কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

‘বই, বই এবং বই’

আমার কচি হাতের ত্রুটি সংবলিত এই লেখা যখন প্রকাশিত হবে, ততদিনে জানার, দেখার, শিখার এবং অনুধাবন করার অমর একুশে বইমেলা গত হয়েছে প্রায় এক মাস। কিন্তু যারা এই সাহিত্য রস গলধঃকরণ করার জন্য প্রতি বছর এর আঙ্গিনায় ছুটে যায়, যাদের পদচারণায় এর গজানো ঘাসগুলো দেবে যায়, তাদের কাছে এই গ্রন্থমেলার স্মৃতির বাক্সগুলো তাজাই রয়ে যায়; মুছে যায় না।

কিন্তু যারা বইপোকা বা গ্রন্থকীট, তারা নতুন রস গ্রহণ করতে, কচকচে মলাট উল্টাতে, জ্ঞান গিলতে, পাতায় পাতায় ছড়ানো নতুন ঘ্রাণ শুকতে বছরের এই এগারোটা মাস চাতক পাখির মত অপেক্ষায় থাকে এই গ্রন্থমেলার। তাদের কাছে সারা বছরের সবচেয়ে সুন্দর সময় হল বইমেলা। যদিও আমাদের দেশে বই পড়ার হার নিতান্তই কম। আগে নাকি একজন অপরজনকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, বার্ষিকী বা বিশেষ কোন আয়োজনে উপহার দিত বই। কিন্তু এখন এমন অনেকে আছেন, যাদেরকে বই উপহার দিলে নাক শিটকায় এই ভেবে যে, বাজারে এত এত জিনিস থাকতে বই! তাই মানুষের এই গা হেলানো অনাগ্রহের প্রেরণা জোগাতে, শুকনো গাছের গোড়ায় পানি ঢেলে তাজা করতে, একটু মনের খোরাক জোগাতে, চিন্তা আর চেতনার পাতা দুলানো মৃদু বাতাস বইয়ে দিতে, ভালোবাসা ও ভালো লাগার মেলা বন্ধন নিয়ে প্রতি বছর হাযির হয় একুশে বইমেলা। বইমেলায় বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকাশনা সংস্থা এবং বিক্রেতা কেন্দ্রগুলো নানা ধরনের বইয়ের ঝাঁপি নিয়ে হাযির হন। যাতে থাকে নানান ধরনের স্বাদ।

অনেক দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ এসে হাযির হন এই জ্ঞানের হাটে, জানার হাটে, দেখতে, কিনতে এবং অভিজ্ঞতার ঝুলি বোঝায় করতে, যেখানে বই প্রেমিকরা মহা আনন্দে নিজেদের সপে দেন বইয়ের মাঝে। জীবনের চরম ব্যস্ততাকে ছাপিয়ে, দুঃখ আর কষ্টকে মাড়িয়ে জীবনের যাতনা থেকে বের হতে, সুখের মাঝে আরেকটু সুখের নীড় আঁকতেই যেন ভালো লাগে বই আর বইয়ের মিলন মেলায়। জ্ঞানের বিসত্মৃতির জন্য বই দিয়েই হয় জ্ঞানের সকল শাখাতে অবাধ বিচরণ। কিন্তু তা শুধু সীমানার পাঠ্যপুস্তক দিয়ে হয় না। জীবিকার জন্য অবশ্য পাঠ্যপুস্তক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রীও প্রয়োজন। নিজের জানার জন্য, সফলতার জন্য, নিজেকে বিকাশের জন্য এত জ্ঞান ভাণ্ডার দ্বারা নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন বাইরের বই। কখনো কখনো একটি সুন্দর বই মানুষের অন্তরে সুন্দর পরিবর্তনের মৃদু ঢেও তোলে।

শুধু বই নিয়ে মনীষীদের উক্তির শেষ নেই। কিন্তু মনীষীদের মনীষী যিনি, মেঘ দিয়ে আকাশ সমৃদ্ধকারী যিনি, আমার এবং আপনার সৃষ্টিকারী যিনি, তার বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর প্রতি নাযিলকৃত প্রথম বাক্যই ছিল ‘পড়’। এখানে শুধু পড়তে বলা হয়েছে অল্প পড়েন আর বেশী পড়েন; পড়েন, শুধু পড়েন। লিও টলস্টয়ের বিখ্যাত উক্তি- জীবনে মাত্র তিনটি জিনিসের প্রয়োজন বই, বই এবং বই। চার্লস ল্যাম্বের উক্তি- বই পড়তে যে ভালোবাসে, তার শত্রু কম। বইকে সুন্দরের প্রতীকরূপে উল্লেখ করে সিডনি স্মিথ বলেন, গৃহের কোন আসবাবপত্র-ই সুন্দর নয় বইয়ের মত। প্রমথ চৌধুরী বলেন, বই কিনে কেউ কখনো দেউলিয়া হয় না। অর্থাৎ যত পারো বই কিনো। বই তোমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।

