কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

সঊদী-তুরস্ক-পাকিস্তান সামরিক চুক্তি বনাম ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ

post title will place here

 اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

করোনা মহামারির পর থেকেই বিশ্বরাজনীতিতে বড় বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয়, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন, বাংলাদেশে দীর্ঘ রাজনৈতিক শাসনের অবসান, হামাস-ইসরাঈল যুদ্ধ, ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাত, মিয়ানমার ও সুদানের গৃহযুদ্ধ—সব মিলিয়ে পৃথিবী যেন নতুন এক অস্থির যুগে প্রবেশ করেছে।

এই পরিবর্তনের সর্বশেষ বড় অধ্যায় ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ। আর ঠিক এই যুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থাতেই সঊদী আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন সামরিক সমীকরণ সামনে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল পরিস্থিতি বুঝতে হলে আমাদেরকে একটু সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম একটি দেশ সিরিয়া। যেখানে দীর্ঘদিন বাশার আল-আসাদের স্বৈরাচারী শাসন ছিল। দীর্ঘদিন সেখানে গৃহযুদ্ধ চলমান ছিল। প্রায় ২ লাখ মানুষ এই দীর্ঘ শাসনে গৃহযুদ্ধে অথবা জেলখানায় অথবা ফাঁসিতে মৃত্যুবরণ করেছেন। এই ভয়াবহ শাসনের অন্যতম সহযোগী ছিল ইরান এবং হিযবুল্লাহ। ফলত আহমাদ আশ-শারার নেতৃত্বে যে মুজাহিদরা ইদলিব থেকে দামেশক পর্যন্ত বিজয় করেছেন, তাদেরও দীর্ঘ সময় ইরান ও তার প্রক্সিদের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে।

অন্যদিকে ইয়ামানে এবং সুদানে আমিরাত ও সঊদী আরব মুখোমুখি অবস্থানে। ইয়ামানে আমিরাত-সমর্থিত পক্ষের নাম সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি), যার প্রধান আইদারুস জুবাইদি। আর সুদানে আমিরাত-সমর্থিত মিলিশিয়ার নাম র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফ (RSF), যার প্রধান হেমদেতি। আর সঊদী আরব জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের নেতৃত্বাধীন সুদানের জাতীয় সেনাবাহিনী বা এসএএফ (SAF)-এর পক্ষে রয়েছে।

এদিকে ইসরাঈল হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ভয়ংকর সম্প্রসারণবাদী দেশ। একই সাথে লেবানন, সিরিয়া, গাযা ও ইরান—এই সকল দেশের সাথে ইসরাঈলের সংঘাত চলমান।

সর্বশেষে ইরান নিজেও মধ্যপ্রাচ্যের একটি সম্প্রসারণবাদী চিন্তার অধিকারী রাষ্ট্র। ইরানের শীআ বিপ্লবের পর তারা আরবের বিভিন্ন শীআ-অধ্যুষিত অঞ্চলে একই ধরনের বিপ্লবের জন্য সকল ধরনের চেষ্টা করে। যার ফলশ্রুতিতে ইরাক, ইয়ামান ও লেবাননে অসংখ্য ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র মিলিশিয়া রয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম হিযবুল্লাহ ও হুথি।

সারমর্ম হিসেবে আমরা বলতে পারি, মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি বলয় তৈরি হয়েছে। একটি ইরান ও ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গ্রুপ। দ্বিতীয়টি ইসরাঈল ও আমিরাত। তৃতীয়টি সঊদী আরবসহ সুন্নী-অধ্যুষিত আরব দেশগুলো। চতুর্থত, আমেরিকা সকল পক্ষের সাথেই সমন্বয় ও মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করে থাকে।

এমন এক চতুর্মুখী সংঘর্ষময় পরিবেশে এই ত্রিদেশীয় চুক্তি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। চুক্তিটির অফিসিয়াল নাম হচ্ছে, ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ (Makkah Joint Defence Agreement)। এই চুক্তিটি মূলত ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সঊদী আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’-এর সম্প্রসারিত রূপ। ভবিষ্যতে আরও মুসলিম দেশ এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত অংশ হচ্ছে, এক দেশের ওপর হামলা সকলের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। এই তিন রাষ্ট্রের শক্তি একত্র করলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ power bloc তৈরির সম্ভাবনা দেখা যায়।

সঊদী আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সামর্থ্য, জ্বালানি বাজারে প্রভাব, G20 সদস্যপদ এবং মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রভূমি হিসেবে বিশেষ মর্যাদা। তুরস্ক NATO সদস্য এবং জোটটির দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি; পাশাপাশি ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক প্রযুক্তিতে তার দ্রুত বিকাশ ঘটেছে। পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র এবং তার রয়েছে বিশাল যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী।

অর্থাৎ একদিকে অর্থনৈতিক শক্তি, অন্যদিকে সামরিক প্রযুক্তি এবং তৃতীয়দিকে nuclear deterrence।

এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এই জোট কার বিরুদ্ধে?

