অবতরণিকা :
পহেলা বৈশাখ ফসলী সনের সূচনা দিন। ফসলী সন ওরফে বঙ্গাব্দ এসেছে মূলত হিজরী সন থেকে। বহুল প্রচলিত তথ্য মতে, কৃষকদের কৃষি পণ্যের খাজনা সুষ্ঠুভাবে আদায়ের সুবিধার্থে এই বঙ্গাব্দের সূচনা। তাই এই বঙ্গাব্দের চৈত্রমাসে কৃষকরা খাজনা পরিশোধ করতেন এবং প্রথম দিনে তথা পহেলা বৈশাখে জমিদারগণ প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন। এছাড়া বাংলার সকল ব্যবসায়ী ও দোকানদার পহেলা বৈশাখে ‘হালখাতা’ করতেন। ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখ বিবর্তিত হতে থাকে, এতে পড়ে ভোগবাদ ও বস্ত্তবাদের কালো হাত। হিন্দুরা একে ধর্মীয় উৎসব বানিয়ে নেয়। আসলেই কী হিন্দুদের ধর্মীয় চেতনার সাথে পহেলা বৈশাখের কোন সম্পৃক্ততা আছে? ইতিহাস কী বলে? সম্পৃক্ততা থাকলেই বা এতে কী পরিমাণ শিরকের সংমিশ্রণ হয়েছে? এটিকে কেন্দ্র করে কথিত বুদ্ধিজীবীদের দ্বিমুখী অবস্থান কেন? এটি কি হাযার বছরের ঐতিহ্য? নাকি বাঙ্গালীর নিজস্ব সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য? এটি কি সার্বজনীন উৎসব হতে পারে? কীভাবে হতে পারে কীভাবে নয়? শুধুই দিবসভিত্তিক বাঙ্গালীপনার শেষ ফল কী? দিবস পালনের ইসলামী মূলনীতিই বা কী.... ইত্যাদি বিষয় তাত্ত্বিকভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে এই প্রবন্ধে।
পহেলা বৈশাখের হিন্দু সম্পৃক্ততা :
পহেলা বৈশাখের প্রধান সমন্নয়ক ফতুল্লাহ সিরাজী। তিনি একজন মুসলিম। নির্দেশদাতা সম্রাট আকবরও দ্বীনে এলাহি চালুকারী একজন কথিত মুসলিম।[1] অনেকে বলে থাকেন, কৃষকদের ফসলী সন তৈরির ক্ষেত্রে হিন্দুদের পূজার হিসাব-নিকাশেরও সমন্নয় করা হয়েছে এ বঙ্গাব্দে। কেননা হিজরী সন তারিখে তাদের পূজার দিন গণনা করতে সমস্যা হত। আরো অদ্ভুত ব্যাপার হল, সম্রাট আকবরের বানানো নতুন ধর্ম ‘দ্বীনে ইলাহী’-এর সিংহভাগ নীতিমালা হিন্দু ধর্ম থেকে নেয়া হয়েছে। বাকি নীতিমালা ইসলাম, খ্রীস্টান, জৈন, শিখ ও জরাথুস্ট্রবাদ থেকে নেয়া হয়েছে।[2] হিন্দু ধর্মের সাথে আকবরের ছিল বেশ সখ্যতা। আকবরের প্রায় তিন শতাধিক স্ত্রী ছিল, যাদের একটা বড় অংশ ছিল হিন্দু। তিনজন ছিল প্রধান স্ত্রীর মর্যাদায় আর বাকিরা ছিল উপপত্নীর (concubines) স্তরে। জাহাঙ্গীরনামায় তার প্রসিদ্ধ ৩৫ জন স্ত্রীর নাম পাওয়া যায়।[3] তাই স্বভাবতই হিন্দুদের সন্তুষ্টি-বিধান করার একটা ব্যাপার স্যাপার ছিল। এছাড়া বাংলা বর্ষের মাসগুলোর নামকরণ হয়েছে হিন্দু জ্যোতিষ শাস্ত্রের বিভিন্ন গ্রহ-নক্ষত্রের নামানুসারে। আবার সেই নামকরণগুলো হয়েছিল বিভিন্ন দেবদেবী বা পৌরাণিক চরিত্র থেকে। যেমন ‘বৈশাখ’ মাসেরই নামকরণ করা হয়েছে ‘বিশাখা’ থেকে, যার ঋগে্বদিক নাম হল ইন্দ্র, আগুনের দেব ইত্যাদি।