কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

এআই ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নতুন বছর: ২০২৬ ও আমাদের করণীয়

post title will place here

আধুনিক বিশ্বে এখন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি চ্যাটজিপিটি কিংবা জেমিনির নাম শোনেননি! অথচ দুই-তিন বছর আগেও এই নামগুলো আমাদের কারও অভিধানে ছিল না। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পুরো পৃথিবীকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছে যে, অল্প সময়েই এগুলো আমাদের দৈনন্দিন আলাপের অংশ হয়ে গেছে।

২০২৫ শেষ হয়ে ২০২৬ শুরু হচ্ছে। আজকের যুগে নতুন বছরে যেকোনো ভালো পরিকল্পনার জন্য এআই এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অপরিহার্য। আমাদের জেন-জি প্রজন্ম এতটাই সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে যে, অনেকেই ‘ডিজিটাল জোম্বি’তে পরিণত হয়েছে—নিজস্ব হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সদাসর্বদা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে; নিজেদের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

অন্যদিকে আমাদের দৈনন্দিন অসংখ্য কাজ এখন এআই দ্বারা সম্পাদিত হচ্ছে— ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপের রিপ্লাই, ছবি ও ভিডিও এডিট, এমনকি সফটওয়্যার-ওয়েবসাইটের কোডিং, গবেষণা-রাইটআপ—সবকিছুতেই মানুষ এআই-এর সাহায্য নিচ্ছে। ফলত সামনে এমন এক পৃথিবী আসছে, যেখানে অযোগ্য, কম দক্ষ মানুষদের জন্য কোনো বাস্তব কর্মক্ষেত্র থাকবে না; শুধু তারাই টিকে থাকবে, যারা হাই-স্কিলড, গভীর কাজে অভ্যস্ত এবং অবিরাম শেখার মানসিকতা রাখে।

অনেকে এআই-কে শুধু ‘ফেতনা’ বা ‘শত্রু’ ভেবে দূরে সরিয়ে দিতে চান। কিন্তু ইতিহাস বলছে— রেডিও যখন এসেছে, টিভি যখন এসেছে, পরে মোবাইল, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ডিশ—প্রতিটি নতুন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমরা প্রথমে ভয় পেয়েছি, ‘ফেতনা’ বলেছি; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলোই আমাদের জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। আজ ছাত্র, ব্যবসায়ী, আলেম-মুফতী-মাওলানা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার—প্রায় সবাই মোবাইল, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছেন।

ঠিক তেমনি, আমরা হাজার চাইলেও এআই-এর উত্থান থামাতে পারব না! বরং প্রতিদিনই আমাদের জীবন এআই-এর মধ্যে আরও গভীরে ঢুকে যাবে। তাই একে দূরে ঠেলে দেওয়া হবে চরম অবাস্তবতা; বরং আমাদের শিখতে হবে—কীভাবে এআই-এর যুগে আমরা সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগাব, কীভাবে হাই-স্কিল শিখে ডিপ ওয়ার্ক করে প্রতিযোগিতার এ পৃথিবীতে টিকে থাকব।

সেক্ষেত্রে নতুন বছরে আমরা সবাই মিলে কিছু নীতিমালা অনুসরণ করার চেষ্টা করতে পারি—

(১) জীবনের লক্ষ্য স্পষ্ট করা: লক্ষ্যবিহীন মানুষের জন্য সময় নষ্ট করা সবচেয়ে সহজ কাজ। নিজেকে প্রশ্ন করুন: ‘আমি কেন বেঁচে আছি? আমার জীবনের মিশন কী? আল্লাহর কাছে কী নিয়ে যেতে চাই?’ যার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নেই, তার প্রতিটি দিন হয়ে যায় ‘এলোপাতাড়ি কাটানো’। এআই-এর যুগে টিকে থাকার প্রথম শর্তই হলো—নিজের জীবনের স্পষ্ট লক্ষ্য ঠিক করা।

(২) ভবিষ্যতের রোডম্যাপ আঁকা: আগামী ৩০ বছরে আমি নিজেকে কোথায় দেখতে চাই—এই চিত্রটি আগে মনের ক্যানভাসে আঁকতে হবে, তারপর খাতায় লিখতে হবে। মুসলিম হিসেবে নিজেকে কোথায় দেখতে চাই। বাবা হিসেবে, সন্তান হিসেবে, স্বামী হিসেবে নিজেকে কোথায় দেখতে চাই। পেশাগত জীবনে কী ধরনের স্কিল-এর অধিকারী হতে চাই। পরিবার, দাওয়াহ, সমাজ—এদের জন্য কী রেখে যেতে চাই। এই সবকিছুর একটা লং-টার্ম রোডম্যাপ বানাতে হবে।

