ وُلَاةُ أُمُورِهِمْ.

‘শাসকদের হুকুম তিন প্রকার :

প্রথম প্রকার : এমন হুকুম যার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ প্রদান করেছেন। যেমন : মসজিদে জামা‘আতের সহিত ছালাত আদায় করার হুকুম, ভালো কাজ সম্পাদনের ও মন্দ কাজ বর্জনের হুকুম ইত্যাদি।

এ প্রকার হুকুম পালন করা ওয়াজিব দু’দিক থেকে। যথা :

প্রথম দিক : এটা মূলত ওয়াজিব। দ্বিতীয় দিক : শাসকবর্গও এটার হুকুম করেছেন।

দ্বিতীয় প্রকার : আল্লাহ্র অবাধ্যতায় শাসকদের হুকুম। তাদের এ প্রকার হুকুম পালন করা আমাদের জন্য বৈধ নয়- যাই হোক না কেন। উদাহরণস্বরূপ, তারা যদি আমাদেরকে হুকুম করে, ‘তোমরা জামা‘আতে ছালাত পড়ো না, তোমরা তোমাদের দাড়ি কামিয়ে ফেল, টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান কর, মুসলিমদের উপর যুলুম কর অর্থাৎ তাদের সম্পদ লুট কর এবং তাদের মারধর কর ইত্যাদি, তাহলে এ হুকুম মান্য করা যাবে না এবং এক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা আমাদের উপর হারাম। তবে আমাদের কর্তব্য, তাদেরকে উপদেশ প্রদান করা এবং তাদেরকে বলা যে, আল্লাহকে আপনারা ভয় করুন, এ জাতীয় হুকুম জারী করা আপনাদের জন্য বৈধ নয়, আল্লাহ্র বান্দাদে অবাধ্যতার হুকুম দেওয়া আপনাদের জন্য হালাল নয়।

তৃতীয় প্রকার : শাসকদের এমন হুকুম, যে বিষয়ে আল্লাহ ও তার রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সরাসরি কোন আদেশও নেই, নিষেধও নেই। তাদের এ জাতীয় হুকুম পালন করা আমাদের উপর ওয়াজিব। যেমন : শাসক কর্তৃক প্রণীত নীতিমালা বা আইন-ক্বানূন, যা শরী‘আত বিরোধী নয়। অতএব, এসব নীতিমালা বা আইন-ক্বানূনের ক্ষেত্রে শাসকদের আনুগত্য করা আমাদের উপর ওয়াজিব। জনগণ যদি সরকারের এ প্রকার হুকুম পালন করে, তাহলে তারা শীঘ্রই নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, প্রশান্তি, আত্মতৃপ্তি লাভ করতে পারবে। তারা শাসকদেরকে ভালোবাসবে এবং শাসকরাও তাদেরকে ভালোবাসবে’।[6]

সরকার আল্লাহ্ অবাধ্যতার আদেশ দিলে তার আনুগত্যের বিধান :

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যদি শাসক আল্লাহ্র অবাধ্যতার হুকুম করে, তাহলে তার আনুগত্য করা হারাম। এখানে একটি প্রশ্ন জাগতে পারে। তা হল, শাসক আল্লাহ্র অবাধ্যতার হুকুম দিলে কি সামগ্রিকভাবে তার আনুগত্য হারাম, নাকি কেবল আল্লাহ্র অবাধ্যতাপূর্ণ হুকমটি মান্য করা হারাম?

এ প্রশ্নের জবাবে জমহূর (অধিকাংশ) ইমামগণ ও আহলেহাদীছগণ বলেছেন, আল্লাহ্র অবাধ্যতার বিষয়ে যে হুকুম তিনি প্রদান করেছেন, কেবলমাত্র তার সেই হুকমটিতে তার আনুগত্য বর্জন করতে হবে। সামগ্রিকভাবে তার আনুগত্য বর্জন বৈধ নয়। তারা আরো বলেছেন যে, এক্ষেত্রে শাসককে উপদেশ দিতে হবে এবং তাকে আল্লাহ্র কঠিন শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করতে হবে।[7] আল্লামা ছান‘আনী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন:

