اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
পৃথিবীতে যখনই কোনো ভয়ংকর-ভয়াবহ যুদ্ধ হয়, তখনই মিডিয়াতে দাজ্জাল ও শেষ যামানার যুদ্ধ আলোচিত হয়। অনেকেই এই বিষয়ে বিভিন্ন ভুল ব্যাখ্যাও প্রদান করে থাকে। কেউ মনে করেন দাজ্জাল হচ্ছে আমেরিকা, আবার কেউ মনে করেন দাজ্জাল হচ্ছে এআই (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স)। অন্যদিকে খ্রিষ্টান ও ইয়াহূদী ধর্মেও এন্টিক্রাইস্ট এবং মাসীহার একটি বিশ্বাস বিরাজমান রয়েছে। পৃথিবীর তিনটি ধর্মের মানুষই শেষ যামানায় একজন মাসীহ বা উদ্ধারকারীর অপেক্ষায় আছে। শেষ যামানায় সত্য সত্যই দুইজন মাসীহ আসবে। একজন হবে মিথ্যা মাসীহ; ইয়াহূদীরা সেই মিথ্যা মাসীহ তথা দাজ্জালের অনুসরণ করবে। আর সত্য ও প্রকৃত মাসীহ ঈসা আলাইহিস সালাম-এর অনুসরণ করবে মুসলিমরা এবং কিছু খ্রিষ্টানেরাও মুসলিম হয়ে তার অনুসরণ করবে। আর এই দুইজন মাসীহই কোনো কাল্পনিক বা কৃত্রিম শক্তি নয়; বরং আদম আলাইহিস সালাম-এর সন্তান তথা মানুষ। আদম আলাইহিস সালাম নিজে যেহেতু ৬০ হাত তথা ৪০ মিটার লম্বা ছিলেন, যা প্রায় ১০ তলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচু—সেহেতু তার সন্তান দাজ্জাল বিশাল দেহের হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। অতএব, বিশাল দেহের যুক্তি দিয়ে দাজ্জালকে অস্বীকার করা বোকামি। যেখান স্বয়ং আদি পিতা আদম আলাইহিস সালাম নিজেই বিশাল দেহের অধিকারী, ঠিক তেমনি ঈসা আলাইহিস সালাম-এর আসমান থেকে নেমে আসা অসম্ভব কিছু নয়; যেখানে আদি পিতা আদম আলাইহিস সালাম নিজে আসমান থেকে নেমে এসেছেন। শুধু তাই নয়, আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সশরীরে দুনিয়া থেকে আসমান সফর করে পুনরায় পৃথিবীতে নেমে এসেছেন।
দাজ্জালের ফিতনা হবে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ফিতনা। আদম আলাইহিস সালাম-কে গাছের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করা এবং তার তাতে পতিত হওয়া, কাবীলের আপন ভাই হাবীলকে হত্যা করা, নূহ আলাইহিস সালাম-এর ক্বওমের শিরকে লিপ্ত হওয়া ও লূত আলাইহিস সালাম-এর ক্বওমের যেনা-ব্যভিচারে অভ্যস্ত হওয়া ইত্যাদি সকল ফিতনার চেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে দাজ্জালের ফিতনা। ফেরাউন ও নমরূদের চেয়েও ভয়াবহ হবে দাজ্জাল। কেননা পৃথিবীতে ফেরাউন ও নমরূদের মতো যত বাতিল ইলাহ আছে তারা কেউই তাদের রব হওয়ার প্রমাণ দিতে পারে না। ফলত তাদেরকে বাতিল প্রমাণ করা অতি সহজ। নদীনালা, খাল-বিল, বৃষ্টি ও ফসলাদি কিছুই তাদের আদেশে উৎপাদিত হয় না। ফলত তাদেরকে বাতিল প্রমাণ করত এক আল্লাহর ইবাদত করা কঠিন কিছু নয়। এই সমস্ত বাতিল ইলাহরা নিজেদের রব হওয়ার প্রমাণ দিতে না পারার পরও মানুষ তাদের ইবাদত করছে, তাহলে যেদিন দাজ্জাল রব হওয়ার প্রমাণ দিবে, যেদিন তার আদেশে আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে, ফসলাদি উৎপাদিত হবে, সেদিন মানুষ কীভাবে নিজের ঈমান নিয়ে বাঁচবে। আর এই কারণেই দাজ্জালের ফিতনা ভয়াবহ। দাজ্জাল শুধু ইলাহর দাবি করবে না; তার রব হওয়ার প্রমাণও দিবে।
