কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ইরান বনাম আমেরিকা ও ইসরাঈল: উপসাগরীয় সংঘাত ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

post title will place here

اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

ইরান বনাম আমেরিকা বা ইরান বনাম ইসরাঈলের দীর্ঘদিনের হুমকি-ধমকি, উত্তেজনা ও সন্দেহ-অবিশ্বাসের পরিবেশ পেরিয়ে বাস্তবেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। একসময় ইরাক আক্রমণের সময় যে ইরান আমেরিকার সহযোগী ছিল, আজ সেই ইরানই আমেরিকার অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ। আমেরিকা এই অপারেশনের নাম দিয়েছে অপারেশন এপিক থিউরি। আর পাল্টা অপারেশন হিসেবে ইরান তার অপারেশনের নাম দিয়েছে অপারেশন ট্রুথ প্রমিজ ৪।

সরাসরি আক্রমণের মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার নজির আধুনিক ইতিহাসে খুবই বিরল। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রচলিত যুদ্ধনীতির বাইরে গিয়ে সরাসরি আক্রমণের মাধ্যমে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিভাগের প্রায় ৪০ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। এর জবাবে ইরান ইসরাঈলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। যদিও এখন পর্যন্ত উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি, তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা ভবিষ্যতে আরব–ইরান সংঘাতে রূপ নিতে পারে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এমন পরিস্থিতিই হয়তো আমেরিকার কৌশলগত লক্ষ্য।

যুদ্ধের শুরু থেকেই আমেরিকার একটি বড় লক্ষ্য হিসেবে আলোচিত হচ্ছে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং নিজেদের অনুকূল কোনো নেতৃত্বকে ক্ষমতায় আনা। এই উদ্দেশ্যে প্রথমেই সর্বোচ্চ নেতাকে টার্গেট করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে যেভাবে রাষ্ট্রপ্রধানকে গ্রেফতারের পর রাষ্ট্রব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, ইরানেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি। এর প্রধান কারণ হলো—ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট।

ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • এখানে সুপ্রিম লিডার রয়েছে, যিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশালী ব্যক্তি।
  • একই সঙ্গে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টও রয়েছে।
  • প্রচলিত নিয়মিত সেনাবাহিনী আছে।
  • পাশাপাশি রয়েছে শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC)

ইরানের সংসদ কোনো আইন পাস করলেই তা কার্যকর হয় না। সেই আইন অনুমোদনের জন্য গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সম্মতি প্রয়োজন হয়। আবার নির্বাচনে কে প্রার্থী হতে পারবে, সেই যোগ্যতা যাচাইয়ের পূর্ণ ক্ষমতাও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের হাতে। ফলে জনগণ ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করলেও কে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে তা নির্ধারণের একচ্ছত্র ক্ষমতা এই কাউন্সিলের। গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ১২ জন সদস্যের মধ্যে:

  • ৬ জনকে সরাসরি নিয়োগ দেন সুপ্রিম লিডার।
  • বাকি ৬ জনকে নিয়োগ দেন বিচার বিভাগ।

কখনো যদি সংসদ ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, তখন সেটি নিষ্পত্তি করে এক্সপেডিয়েন্সি বা মাসলাহাত কাউন্সিল। এই কাউন্সিলে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত থাকেন:

  • দেশের প্রেসিডেন্ট
  • প্রধান বিচারপতি
  • সামরিক শীর্ষ নেতৃত্ব
  • সাবেক প্রেসিডেন্ট
  • এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

