২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে আবারও উত্তেজনায় কাঁপছে পুরো পৃথিবী। এবারের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে বিশ্বকাপের জ্বর ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। অলিগলি থেকে শুরু করে ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব—সবখানেই এখন বিভিন্ন দলের সমর্থন, পতাকা, জার্সি এবং খেলোয়াড়দের নিয়ে উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আমরা এই বিশ্বকাপের সঙ্গে কতটুকু সম্পৃক্ত হতে পারি? আজ ফিতনার এই যুগে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা উচিত—এই উন্মাদনা কি শুধু খেলাধুলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি ধীরে ধীরে এটি আমাদের ঈমান, চিন্তাধারা ও সংস্কৃতির উপরও প্রভাব ফেলছে?
বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও আমাদের ঈমান-আক্বীদা এখনো পুরোপুরি ইসলামের আলোকে গড়ে ওঠেনি। ফলে পশ্চিমা সংস্কৃতি, বিধর্মীদের জীবনাদর্শ এবং তাদের প্রতীকগুলো আমরা সহজেই গ্রহণ করে নিচ্ছি। আজ বিশ্বকাপের নামে আমরা এমন অনেক কাজ করছি, যা একজন মুমিনের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বিশ্বকাপ: একটি বৈশ্বিক সংস্কৃতি
বর্তমান যুগে ফুটবল শুধু একটি খেলার নাম নয়, এটি এখন এক বিশাল সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি ডলারের ব্যবসা, বিজ্ঞাপন, ফ্যাশন, বিনোদন এবং পশ্চিমা জীবনাদর্শ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
বিশেষ করে এবারের বিশ্বকাপ যেহেতু আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাই পশ্চিমা উদারবাদী সংস্কৃতির প্রচারণা আরও ব্যাপকভাবে সামনে আসাটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্ব প্রকাশ্যে LGBTQ মতবাদ (LGBTQ একটি সংক্ষিপ্ত রূপ, যা বিভিন্ন যৌন অভিমুখিতা ও লিঙ্গ পরিচয় বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে এর অর্থ হলো L=Lesbian, G=Gay, B=Bisexual, T=Transgender ও Q=Queer/Questioning), উন্মুক্ত সম্পর্ক, বেপর্দা সংস্কৃতি এবং ধর্মনিরপেক্ষ জীবনব্যবস্থাকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। বড় বড় ক্রীড়া আয়োজনগুলোও এখন এসব মতাদর্শ প্রচারের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ অনেক ফুটবল ক্লাব, খেলোয়াড় এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রকাশ্যে সমকামিতার প্রতীক ব্যবহার করছে, Rainbow Campaign-এ অংশ নিচ্ছে এবং পশ্চিমা সামাজিক মতাদর্শকে সমর্থন করছে। অথচ অনেক মুসলিমও তাদেরকে আদর্শ মনে করে অজান্তেই এসব প্রচারণাকে সমর্থন করছে।
ইসলাম কী বলে?
কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে সতর্ক করে বলেছেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ‘হে মুমিনগণ! ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানদের তোমরা বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু’ (আল-মায়েদা, ৫/৫১)। অন্য আয়াতে তিনি আরও বলেছেন,لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ ‘মুমিনগণ যেন মুমিনদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে’ (আলে ইমরান, ৩/২৮)।
অর্থাৎ মুসলিমদের কখনোই ইয়াহূদী, খ্রিষ্টান বা অন্য কোনো বিধর্মীর সঙ্গে আন্তরিক হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত নয়, শুধু সামাজিক ও একান্ত প্রয়োজনের ক্ষেত্র ছাড়া। এ বিষয়ে ইসলামে সুস্পষ্ট সীমারেখা ও কঠোর বিধান রয়েছে।
অনেকেই বলেন, খেলা সমর্থন করলেই কি বন্ধুত্ব হয়ে যায়? কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রথমে সমর্থন, তারপর ভালোবাসা, আর ভালোবাসা থেকেই আসে অনুসরণ ও অনুকরণ। এভাবেই ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে হৃদ্যতা তৈরি হয়। আজ আমরা বিভিন্ন দেশের জয়-পরাজয়ে হাসছি-কাঁদছি, খেলোয়াড়দের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঝগড়া বা বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত হচ্ছি। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনেও পরস্পরের সঙ্গে সংঘাত ও বিরোধে জড়িয়ে পড়ছি। এগুলো কি নিছক ছেলেখেলা?