وَقَوْلُهُ: (مَا لَمْ يَأْمُرْ بِمَعْصِيَةِ اللهِ) يَحْتَمِلُ أَنَّ مُرَادَهُ أَنَّهُ لَا طَاعَةَ لَهُ إِذَا وَقَعَ مِنْهُ ذَلِكَ وَلَوْ أَمَرَ بِطَاعَةٍ لِأَنَّ أَمْرَهُ بِالمَعْصِيَةِ أَسْقَطَ وُجُوبَ طَاعَتِهِ، فَيَخْتَصُّ وُجُوبُ الطَّاعَةِ بالعادل، وَيَحْتَمِلُ أَنْ يُرَادَ: فَلَا طَاعَةَ لَهُ فِي ذَلِكَ الأَمْرِ الخَاصِّ الَّذِي هُوَ مَعْصِيَةٌ وَالاِحْتِمَالُ الآخَرُ أَظْهَرُ وَيَدُلُّ لَهُ: لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الخَالِقِ.

‘যখন শাসক আল্লাহ্র অবাধ্যতার আদেশ দিবে, তখন তার আনুগত্য চলবে না’ উক্তিটির দু’টি অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। যথা :

প্রথম সম্ভাবনা : আল্লাহ্র অবাধ্যতার বিষয়ে তার আদেশ যেমন মান্য করা যাবে না, তেমন আল্লাহ্র আনুগত্যের বিষয়েও তার আদেশ পালন করা যাবে না। কারণ আল্লাহ্র অবাধ্যতার আদেশ করে তিনি নিজের আনুগত্যের অধিকার হারিয়েছেন। অতএব, আনুগত্যের অধিকার একমাত্র ন্যায়পরায়ণ শাসকের জন্য।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা : আল্লাহ্র অবাধ্যতার বিষয়ে যে আদেশ তিনি দিয়েছেন, কেবলমাত্র তার সেই আদেশটি মান্য করা যাবে না।

আর সম্ভাবনা দু'’টির মাঝে এই শেষোক্ত সম্ভাবনাটিই বেশী স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য; কারণ নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ্র অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য চলবে না’।[8] অর্থাৎ যে আদেশ-নিষেধে আল্লাহ্র অবাধ্যতা নেই, সেখানে তার আনুগত্য চলবে।

অতএব, শাসক যদি কোন পাপের নির্দেশ দেয়, তাহলে তার সেই নির্দেশটি পালন করা নাজায়েয, তবে সামগ্রিকভাবে তার আনুগত্য বর্জন করা যাবে না।

বিখ্যাত হানাফী মুহাদ্দিছ মোল্লা আলী কারী রাহিমাহুল্লাহ মিরকাতুল মাফাতীহ-এর মাঝে আল-মুজহিরের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন,

سَمْعُ كَلَامِ الْحَاكِمِ وَطَاعَتُهُ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ سَوَاءٌ أَمَرَهُ بِمَا يُوَافِقُ طَبْعَهُ أَوْ لَمْ يُوَافِقْهُ بِشَرْطِ أَنْ لَا يَأْمُرَهُ بِمَعْصِيَةٍ فَإِنْ أَمَرَهُ بِهَا فَلَا تَجُوزُ طَاعَتُهُ وَلَكِنْ لَا يَجُوزُ لَهُ مُحَارَبَةُ الْإِمَامِ.

‘প্রতিটি মুসলিমের উপর ওয়াজিব, শাসকের কথা শ্রবণ করা এবং তা মান্য করা, শাসকের আদেশ তার মন মতো হোক বা না হোক, তবে শর্ত হল শাসকের আদেশ যেন আল্লাহ্র অবাধ্যতায় না হয়। যদি শাসক কোন পাপের তথা আল্লাহ্র অবাধ্যতার আদেশ করে, তাহলে তার আদেশ পালন করা জায়েয নয়। তবে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামাও জায়েয নয়’।[9]

ফাসেক্ব শাসকের আনুগত্যের বিধান :

যদি শাসক আল্লাহ্র অবাধ্যতার হুকুম না দেয় কিন্তু নিজে আল্লাহ্র অবাধ্যতায় লিপ্ত হয় অর্থাৎ এমন কিছু পাপাচারে লিপ্ত হয়, যা কুফরীর পর্যায়ভুক্ত নয়, তাহলে কি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ হবে কিংবা তার আনুগত্য থেকে কি হাত গুটিয়ে নেয়া জায়েয হবে?

এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলব, এ ধরনের শাসক হল ফাসেক্ব শাসক। আর ফাসেক্ব শাসকের ক্ষেত্রে সঠিক ও বিশুদ্ধ মানহাজ হল, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ নয় এবং তার আনুগত্য হতে হাত গুটিয়ে নেয়া জায়েয নয়; বরং ফাসেক্ব শাসকের আনুগত্য করা ওয়াজিব। আর এটা প্রসিদ্ধ ইমামদের ও আহলেহাদীছদের মত।[10] বরং এ বিষয়টিতে আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মাঝে কোন মতভেদ নেই; তারা এ বিষয়ে সকলেই একমত।

আল্লামা ত্বীবী রাহিমাহুল্লাহ তার বিখ্যাত মিশকাতের ভাষ্য গ্রন্থ ‘আল কাশেফ আন হাকায়িকিস সুনান’ গ্রন্থে বলেছেন,

أَجْمَعَ أَهْلُ السُّنَّةِ عَلَى أَنَّ السُّلْطَانَ لَا يَنْعَزِلُ بِالْفِسْقِ لِتَهَيُّجِ الْفِتَنِ فِي عَزْلِهِ وَإِرَاقَةِ الدِّمَاءِ وَتَفْرِيقِ ذَاتِ الْبَيْنِ، فَتَكُونُ الْمَفْسَدَةُ فِي عَزْلِهِ أَكْثَرَ مِنْهَا فِي بَقَائِهِ.

‘আহলুস সুন্নাহর ইজমা‘ হয়েছে যে, রাষ্ট্রপ্রধান বা বা বাদশাহ ফিসক্ব তথা পাপকার্য সংঘটিত করার অপরাধে অপসারিত হবে না; কারণ ফাসেক্ব শাসককে অপসারণ করতে গেলে আরো তীব্র আকার ধারণ করবে, রক্তপাত ঘটবে, মুসলিমদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি হবে। ফলে ফাসেক্ব শাসক (সরকার) ক্ষমতায় থাকলে যে অকল্যাণ হত, তাকে অপসারণ করতে গেলে তার চেয়ে বেশী অকল্যাণ ও বিপর্যয় সৃষ্টি হবে’।[11]

ফাসেক্ব শাসকের আনুগত্য যে ওয়াজিব তার দলীল :

(১) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَلَا مَنْ وَلِيَ عَلَيْهِ وَالٍ فَرَآهُ يَأْتِي شَيْئًا مِنْ مَعْصِيَةِ اللهِ فَلْيَكْرَهْ مَا يَأْتِي مِنْ مَعْصِيَةِ اللهِ وَلَا يَنْزِعَنَّ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ.

‘সাবধান! যার উপরে কোন শাসক অধিষ্ঠিত হয়েছে, সে যদি তার শাসককে কোন পাপকাজ করতে দেখে, তাহলে সে যেন তার শাসকের সংঘটিত পাপকে ঘৃণা করে এবং সে যেন তার শাসকের আনুগত্য হতে হাত গুটিয়ে না নেয়’।[12]

(২) মদীনার কিছু লোক যখন বাদশাহ ইয়াযীদ ইবনে মু‘আবিয়ার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন, তখন মদীনার প্রবীণ ও বিজ্ঞ ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে বিদ্রোহ করতে নিষেধ করেছিলেন, তাদেরকে বিদ্রোহ হতে ফিরে আসতে আহবান করেছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।[13] অথচ কথিত আছে, বাদশাহ ইয়াযীদ ইবনে মু‘আবিয়া মদপান করতেন এবং আরো কিছু নোংরামিতে তিনি জড়িত ছিলেন।[14]

যদিও বিশ্লেষকগণ বলেছেন, এগুলো বাদশাহ ইয়াযীদের সম্পর্কে শী‘আ সম্প্রদায়ের মিথ্যা ও অপপ্রচার। তবে এটা ঠিক যে, তার মাঝে কিছু ফাসেক্বী কর্মকাণ্ড ছিল। আল্লাহ অধিক ভালো জানেন।

যালেম শাসকের আনুগত্যের ব্যাপারে ইসলামের বিধান :

যদি কোন মুসলিম শাসক জনগণের উপর যুলুম-অত্যাচার করে, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করে, সম্পদ লুট করে, জনগণকে অধিকার বঞ্চিত করে, তাহলে তার আনুগত্য থেকে বের হওয়া এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ কি বৈধ নয়, সে বিষয়ে মতভেদ আছে। তবে সঠিক মত হল, কোন মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ নয়, যদিও সে যালেম তথা অত্যাচারী হয়। এ মতটির প্রবক্তা হলেন জমহূর ওলামায়ে কেরাম ও আহলেহাদীছগণ এবং এটাই সালাফী মানহাজ।