[4] প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ১৯১৭ সালে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে পহেলা বৈশাখে ‘হোম কীর্ত্তণ’ আর পূজার ব্যবস্থা করা হয়। সুতরাং ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে পহেলা বৈশাখের যে গোড়ায় গলদ তা স্পষ্ট। পহেলা বৈশাখ যে হিন্দুদের উৎসব উইকিপিডিয়ার ভাষ্য থেকে এটা আরো স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে, ‘পহেলা বৈশাখের দিন উল্লেখযোগ্য ভিড় চোখে পড়ে কলকাতার কালীঘাটে। সেখানকার বিখ্যাত কালি মন্দিরে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ভোর থেকে প্রতিক্ষা করে থাকেন দেবীকে পূজা নিবেদন করে হালখাতা আরম্ভ করার জন্য। ব্যবসায়ী ছাড়াও বহু গৃহস্থ পরিবারের মঙ্গল কামনা করে দেবীর আশির্বাদ প্রার্থনা করতে কালীঘাটে গিয়ে থাকেন’।[5]
বৈশাখী শিরক ও মুসলমানিত্ব বিসর্জন :
হিন্দুদের ধর্মীয় আচরণ ও পূজা-পার্বন যখন পহেলা বৈশাখের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে, তখন সেখানে শিরক না থাকাই অসম্ভব। হিন্দু ধর্মের আগাগোড়া শিরকের উপর প্রতিষ্ঠিত। তারা বেহিসাব মা‘বূদের পূজা করে। গরু থেকে শুরু করে লিঙ্গ পর্যন্ত সবই তাদের দেবতা। তারা গরুকে দেবতা মেনে তার গোশত খায় না কিন্তু এর চামড়া দিয়ে জুতা বানিয়ে অবাধে বিচরণ করে। পহেলা বৈশাখে যে প্রাণীগুলোর মুখোশ ও প্রতীক ব্যবহার করা হয়, সেগুলো সবই তাদের কোন না কোন বিশেষণপ্রাপ্ত দেবতা বিশেষ বা দেবতার বাহন। এটা সবার জানা যে, পেঁচা হল হিন্দুদের কাছে মঙ্গলের প্রতীক। এটি তাদের অন্যতম দেবতা লক্ষ্মীর বাহন। তাই এটি বহন করলে লক্ষ্মী আসবে, কল্যাণ আসবে। তেমনিভাবে ইঁদুর হল গণেশের বাহন, হনুমান হল রামের বাহন, হাঁস হল স্বরসতীর বাহন। সেই সাথে হাতী, বাঘ, সিংহ হল দূর্গার বাহন, গাভী হল দূর্গার সহযাত্রী, ময়ূর হল কার্তিকের বাহন, ক্ষিপ্ত ষাঁড় হল শিবের বাহন। এছাড়াও সূর্য হচ্ছে হিন্দুদের গুরুত্বপূর্ণ দেবতা, যার প্রতীক মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যপক পরিমাণে ধারণ করা হয়। এরপরও কী কেউ বলতে পারে যে, মঙ্গল শোভাযাত্রায় এ প্রতীকগুলো নিছক শোভা বা সৌন্দর্য্য বর্ধক বা আর্ট হিসাবে ব্যবহার করা হয়?! এগুলো শিরক নয়?! এমন প্রকাশ্য একটি শিরকের অনুষ্ঠানে কোন মুসলিম কীভাবে অংশ নিতে পারে? এছাড়াও এ দিনে বৈশাখের কাছে কল্যাণ চাওয়া হয় ইনিয়ে বিনিয়ে, গানের সুরে। বৈশাখের মত একটি নির্জীব বস্তু কীভাবে মানুষকে কল্যাণ দিতে পারে? সে তো নিজেই আল্লাহ্র সৃষ্ট