اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
জেরুজালেমে আগুন জ্বলছিল; গত ডিসেম্বর ২০১৭-এর শুরুর দিকে তাতে ফুঁ দিয়ে আগুন আরো প্রখর করা হল। আসলে জেরুজালেমকে ঘিরে যত ধর্মযুদ্ধ ও রক্তপাত হয়, তা পৃথিবীর আর কোন ভূখণ্ড নিয়ে বা ভূখণ্ডে হয় না। একে ঘিরেই খ্রীষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে ১৬টি ক্রুসেড সংঘটিত হয়েছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের একটা বৃহৎ ভূখণ্ড অশান্ত হয়ে রয়েছে বিগত ৭০ বছরের উপর। এ অশান্তির সূচনা হয় ১৯৪০ সালে, যখন চূড়ান্তভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির সরকার ১৯১৭ সালের এক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে- যা ইতিহাসে ‘বেলফোর ডিক্লারেশন’ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে ইয়াহূদীদের জন্য ব্রিটিশদের দখলকৃত ফিলিস্তীনে রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এরপর সব ধরনের বাধা উপেক্ষা করে ১৯৪৮ সালের ১৫ মে ডেভিড বেন গোরিয়ন ইসরাঈলী রাষ্ট্রের ঘোষণা করেন। এ ঘোষণা আসে ১৯৪৭ সালে জাতিসঙ্ঘের ঘোষণাপত্র ১৮১-এর প্রেক্ষাপটে। ঐ ঘোষণাপত্রে ফিলিস্তীনকে বিভক্ত করে দু’টি পৃথক রাষ্ট্র- ইয়াহূদী এবং ফিলিস্তীন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। প্রথমেই এ ইয়াহূদী রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন হ্যারি এস ট্রুম্যান। ইসরাঈলের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা এবং জাতিসঙ্ঘের ‘হঠকারিতা’ মেনে নিতে পারেনি ঐ সময়ের আরব রাষ্ট্রগুলো, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত মুসলিমপ্রধান দেশ ও জনগোষ্ঠী।
ইসরাঈল রাষ্ট্রের রাজধানী জেরুজালেমকেই আধুনিক ইসরাঈলী রাষ্ট্রের রাজধানী করার ইচ্ছা লুকিয়ে রাখেনি ইসরাঈলী কর্তৃপক্ষ। ১৯৮০ সালে ইসরাঈলী সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনে জেরুজালেমের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘জেরুজালেম ল’ পাস করা হয়েছিল। তখন থেকেই ইসরাঈল কর্তৃপক্ষ পুরো জেরুজালেম শুধু দখলই করেনি, বরং এর প্রশাসনকেও শক্তিশালী করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ১৯৯৫ সালে জেরুজালেমে দূতাবাস স্থাপন করার জন্য বিল পাস করেছিল। কিন্তু কোন প্রেসিডেন্টই ঐ বিলের সিদ্ধান্তকে কার্যকর করেনি। অন্য কেউ না করলেও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৬ ডিসেম্বর ২০১৭-তে তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে দূতাবাস সরিয়ে আনার ঘোষণা দেন। তার এই ঘোষণার মাধ্যমে জেরুজালেমকে ইসরাঈলের রাজধানী হিসাবে ঘোষণা দিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প হঠাৎ করে এ ঘোষণা দেননি; বরং এটা ছিল তার নির্বাচনের একটি ম্যানডেট (Mandate)। এ ম্যানডেটের সুবাদেই তিনি ইয়াহূদীদের যে ভোট পেয়েছিলেন, তা ছিল মোট ভোটের প্রায় ২৪ শতাংশ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ ঘোষণায় বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের মধ্যে দারুণ ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের নেতারা এই ঘোষণার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ বৃটেনসহ অন্যান্য দেশও যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘোষণা মেনে নিতে পারেনি। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ফের রক্তক্ষয়ী বিরোধ শুরু হয়েছে।
ইয়াহূদীরা আল্লাহর চির অভিশপ্ত জাতি (আল-ফাতিহা, ১/৭)। মুমিনদের জন্য এদের চেয়ে ঘোর শত্রু আর কেউ নেই (আল-মায়েদাহ, ৫/৮২)। এরা রক্তপিপাসু ও ভূমিদস্যু। এদের লক্ষ্যই হচ্ছে, ক. মুসলিম উম্মাহকে কুফরীতে ফিরিয়ে দেওয়া, খ. তাদেরকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং গ. গোটা মানবগোষ্ঠীর উপর কর্তৃত্ব করা, তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখল করা। কিন্তু তারা উপলব্ধি করেছে যে, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে মুসলিমদের ঈমান ও আক্বীদা। তাই এই ঈমান ও আক্বীদা ধ্বংস করার জন্য তারা তাওরাতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছে, মুসলিমদের ইতিহাস বিকৃত করেছে, নবী-রাসূলগণের জীবনী ও ধর্ম বিকৃতির অপচেষ্টা করেছে। এরা নবীগণের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, তাদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে (আল-বাক্বারাহ, ২/৯১)। এমনকি এরা রবের উপর মিথ্যা রটনা করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। তাদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও দখলদারিত্বের বৈধতা সাব্যস্ত করাই এসব অপবাদের মূল লক্ষ্য। কারণ -তাদের দৃষ্টিতে- খোদ রব যেহেতু রক্তপিপাসু (নাঊযুবিল্লাহ) এবং কিছু কিছু নবী যেহেতু হত্যাকর্ম করেছেন (নাঊযুবিল্লাহ), সেহেতু তাদের এ হত্যাযজ্ঞ কোন ব্যাপারই নয়!