ইবনু বাত্ত্বাল রাহিমাহুল্লাহ তার বিখ্যাত ছহীহ বুখারীর ভাষ্য গ্রন্থে আবুবকর ইবনু আত-তায়্যিব রাহিমাহুল্লাহ-এর বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন,

أَجْمَعَتِ الأُمَّةُ أَنَّهُ يُوجِبُ خَلْعَ الإِمَامِ وَسُقُوطَ فَرْضِ طَاعَتِهِ كُفْرُهُ بَعْدَ الإِيمَانِ، وَتَرْكُهُ إِقَامَةَ الصَّلَاةِ وَالدُّعَاءَ إِلَيْهَا، وَاخْتَلَفُوا إِذَا كَانَ فَاسِقًا ظَالِمًا غَاصِبًا لِلأَمْوَالِ؛ يَضْرِبُ الأبشار وَيَتَنَاوَلُ النُّفُوسَ المُحَرَّمَةَ وَيُضِيعُ الحُدُودَ وَيُعَطِّلُ الحُقُوقَ فَقَالَ كَثِيرٌ مِنْ النَّاسِ: يَجِبُ خَلْعُهُ لِذَلِكَ. وَقَالَ الجُمْهُورُ مِنْ الأُمَّةِ وَأَهْلِ الحَدِيثِ: لَا يُخْلَعُ بِهَذِهِ الأُمُورِ، وَلَا يَجِبُ الخُرُوجُ عَلَيْهِ؛ بَلْ يَجِبُ وَعْظُهُ وَتَخْوِيفُهُ وَتَرْكُ طَاعَتِهِ فِيمَا يَدْعُو إِلَيْهُ مِنْ مَعَاصِي اللهِ.

‘মুসলিম উম্মাহর মাঝে ইজমা’ সংঘটিত হয়েছে যে, শাসক যদি ঈমান আনার পর আবার কফুরী করে এবং ছালাত ক্বায়েম না করে ও তার দিকে আহবান না করে, তাহলে তাকে অপসারণ করা ওয়াজিব হয়ে যাবে এবং তাকে আনুগত্য করা আর আবশ্যক থাকবে না।

তবে যদি শাসক ফাসেক্ব ও যালেম হয়, সম্পদ লুটকারী হয়, মানুষদেরকে মারধর করে, নিষিদ্ধ প্রাণ হত্যা করে, শরী‘আত নির্ধারিত দণ্ডবিধি অকার্যকর করে রাখে, জনগণের অধিকার বিনষ্ট করে, তাহলে তার আনুগত্যের বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকের মতে, এগুলোর অপরাধে শাসককে অপসারণ করা ওয়াজিব। অন্যদিকে মুসলিম উম্মাহর জমহূর এবং আহলেহাদীছগণ বলেছেন, এ সকল অপরাধের কারণে শাসককে অপসারণ করা চলবে না এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ওয়াজিব নয়; বরং ওয়াজিব হল, তাকে সদুপদেশ প্রদান করা, আল্লাহ ও পরকালের বিষয়ে তাকে ভীতি প্রদর্শন করা এবং তিনি যে পাপের দিকে আহবান করেন, সে বিষয়ে তার আনুগত্য বর্জন করা’।[15]

ইমাম ত্বাহাবী রাহিমাহুল্লাহ তার আল-আক্বীদাহ আত-ত্বহাবিয়্যাহ গ্রন্থে ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের আকীদা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন,

وَلَا نَرَى الْخُرُوْجَ عَلَى أَئِمَّتِنَا وَوُلَاةِ أُمُورِنَا وَإِنْ جَارُوا وَلَا نَدْعُو عَلَيْهِمْ وَلَا نَنْزِعُ يَدًا مِنْ طَاعَتِهِمْ وَنَرَى طَاعَتَهُمْ مِنْ طَاعَةِ اللهِ عز وجل فَرِيْضَةً مَا لَمْ يَأْمُرُوْا بِمَعْصِيَةٍ.

