اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
ভারতের রাজনীতিতে গত তিন দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান। একসময় মাত্র দুই আসনে বিজয়ী হওয়া দল বিজেপি আজ ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। গেরুয়া পতাকার এই উত্থান পশ্চিমবঙ্গেও তাদের বিজয়কেতন উড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি প্রায় অপ্রাসঙ্গিক ছিল। অথচ মাত্র এক যুগের ব্যবধানে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বাঙালি অধ্যুষিত আরও দুটি রাজ্য—আসাম ও ত্রিপুরাও এখন বিজেপি-শাসিত। ফলে বাংলাদেশের চারপাশে কার্যত গেরুয়া বলয় তৈরি হয়েছে। এই উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং প্রায় ১০০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক পরিকল্পনা, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক কৌশলের ফল।
বিজেপির এই উত্থানের শুরুটা হয়েছিল Rashtriya Swayamsevak Sangh বা আরএসএসের মাধ্যমে। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন শুরু থেকেই ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ধারণাকে কেন্দ্র করে কাজ করে আসছে। তাদের লক্ষ্য ছিল কেবল নির্বাচন জেতা নয়; বরং সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা, মিডিয়া এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে হিন্দুত্ববাদী আদর্শের অধীনে নিয়ে আসা। বিজেপি মূলত এই সংগঠনেরই রাজনৈতিক শাখা।
প্রথমদিকে তাদের রাজনৈতিক সাফল্য ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু বাবরি মসজিদ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ‘রাম জন্মভূমি আন্দোলন’ বিজেপিকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ১৯৮৪ সালে দুই আসনের দল ১৯৯৬ সালে ভারতের সবচেয়ে বড় দলে পরিণত হয়। একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠন ধৈর্য, সাংগঠনিক শক্তি এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের মাধ্যমে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ আরএসএস ও বিজেপি। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মূল দর্শন ‘হিন্দুত্ব’—যার প্রধান তাত্ত্বিক Vinayak Damodar Savarkar। এই দর্শনে ভারতের জাতীয় পরিচয়কে হিন্দু পরিচয়ের সঙ্গে একীভূত করা হয়। মুসলিমরা সেখানে ‘সমান অংশীদার’ নয়; বরং ‘বহিরাগত’ হিসেবে বিবেচিত। তাদের দৃষ্টিতে মুসলিম মোঘল শাসনামল ছিল হিন্দুদের জন্য ‘দাসত্বের যুগ’। এই রাজনীতির বাস্তব উদাহরণ ইতোমধ্যে দেখা গেছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে। বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি সেই রাম মন্দির উদ্বোধন করা হয়।
কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদাও বাতিল করা হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ছিল ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে। বিজেপি ২০১৯ সালে সেটি বাতিল করে। অথচ এটি ১৯৫১ সাল থেকেই আরএসএসের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ছিল। একই বছরে Citizenship Amendment Act (CAA) পাশ হয়। NRC-এর মাধ্যমে যারা ১৯৫২ সালের পূর্বের ডকুমেন্ট দেখাতে পারবে না, তাদের নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যাবে। আর CAA-এর মাধ্যমে অমুসলিমরা নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ পেলেও মুসলিমরা সেই সুবিধার বাইরে থাকবে এবং তাদের ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে ভারত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। এটি মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানোর বৃহত্তর হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের অংশ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণ, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল, কিংবা NRC-CAA—এসব বিষয় একসময় ভারতের রাজনীতিতে অসম্ভব মনে হতো। অথচ বিজেপি তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী একের পর এক বাস্তবায়ন করেছে। সুতরাং, বিজেপি তাদের অন্যান্য ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নের দিকেও অগ্রসর হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণা। ভারতের নতুন সংসদ ভবনে যে মানচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে, সেখানে আফগানিস্তান থেকে আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বৃহত্তর ভারতের ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে। তাই এটি বাংলাদেশের জন্য কেবল রাজনৈতিক বিষয় নয়; বরং একটি অস্তিত্বগত সংকট। একদিকে বাংলাদেশের অস্তিত্বের সংকট, অন্যদিকে ভবিষ্যতে আসাম বা পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুসলিম বাঙালিদের বাস্তুচ্যুতির সম্ভাবনা তৈরি হলে তা বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি ও অর্থনৈতিক চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজও মুক্তিযুদ্ধের নামে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন একটি শক্তিশালী জাতীয় আদর্শিক ভিত্তি। আর সেটিই হচ্ছে ইসলাম। ১৯৪৭ সালের সেক্যুলার ভারত যেভাবে ধীরে ধীরে কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দিকে অগ্রসর হয়েছে, তেমনি ১৯৪৭ সালে মুসলমানিত্বের নামে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ইসলামভিত্তিক ঐক্য ও মূল্যবোধের দিকে ফিরে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। Top of Form(প্র. স.)