সময়ের মধ্য থেকে এটি সময় মাত্র। সব কল্যাণ তো বৈশাখের সৃষ্টিকর্তার হাতে। অথচ পহেলা বৈশাখে বৈশাখপূজার ষোলকলা পূর্ণ করে ঈমান ও মুসলমানিত্ব উভয়ের বিসর্জন দেয়া হয়। দয়াময় আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে দিবস, রজনী, সূর্য ও চন্দ্র, তোমরা সূর্যকে সিজদা কর না, চন্দ্রকেও না; আল্লাহকে সিজদা কর, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা নিষ্ঠার সাথে শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত কর’ (হা-মীম সাজদাহ, ৩৭)।
বাঙ্গালিপনা বনাম বুদ্ধিবৃত্তিক কাঙ্গালিপনা :
পহেলা বৈশাখের সাথে এমন কিছু অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা জড়িত, যে ধারণাগুলো হাযার বছরের পুরনো প্রকৃতিপূজাকে পুনর্জীবিত করে। একই সাথে এমন নিমণমানের চেতনা-বিশ্বাস কথিত বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঙ্গালিপনা উন্মোচন করে। পহেলা বৈশাখে মঙ্গল কামনা করে, অমঙ্গল তাড়ানোর বাসনা নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। এটি বর্তমান পহেলা বৈশাখের একটি আবশ্যিক অনুষঙ্গ। এ শোভাযাত্রায় ঢোল-তবলা, বিভিন্ন পশু-পাখিদের মুখোশ, হিন্দুদের প্রতিমার ছবি, সূর্যের প্রতিকৃতি ইত্যাদি ধারণ করা হয়। সেই সাথে বৈশাখের পোশাক পরে খুশির ঠেলায় যুবক-যুবতীরা অশ্লীল নাচ প্রদর্শনে মত্ত হয়ে ওঠে। বৈশাখের কাছে প্রার্থনা করা হয় অনাগত গোটা বছরের বরকত ও কল্যাণ। এই রাতের ‘জিরো আওয়ারে’ ভালো কিছু করা হয়, ভালো কিছু খাওয়া হয়, উল্লাস প্রকাশ করা হয় এই ধারণা নিয়ে যে, গোটা বছরটা এমন ভালোতেই কেটে যাবে, মন্দ বা কোন অনিষ্ট স্পর্শ করতে পারবে না। পশু-পাখিদের মুখোশ ও প্রতিমা ধারণসহ উপরিউক্ত সকল ধ্যান-জ্ঞান ও আচার-আচরণ বুদ্ধির নামে নির্বুদ্ধিতা নয়! চরম মূর্খতা নয়! হাযার বছরের পুরোনো প্রকৃতিপূজার সাথে পুরোপুরি সাদৃশ্য নয়! আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হল, যারা সার্বজনীন বিজ্ঞানসম্মত ধর্মের মানবিক ও সুষম নীতিগুলোকে অবৈজ্ঞানিক ও অন্ধত্ব বলতে কুণ্ঠাবোধ করেন না, তারাই পহেলা বৈশাখের এমন বিকৃত প্যাগানিজমকে তালি বাজিয়ে সমর্থন দিচ্ছেন। তারা আবার মিডিয়ায় সপ্রংশ হয়ে পহেলা বৈশাখের গুণকীর্তন করছেন! এই বুদ্ধিজীবী নামে কুবুদ্ধির ধ্বজাধারীরা সর্বদা বৈজ্ঞানিক শিক্ষার কথা বলে, ধর্মের নামে অন্ধত্বকে তাড়ানোর কথা বলে, তারাই আবার পহেলা বৈশাখের এহেন রীতিনীতি পালনে একাকার হয়ে যান। এরাই হাতী-ঘোড়া-পেঁচার মাধ্যমে মঙ্গল কামনা করেন, আলোর সন্ধান করেন আর সেই সাথে নিজেদেরকে আলোকপ্রাপ্ত বানানোর চেষ্টা করেন! কী প্রতিবন্ধী বুদ্ধিজীবী এরা! কী অদ্ভুত পল্টিবাজি! ধ্বংস হোক এমন শয়তানী রং মাখানো বাঙ্গালিপনার! যার সাথে আসল বাংলার কোন সম্পর্ক নেই।