ইবসেন বলেন, যার বাড়ীতে একটি লাইব্রেরী আছে, মানসিক ঐশ্বর্যের দিক দিয়ে সে অনেক বড়। আর লাইব্রেরী থাকার অর্থই হচ্ছে বই থাকা। পুরো বাড়ীতে অন্তত একটি আলমারি সাজানো বই দিয়ে। থালা-বাসন দিয়ে তো আলমারি সাজানো আছেই। এখন একটি আলমারি সাজানো বই দিয়ে। আপনাকে পড়ার জন্য সাজাতে বলছি না; শুধু সৌন্দর্যের জন্য সাজাতে বলছি। তাহলে যারা আপনার বাড়ীতে আসবে, তাদের মধ্যে কেউ তো চাইবে পড়ার জন্য। কেউ চাইলে বই দিতে কুণ্ঠিত হবেন না। বরং আগ্রহের সাথে দিবেন। বন্ধু-বান্ধব অথবা বিশেষ কোন মানুষকে কিছু দিতে চাইলে অন্য কিছু দেওয়ার পরিবর্তে দু’টি বই দেন। আমি বলছি না যে, অন্যকিছু দিবেন না। এজন্য বলছি যে, আপনি দিয়েছেন ভেবে তো সে পড়বে। কারণ যাকে একবার বই পড়ার নেশা জেঁকে বসবে, সত্যিই যদি সে বইপোকা হয়ে যায়, তাহলে তাকে আর কেউ বাধা দিতে পারবে না। কেউ বই চাইলে পড়তে দেওয়া, নিজে থেকে দেওয়া, উপহার হিসাবে দেওয়া, পড়ার প্রতি উৎসাহিত করা, বইকে ভালোবাসা, নিজের টাকা দিয়ে অন্যকে বই কিনে দেওয়া, পায়ে হেঁটে মানুষের বাড়ী বাড়ী গিয়ে বই পড়ার আন্দোলন শুরু করা, এসবকিছুর জন্য যদি আমি একজন মানুষের নাম উল্লেখ না করি, তাহলে যারা তাকে চেনেন তারা হয়তো আমার এই লেখাকে কিছুটা অসম্পূর্ণ বলবেন। তিনি হলেন, রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামের আলোর ফেরিওয়ালা পলান সরকার (জন্ম: ৯ সেপ্টেম্বর ১৯২১, মৃত্যু: ১ মার্চ ২০১৯)। যদিও মৃত্যুর পরই তার সম্পর্কে জানতে পারি। কারণ মৃত্যুর পর পত্র-পত্রিকায় সরব হয়ে উঠেছিল তার বিষয়টি।

পলান সরকার, তিনি তার সারা জীবন বইয়ের পিছনে ছুটেছেন, বইকে ভালোবেসেছেন, একাই বাড়ী বাড়ী গিয়ে অন্যকে পড়তে দিয়েছেন। আপনিও বই কিনেন, অন্যকে পড়তে দেন। আর এই বই কিনার উত্তম সময় হচ্ছে বইমেলা। শুধু যে ঢাকায় বই মেলা হয়, এমনটা তো নয়; প্রায় অনেক জেলাতেই হয়। খোঁজ রাখেন যে, কখন আপনার বিভাগে বই মেলা হবে। সেখানে যান, একটি বই কিনতে চেষ্টা করেন। যদি তাও না পারেন, তাহলে শুধু ঘ্রাণ শুঁকে আসেন। হয়তো এই ঘ্রাণ শুঁকা থেকেই কিনার আগ্রহ জাগবে। তবে বাঙ্গালিরা এখন আর এতোটা নিঃস্ব নয় যে, একটা বই কিনতে পারবে না। আর যদি কিনতেও বখিলতা করেন, তাহলে চেয়ে নেন। তাও একটা বই হাতে নেন। দশ পৃষ্ঠা পড়েন, তাও পড়েন।

