কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

পণ্যে ভেজাল: বিপন্ন মানবতা

اَلْحَمْدُ لِلهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

পণ্যে ভেজাল আমাদের দেশে এখন ওপেনসিক্রেট। দুনিয়াজুড়ে যখন খাদ্যপণ্য বিশুদ্ধ করার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চলছে, তখন আমাদের দেশে খাদ্যকে বিষে পরিণত করার প্রতিযোগিতা চলছে! খাদ্যপানীয়, নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র সবকিছুতেই ভেজাল ও রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রণের সমারোহ। ভেজালমুক্ত জিনিস এখন রীতিমত দুর্লভ; নিরাপদ খাদ্য খুবই দুষ্প্রাপ্য। খাদ্যপানীয়র প্রতিটি পদই আজ ভেজালে ছড়াছড়ি; নানা রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা বিষাক্ত। চাল, ডাল, লবণ, তেল থেকে শুরু করে ডিম, দুধ, পানি পর্যন্ত ভেজাল ও নকলে ভরপুর। চাল ও ডিমেরও নকল বেরিয়েছে। দুধের নামে বিক্রি হচ্ছে রাসায়নিক পদার্থের তরল মিশ্রণ। নকল বাঁধাকপিও নাকি বাজারে বিক্রি হয়! এদিকে নিত্য ব্যবহার্য অন্যান্য জিনিসপত্রে ভেজাল তো খুবই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ভেজাল ও বিষমুক্ত খাঁটি পণ্যপ্রাপ্তির চিন্তা করাই যেন বর্তমান আকাশকুসুম চিন্তা। নিরাপদ খাদ্যপণ্য আদৌ আছে কিনা, তা এখন সবার হৃদয়ের প্রশ্ন। ইউরিয়া, ফরমালিন, বিষাক্ত রঙ, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, গ্যাস জাতীয় ইথাইলিন, হরমোন জাতীয় ইথরিল, সুপারফিক্স হরমোন, রাইপেন, ইথোপেন, কপার সালফেট ইত্যাদির মাধ্যমে খাদ্যপণ্যকে বিষাক্ত করা হচ্ছে। একশ্রেণীর অসৎ ব্যবসীয় এসব মারাত্মক অপরাধের সাথে জড়িত, যাদের যে কোন কিছুর বিনিময়ে শুধুই চাই টাকা। মানুষের জীবনের কোন মূল্য তাদের কাছে নেই। সুস্থ বিবেক, নীতি, নৈতিকতা, মনুষ্যত্ববোধ বলতে যেন আজ কিছুই অবশিষ্ট নেই।

এসব নকল, ভেজাল ও বিষাক্ত পণ্য ব্যবহার করে মানুষ নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রাদুর্ভাব ঘটছে ক্যানসার, ডায়াবেটিসের মত বিভিন্ন মরণব্যাধি ও দূরারোগ্য রোগের। এসব বিষাক্ত খাদ্য ও পানীয় শরীরের সর্বাঙ্গের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। লিভার, কিডনি, ফুসফুস, গলবিল, হৃৎপিণ্ড, অস্থিমজ্জা ইত্যাদি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দৈহিক বিকলাঙ্গতা সৃষ্টি হচ্ছে। গড়ে উঠছে একটি অসুস্থ জাতি। ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে অসংখ্য বনু আদম। এক হিসাব মতে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ, কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ। এছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা দেশে প্রায় ১৫ লাখ। আর এক পরিসংখ্যানে প্রকাশ, দেশে ৮০-এর দশকে যেখানে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০ লাখ, সেখানে বর্তমান ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা ৮০ থেকে ৯০ লাখ, বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশ মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত এবং ১০ থেকে ১২ লাখ লোক কিডনি রোগে আক্রান্ত।