ইয়াহূদীদের ফিলিস্তীন দখল গোটা মুসলিম বিশ্ব দখলের প্রথম পদক্ষেপ। তাদের ধারণা মতে, নবী ইবরাহীম, ইসহাক্ব, ইয়া‘কূব, দাঊদ, সুলায়মান (আঃ) প্রমুখ ইয়াহূদী ছিলেন এবং ওয়ারিশসূত্রে ফিলিস্তীন শুধু নয়; বরং গোটা বিশ্বের তারা উত্তরাধিকারী। কারণ তারা ঐসব নবীর বংশধর এবং তারাই আল্লাহর নির্বাচিত জনগোষ্ঠী!
কিন্তু তাদের এ ধারণা শতভাগ মিথ্যা। তারা না নবী-রাসূলগণের ওয়ারিশ, না মুসলিমদের ওয়ারিশ, না কোন ভূখণ্ডর উত্তরাধিকারী। ফিলিস্তীন বা অন্য কোন দেশ তো দূরের কথা, এমনকি বিশ্বের এক বিঘত জায়গারও উত্তরাধিকারী তারা নয়। কারণ ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক্ব, ইয়া‘কূব, দাঊদ, সুলায়মান, মূসা, ঈসা (আঃ)সহ সকল নবীর ধর্মই ছিল ইসলাম, তাঁরা সবাই ছিলেন মুসলিম এবং তাঁরা সবাই ইসলামের দিকেই দা‘ওয়াত দিয়ে গেছেন। তাঁদের কেউ খ্রীষ্টানও ছিলেন না, ইয়াহূদীও ছিলেন না (দ্রষ্টব্য: আল-বাক্বারাহ, ২/১২৪, ১২৮, ১৩০-১৩৩, ১৪০; আলে ইমরান, ৩/৬৭-৬৮; ইউনুস, ১০/৮৪; আন-নামল, ২৭/২৯-৩১; হূদ, ১১/৪৬)। সুতরাং মুসলিম ব্যতীত অন্য কোন ইয়াহূদ, নাছারা বা আর কোন কাফের-মুশরিক কোন দিক দিয়েই নবীগণের ওয়ারিশ হতে পারে না, যদিও তারা কোন নবীর বংশধর হয়। কারণ নবী-রাসূলগণ ছিলেন মুসলিম আর এরা হচ্ছে কাফের। সেজন্য নবী-রাসূলগণের একমাত্র উত্তরাধিকারী হচ্ছেন মুসলিমরা। কারণ তারাই তাঁদের প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাঁদের আনুগত্য করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষদের মধ্যে যারা ইবরাহীমের অনুসরণ করেছিল, তারা, আর এই নবী এবং যারা এ নবীর প্রতি ঈমান এনেছে, তারা ইবরাহীমের ঘনিষ্টতম’ (আলে ইমরান, ৩/৬৮)। মুসলিমরাই সবদিক দিয়ে নবীগণের একমাত্র উত্তরসূরী। আল্লাহ বলেন, ‘আমি উপদেশের পর কিতাবে লিখে দিয়েছি যে, আমার নেককার বান্দাগণই পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে’ (আল-আম্বিয়া, ২১/১০৫)। তাহলে কিভাবে কোন কাফের কোন নবীর উত্তরাধিকারী দাবী করতে পারে! অনুরূপভাবে কস্মিনকালেও কোন কাফের কোন মুসলিমের উত্তরাধিকারী হতে পারে না (ছহীহ মুসলিম, হা/১৬১৪)।
আদম (আঃ) সর্বপ্রথম বায়তুল মাক্বদেস নির্মাণ করেন। এরপর ইবরাহীম, ইসহাক্ব, ইয়া‘কূব, সুলায়মান (আঃ)সহ আরো কতিপয় নবী এর সংস্কারকর্ম করেন। জেরুজালেম নবী-রাসূলগণের ঐতিহ্যবাহী স্থান। এ স্থানটি সর্বযুগে মুসলিমদের অধিকারে ছিল; শুধুমাত্র কিছুকাল ছাড়া- যখন রক্তপিপাসু ও দুর্বৃত্তরা তা জবর দখল করেছিল। এদের কারো কারো কথা আল্লাহ পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। যেমন- ‘প্রবল শক্তিশালী এক জাতি’, ‘জালূত এবং তার সৈন্যবাহিনী’ (দ্রষ্টব্য: আল-বাক্বারাহ, ২/২৫১; আল-মায়েদাহ, ৫/২২)। অনুরূপভাবে খৃষ্টপূর্ব ৬৪ সালে রুমানরা তা দখল করে নিয়েছিল। এরপর ইউরোপীয় ক্রুশধারীরা ৪৯২ থেকে ৬৯০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত তা জবর দখল করে রেখেছিল। সর্বযুগে যখনই জবরদখলকারীরা সেটা দখল করেছে, তখনই মুসলিমরা তা পুনরুদ্ধার করেছে।