অনেকে বলছেন, এটি ইরানকে ঠেকানোর জন্য। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল নয়।

২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সাথে সঊদী আরবের যে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি হয়েছিল, রিয়াদ তা এখনো লঙ্ঘন করেনি। ২০২৬ সালের এই যুদ্ধ চলাকালীন সঊদী আরব তার ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইরানে কোনো আক্রমণাত্মক মিশন বা বোমাবর্ষণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। পাশাপাশি পাকিস্তান যে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, অবশ্যই সেখানে সঊদীর সমর্থন আছে। এমনকি খামেনির জানাযাতেও সঊদী আরব অংশগ্রহণ করেছে। অন্যদিকে সঊদী আরব আবার ইয়ামানের হুথি এবং ইরাকের মিলিশিয়াগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। যার বেশিরভাগ ইরান-সমর্থিত। এটি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, সঊদী আরব ইরানের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু ইরান-সমর্থিত প্রক্সিগুলোকে সমর্থন করে না। আর এমনটাই সিরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান আহমাদ আশ-শারার আল-জাযীরাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ফুটে উঠেছে।

অনেকেই মনে করছেন এটি একটি আমেরিকা-সমর্থিত জোট। ফলত এটির কোনো কার্যকারিতা থাকবে না। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ইসরাঈল যা চাচ্ছে সেটি সে আমেরিকার মাধ্যমেই করাচ্ছে। আমেরিকাতে ইসরাঈলের অর্থনৈতিক ও মিডিয়া শক্তি অত্যন্ত প্রভাবশালী। একইভাবে আরব দেশগুলো যদি তাদের অর্থকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকাকে দিয়ে কিছু করাতে পারে, সেটি কখনোই খারাপ কিছু নয়। যেমন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি একটি সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন, আমেরিকা কুর্দিদের দিয়ে ইরানে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করেছিল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বিষয়টি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বোঝানোর কারণে আর বাস্তবায়িত হয়নি। অতএব সম্পর্ক সবসময় খারাপ নয়। তবে মক্কা চুক্তি যারা ভালোভাবে অনুধাবন করেছেন, তারা বুঝবেন এটি মূলত আমেরিকা ও ইসরাঈলের বলয় থেকে বের হয়েই স্বতন্ত্র একটি চুক্তি। যেমন সাবেক ইসরাঈলি প্রেসিডেন্ট নাফতালি বেনেট এক বক্তব্যে বলেন, Turkey is trying to flip Saudi Arabia against us by forming a Sunni axis with nuclear Pakistan. তথা, তুরস্ক চেষ্টা করছে সঊদী ও নিউক্লিয়ার শক্তিধর পাকিস্তানকে নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে একটি সুন্নী অক্ষ তৈরি করতে। তার এই বক্তব্য প্রমাণ করে এটি আমেরিকা-ইসরাঈল নিয়ন্ত্রিত কোনো জোট নয়। পাশাপাশি আমিরাতের এই জোটে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা কম। কেননা তারা ইসরাঈলের মতোই সম্পূর্ণরূপে ইরান ধ্বংসের মধ্যে সমাধান দেখে। আর সঊদী, তুরস্ক ও পাকিস্তান এই অঞ্চলে বড় কোনো যুদ্ধ চায় না। তারা ইরানের সার্বভৌমত্বকে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু ইরানের প্রক্সি যুদ্ধকে সমর্থন করে না।

তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়, আদৌ এই জোট কোনো কার্যকরী জোট হবে কি না?

কেননা মুসলিমদের জোট করার অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। মুসলিম বিশ্বের OIC আছে, D-8 আছে, GCC আছে, আরব লীগ আছে; সংগঠনের অভাব নেই। কিন্তু তাদের অধিকাংশই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। মক্কা ডিফেন্স প্যাক্টের এই তিন দেশেরও স্বার্থ সবসময় অভিন্ন নয়। সঊদীর সমস্যা হুথিদের সাথে। তুরস্কের সমস্যা কুর্দি ও গ্রিসের সাথে। পাকিস্তানের সমস্যা বেলুচিস্তান ও আফগানিস্তানে। এই সকল লোকাল সমস্যা অন্য দেশ নিজের ঘাড়ে কীভাবে নেবে? অনেকেই এই জোটকে এক ধাপ আগ বাড়িয়ে মুসলিম ন্যাটো বলছেন। অথচ যুদ্ধ শুরু হলে NATO-কে শূন্য থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় না—কে কোথায় সেনা পাঠাবে, কোন বিমানঘাঁটি ব্যবহার হবে বা command structure কী হবে। এগুলো সবই ন্যাটোর পূর্বনির্ধারিত এবং সমন্বিত কাঠামোয় রয়েছে। Joint Defence Council, Permanent Military Headquarters, Integrated Air and Missile Defence, Joint Intelligence Centre, Rapid Reaction Force এবং Defence Industrial Board—এ ধরনের অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ন্যাটো একটি স্বয়ংক্রিয় সচল প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে ন্যাটোর নেতা আমেরিকা। সকল সদস্য দেশ একপ্রকার তার কথা শুনতে বাধ্য। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নও সচল থাকে, কেননা সেখানেও সিদ্ধান্ত মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জবাবদিহিতার সিস্টেম রয়েছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিম বিশ্বের কোনো জোটেই কোনো বাধ্যবাধকতা বা জবাবদিহিতার সিস্টেম নেই। ফলত জোট গঠন হলেও কোনো কার্যকারিতা থাকে না। এই জোটও তখনই কার্যকর হবে, যখন ন্যাটোর মতো সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি সমন্বিত সামরিক সিস্টেম থাকবে। পাশাপাশি সকল রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা ও বাধ্যবাধকতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকবে।

তবে এই চুক্তির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দিক যুদ্ধ নয়; বরং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প তৈরি করা। সঊদীর capital, তুরস্কের defence technology এবং পাকিস্তানের missile ও military expertise একত্র হলে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, air defence system, naval platform, ammunition, satellite ও cyber technology-তে বড় ধরনের যৌথ উৎপাদন সম্ভব। এই জোটের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব অন্তত সামরিক শিল্পে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র হতে পারবে। আমরা চাই, বাংলাদেশও এই চুক্তিতে যুক্ত হয়ে ভারতের বলয় থেকে বের হয়ে আসার রাস্তা খুঁজুক। মহান আল্লাহ এই জোটকে মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য কবুল করুন- আমীন! (প্র. স.)

Magazine