ইসলামের দৃষ্টিতে ফাঁকিবাজি, জালিয়াতি, ধোঁকা ও প্রতারণা সম্পূর্ণ হারাম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’ (মুসলিম, হা/১০১)। ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয়ে প্রতারণাকেও ইসলাম বিভিন্নভাবে নিষিদ্ধ করেছে; হাদীছগ্রন্থগুলোতে এ সম্পর্কিত হাদীছের অভাব নেই (দ্র: বুখারী, হা/২১৫০; মুসলিম, হা/১০২ ইত্যাদি)। কারো ক্ষতি করাও ইসলামে মারাত্মক অন্যায়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘অন্যের ক্ষতি করা চলবে না। প্রতিশোধমূলক পরস্পরকে ক্ষতিগ্রস্ত করাও যাবে না’ (আহমাদ, হা/২৮৬৫; ইবনু মাজাহ, হা/২৩৪০, ‘ছহীহ’)। ধোঁকা, প্রতারণা, ক্ষতি সাধন ইত্যাদি বান্দার সাথে সম্পর্কিত পাপ, যা খোদ আল্লাহও ক্ষমা করেন না। দ্বীন, জীবন, মাল, সম্মান ও মস্তিষ্ক- ইসলাম এই পাঁচটি যরূরী ও মৌলিক বিষয় (اَلضَّرُوْرِيَّاتُ الْخَمْسُ) হিফাযতের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। বরং ইসলামের সব বিধিবিধান মূলত এই পাঁচটি যরূরী বিষয়কে সংরক্ষণের জন্যই। এসব যরূরী বিষয়ের মধ্যে জীবনের হিফাযত অন্যতম। ইসলামে যেমন নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হারাম (আল-বাক্বারাহ, ২/১৯৫; আন-নিসা, ৪/২৯), তেমনি অন্যায়ভাবে অন্যের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলাও হারাম (আল-আন‘আম, ৬/১৫১)। ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা সমস্ত মানুষকে হত্যা করার শামিল (আল-মায়েদাহ, ৫/৩২)। জীবন রক্ষার তাগিদে ইসলাম অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেছে (আল-বাক্বারাহ, ২/১৭৮)

সম্মানিত পাঠক! ব্যবসায়ীর মুখোশধারী এসব দুর্বৃত্ত একবারে বিষ খাইয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মানুষকে হত্যা করছে না, তবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিচ্ছে। এসব অপরাধ দমনে শুধু আইন করে আর মাঝে মাঝে ভেজাল বিরোধী অভিযান চালিয়ে ফল আসবে না। বরং এর পাশাপাশি (ক) জনগণের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি ও আল্লাহভীতি সৃষ্টি করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি নাগরিকের জন্য অন্তত দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ধর্মীয় অনুভূতি সৃষ্টির জন্য অন্যান্য উদ্যোগও হাতে নেয়া যেতে পারে। (খ) তাদের মধ্যে পরকালে জবাবদিহিতার আক্বীদা তৈরি করতে হবে। (গ) পার্থিক ধনসম্পদের অস্থায়ীত্ব, মূলহীনতা ও অসারতা জনগণকে বুঝাবার পদক্ষেপ নিতে হবে। (ঘ) অন্যের প্রতি যুলমের ভয়াবহতা সম্পর্কে সবাইকে সজাগ করতে হবে। (ঙ) খামার, হাট-বাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও নযরদারিতে রাখতে হবে। (চ) দুর্নীতির মূল উৎস বন্ধ করতে হবে। এসব অপকর্মের সাথে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন আইন করে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে এদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। (ছ) উন্নত প্যাকেজিং পস্নান্ট হাতে নিতে হবে, যাতে কিছুদিন ফলমূল সংরক্ষণ করা যায়। (জ) খাদ্যদ্রব্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার বিজ্ঞানসম্মত উপায় আবিষ্কার করতে হবে। (ঝ) খাদ্যপানীয়তে যেসব রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো হচ্ছে, সেগুলো আমদানি, সংরক্ষণ, মওজুদকরণ, বিতরণ, ব্যবহার ও উন্মুক্ত বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। (ঞ) গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে এবং ভেজাল ও রাসায়নিক বিষযুক্ত পণ্য সনাক্তকরণ পদ্ধতি সহজলভ্য করতে হবে এবং সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে যাবতীয় দুর্নীতি থেকে রক্ষা করে ইহকালে শান্তি ও পরকালে মুক্তি লাভের তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

Magazine