আসলেই কি হাযার বছরের ঐতিহ্য? :
পহেলা বৈশাখকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে এবং সর্বস্তরে ভক্ষণযোগ্য হওয়ার জন্য কথিত বুদ্ধিজীবী মহল ও কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিছু মিথ্যা টাইটেল ব্যবহার করেন। পহেলা বৈশাখ নাকি ‘হাযার বছরের ঐতিহ্য’, এটি নাকি ‘বাঙ্গালীর সার্বজনীন উৎসব’, ‘বাঙ্গালির ঐতিহ্য’, ‘বাঙ্গালির সংস্কৃতি’। এগুলো গণমাধ্যমেও বেশ জোরেসোরে প্রচার চালানো হয়। আমরা জানি যে, বঙ্গাব্দ সন প্রবর্তনের নির্দেশদাতা স্বয়ং বাঙ্গালি ছিলেন না। তিনি একজন মোঘল শাসক ছিলেন। তিনি মোঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় শাসক ছিলেন।[6] তাহলে বাঙ্গালী ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি না বলে বলতে হয় ‘মোঘলীয় ঐতিহ্য’। বড় অদ্ভুত ব্যাপার হল, ব্রিটিশরাজ্যের বিজয় কামনা করে প্রথম ১৯১৭ সালের পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করে কলকাতার হিন্দু মহল। আবার যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজল, স্বাধীনতাকামী সুভাষ বসু ব্রিটিশ তাড়াতে আজাদ-হিন্দ ফৌজ গঠণের জন্য দুনিয়া চষে বেড়াতে লাগলেন, তখন হিন্দু সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ১৯৩৮ সালে উৎসব করে পহেলা বৈশাখ পালন করল। পূজায় পূজায় ব্রিটিশদের জন্য বিজয় কামনা করল।[7] সেই পহেলা বৈশাখ বাঙ্গালির ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি হয় কীভাবে? এছাড়াও প্রথম আধুনিক নববর্ষ পালিত হওয়ার খবর পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। ১৯৬৭ সালের আগেও পহেলা বৈশাখ সবার কাছে বর্তমান সময়ের মত ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পালন করার মত কোন বিষয় ছিল না। পরবর্তী সময়ে এটি বিবর্তিত হতে থাকে এবং এটি যে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কিত একটি পূজা অনুষ্ঠান, তা প্রমাণিত হতে থাকে। পহেলা বৈশাখের যে মঙ্গল শোভাযাত্রা একটি আবশ্যিক অঙ্গ হিসাবে বিবেচিত হয়, সেটার সূচনা মাত্র কিছুদিন আগে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে তরুণ ঘোষের নেতৃত্বে এ অনুষঙ্গটি যোগ হয় শিরকের সুস্পষ্ট উপাদান হিসাবে।[8] সুস্থ সংস্কৃতিকে রোগাক্রান্ত করে শয়তানের বাদ্য-যন্ত্রের মাধ্যমে বিকৃত বিনোদন উপস্থাপন করাই হল চারুকলা ইনস্টিটিউটগুলোর কাজ। আর সেই কাজই তারা করেছে। এই হল হাযার বছরের সংস্কৃতির আসল দশা!
