ভূমিকা :
‘মি-টু’ (Me too) হল নারীদের একটা বৈশ্বিক আন্দোলনের নাম। কর্পোরেট লেভেলে, মিডিয়া জগতে এরা কার কার কাছে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে, সেসব লিখে ও বলে জোরে-শোরে প্রকাশ করার নামই হল ‘মি-টু’ আন্দোলন। অর্থাৎ ‘মি-টু’ মানে হল, ‘আমিও কোন না কোনভাবে যৌন হেনস্থার শিকার’।
‘মি-টু’ আন্দোলনের উৎপত্তি ও বিস্তৃতি :
১৯৯৭ সালে সমাজকর্মী ও কমিউনিটি আয়োজক তারানা বার্ক প্রথম এ আন্দোলনের ধারণা দেয় এবং একটি প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করে। সেই ধারাবাহিকতায় হলিউড অভিনেত্রী অ্যালিসা মিলানো ইয়াহূদী প্রযোজক হার্ভে ওয়েন স্টেইনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় মি-টু হ্যাশটাগ দিয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। এরপর একে একে মুখ খুলতে থাকেন হলিউডের অনেকে। এরপর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক হোমরা-চোমরার নামে অনেক ঘটনা বের হয়ে আসতে থাকে। ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো, বলিউডের অমিতাভ বচ্চন কিংবা বাংলাদেশের নাট্যকার সেলিম আদ-দ্বীনের নামও বের হয়ে আসে। তারানা বার্ক যখন ১৩ বছরের এক কিশোরীর মুখে তার ওপর যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা শুনেছিলেন, তখনই তার বুকের ভেতর জন্ম নিয়েছিল এই ‘মি-টু’। পরে যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে তার প্রচার আন্দোলনের নাম রাখেন ‘মি-টু’। তবে নিরধিকাল ধরে মেয়েরা পৃথিবীর সর্বত্র যৌন সহিংসতার শিকার হলেও কৃষ্ণাঙ্গ বার্ক-এর ২০০৬ সালে গড়ে তোলা এই আন্দোলনকে বিশিষ্ট শেতাঙ্গ নারীবাদীরা অবশ্য পাত্তা দেননি দীর্ঘদিন। কোন সমর্থনও পায়নি তাদের। শেষ পর্যন্ত গ্লামার ওয়ার্ল্ড হলিউড-এর বিখ্যাত সিনেমা প্রযোজক হার্ভে ওয়েন স্টেইন-এর বিরুদ্ধে সম্প্রতি যৌন নিপীড়নের একাধিক অভিযোগ প্রকাশ্যে উঠে এলে ‘মি-টু’ শব্দ দু’টি ছড়িয়ে পড়ে আলি সামিলানোর হাত ধরে। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে গত অক্টোবর, ২০১৭ সালে মি-টু শব্দ দু’টি সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগ হিসাবে ব্যবহার করলে সঙ্গে সঙ্গে দাবানলের মতো তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সেই থেকে কাজের জায়গায় যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে প্রচার অভিযান হিসাবে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে থেকে কেবলই বিরামহীনভাবে উঠে আসে এই ‘মি-টু আন্দোলন’। https://bit.ly/2ShQpEf এই লিংকে ঢুকলে প্রায় ২৫২ জন পশ্চিমা সেলিব্রেটির নাম পাওয়া যাবে, যারা ‘মি-টু’ আন্দোলনের পর নারী যৌন হয়রানির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশে মি-টু আন্দোলন :
মি-টু আন্দোলন আমেরিকা-ভারত ছাড়িয়ে এখন বাংলাদেশে। আর আন্দোলনের অংশ হিসাবে যারা নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া যৌন নিপীড়নের ঘটনা প্রকাশ করছেন, তারা অন্যদেরও মুখ খোলার আহবান জানিয়েছেন। গত ২২ নভেম্বর, ২০১৮ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাংলাদেশ মি-টু আন্দোলন : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন জাকিয়া সুলতানা মুক্তা, মুশফিকা লাইজু, তাশনুভ আনানসহ অনেকেই।[1]