(৩)মাস্টারপ্ল্যানকে ছোট ছোট ধাপে ভেঙে ফেলা: ৩০ বছরের মাস্টারপ্ল্যানকে চোখের সামনে আনতে হলে আগে ভাবুন, আগামী ১০ বছরে কী হতে হবে। তারপর সেই ১০ বছরের কাজকে ভাগ করুন ৫ বছরে। তারপর ৫ বছরের কাজকে ভাগ করুন আগামী এক বছরে। এভাবে বড় স্বপ্নকে ধীরে ধীরে বাস্তবসম্মত, করণীয় ধাপে নামিয়ে নিয়ে আসতে হবে।

(৪) এক বছরের প্ল্যান স্পষ্ট হলে—টাইম ম্যানেজমেন্ট ও ডিপ ওয়ার্কে মনোযোগ দেওয়া: যখন আপনার সামনে পুরো বছরের কাজ পরিষ্কার হয়ে যাবে, তখন ফোকাস হওয়া উচিত দুই জিনিসে: টাইম ম্যানেজমেন্ট এবং ডিপ ওয়ার্ক (গভীর মনোযোগের কাজ)।

এআই ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যারা দিনভর শুধু নোটিফিকেশন, চ্যাট, স্ক্রল নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, তারা পিছিয়ে পড়বে; আর যারা একাগ্রতা নিয়ে গভীর চিন্তা ও কঠিন কাজ করবে, তারাই নেতৃত্ব দেবে।

(৫) সময় ব্যবস্থাপনায় পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের শক্তি: টাইম ম্যানেজমেন্ট শেখার ক্ষেত্রে পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতই সর্বোত্তম ফ্রেমওয়ার্ক। বিশেষ করে ফজরের ছালাতের জন্য ঘুম থেকে উঠা এবং ফজরের পরের সময়কে জ্ঞান, লেখা, পরিকল্পনা ও ডিপ ওয়ার্কের জন্য ব্যবহার করা—এগুলো আমাদের দিনকে বদলে দিতে পারে। যে মানুষ ফজরের পরে সময়কে ‘জীবন্ত’ বানাতে পারে, সে তার পুরো দিনের কাজকে এক ধাপ উপরে তুলে নিতে পারে।

(৬) ডিভাইস ডিটক্স ও ডিপ ওয়ার্কের সময় নির্ধারণ: আমাদের প্রতিদিন একটি বাধ্যতামূলক সময় রাখতে হবে, যেখানে: (১) মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাব—সব ডিভাইস থেকে দূরে থাকব। (২) কেবল গভীর মনোযোগের কাজ করব— পড়াশোনা, বড় কোনো সমস্যা সমাধান, পরিকল্পনা, গবেষণা, ছালাত, দু‘আ-তাদাব্বুর ইত্যাদি।

ডিপ ওয়ার্কের জন্য দৈনিক যত বেশি সময় বের করতে পারব, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে আমরা তত বেশি মূল্যবান হয়ে উঠব। এর জন্য ফজরের পরবর্তী সময় দুনিয়া-আখেরাত—দুই দিক থেকেই সেরা সময়।

(৭) আধুনিক যুগের ‘অক্ষরজ্ঞান’ কম্পিউটার ও এআই-এর অক্ষরজ্ঞান: আজকের পৃথিবীতে শুধুই পড়তে-লিখতে পারা অক্ষরজ্ঞান নয়; কম্পিউটার ও এআই-এর বেসিক বুঝাও এক ধরনের অক্ষরজ্ঞান। তাই— এআই–কে ভয় না পেয়ে, এটাকে ভালোভাবে শেখা এবং সঠিক কাজে প্রয়োগ করা জরুরী। অন্যথা আমরা যুগের দৃষ্টিতে অশিক্ষিত হিসেবেই গণ্য হবো—চাই আমরা ডিগ্রি যতই নিই না কেন।