বঙ্গাব্দের বর্তমান প্রভাব :
আমরা জেনেছি কৃষকদের সুবিধার্থে ফসলি মৌসুমের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে হিজরী সন থেকে বঙ্গাব্দ সনের প্রবর্তন করেছেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ ফতুল্লাহ সিরাজী। আর এটা হয়েছে সম্রাট আকবরের নির্দেশে। বঙ্গাব্দের সূচনা থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত লোকেরা বিশেষ করে কৃষক শ্রেণি বেশ উপকৃত হয়েছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এর একটা যথাযথ মান ছিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ সনটাকে কদর করা হত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এর কদর কমে গিয়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর একটা বৃহৎ অংশ বঙ্গাব্দের খোঁজ-খবরই রাখেন না। দৈনন্দিন, মাসিক ও বাৎসরিক কোন হিসাব-কিতাবেই বঙ্গাব্দকে টেনে আনে না। শুধু বৃদ্ধ শ্রেণির কিছু লোকজনই এর নাম নেয়ার চেষ্টা করেন, জীবনের আংশিক হিসাব এর মাধ্যমে চালানোর চেষ্টা করেন। এই বৃদ্ধ শ্রেণি ছাড়া যুবক ও কিশোর শ্রেণির তেমন কেউই বঙ্গাব্দ সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। তাদেরকে বাংলা সনের মাসগুলো বলতে বললে শরমে মুখ লুকানোর চেষ্টা করেন, কেউ বা বিরক্ত হয়ে এমন প্রশ্ন করার কারণে চোখ লাল করে প্রশ্নকারীর দিকে তাকান। মনে মনে বলতে থাকেন, সর্বত্র এখন ইংরেজির কদর চলছে। বঙ্গাব্দ জেনে এত ফখর করার কী আছে! বাস্তবেও তাই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবেই বঙ্গাব্দকে কোন পাত্তা দেয়া হচ্ছে না। লোকজনই বা পাত্তা দিবে কেন? বঙ্গাব্দ আজ আমাদের মত যুবকদের কাছে কেবল একটা স্মৃতি হিসাবেই আছে। কারো কাছে ইতিহাসের সাক্ষী হিসাবে আছে।
তাহলে পহেলা বৈশাখের কেন এত প্রভাব? :
মন্দের প্রতি মানুষের আকর্ষণ স্বভাবজাত। আর পহেলা বৈশাখের সাথে মন্দের হরেক উপসর্গ যুক্ত হয়েছে। এতে আরো যুক্ত হয়েছে ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতা শূন্য থাক’-এর চরম বস্ত্তবাদী নীতি। যুবক-যুবতীদের অবাধ বিচরণ, ঢোল-তবলার তালে একত্রে নৃত্য প্রদর্শন, পাশ্চাত্যের অনুসরণে মদ গলধকরণ, বাঁধাহীন উচ্ছৃখলতা, অশ্লীলতার সংযোজন, কপোত-কপোতীর আনলিমিটেড প্রেমসহ নানা অনাচার ও অজাচার যুক্ত হয়েছে। নৈতিকতার বালাইহীন হিন্দুইজমের অনেক বিকৃত আচার মিশে গেছে এ অনুষ্ঠানে। এতে রয়েছে অপকর্মে সুড়সুড়ি দেয়ার সূর্যমুখী আয়োজন। সব মিলিয়ে পহেলা বৈশাখ পরিণত হয়েছে অবৈধ ও বিকৃত প্রমোদ অনুষ্ঠানে। শয়তান যেভাবে মন্দকে সুশোভিত করে মানুষের নিকট উপস্থাপন করে, মিডিয়াও তেমনভাবে এ বৈশাখকে সর্ব সাধারণের মাঝে বিশেষ করে যুবক-যুবতীদের মাঝে চিত্তাকর্ষক করে তুলে ধরেছে। দেশী-বিদেশী বানিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদও তাদের ব্যবসাকে মাতিয়ে তুলতে এ দিনের আনুষ্ঠানিকতাকে গ্রহণ করেছে। তাদের উদ্বৃত্ত মালের চালান নিঃশেষ করতে ও বিপুল মুনাফা হাতাতে এমন ধরনের অনুষ্ঠানগুলোকে অন্যতম মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে। ফলে পহেলা বৈশাখের মত ভোগবাদী ও রং তামাশার অনুষ্ঠানগুলোর প্রভাবে বিবেকহীন আবেগী ও প্রবৃত্তি পূজারী জনগণ বেশ সহজেই প্রভাবিত হয়।