বাংলাদেশে যখন হ্যাশট্যাগ মি-টু আন্দোলনের ঢেউ এসে লেগেছে, যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছেন নারীরা, তখন একদল পুরুষ অধিকার কর্মী ‘পুরুষ রক্ষা’ আন্দোলনে নেমেছেন।[2] এই আন্দোলনের সূচনা করেছে ‘বাংলাদেশ মেন’স রাইটস ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সংগঠন। এরা মনে করেন, বাংলাদেশের সমাজে পুরুষরাই এখন বেশি বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিদ্যমান আইন-কানুন, বিচার ব্যবস্থা পুরুষদের বিপক্ষে। বাংলাদেশে পুরুষ এখন এতটাই ভালনারেবল যে, তার নামে কোন নারী একটি মামলা দিলেই সেটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই-বাছাই না করেই নারীর পক্ষে রায় দেয়া হচ্ছে। এরকম ক্ষেত্রে পুরুষরা একেবারে অসহায়। অনেক ক্ষেত্রে দেন-মোহরের অংক অনেক বেশি থাকে, বিধায় পুরুষরা চাইলেও বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে পারছে না। ফলে পুরুষরা ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।
মি-টু আন্দোলনের ভবিষ্যৎ :
সাধারণ মেয়েরা মি-টু আন্দোলনের লেজ ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে সমাজ উপকৃত হবে কি না? এ প্রশ্নটা একটু ক্রিটিকাল। তবে এর কয়েকটা উত্তর হতে পারে:
(ক) কোর্টে দেখা যেত নারী নির্যাতন ট্রাইবুনালে সাধারণ মানুষ এমনকি সংশ্লিষ্ট উকিল ছাড়া অন্যদের ঢুকতে দেয়া হত না। অনেক সময় বাদীনীকে বিচারক ভেতরে নিয়ে জবানবন্দি নিয়ে থাকে। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে আমার মনে হয়, নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রচারের একদিকে যেমন পজিটিভ দিক আছে, তেমনি নেগিটিভ দিকও আছে। কেননা, এর মাধ্যমে অনেকের মনের ভেতরে গোপন আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হতে পারে এবং সুযোগ বুঝে কাজে লাগাতে পারে। কারণ, মুভিতে ধর্ষণের ভিডিও ধর্ষণ হ্রাসের পরিবর্তে ধর্ষণ বৃদ্ধি করে বলে বিভিন্ন গবেষণায় বের হয়ে এসেছে। এসব অভিযোগের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে গোপন সেল থাকুক, সেখান থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অপরাধীর বিচার করা হোক। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব উন্মুক্ত আলোচনার পজিটিভ দিক থেকে নেগেটিভ দিকই বেশি।
(খ) পুরুষটা দোষী হলে তো কোন সমস্যা নেই। কিন্তু যদি কোন মহিলা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কোন পুরুষকে ফাঁসিয়ে দেয়, তখন? তখন ঐ পুরুষটাকে এবং তার পরিবারবর্গকে সমাজে নিগৃহীত হতে হবে, এর দায় কে নেবে?
সুধী পাঠক! কিছুদিন আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর আরেকটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার কথা আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। রাজধানীর উপকণ্ঠে সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মীর মুর্তজা আলীর সঙ্গে টেলিফোনে কথোপকথনের ঐ অডিও এখন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফাঁস হওয়া ফোনালাপে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নানা ঘটনা উঠে এসেছে।[3] সেখানে ছাত্রীদের ব্যবহার করে প্রতিপক্ষে নারী নির্যাতন মামলা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
(গ) মি-টুতে সাধারণ মহিলাদের মধ্যে উস্কাচ্ছে নারীবাদীরা। তারা পুরুষের বিরুদ্ধে নারীদের উস্কে দিয়ে ও বিভেদ সৃষ্টি করে নারী-পুরুষের মধ্যে একটা হিংসাত্মক সম্পর্ক তৈরি করছে। এতে করে নারীর বিরুদ্ধে পুরুষ বিষেদগার হচ্ছে। পুরুষের বিরুদ্ধে নারী বিষেদগার হচ্ছে। যেহেতু নারী শারীরিকভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল, তাই এই হিংসার আলটিমেট এফেক্ট পড়বে নারীর উপর অর্থাৎ সমাজে নারী নির্যাতন আরো বেড়ে যাবে। ‘মি-টু’ দিয়ে সমাজে নারী নির্যাতন কমবে- এটা বিশ্বাস করা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। কারণ পাশের দেশের অনুকরণে এই ‘মি-টু আন্দোলন’ শুরু হয়েছে ঠিকই কিন্তু সেই দেশে এই মি-টু আন্দোলনের ফলে যেমন কোন পরিবর্তন আসেনি, তেমনি বাংলাদেশেও এটি সাময়িক তোলপাড়ের মধ্যেই আটকে যাবে।
