আমি বাংলা কিংবা বাঙালি সংস্কৃতির গবেষক নই। নিজ দেশ বা সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনও নই। কিন্তু ইদানীং যেভাবে ও যে আঙ্গিকে বাংলা নববর্ষ পালিত হচ্ছে, তাতে কিছু বিষয়ের হিসাব আমি এখনো মিলাতে পারিনি। আপনারা হয়তো বলতে পারবেন–
১. বাঙালি সংস্কৃতির ছাত্র-গবেষক সবাই দাবি করেন যে, আমাদের সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরনো। কিন্তু-
ক. ১৩৭২ বঙ্গাব্দে (১৯৬৫ খ্রি.) ছায়ানট সর্বপ্রথম ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’- এ গানের মাধ্যমে নতুনরূপে বর্ষবরণ শুরু করে।
খ. সর্বপ্রথম আনন্দ শোভাযাত্রার প্রবর্তন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে। পরে ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হিসেবে নামকরণ করা হয়।
গ. ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে সর্বপ্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
মন্তব্য: তাহলে কি ধরে নেওয়া যায়, বর্ষবরণের এই নতুন রূপ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালি সংস্কৃতি নয়, অন্তত হাজার বছরের সংস্কৃতি তো নয়ই। নয়তো আমাদের সংস্কৃতিই হাজার বছরের পুরনো নয় অথবা আমরাই শুধু বাঙালি, পশ্চিমবঙ্গের লোকজন বাঙালি নয়।
২. বর্ষবরণের অনুষঙ্গ হিসেবে এখন প্রচলিত হচ্ছে পান্তা-ইলিশ আর বৈশাখী পোশাক।
মন্তব্য: আসলেই কি পান্তা-ইলিশ আমাদের সংস্কৃতি? বিশ-ত্রিশ বছর আগেও ইলিশ স্থানীয় বাজারে দেখা যেত কালেভদ্রে [১৯৭২ সাল পর্যন্ত ইলিশ আহরণ প্রধানত পদ্মা, মেঘনা, করতোয়া, রূপসা, শিবসা, পায়রা ইত্যাদি নদীর উজানেই সীমাবদ্ধ ছিল (বাংলাপিডিয়া)]।
তাহলে ইলিশ সারা বাংলাদেশের সংস্কৃতি হয় কীভাবে? কেন পান্তা আর আলুভর্তা, মরিচভর্তা কিংবা অন্য কিছু নয়? আরো একটা বিষয় স্মর্তব্য যে, কমবেশি জানুয়ারি থেকে এপ্রিল হচ্ছে জাটকার সময়, দেশের আইনে যা ধরা নিষেধ। তাই বর্ষবরণে এই অনুষঙ্গ কতটুকু বাস্তবসম্মত?
এবার আসি পোশাকে। পুরুষের বেলায় পাঞ্জাবি-পায়জামা, আর নারীদের লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। অবশ্য উৎসব-পার্বণে পোশাক-পরিচ্ছদে নারীদের আগ্রহ বেশি। বাংলাদেশের কোথায় লাল পেড়ে সাদা শাড়ি প্রচলিত আমি জানি না, অন্তত আমি আমার এই জীবনে দেখিনি। শুধু বৈশাখ এলেই বর্ষবরণের নামে এটা পরা হয়, অথচ বিশ বছর আগেও এটা ছিল না।
৩. মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত হচ্ছে নানা মূর্তি, প্রতিকৃতি। যেমন- পাপেট, ঘোড়া, হাতি (১৯৮৯); বিশালকায় হাতি, বাঘের প্রতিকৃতির কারুকর্ম (১৯৯১); বিরাট আকারের কুমির (১৯৯২); বাঘ, হাতি, ময়ূর, ঘোড়া (১৯৯৩) ইত্যাদি। তাছাড়া আরও দেখা যায় কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশখচিত প্ল্যাকার্ডসহ রং-বেরঙের পোশাকে বিচিত্র সাজসজ্জা আর সাথে বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য।
মন্তব্য: এর কোনটা বাংলাদেশের সাথে জড়িত? যদি একান্তই আমাদের দেশকে তুলে ধরতে হয়, তাহলে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, নিদেনপক্ষে মহিষ, ভেড়া ইত্যাদি কেন নয়? তাছাড়া দৈত্য-দানব, রাক্ষস ইত্যাদি কীরূপ বিজ্ঞানসম্মত চেতনা? এদের নিয়ে কীভাবে আনন্দ প্রকাশ করা যায় কিংবা মঙ্গল আহ্বান করা যায়? আমার তা বোধগম্য নয়।
পরিশেষে, বর্ষবরণের বিরোধিতা হুজুরগণ করবেন-ই তাতে আর বলার কী আছে? ইসলাম কী বলেছে তা আর এখানে নাই-বা বললাম। আসলে বলার কিছু নেইও, কেননা মূর্তি নিয়ে মিছিল, অশ্লীলতা আর পর্দাহীনতার বিধানে কোনো দ্বিমত কোনো আলেম-উলামা কোনোকালে করেননি।
কিন্তু যদি আসলেই আমরা বাঙালি সংস্কৃতিকে ভালোবাসি, তাহলেও চিন্তার বিষয় হলো আমরা যা করছি তা কি আমাদের সংস্কৃতি? এগুলো কি আমাদের কালচারকে প্রতিনিধিত্ব করে? নাকি গত দুই-তিন দশকে কতিপয় মুষ্টিমেয় সুশীলদের চাপিয়ে দেওয়া কিছু অনুষ্ঠানকে আমরা পালন করে নতুন করে বাঙালি সাজছি?
একটু নিজেকে প্রশ্ন করি, ত্রিশ বছর আগেও কি এ দেশে এমনটা ছিল? নাকি আরও অতীতে ছিল? আমার জানামতে, মেলা, নৌকাবাইচ, কুস্তি, যাত্রাপালা, হালখাতা ইত্যাদি ছিল নতুন বর্ষের অনুষঙ্গ। আজ হঠাৎ করে কীভাবে ও কেন আমাদের সংস্কৃতি পরিবর্তিত হলো? তাও শুধু ঢাকায়, তাহলে কি বলব, শুধু ঢাকাতেই বাঙালিদের বাস?
আমরা জনগণ, কিছুই জানি না। কিন্তু এটা জানি যে, বাঙালিদের হুজুগের ভালো সদ্ব্যবহারই হচ্ছে এসব কাজে। ত্রিশ বছরে যদি আমাদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পরিবর্তন হতে পারে, তাহলে আমরা আশাবাদী যে, সামনের ত্রিশ বছরে হয়তো আমরা সত্যিকারের ভালো কোনো অনুষ্ঠানের প্রবর্তন করতে পারব। যাতে কল্যাণ হবে ধনী-গরীব, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার। মুসলিমরাও সেদিন নিশ্চয়ই বিরোধিতা করবেন না। আমরা চাইলেই তা করতে পারি।
মুস্তফা মনজুর
সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