‘আমরা আমাদের শাসকদের ও দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ মনে করি না, যদি তারা যুলুমও করে। আমরা তাদের জন্য বদদো‘আ করি না, তাদের আনুগত্য থেকে আমরা হাত গুটিয়ে নিই না এবং তাদের আনুগত্য করাকে আমরা ফরয মনে করি যা আল্লাহ্র আনুগত্যেরই অংশ, যে পর্যন্ত না তারা পাপের আদেশ করে’।[16]

যালেম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যে নাজায়েয বরং ভালো কাজে তার আনুগত্য করা যে ওয়াজিব, তার কিছু দলীল আমরা নীচে পেশ করলাম:

(১) হাদীছে এসেছে,

سَأَلَ سَلَمَةُ بْنُ يَزِيْدَ الْجُعْفِيُّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا نَبِيَّ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ قَامَتْ عَلَيْنَا أُمَرَاءُ يَسْأَلُوْنَا حَقَّهُمْ وَيَمْنَعُوْنَا حَقَّنَا فَمَا تَأْمُرُنَا فَأَعْرَضَ عَنْهُ ثُمَّ سَأَلَهُ فَأَعْرَضَ عَنْهُ ثُمَّ سَأَلَهُ فِي الثَّانِيَةِ أَوْ فِي الثَّالِثَةِ فَجَذَبَهُ الْأَشْعَثُ بْنُ قَيْسٍ وَقَالَ اسْمَعُوْا وَأَطِيْعُوْا فَإِنَّمَا عَلَيْهِمْ مَا حُمِّلُوْا وَعَلَيْكُمْ مَاحُمِّلْتُمْ .

‘সালামাহ ইবনে ইয়াযীদ আল-জু‘ফী রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহ্র নবী! আমাকে বলুন, যদি আমাদের উপর এমন শাসকদের আবির্ভাব ঘটে, যারা আমাদের কাছ থেকে নিজেদের অধিকার চেয়ে নেয় অথচ আমাদেরকে আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে আমরা কী করব? প্রশ্ন শুনে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। ছাহাবী পুনরায় প্রশ্ন করলেন। তখন নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা (শাসকের) কথা শোনো এবং মানো। কেননা তাদের উপর যে দায়িত্ব আরোপিত হয়েছে, তা পালন করা তাদের উপর ওয়াজিব এবং তোমাদের উপর যে দায়িত্ব আছে, তা পালন করা তোমাদের উপর ওয়াজিব’।[17]

(২) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

سَتَكُوْنُ أَثَرَةٌ وَأُمُوْرٌ تُنْكِرُونَهَا قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ فَمَا تَأْمُرُنَا قَالَ تُؤَدُّوْنَ الْحَقَّ الَّذِيْ عَلَيْكُمْ وَتَسْأَلُوْنَ اللهَ الَّذِيْ لَكُمْ.

‘আমার পরে অচিরেই দেখা যাবে স্বার্থপরতা ও স্বজনপ্রীতি (অর্থাৎ শাসকরা নিজেদের লোকদেরকে অন্যের উপর অগ্রাধিকার দিবে অথবা নিজেরাই রাষ্ট্রীয় সম্পদ ভোগ দখল করবে) এবং উদ্ভব হবে এমন সব বিষয়ের, যেগুলোকে তোমরা পাবে গর্হিত। ছাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, আমাদের কেউ এ পরিস্থিতিতে পড়লে তার প্রতি আপনার পরামর্শ কী? নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমাদের উপর শাসকদের যে অধিকার রয়েছে, তোমরা সেটা আদায় করবে এবং তোমরা তোমাদের অধিকার আল্লাহ্র কাছে চাইবে’।[18]