বস্তুবাদের কালো হাত লাগার এক পর্যায়ে এতে সুস্পষ্ট শিরকের উপাদান যুক্ত হয়েছে। শিরক এমন সর্বশেষ ও চূড়ান্ত অপরাধ, যে অপরাধ আল্লাহ তা‘আলা পরকালে কখনই ক্ষমা করবেন না।
দিবসভিত্তিক বাঙ্গালিপনা :
সারা বছর বাঙ্গালিয়ানার কোন কদর না করে শুধু পহেলা বৈশাখের অপেক্ষায় থাকা কোন ধরনের বাঙ্গালিপনা এটা বিবেকসম্পন্ন মানুষ মাত্রই ভাবা উচিত। কোন কিছুকে দিবসের মাঝে সীমাবদ্ধ করা মানেই এক ধরনের নাটক মঞ্চস্থ করা। বর্তমান সময়ে যে হারে দিবস বাড়ছে, তার চেয়ে বেশি হারে মানুষের মন থেকে আন্তরিকতা, রিয়েলিটি বিদায় নিচ্ছে। কেউ বাংলাকে ভালোবাসলে সে তার গোটা জীবনেই বাংলাকে কদর করবে। বাংলা সংশ্লিষ্ট সবকিছুকে তার হৃদয়ে স্থান দিবে। যথার্থ মূল্যায়ন করবে। বাংলা নিয়ে লিখবে, কবিতা রচনা করবে, বাংলাকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টায় রত থাকবে। কিন্তু পহেলা বৈশাখে নাচগান করাতে বাংলার কী যায় আসে! সারা বছর ইংরেজি কোচিং, হিন্দি আর ইংলিশ মুভি দেখে, চাইনিজ আর থাই খেয়ে পহেলা বৈশাখে আসে বাঙ্গালী সাজতে। এটা কি পরিষ্কার হিপক্রিসি নয়? দিন-রাত স্বপ্ন দেখে বিদেশে সেটল হওয়ার, সে কিনা বাঙ্গালিয়ানা দেখায় পহেলা বৈশাখে। সারা বছর বাঙ্গালী খাবারের কদর না করে এক সকালেই পান্তা-ইলিশ খেয়ে বাঙ্গালী সাজার চেষ্টা কি নিছক কৃত্রিমতা নয়? সারা বছর শার্ট-টাই আর ইংলিশ পোশাক পরে এক দিন শুধু শাড়ি-পাঞ্জাবী পরে বাঙ্গালী চেহারা দেখানো কি মিথ্যা ছলনা নয়? পহেলা বৈশাখের একই পান্তা পরের দিন সকালে দিলে যে নাক শিটকিয়ে উঠে, তার কিসের বাঙ্গালিপনা! এগুলো দিবসভিত্তিক বৈশাখপূজার ফল। তাই কোন নির্দিষ্ট দিনে নয়, বাংলাকে ভালোবাসি সর্বদা সবখানে।
আসলেই কি সার্বজনীন উৎসব? :
বাংলা ভাষাভাষী সকলেই বাঙ্গালী, আর বাঙ্গালী মাত্রই বাংলাকে ভালোবাসা তার কর্তব্য। আমরা মুসলিমরা বাঙ্গালী, হিন্দুরাও বাঙ্গালী। জন্মসূত্রে যারাই বাংলাকে ভাষা হিসাবে পেয়েছে, তারাই বাঙ্গালী। বাঙ্গালী হওয়ার প্রশ্নে ধর্মের প্রসঙ্গ আসবে কেন? হিন্দু সংস্কৃতি পালন করে মুসলিমদেরকে বাঙ্গালী হতে হবে কেন? আর হিন্দুদেরকেই বা মুসলিমদের সংস্কৃতি মেনে বাঙ্গালী হতে হবে কেন? হিন্দুদের ধর্মীয় আচার বাংলার সাথে যুক্ত করে সেগুলোকে বাঙ্গালী হওয়ার শর্ত হিসাবে আরোপ করা হবে কেন? পূর্বে ছিল না কিন্তু পরে আরোপিত ধর্মীয় আদর্শকে কেন সার্বজনীন করা হবে। ৯০ ভাগ মানুষের ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা সর্বজনীন হতে না পারলেও পহেলা বৈশাখের পূজা-পার্বন সার্বজনীন হয় কী করে? স্বরসতী আর দূর্গাপূজা ৯০ ভাগ মানুষের সার্বজনীন উৎসব হয় কী করে? সবই প্রবৃত্তি পূজারী, বস্ত্তবাদী বুদ্ধিজীবি ও রাজনৈতিক নেতাদের ধান্দাবাজি!