প্রতি বছর বই মেলা হয় দেখার, শেখার, অভিজ্ঞতার জন্য, উৎসাহ, আগ্রহ ও পড়ার জন্য। কিন্তু বাঙ্গালিদের অর্থাৎ আমাদের বই পড়ার আগ্রহ অনেক কম। তাই অমুক বই এতো লাখ বিক্রি হয়েছে, এমন খবর আমরা সাধারণত শুনি না। অথচ পশ্চিমাদের এমন খবর দিয়ে আমাদের পত্রিকার পাতাগুলো রঙ্গীন হয়ে ওঠে। ওবামা, ক্লিনটন বই পড়েন এবং লেখেন, বিশ্বের বর্তমানে দ্বিতীয় ধনী বিলগেটস শুধু মাইক্রোসফট নিয়েই থাকেন না; তাকে বলা হয়ে বইপোকা। বছরে তিনি ৫০টি বই পড়ে থাকেন। প্রতি বছরই তিনি তার দৃষ্টিতে ‘সেরা ১০টি বই’ পড়ার জন্য সবাইকে উৎসাহিত করেন। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ প্রতি দুই সপ্তাহে ১টি বই পড়েন। সাড়া জাগানো টপ তারকা মাইকেল জ্যাকসনও প্রচুর বই পড়তেন। প্রায় ১০ হাযার বইয়ের একটি লাইব্রেরী ছিল তার। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক ধনী ওয়ারেন বাফেট প্রতিদিন ৬০০ থেকে ১০০০ পৃষ্ঠা পড়েন। কিন্তু যদি বিত্তশালী বাঙ্গালীদের বাড়ী দেখা হয়, তাহলে হয়তো পুরো বাড়ীর বই জমা করে একটা আলমারি পূর্ণ হবে কিনা সন্দেহ আছে।

প্রায় সব মানুষই বাড়ী-ঘর সাজায় থালা-বাসন, কাপড়-চোপড়, লোহা-লক্কড় দিয়ে। কিন্তু একবার এসবের পরিবর্তে বাড়ী না, শুধু একটা ঘর সাজাতে বলছি বই দিয়ে। অর্থ-সম্পদ তো আছে, তাহলে একটা ঘর সাজাতে নিশ্চয় কোন অসুবিধা নেই। আপনাকে পড়তে বলছি না; শুধু সাজাতে বলছি স্রেফ সৌন্দর্যের জন্য। আপনি না পড়েন, কিন্তু যারা বই পড়ে তাদের কাছে আপনার বাড়ী হবে সবচেয়ে সুন্দর বাড়ী।

বই এর সাথে নিবিড় সান্নিধ্য গড়ে তুলতে হবে। অবসরের সঙ্গী হবে বই। যানবহনে থাকলে সঙ্গী হবে বই। কোথাও গেলে পড়ার সুযোগ পাবেন কিনা সেটা পরে, সাথে একটা বই রাখেন। পড়েন অথবা না পড়েন সাথে রাখতে নিশ্চয় ভয় বা আপত্তি নেই। বিভিন্ন বইয়ে পড়েছি, কেউ যদি একটু বেশী পড়ে তাহলে তার বন্ধুরা নাকি তাকে ‘আতেল’ বলে ক্ষেপায়। পঞ্চম শ্রেণী কী ৬ষ্ঠ শ্রেণীর বইয়ে পড়েছিলাম মনে নেই, সুফিয়া কামালের একটা কবিতা ‘পাছে লোকে কিছু বলে’; অতএব পড়েন। ভয়ের কিছু নেই। সমালোচনা একটু হবেই। আর আলোচনা-সমালোচনা ছাড়া কখনো মানুষ হয় না।

বাঙ্গালিরা কম পড়ে এটাই সত্য। একবার ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম আসার পথে এক সাদা চামড়ার মেয়েকে দেখেছিলাম, যে গন্তব্য পৌঁছা পর্যন্ত সবটা সময় বইয়ে মুখ গুজে ছিল। সত্যি আমি অনেক অবাক হয়েছিলাম! আরো অবাক হয়েছি এটা ভেবে, বাঙ্গালিরা গল্প, ঘুম আর মোবাইল চালানো ছাড়া আর কিছু জানে না।

একজন লেখক স্বপণ দেখেন তার লেখার অনেক পাঠক হবে, যারা তার বই কিনে পড়বে। অন্তত একজন লেখকের এই স্বপ্ন পূরণ করার জন্য হলেও বই পড়েন। আমি আমার এই রচনায় শুধু এই একটা কথাই বলতে চেয়েছি যে, গ্রন্থমেলায় যান, বই দেখেন, কিনেন এবং অন্যকে পড়তে উৎসাহিত করেন। আমরা কি পারি না, দিনে নয়, সপ্তাহে নয়, মাসে অন্তত দু’টি বই পড়তে? আমরা কি পারি না, কাউকে দু’টি বই উপহার দিতে?

সবশেষে একটা কথা বলা যরূরী মনে করছি, তা হল, সব বই কিন্তু পড়া যাবে না। যেসব বই একজন মুসলিমকে ইসলাম থেকে দূরে সরায়, নাস্তিকতার পথ দেখায়, পরকালবিমুখ করে, ইসলামের অভ্যন্তরে সন্দেহ ও বিভ্রাট সৃষ্টি করে, পাপের পথে পরিচালিত করে, সেসব বই থেকে যোজন যোজন দূরে থাকতে হবে। ইহকাল ও পরকালে কল্যাণ বয়ে আনে শুধুমাত্র এমন বই পড়তে হবে।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে বেশী বেশী বই পড়ে আলোকিত হবার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

Magazine