(৮) প্রাইভেসিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া: আজকের বিশ্বে আমাদের ডেটাই হলো বাজারে বিক্রয়যোগ্য পণ্য। সকল প্ল্যাটফর্ম আমাদের তথ্য-আচরণ বিশ্লেষণ করে ইনকাম করে। ফলে এমন অবস্থা হয়েছে যে, ‘মানুষের নিজের চেয়ে তার মোবাইল, তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, চ্যাটজিপিটি তাকে বেশি চিনে’। এটা মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তাই— (১) প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া ব্যক্তিগত কোনো কিছুই সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার না করা। (২) বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের ছবি-ভিডিও একদম না দেওয়া, কেননা বদনজর সত্য। (৩) চ্যাটজিপিটি বা অন্য এআই টুল দিয়ে কাজ করতে গিয়ে নিজেদের অতি সেন্সিটিভ পার্সোনাল ডেটা, সিকিউরিটি-সংক্রান্ত তথ্য কখনো শেয়ার না করা।

(৯) শিশু-কিশোরদের জন্য ডিভাইসের ব্যাপারে কঠোর নীতি: ছোট বাচ্চাদের কোনো অজুহাতেই ব্যক্তিগত ডিভাইস দেওয়া ঠিক না। যতটা সম্ভব ১৮ বছরের আগে শিশু–কিশোরদের জন্য ব্যক্তিগত স্মার্টফোন, ট্যাব, ব্যক্তিগত আনলিমিটেড ইন্টারনেট—এসবকে হারাম-পর্যায়ের সতর্কতা নিয়ে দেখা দরকার। অন্যথা আমরা মানুষ নয়, ‘জোম্বি প্রজন্ম’ তৈরি করব—যারা চিন্তা করবে অ্যালগরিদম দিয়ে, সিদ্ধান্ত নেবে ট্রেন্ড দিয়ে আর জীবন কাটাবে স্ক্রল-ওয়াচ-স্ক্রলের ঘোরে এক দাসের মতো।

(১০) নতুন বছর মানে খুশি নয়, বরং আত্মসমালোচনার সময়: নতুন বছর মানেই সবসময় পার্টি— এটা একটি সেক্যুলার বস্তুবাদী ধারণা। বাস্তবতা হলো নতুন একটি বছর শুরু মানে আমাদের জীবন থেকে একটি বছরের বিদায়; আমরা মৃত্যুর আরও এক বছর কাছে চলে এলাম। তাই থার্টি ফার্স্ট নাইটের নামে সব ধরনের হারাম, বেহায়াপনা ও গাফেলতি থেকে দূরে থাকা জরুরী। বরং বুদ্ধিমানের কাজ হলো: ১. গত এক বছরের কাজের হিসাব করা, ২. নিজের গুনাহ, ভুল, অবহেলা নিয়ে আত্মসমালোচনা করা এবং ৩. আগামী এক বছরের জন্য স্পষ্ট পরিকল্পনা ও দুনিয়াবী ও দ্বীনী লক্ষ্যের রোডম্যাপ তৈরি করা।

শেষ কথা, এআই ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও মৃত্যু ও আখেরাতের সত্য বদলায় না। আজকের আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জন্য এত বেশি বিনোদনের রাস্তা খুলে দিয়েছে যে, আমরা মৃত্যুর কথা স্মরণ করার সুযোগই পাই না। শয়তান এ সব চাকচিক্য ও বিনোদনের মাধ্যমে আমাদের সেই নিশ্চিত বাস্তবতা—মৃত্যু ও আখেরাত—থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু সত্য হচ্ছে— মৃত্যু আমাদের একমাত্র নিশ্চিত গন্তব্য। তাই নতুন বছরে শুধু দুনিয়ার রোডম্যাপ নয়, আখেরাতের রোডম্যাপও বানাতে হবে: আমি কীভাবে আল্লাহকে রাযী করব, কীভাবে গুনাহ থেকে তওবা করব, কীভাবে জান্নাতের পথে আমার জীবনকে সাজাব ইত্যাদি। আমরা আল্লাহর কাছে দুআ করি— ‘হে আল্লাহ! এআই ও সোশ্যাল মিডিয়ার এই নতুন যুগে আমাদের ঈমান, বিবেক ও নিয়ন্ত্রণশক্তিকে মযবূত করে দাও। আমাদের সময়, প্রতিভা ও প্রযুক্তিকে তোমার আনুগত্যের পথে লাগানোর তাওফীক্ব দাও। আমাদের দুনিয়ার রোডম্যাপকে আখেরাতের রোডম্যাপের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে দাও। আমাদের, আমাদের সন্তানদের এবং আমাদের প্রজন্মকে হেদায়াত ও নিরাপত্তা দান করো- আমীন!

-আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক

 ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; 

এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।

Magazine