অতএব, সমাজ থেকে নারী নির্যাতন নির্মূলে মি-টু আন্দোলনের পরিবর্তে পবিত্র ইসলামের নিয়ম-নীতি অনুসরণ করুন, ইসলামী পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করুন, নারী-পুরুষের জন্য পৃথক স্কুল-কলেজ, ভার্সিটি তৈরি করে দিন, পৃথক শপিং সেন্টার করে দিন। কেননা, মহিলাদের কর্মক্ষেত্র পুরুষদের কর্মক্ষেত্র থেকে পৃথক হওয়া ওয়াজিব। কিশোর-তরুণীদের শিক্ষাক্ষেত্র কিশোর-তরুণ থেকে পৃথক হওয়া যরূরী।[4] নারী-পুরুষের যাতায়াতের জন্য আলাদা বাস-ট্রেনের ব্যবস্থা করে দিন। নারী-পুরুষকে সঠিক সময়ে বিয়ে দিন। মিডিয়ায় উলঙ্গপনা বন্ধ করুন। ইসলামী বিচার ব্যবস্থা ক্বায়েম করুন। ইসলামের বিচার ব্যবস্থা হল: অবিবাহিত বালেগ ও বুদ্ধিমান মুসলিম নারী হোক বা পুরুষ যদি যিনা করে, তাহলে তার শাস্তি হল একশটি বেত্রাঘাত (আন-নূর, ২৪/২)। আর বিবাহিত নারী-পুরুষ যিনা করলে তার শাস্তি হল রজম।[5] তাহলে নারী নির্যাতন শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে, ইনশাআল্লাহ। পবিত্র ইসলামে যিনা-ব্যভিচার করা তো দূরের কথা, কাছে যাওয়াও নিষেধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যিনার কাছেও যেও না। কেননা তা অত্যন্ত নির্লজ্জতা ও খুব বেশি খারাপ পথ’ (বনী ইসরাঈল, ৩২)। এ কথা শুনে হয়তো অনেকের মধ্যে নারী স্বাধীনতার স্লোগান দিয়ে চুলকানি তৈরি হতে পারে। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, হলিউড-বলিউডের নারীরা তো কম স্বাধীনতা ভোগ করে না, তাহলে তারা কেন এত নির্যাতিত হচ্ছে? কেন তাদেরকে আজ ‘মি-টু’র আশ্রয় নিতে হচ্ছে? কে দিবে এ প্রশ্নের জবাব?
হে নারী আন্দোলনের নেত্রী! তুমি নারীদের পর্দাকে বীভৎস দৃষ্টিতে দেখছ। বলছো নারীদের পর্দা হচ্ছে দাসত্ব বেড়ি। অথচ পর্দা হচ্ছে নারীদের মুক্তির যামিনদার ও আত্মার তৃপ্তি। আজ তোমরা নারীদেরকে মুক্তি দিতে গিয়ে ঘর, বর ও বস্ত্র সবকিছু থেকে মুক্ত করে ছেড়েছ। আজ নারী ঘর-বর ও বস্ত্র ছেড়ে নগ্ন হয়ে একাই চলছে রাস্তা-ঘাটে। তাইতো নারী নির্যাতন হয়ে গেছে ডাল-ভাত। স্কুল-কলেজ, কর্মক্ষেত্র, অফিস, আদালত এমনকি চলন্ত গাড়িতেও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারী। এক নির্যাতন থেকে বাঁচাতে গিয়ে নারীদের মহা নির্যানের যাঁতাকলে ফেলে দিয়েছে। এ যেন কেঁচো মারতে গিয়ে গোখরা সাপের বিষাক্ত ছোবল।[6]
‘মি-টু’র অপব্যবহার :
‘মি-টু’ প্লাটফর্মের ফায়দা তুলে গুটিকয়েক নারী হীন স্বার্থ চরিতার্থ করছে।[7] ভারতের কেন্দ্রীয় জাহাজ ও অর্থমন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী পন রাধাকৃষ্ণ বলেছেন, ‘মি-টু আন্দোলন’ শুরু করেছেন বিকৃতমনারা। দেশ জুড়ে ‘মি-টু আন্দোলন’ ছড়িয়ে পড়া নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ মন্তব্য করেছেন।[8]
রাঘব বোয়ালদের শেষ উপলব্ধি :
মি-টু নামক লজ্জা থেকে নিজের ইমেজ বাঁচাতে আমেরিকার বানিজ্যিক রাজধানী ওয়াল স্ট্রীটের রাঘব বোয়ালেরা অনুসরণ করছে বেশ কিছু নতুন ফর্মূলা। সেই ফর্মূলাগুলো নিয়ে বিশাল কলেবরের সংবাদ ছাপিয়েছে মার্কিন পত্রিকা Bloomberg, সেই ফর্মূলাগুলো হল:
(i) Never being alone with a female in a closed room.