অন্যদিকে, সুপ্রিম লিডার কে হবেন তা নির্ধারণের দায়িত্বে রয়েছে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস। এই পরিষদের সদস্যরা আবার প্রতি আট বছর পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। ফলে ইরানের ব্যবস্থায় কিছু ক্ষমতা সরাসরি জনগণের হাতে থাকলেও, তার মূল নিয়ন্ত্রণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে সুপ্রিম লিডারের প্রভাবাধীন অবস্থায় থাকে। এই কারণেই ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোতে কোনো একজন ব্যক্তির মৃত্যু বা অপসারণের মাধ্যমে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন ঘটানো সহজ নয়। এই যুদ্ধে আমেরিকার সর্বনিম্ন চাওয়া হচ্ছে সম্বল ইরানের আকাশ থেকে বোম্বিং করে ইরানের বিভিন্ন মিসাইল ও পারমাণবিক ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করে ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করা। এই চাওয়াতে হয়তো আমেরিকা অনেকটাই সফল হতে পারে। অন্যদিকে ইরানের মূল প্রতিরোধ হচ্ছে স্বল্পমূল্যের ড্রোন হামলা চালিয়ে উপসাগরীয়দেশগুলো ও ইসরাঈলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করা। আকাশ প্রতিরক্ষা যত দুর্বল হবে ততই নির্দিষ্ট লক্ষ্যে মিসাইল আঘাত হানতে সক্ষম হবে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, বিকল্প কৌশল হিসেবে ইরানের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধ উসকে দেওয়ার পরিকল্পনাও থাকতে পারে। কুর্দি, সুন্নি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে সশস্ত্র বিদ্রোহে উৎসাহিত করার মাধ্যমে দেশটিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরান–ইসরাঈল যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা পুরো বিশ্বের জন্য ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। কিন্তু ইরান–ইসরাঈল যুদ্ধ তার চেয়েও বড় অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিশ্বের বড় অংশের তেল ও জ্বালানি এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ২০২৫ সালে ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ১১০ বিলিয়ন ঘন মিটারের বেশি এল এন জি এই পথ দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। গত ৮০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মত এই রুট বন্ধ হয়ে গেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে:

  • জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে
  • অর্থনীতিতে চাপ বাড়তে পারে
  • রেমিট্যান্স প্রবাহ ব্যাহত হতে পারে

কারণ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেকাংশে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল, আর সেই রেমিট্যান্সের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করবে। উপসাগরীয় অঞ্চলে লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। সেখানে সামরিক হামলা হলে বাংলাদেশিদের হতাহত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে। ইতোমধ্যেই বাহরাইন, আমিরাত ও সঊদী আরবে কয়েকজন বাংলাদেশি নিহত ও আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

কিছু মার্কিন সামরিক সদস্য অভিযোগ করেছেন যে, তাদেরকে এই যুদ্ধকে বাইবেলে বর্ণিত Armageddon বা শেষ যুগের যুদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সেই যুদ্ধ সংঘটিত হলে যিশু খ্রিষ্ট (ঈসা আলাইহিস সালাম) পুনরায় পৃথিবীতে আগমন করবেন। ইসলামী বর্ণনাতেও শেষ যুগে কিছু বড় যুদ্ধের কথা উল্লেখ রয়েছে। হাদীছ অনুযায়ী, সিরিয়ায় রোমান খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে এক ভয়ংকর যুদ্ধ সংঘটিত হবে। তবে তার আগে তাদের মধ্যে একটি চুক্তি হবে এবং সেই চুক্তির ভিত্তিতে তারা তৃতীয় কোনো শক্তির বিরুদ্ধে একসাথে যুদ্ধ করবে। পরে চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে তাদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হবে। বর্ণনায় আছে, তখন খ্রিষ্টানরা ৮০টি পতাকা নিয়ে একত্রিত হবে এবং প্রতিটি পতাকার অধীনে থাকবে ১২ হাজার সৈন্য। সেই যুদ্ধে মুসলিমদের এক-তৃতীয়াংশ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাবে, এক-তৃতীয়াংশ শহীদ হবে এবং এক-তৃতীয়াংশ বিজয়ী হবে। এর পরপরই দাজ্জাল প্রকাশ পাবে এবং ঈসা আলাইহিস সালাম অবতরণ করবেন। তবে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয় এই ঘটনাগুলো কখন ঘটবে। তাই প্রতিটি সমসাময়িক যুদ্ধকে এসব ভবিষ্যদ্বাণির সঙ্গে জোর করে মিলিয়ে দেখাও সঠিক নয়। বরং আমাদের উচিত দাজ্জালের ফেতনা ও শেষ যুগের বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দু‘আ করা এবং ঈমানের সাথে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার চেষ্টা করা। (প্র. স.)

Magazine