কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কুরবানীর শিক্ষা

اَلْحَمْدُ لِلهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

আরবী ‘কুরবান’ (قُرْبَانٌ) শব্দটি কুরআন (আলে ইমরান, ৩/১৮৩; আল-মায়েদাহ, ৫/২৭) ও হাদীছে (আহমাদ, হা/১০৪৭৪) পাওয়া যায়, যার ফার্সী ও উর্দূরূপ ‘কুরবানী’ (قُرْبَانِي) বাংলাতেও ব্যবহৃত হয়। কুরআন-হাদীছে শব্দটির কয়েকটি প্রতিশব্দ পাওয়া যায়। যেমন- নাহর (আল-কাওছার, ১০৮/২), নুসুক (আল-আন‘আম, ৬/১৬২), মানসাক (আল-হাজ্জ, ২২/৩৪), উযহিয়্যাহ (মুসলিম, হা/১৯৭৭), যহিয়্যাহ (বুখারী, হা/৫৫৭০)। এর অর্থ নৈকট্য, সান্নিধ্য। কুরবানীর দিন ও তাশরীক্বের দিনসমূহে আল্লাহ্র নৈকট্য হাছিলের লক্ষ্যে উট, গরু ও ছাগল যবেহ করাকে কুরবানী বলে (ফিক্বহুস সুন্নাহ, ৩/৩১৭)। ইসলামে কুরবানী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় কর ও কুরবানী কর’ (আল-কাওছার, ১০৮/২)। অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে, ‘বল, নিশ্চয়ই আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ্র জন্যই’ (আল-আন‘আম, ৬/১৬২)

মানবজাতির পিতা আদম আলাইহিস সালাম-এর দুই পুত্র হাবীল ও কাবীলের প্রদত্ত কুরবানী থেকেই কুরবানীর ইতিহাসের সূচনা হয় (আল-মায়েদাহ, ৫/২৭)। সেই সময় থেকে বিগত সব উম্মতের জন্যই কুরবানীর বিধান চালু ছিল (আল-হাজ্জ, ২২/৩৪)। উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্য কুরবানীর যে নিয়ম ধার্য হয়েছে, তা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কর্তৃক তদীয় পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহ্র নির্দেশে কুরবানী দেওয়ার অনুসরণে চালু হয়েছে (আছ-ছফফাত, /১০২-১০৮)। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর ত্যাগকে মুহাম্মাদী সুন্নাত হিসাবে আল্লাহ আমাদের জন্য রেখে দিয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সে বহু আকাঙ্ক্ষার ফসল কলিজার টুকরা সন্তানপ্রাপ্তির পর নিজ হাতে তাকে যবেহ করার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে ঈমান, ইখলাছ, তাক্বওয়া, ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের যে নযীরবিহীন দৃষ্টান্ত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম উপস্থাপন করেছিলেন, তা থেকে দীক্ষা নিতেই এই কুরবানীর বিধান। এটা মোটেও পশু যবেহ আর গোশত খাওয়ার উৎসব নয়; বরং তাক্বওয়া ও ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর এই কুরবানী। সেজন্যই তো খুলূছিয়াত ও তাক্বওয়ার অবর্তমানে পশুর রক্ত-মাংসের কানাকড়ি মূল্যও আল্লাহ্র কাছে নেই (আল-হাজ্জ, ২২/৩৭)। পিতা-পুত্রের আত্মত্যাগের এই ঘটনার মধ্যে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় দিক রয়েছে। যেমন: (১) ঈমান ও আমলের উপর সন্তান লালনপালন। এমনই একটি পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন ইসমাঈল আলাইহিস সালাম। আর সেকারণেই তিনি পিতার পূর্ণ আনুগত্য করেছিলেন; দেখিয়েছিলেন ইলাহী নির্দেশের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ। (২) জান, মাল, সন্তান সবকিছুর উপরে থাকতে হবে আল্লাহ্র মহববত, আনুগত্য ও তার নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণ। তাই তো পিতা-পুত্র নির্দ্বিধায় আল্লাহ্র আদেশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন (আছ-ছফফাত, ৩৭/১০৩)। (৩) শরী‘আতের অনুকূলে মাতা-পিতার নির্দেশের অকুণ্ঠ অনুসরণ, যা এই ঘটনার উজ্জ্বল একটি দিক। (৪) মাতা-পিতার প্রতি আনুগত্য ও আল্লাহ্র কাছে আত্মসমর্পণের নিশ্চিত পুরস্কার (আছ-ছফফাত, ১০৪-১০৭)। (৫) ভালোকাজের প্রভাব যেমন বেশী, তেমনি তা দীর্ঘস্থায়ীও বটে। সেজন্যই তো পিতা-পুত্র আলাইহিস সালাম-এর আত্মত্যাগের নযীরবিহীন ঘটনাটিকে আল্লাহ চিরস্মরণীয় ও পালনীয় করে রেখেছেন (আছ-ছফফাত, ১০৮)। (৬) সন্তানের সাথে সংলাপ এবং তাদের পরামর্শ ও মতামত গ্রহণ। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তদীয় পুত্রকে যবেহ করার ইলাহী নির্দেশপ্রাপ্তি সত্ত্বেও তার সাথে সংলাপ করেছিলেন ও তার মতামত চেয়েছিলেন, ‘তোমার মত কী?’ (আছ-ছফফাত, ১০২)। (৭) কঠিন থেকে কঠিন বিপদেও ধৈর্যধারণ করা এবং ধৈর্যধারণে মহান আল্লাহ্র সাহায্য প্রার্থনা করা। ১৫ বছর বয়স না পেরুতেই এ দু’টিরই সমাবেশ ঘটেছিল ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর জীবনে (ঐ)। আল্লাহু আকবার! দ্বীনের উপর সন্তান প্রতিপালনের কী অসাধারণ দৃষ্টান্ত! (৮) বড় ঈমানের বড় পরীক্ষা (আছ-ছফফাত, ১০৬)। ইবরাহীম আলাইহিস সালাম৮৬ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন একটি সন্তানের। এই দীর্ঘ অপেক্ষা ও সাধনার পর আল্লাহ তাকে একটা কলিজার টুকরা সন্তান দান করলেন। তাকে কষ্টক্লেশ করে তিনি লালনপালনও করলেন। যখনই কৈশোরে পদার্পণ করলেন, তখনই আসলো তাকে যবেহ করার অগ্নিপরীক্ষা। পরীক্ষা মহাপরীক্ষায় রূপ নেওয়ার আরেকটি দিক হচ্ছে, যাকে পাওয়ার জন্য ৮৬ বছরের অপেক্ষা, তাকে নিজ হাতে যবেহ করার নির্দেশ। (৯) কঠিনের পরে আসে সহজ, বিপদের পরে স্বস্তি, কষ্টের পরে সুখ। কঠিন পরীক্ষায় পিতা-পুত্র উভয়ই সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার বদৌলতে তারা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নগদ পুরস্কার পেয়ে ধন্য হয়েছিলেন। (১০) আল্লাহ্র আনুগত্যে নেমে আসে অবারিত বরকত (আছ-ছফফাত, ১১৩)। (১১) সর্বদা ভালোকাজে বাঁধ সাজে শয়তান। কিন্তু তার কুমন্ত্রণা ও প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে অভীষ্ট লক্ষ্য পৌঁছাই মুমিনের কাজ।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে কুরবানীর বিধান থেকে ঈমান, ইখলাছ, তাক্বওয়া ও ত্যাগের শিক্ষা গ্রহণের তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

Magazine