যখন কোনো ব্যক্তির প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার জীবনধারা, পোশাক, আচরণ ও চিন্তাভাবনার প্রতিও আকর্ষণ তৈরি হয়। এ কারণেই আজ আমাদের দেশে মেসি, রোনালদো, নেইমারসহ বিভিন্ন নামিদামি খেলোয়াড়কে ঘিরে ব্যাপক উন্মাদনা দেখা যায়। আর এভাবেই ধীরে ধীরে আমরা পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুসরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি।
অনুকরণ ও অনুসরণের ভয়াবহতা:
ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই দেখা যায়, বিদেশি পতাকায় ছেয়ে যাচ্ছে পুরো শহর। বিধর্মী দেশগুলোর জার্সি পরে মুসলিম ছেলে-মেয়েরা গর্বভরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেকেই কাফের-মুশরিক খেলোয়াড়দের হেয়ারস্টাইল, ফ্যাশন ও জীবনধারার অনুসরণে নিজেদের সাজাচ্ছে। রাত জেগে খেলা দেখতে গিয়ে অবহেলিত হচ্ছে ছালাত ও অন্যান্য ইবাদত। এমনকি খেলাকে কেন্দ্র করে পাড়া-মহল্লায় গালাগালি, ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতার পরিবেশও তৈরি হচ্ছে। অথচ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির অনুকরণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে’।[1] অর্থাৎ কেউ যদি কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর অনুসরণ করে, তাহলে ক্বিয়ামতের দিন তাকে সেই জাতি বা গোষ্ঠীর সঙ্গেই গণ্য করা হবে। এই হাদীছ শুধু পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং চিন্তা-চেতনা, সংস্কৃতি ও আদর্শগত অনুসরণের ব্যাপারেও আমাদের সতর্ক করে।
আজ অনেক মুসলিম বিভিন্ন দলের খেলোয়াড়দের জীবনধারা অনুসরণ করছে। অথচ সেই খেলোয়াড়দের বড় একটি অংশের জীবন হারাম সম্পর্ক, উল্কি, মদ্যপান, বেপর্দা সংস্কৃতি এবং ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে পরিপূর্ণ। একজন মুসলিমের আদর্শ হওয়া উচিত রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ছাহাবায়ে কেরাম এবং নেককার মানুষদের জীবন। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে আজ উম্মাহর বহু তরুণের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে বিধর্মী ফুটবল তারকা ও সেলিব্রিটিরা।
বিশ্বকাপ উন্মাদনায় ঈমানের দুর্বলতা:
বর্তমানে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে এমন অবস্থা তৈরি হয় যে, ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পর্ক নষ্ট হয়, সামাজিক মাধ্যমে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার হয়, মুসলিমরা বিভিন্ন জাতীয়তাবাদে বিভক্ত হয়ে পড়ে, সময় ও অর্থের অপচয় হয়, অনেকেই ছালাত বা ইবাদত থেকে গাফেল হয়ে যায়। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো এসবকে এখন ‘স্বাভাবিক’ মনে করা হয়। অথচ একজন মুমিনের হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত আল্লাহ, তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আখেরাতের চিন্তা। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ ‘মানুষ যার সাথে ভালোবাসা রাখবে, (ক্বিয়ামতের দিন) সে তার সাথেই থাকবে’।[2] তাহলে আমরা একবার চিন্তা করি, আসলে আমরা কাদেরকে ভালোবাসছি?
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা সত্য প্রমাণিত:
হাদীছে এসেছে, আবূ সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,لَتَتَّبِعُنَّ سَنَنَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ حَتَّى لَوْ دَخَلُوا فِى جُحْرِ ضَبٍّ لاَتَّبَعْتُمُوهُمْ ‘তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি পুরোপুরি অনুসরণ করবে প্রতি বিঘতে বিঘতে এবং প্রতি গজে গজে। এমনকি তারা যদি সাপের গর্তেও ঢুকে, তাহলে তোমরাও তাতে ঢুকবে’।[3]
বর্তমানে আধুনিক মুসলিমদের পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ দেখে এই হাদীছের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুসলিমরা আজ ইসলামী পরিচয়ে লজ্জাবোধ করে, কিন্তু বিধর্মীদের পতাকা নিয়ে রাস্তায় মিছিল করতে লজ্জা পায় না। দাড়ি, হিজাব ও সুন্নাহকে ‘ব্যাকডেটেড’ মনে করা হয়; অথচ ফুটবল তারকাদের স্টাইলকে ‘স্মার্টনেস’ মনে করে। আর এভাবেই আমরা বিধর্মীদের অনুসরণ করতে গিয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশিত পথ থেকে দূরে সরে জাহান্নামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। অথচ প্রায় ১৪০০ বছর আগেই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের এ ধরনের অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
মুসলিমদের করণীয় কী?
চারদিকে নানাবিধ ফিতনার এই যুগে আমাদের ঈমান ও আমল রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। তাই আমাদের উচিত নিজেদের ঈমান ও আক্বীদা সংরক্ষণ করা এবং বিধর্মীদের অন্ধ অনুসরণ থেকে দূরে থাকা। কোনোভাবেই খেলাধুলাকে জীবনের মূল উদ্দেশ্যে পরিণত করা উচিত নয়।
শৈশব থেকেই কোমলমতি শিশুদের ইসলামী আদর্শে গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে পরিচালিত করার চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের মূল্যবান সময় ইবাদত, জ্ঞানার্জন ও কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা উচিত।
মনে রাখতে হবে, ইসলাম বৈধ বিনোদনকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেনি। তবে এমন কোনো বিনোদন বৈধ নয়, যা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, হারাম সংস্কৃতির দিকে আকৃষ্ট করে কিংবা ঈমানকে দুর্বল করে ফেলে।
শেষকথা:
আজ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজ যে উন্মাদনায় ডুবে যাচ্ছে, তা নিছক খেলার আবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ধীরে ধীরে আমাদের হৃদয়, চিন্তাধারা, সংস্কৃতি ও ঈমানের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
অতএব, আমাদের উচিত আবেগের পরিবর্তে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে নিজেদের জীবনকে যাচাই করা। কারণ দুনিয়ার সাময়িক উল্লাস নয়, বরং আখেরাতের সফলতাই একজন মুমিনের প্রকৃত লক্ষ্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং ঈমানের উপর অটল থাকার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী
পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম।
[1]. আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৭০।
[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৯।