ইসলামের উৎসব কেবল দু’টি :
কোন ধর্মের উৎসব সে ধর্মের একটি ইবাদত। ইয়াহূদী, খ্রীস্টান, হিন্দুসহ সকল ধর্মেই সুনির্দিষ্ট কিছু উৎসব রয়েছে। প্রত্যেকটি উৎসবের জন্য নির্ধারিত দিন রয়েছে। সার্বজনীন ধর্ম ইসলামে দু’টি উৎসব গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে। এ দু’টি ছাড়া অন্য কোন দিবসভিত্তিক উৎসব ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। শিরকমুক্তভাবে মুসলিমরা তৈরি করলেও তা বৈধ নয়। আর হিন্দুদের আক্বীদা-বিশ্বাস সম্বলিত কোন দিবস তো কল্পনাও করা যায় না! নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করলেন, তখন মদীনার অধিবাসীদের দু’টি উৎসবের দিন ছিল, যে দিনগুলোতে তারা আনন্দ-উৎসব করত। তিনি ছাহাবীগণকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ দিনগুলো কীসের জন্য?’ তারা বলল, ‘জাহেলিয়াতের যুগে আমরা এ দিনগুলোতে আনন্দ উৎসব করতাম’। তখন আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা তাদের এই দু’টি দিনের চাইতে উত্তম দু’টি দিন তোমাদের দান করেছেন। আর তা হল, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা’র দিন’।[9] সুতরাং পহেলা বৈশাখের মত পৌত্তলিকতায় কলংকিত উৎসবে মেতে ওঠা সুস্পষ্টভাবেই হারাম। আল্লাহ আমাদেরকে শয়তানের চক্রান্ত থেকে হিফাযত করুন- আমীন!
[1]. মূলত সে একজন ধর্মত্যাগী কাফির। কারণ তার দ্বীনে ইলাহীর সিংহভাগ নিয়ম-নীতিই হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্ম থেকে নেয়া। তার নতুন এ ধর্মে ইসলাম থেকে যৎ সামান্যই নেয়া হয়েছে।
[2]. The elements were primarily drawn from Islam and Hinduism, but some others were also taken from Christianity, Jainism, Sikhism and Zoroastrianism. https://en.wikipedia.org/wiki/Din-i_Ilahi
[3]. https://www.quora.com/How-many-wives-did-Akbar-have
[4]. https://bit.ly/2pbX3yc (উইকিপিডিয়া)
[6]. উইকিপিডিয়া (ইংরেজি) : https://en.wikipedia.org/wiki/Akbar
[7]. শরীফ আবু হায়াত অপু, তত্ত্ব ছেড়ে জীবনে, পৃঃ ৫৯।
[8]. উইকিপিডিয়া - https://bit.ly/2u8c33T.
[9]. . আবুদাঊদ, হা/১১৩৪।