(ii) Not having private dinners with a female, especially when there is fear of flitration.
(iii) Not sitting next to females on a plane or train.
(iv) Not travelling on business meetings alone with a female.
(v) Avoiding any type of potentially problematic interactions with a female.
অর্থাৎ মি-টু সংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যা থেকে বাঁচতে তারা বলছে, বদ্ধ কোন ঘরে কখনোই কোন মহিলার সাথে সময় কাটাবেন না। কখনোই কোন মহিলার সাথে একান্ত ডিনারে যাবেন না। প্লেন অথবা ট্রেনে কখনোই কোন মহিলার পাশের সিটে বসবেন না। ব্যবসার কাজে কখনোই কোন মহিলার সাথে ভ্রমণ করবেন না। সমস্যা হতে পারে এরকম কোন প্রকার মেলামেশা মহিলার সাথে করবেন না।
অপরদিকে ভারতে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি থেকে বাঁচতে শালীন পোশাক পরিধান করার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এবং বাস-ট্রেনে পুরুষদের সংস্পর্শ পরিহার করে বসতে বলা হচ্ছে।[9]
সুধী পাঠক! এখানে যেসকল মহিলার সাথে মিশতে, বসতে, থাকতে, ঘুরতে নিষেধ করা হয়েছে তারা কিন্তু বউ, কন্যা জাতীয় কেউ নন। তারা নিছক তাদের অফিসের কলিগ, বান্ধবী টাইপের মহিলা। বলা হচ্ছে, এ জাতীয় মহিলার সাথে একান্ত মিশলে, ঘুরলে, আলাপে গেলে কিংবা অন্য কোন সম্পর্কে গেলেই কেউ অনৈতিক কোন কাজে জড়িয়ে পড়তে পারেন। তাই উত্তম হল, তাদের সাথে প্রয়োজন ব্যতীত অন্য কোন ধরনের সাক্ষাৎ, আলাপ, সম্পর্ক এড়িয়ে চলা। রিপোর্টটিতে আরো বলা হয়েছে, অফিসের কোন কলিগের সাথে যদি মিটিং করতেই হয়, তাহলে সাথে তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে রাখুন। এতে আপনি সহজেই অনৈতিক কোন কাজ করতে পারবেন না। মজার ব্যাপার হল, ইসলামী শরী‘আহ ঠিক এই কথাগুলোই বলে থাকে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, ফ্রি মিক্সিং ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে। কেননা, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘মাহরাম ছাড়া কোন পুরুষ যেন কোন মহিলার সাথে নির্জনতা অবলম্বন না করে এবং মাহরাম ছাড়া যেন কোন মহিলা একাকী সফর না করে।[10] অবাক করা ব্যাপার, আজকে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের ইমেজ বাঁচাতে ঠিক সেই নিয়ম-নীতির কথাই বলছে, যা আমাদের ইসলাম আজ থেকে প্রায় দেড় হাযার বছর পূর্বে বলেছে। অথচ আমরা যখন এ কথাগুলো বলি, তখন বলা হয় আমরা নাকি গোঁড়া, অন্ধ, কূপমণ্ডুক আর ধর্মান্ধ। আমরা নাকি নারীদেরকে ঘরের মধ্যে বন্দী করে রাখতে চাই। আমরা নাকি নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। তো নারী স্বাধীনতার স্বর্গরাজ্যে (?) এখন কেন নারীদের সাথে বসতে, মিশতে, ঘুরতে, খেতে নিষেধ করা হচ্ছে? কেন বলা হচ্ছে নারী কলিগদের যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে? আসল কথা হল, ‘এভ্রি অ্যাকশন হ্যাজ অ্যান ইক্যুয়াল অ্যাকশন এন্ড অপজিট রি-অ্যাকশন’। কেননা, এটা ঠিক যে, বন উজাড় করে দিয়ে নগরায়ন ঘটাতে চাইলে দুর্যোগ নামবেই, নামাটাই স্বাভাবিক।