(৩) হাদীছে এসেছে,

قَالَ حُذَيْفَةُ بْنُ الْيَمَانِ قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنَّا كُنَّا بِشَرٍّ فَجَاءَ اللهُ بِخَيْرٍ فَنَحْنُ فِيْهِ فَهَلْ مِنْ وَرَاءِ هَذَا الْخَيْرِ شَرٌّ قَالَ نَعَمْ قُلْتُ هَلْ وَرَاءَ ذَلِكَ الشَّرِّ خَيْرٌ قَالَ نَعَمْ قُلْتُ فَهَلْ وَرَاءَ ذَلِكَ الْخَيْرِ شَرٌّ قَالَ نَعَمْ قُلْتُ كَيْفَ قَالَ يَكُوْنُ بَعْدِيْ أَئِمَّةٌ لَا يَهْتَدُوْنَ بِهُدَايَ وَلَا يَسْتَنُّوْنَ بِسُنَّتِيْ وَسَيَقُوْمُ فِيْهِمْ رِجَالٌ قُلُوْبُهُمْ قُلُوْبُ الشَّيَاطِيْنِ فِيْ جُثْمَانِ إِنْسٍ قَالَ قُلْتُ كَيْفَ أَصْنَعُ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنْ أَدْرَكْتُ ذَلِكَ قَالَ تَسْمَعُ وَتُطِيْعُ لِلْأَمِيْرِ وَإِنْ ضُرِبَ ظَهْرُكَ وَأُخِذَ مَالُكَ فَاسْمَعْ وَأَطِعْ .

‘হুযায়ফা ইবনু ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসুল! আমরা ছিলাম অকল্যাণের মাঝে; তারপর আল্লাহ আমাদের জন্য কল্যাণ নিয়ে আসলেন। আমরা এখন কল্যাণে আছি, তবে এ কল্যাণের পরে কি আবার কোন অকল্যাণ হতে পারে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, এ অকল্যাণের পরে কি আবার কোন কল্যাণ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, এ কল্যাণের পরে কি আবার কোন অকল্যাণ আসতে পারে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, সেটা কেমন অকল্যাণ? তিনি বললেন, আমার পরে অনেক শাসক ও নেতার উদ্ভব হবে, যারা আমার হেদায়াতের উপর চলবে না এবং আমার সুন্নাতও তারা অনুসরণ করবে না। তাদের মধ্যে এমন সব লোকেরা নেতৃত্ব দিবে, যাদের অন্তর হবে মানব দেহে শয়তানের অন্তর। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আমরা সে পরিস্থিতির সম্মুখীন হই, তাহলে আমরা কী করব? তিনি বললেন, তুমি শাসককে শুনবে এবং মানবে। যদি তোমার পিঠে মারাও হয় বা তোমার ধন-সস্পদ কেড়েও নেয়া হয়, তবুও তুমি শাসককে শুনবে এবং আনুগত্য করবে’।[19]

উপসংহার :

পরিশেষে, আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে, ইসলাম মুসলিম সরকারের আনুগত্যের বিষয়ে খুব সুন্দর ও সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। আরো প্রমাণিত হল, মানবতার ইহকালীন ও পরকালীন সফলতার সার্বিক ব্যাখ্যা ইসলামে রয়েছে। আমাদের কর্তব্য হল, ইসলামের সঠিক দিকনির্দেশনা গ্রহণ করে তদনুযায়ী বাস্তবসম্মত কাজ করা, তাহলেই আমরা উভয় জগতে সফলতা অর্জন করতে পারব। মনে রাখতে হবে, ইসলাম কেবল জানার নাম নয়; বরং ইসলাম হল জানা এবং মানা। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

-আব্দুর রঊফ বিন আইয়ূব আলী



[1]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৯৫, হাদীছটি ছহীহ।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৪৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৩৯।

[3]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১০৯৫, হাদীছটি ছহীহ।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৪৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৩৯।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৩৫।

[6]. শারহু রিয়াদিছ ছালেহীন, ৩/৬৭২ পৃঃ।

[7]. শারহু ছহীহুল বুখারী লি ইবনে বাত্তাল, ৮/২১৫-২১৬ পৃঃ।

[8]. আত-তানবীর শারহুল জামেঈছ ছাগীর, ৭/১২০ পৃঃ।

[9]. মিরকাতুল মাফাতীহ, ৬/২৩৯২ পৃঃ।

[10]. শারহু ছহীহুল বুখারী লি ইবনে বাত্তাল, ৮/২১৫ পৃঃ।

[11]. শারহুল মিশকাত লিত ত্বীবী, ৮/২৫৬০ পৃঃ।

[12]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৫৫।

[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৫১; ছহীহ বুখারী, হা/৭১১১।

[14]. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮/২৫৮ পৃঃ।

[15]. শারহু ছহীহুল বুখারী লি ইবনে বাত্তাল, ৮/২১৫-২১৬ পৃঃ ।

[16]. আল-আক্বীদা আত-ত্বাহাবিয়্যাহ, পৃঃ ৬৮।

[17]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪৬।

[18]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬০৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪৩।

[19]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৪৭।

Magazine