এছাড়া ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে, ঈসা (আঃ)-এর জন্মের ৬ হাযার বছর পূর্বে সর্বপ্রথম আরবের কিন‘আন গোত্র সর্বপ্রথম ফিলিস্তীনে বসবাস করেছিল এবং তাদের নামেই ‘ফিলিস্তীন’ নামকরণ করা হয়েছিল। অথচ ইয়াহূদীরা সেখানে প্রবেশ করেছিল ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রবেশের প্রায় ৬ শ’ বছর পরে। অর্থাৎ ঈসা (আঃ)-এর জন্মের প্রায় ১৪ শ’ বছর পূর্বে তারা সেখানে প্রবেশ করেছিল। তার মানে ইয়াহূদীদের ফিলিস্তীনে প্রবেশের প্রায় ৪ হাযার ৫ শ’ বছর পূর্বে কিন‘আন আরবরা সেখানে প্রবেশ করেছিল।
ইসলামের সাথে জেরুজালেমের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। পবিত্র কুরআনে একে এবং এর আশপাশের অঞ্চলকে ‘বরকতময়’ এবং ‘পবিত্র স্থান’ বলা হয়েছে (বানী ইসরাঈল, ১৭/১; আল-মায়েদাহ, ৫/২১)। নেকীর উদ্দেশ্যে যে মসজিদগুলোতে সফর করা বৈধ, সেগুলোর মধ্যে বায়তুল মাক্বদেস একটি (দ্রষ্টব্য: ছহীহ বুখারী, হা/১১৮৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৯৭)। এ মসজিদে ছালাত আদায়ের রয়েছে বিশেষ ফযীলত (দ্রষ্টব্য: মুস্তাদরাক হাকেম, হা/১৩৯৭, ‘ছহীহ’)। এখানে দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না (দ্রষ্টব্য: মুসনাদে আহমাদ, হা/১৯৬৬৫, ‘ছহীহ’)। বরং দাজ্জালকে এতদ্অঞ্চলে হত্যা করা হবে (দ্রষ্টব্য: ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৩৭)। মে‘রাজ রজনীতে রাসূল (ছাঃ)-কে সর্বপ্রথম এ মসজিদেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল (দ্রষ্টব্য: বানী ইসরাঈল, ১৭/১)। তিনি এখানেই অন্যান্য নবী-রাসূলগণকে পেছনে নিয়ে ছালাত আদায় করেছিলেন (দ্রষ্টব্য: ছহীহ মুসলিম, হা/১৭২)। এটাই ছিল মুসলিমদের প্রথম ক্বিবলা, যেদিকে ফিরে রাসূল (ছাঃ) ১৬ মাস ছালাত আদায় করেছিলেন (দ্রষ্টব্য: ছহীহ বুখারী, হা/৪১; ছহীহ মুসলিম, হা/৫২৫)। সর্বোপরি এটা হচ্ছে অহি নাযিলের স্থান।
উপর্যুক্ত সংক্ষেপ্ত বিশ্লেষণে প্রমাণিত হল যে, বায়তুল মাক্বদেস কেবলমাত্র মুসলিমদের মসজিদ এবং তাদের অধিকার; অন্য কারো নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন চরম ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী, কা-জ্ঞানহীন, অযোগ্য, যালেম শাসক। আমরা তার জেরুজালেমকে ইয়াহূদীদের রাজধানী ঘোষণার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। তার এ ঘোষণা হঠকারী, জঘন্য, বিদ্বেষমূলক, সীমালঙ্ঘন ও খেয়ানতের ঘোষণা। ফলে, ট্রাম্পকে বিশ্ববাসীর নিকট ক্ষমা চাইতে হবে এবং এ ঘোষণা প্রত্যাহার করতে হবে। আমরা তার পদত্যাগ দাবী করছি। মহান আল্লাহ ইয়াহূদ ও তাদের দোসরদের অপবিত্রতা থেকে জেরুজালেমকে পবিত্র করুন। একে আবার মুসলিমদের নিকট ফিরিয়ে দিয়ে তা পুনরায় আবাদ করার ব্যবস্থা করে দিন। আমীন!