মাসুদা ভাট্টি বনাম তাসলিমা নাসরিন :
গত ১৬ অক্টোবর ২০১৮, মধ্যরাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তর টেলিভিশনের উদ্দেশ্যে ‘একাত্তরের জার্নাল’ টক-শোতে যখন রাজনৈতিক বিতর্ক চলছিল, তখন সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলে মন্তব্য করেছিলেন নিউ নেশন পত্রিকার সম্পাদক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। হলিউড-বলিউড থেকে শুরু করে সারা বিশ্বে যখন নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে হ্যাশটাগ মি-টু আন্দোলনের জোয়ার চলছে, তারই এক কাছাকাছি সময়ে মাসুদা ভাট্টির উদ্দেশ্যে মইনুল হোসেন এমন মন্তব্য করেছেন। এরপর দেশের ৫৫ জন বিশিষ্ট সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টির পাশে দাঁড়িয়ে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে ক্ষমা চাইতে বলেন। আর গত ২২ শে অক্টোবর ২০১৮, সোমবার গ্রেফতার করে তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়। উল্লেখ্য, গত ২১ শে অক্টোবর, ২০১৮ রবিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেয়া এক স্ট্যাটাসে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টিকে ‘ভীষণ রকম চরিত্রহীন’ বলে মন্তব্য করেন তাসলিমা নাসরীন। সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, ঠিক তখনই নির্বাসিত বাংলাদেশী লেখিকা তাসলিমা নাসরীন এমন মন্তব্য করেন।
সমাপনী বক্তব্য :
ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে নিজেকে প্রদর্শন আর বিকিয়ে বসাই যখন একমাত্র স্বাধীনতা ও অধিকার হয়ে উঠে, তখন এসব ‘মি-টু আন্দোলন’ স্রেফ কালক্ষেপন ছাড়া আর কিইবা হতে পারে? মুক্তো দানা যদি ঝিনুকের পেট ছেড়ে সাগর পাড়ে বড় হতে চায়, সে তো মানুষের লাথি খাবেই। খাওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই আসুন! ইসলামী অনুশাসনের মাধ্যমে সমাজ থেকে যিনা-ব্যভিচারের মতো পাপাচার, অনাচার নির্মূল করি।
[1]. একুশে টেলিভিশন : ২২ নভেম্বর ২০১৮, প্রকাশিত- ০৬:২৯ পিএম।
[2]. www.bbc.com/bengali/news-46253456.
[3]. dainikamadershomoy.com/Bangladesh/165595.
[4]. আব্দুল হামিদ ফাইযী, পর্দার বিধান (ঢাকা: তাওহীদ পাবলিকেশন্স, প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারী-২০১২), পৃঃ ১২০।
[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯০।
[6]. উম্মে মারিয়াম রাযিয়া বিনতে আযীযুর রহমান, কেন এই নির্যাতন? কী তার প্রতিকার? (রাজশাহী: নিবরাস প্রকাশনী, প্রথম সংস্করণ- বৈশাখ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ), পৃঃ ২৫-২৬।
[7]. কালের কণ্ঠ অনলাইন, ১৪ অক্টোবর ২০১৮, ১১:১৪ এএম।
[8]. By Indian Express Bangla Web Desk, New Delhi, October 18, 2018, 5:56:06 PM.
[9]. মাসিক আদর্শ নারী, মে-জুন ২০১৮ (২৪তম বর্ষ, ৩য় সংখ্যা), পৃঃ ২৫।
[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৩০০৬, ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৪১।