দাজ্জালের কাছে রব হওয়ার মতো প্রায় সকল ক্ষমতা থাকবে। এমনকি সে মৃতকেও জীবিত করতে পারবে। তার গতি হবে ঝড়ের সময় মেঘমালার গতির ন্যায়। সে ৪০ দিন পৃথিবীতে অবস্থান করবে। যার প্রথম দিন হবে এক বছর, দ্বিতীয় দিন হবে এক মাস এবং তৃতীয় দিন হবে এক সপ্তাহ। বাকী ৩৭ দিন হবে স্বাভাবিক। মহান আল্লাহ চাইলে কোনো কারণ ছাড়াই এমনটি ঘটবে। অথবা দাজ্জালের আগমনে সৌরজগতে এমন বিশাল পরিবর্তন হবে যার ধাক্কা সামাল দিয়ে পৃথিবী ও সূর্যকে স্বাভাবিক হতে প্রথম দিন লাগবে এক বছর, দ্বিতীয় দিন লাগবে এক মাস এবং তৃতীয় দিন লাগবে এক সপ্তাহ। তারপর পরিপূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। দাজ্জালের প্রতি যারা ঈমান আনয়ন করবে, দুনিয়ার ধনসম্পদ ও ঐশ্বর্য মৌমাছির মতো তাদের পিছনে ছুটবে। দাজ্জালকে যারা অস্বীকার করবে, তারা দুর্ভিক্ষে পতিত হবে। তাদের জন্য আকাশের বৃষ্টি ও যমীনের ফসল পরিপূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে। কাঠ চিবিয়ে খাওয়া ছাড়া আর কোনো খাবার থাকবে না। দাজ্জাল পৃথিবীর সকল শহরে প্রবেশ করবে; শুধু মক্কা-মদীনা ব্যতীত। তবে মদীনায় যত মুনাফেক্ব থাকবে তারাও ভূমিকম্পের ভয়ে মদীনা থেকে বের হয়ে দাজ্জালের অনুসারী হয়ে যাবে। দাজ্জালের অনুসারীদের বড় অংশ হবে ইয়াহূদীরা; বিশেষ করে ইরানের ইসফাহান শহরের ইয়াহূদীরা।
দাজ্জালের এই ভয়াবহ ফিতনা থেকে মুসলিমদের বাঁচাতে তাদের উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী হিসেবে ঈসা আলাইহিস সালাম আসবেন। আর তিনিই প্রকৃত মাসীহ। মিথ্যা মাসীহ দাজ্জাল যখন সত্য মাসীহ ঈসাকে দেখবে, তখন সে গলে যেতে থাকবে। আর ঈসা আলাইহিস সালাম তাকে নিজে হাতে হত্যা করবেন। এইভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ ফিতনার পরিসমাপ্তি হবে।
দাজ্জালের এই ভয়াবহ ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য আমাদের ঈমান হতে হবে আছহাবে কাহফ ও আছহাবে উখদূদের মতো। মহান আল্লাহর তাওহীদে অগাধ আস্থা ও পরকালে সীমাহীন বিশ্বাস ছাড়া দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। অবৈধ এক টাকার প্রতিও যদি লোভ থাকে, তাহলে দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। কেননা তখন সকল সম্পদ দাজ্জালের কাছেই থাকবে আর মুমিনরা থাকবে ক্ষুধার্ত ও নিঃস্ব। আছহাবে উখদূদ যেভাবে ঈমান বাঁচাতে আগুনে প্রবেশ করেছিল, আছহাবে কাহফ যেভাবে ঈমান বাঁচাতে দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই ঈমান বাঁচাতে যারা দুনিয়া বিসর্জন দিতে প্রস্তুত তারাই একমাত্র ঈমান ধরে রাখতে পারবে। আর এই জন্যই পরকালে বিশ্বাস মযবূত হতে হবে। জান্নাতে নিজেদের স্থানকে যারা চোখ বন্ধ করলে দেখতে পায়, তাদের কাছে দুনিয়ার আগুন জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম। তাদের কাছে মৃত্যু জান্নাতে যাওয়ার রাস্তা। তাদের কাছে সকল বিপদ ও সমস্যা জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম। তাই জান্নাতের আশায় সকল কিছুই তাদের জন্য সহজ।
সর্বোপরি আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের মৃত্যুই আমাদের ক্বিয়ামত। আমরা যতই ইমাম মাহদী, দাজ্জাল ও ঈসা আলাইহিস সালাম নিয়ে আলোচনা করি না কেন, তখন নতুন কোনো নবীও আসবে না; নতুন কোনো কিতাবও অবতীর্ণ হবে না। বরং আজ যে কুরআন ও হাদীছ আছে সেটির উপরেই তারা আমল করবেন। এই কুরআন ও হাদীছের উপর আমল ও ঈমানের মাধ্যমেই তারা নিজেদের ঈমানকে হেফাযত করবেন। সুতরাং যেহেতু আমাদের মৃত্যুই আমাদের ক্বিয়ামত আর আমাদের কাছে কুরআন ও হাদীছ আছে, তাই আমাদের উচিত নিজের আমলের সংশোধন ও কুরআন-হাদীছ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে ঈমান অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া। (প্র. স.)
