কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণে গুজব ও সতর্কতা

ভূমিকা :

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের পদ্মা নদীর উপর নির্মাণাধীন একটি বহুমুখী সড়ক ও রেল সেতু। এর মাধ্যমে লৌহজং, মুন্সিগঞ্জের সাথে শরিয়তপুর ও মাদারীপুর যুক্ত হবে, ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সাথে উত্তর-পূর্ব অংশের সংযোগ ঘটবে।

বাস্তবায়নের পথে স্বপ্নের পদ্মা সেতু : 

বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য পদ্মা সেতু হতে যাচ্ছে এদেশের ইতিহাসের একটি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ প্রকল্প। দুই স্তর বিশিষ্ট স্টিল ও কংক্রিট নির্মিত ট্রাস ব্রিজটির ওপরের স্তরে থাকবে চার লেনের সড়ক পথ এবং নিচের স্তরটিতে থাকবে একটি একক রেলপথ। সরকারের পরিকল্পনামাফিক ২০১৮ সালের শেষের দিকে এটি যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।

প্রকল্প প্রস্ত্ততির সাথে যুক্ত কিছু লোকের দুর্নীতির অভিযোগ উঠায় বিশ্ব ব্যাংক তার প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নেয় এবং অন্যান্য দাতারা সেটি অনুসরণ করে। যাহোক, দুর্নীতির অভিযোগ পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয় এবং কোন প্রমাণ না পাওয়ায় কানাডিয়ান আদালত পরবর্তীতে মামলাটি বাতিল করে দেয়। বর্তমানে প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সম্পদ থেকে অর্থায়ন করা হচ্ছে।

পদ্মা বহুমুখী সেতুর সম্পূর্ণ নকশা এইসিওএমের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরামর্শকদের নিয়ে গঠিত একটি দল তৈরি করে। সেতুটি তৈরির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে চায়না রেলওয়ে গ্রম্নপ লিমিটেড-এর আওতাধীন ‘চায়না মেজর ব্রীজ ইঞ্জিয়ারিং’ নামক একটি কোম্পানী। বর্তমানে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ দ্রম্নতগতিতে এগিয়ে চলেছে। মূল সেতুর ২৯৪টি পাইলের মধ্যে ২৯২টি বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। ৪২টি পিয়ারের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩০টি পিয়ারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৪টি স্প্যান স্থাপন করা হয়েছে, যা এখন দৃশ্যমান। ৩০ জুন ২০১৯ পর্যন্ত মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি ৮১ শতাংশ, নদীশাসন কাজের অগ্রগতি ৫৯ শতাংশ এবং প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭১ শতাংশ।[1]

পশুর রক্ত ঢেলে পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপন কাজের উদ্বোধন :

গত ২০১৫ সালের ১ মার্চ, রবিবার সকালে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় মূল সেতুর পরীক্ষামূলক ভিত্তি স্থাপনের সময় দু’টি কালো ষাড়, দু’টি খাসি এবং দু’টি মোরগ জবাই করে নদীতে তাদের রক্ত ঢালতে দেখা যায় চাইনিজ ঐ প্রতিষ্ঠানের (চায়না মেজর ব্রীজ ইঞ্জিয়ারিং কোম্পানী) কর্মীদের। ভাসিয়ে দেওয়া হয় কয়েকটি মুরগীও। এছাড়া ষাড়ের সামনের দু’টি পা এবং জবাই করা দু’টি মুরগীও তারা ভাসিয়ে দেন। অবশ্য অবশিষ্ট মাংস প্রকল্পে কর্মরত চীনাদের মাঝে বিতরণ করা হয়। সেতু তৈরির এ মহাযজ্ঞ শুরুর পর প্রকল্পে চীনের প্রায় ১৫০ জন প্রকৌশলী এবং ৩৫০ জন কর্মী অংশ নিয়েছে। কারণ, চীনারা বিশ্বাস করেন যে, ‘বড় কোন কাজের শুরুতে এই পশু উৎসর্গ করলে স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। আর এটি কাজে দুর্ঘটনা রোধ করে সফলতা নিয়ে আসে’। চীনা কোম্পানিটি তাদের প্রকৌশলী ও কর্মীদের আগ্রহে এ রীতি পালনে অর্থায়ন করেছে বলে প্রকল্পের কাজে সংশ্লিষ্ট এক বাংলাদেশি প্রকৌশলী নিশ্চিত করেন।[2]

তবে লোকমুখে নরবলির ঘটনা শোনা গেলেও এর পক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পদ্মা সেতু নিয়ে গুজব ও সতর্কতা :

চলতি ২০১৯ সালের গত জুলাই মাসে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে মানুষের এক লক্ষ মাথা লাগবে বলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ইউটিউব, ফেসবুক ইত্যাদিতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ঐ অঞ্চলের কাছে বেশ কয়েকটি এলাকায় বিভিন্ন বয়সী মানুষ অপহৃত হচ্ছে বলেও গুজব ছড়িয়ে পড়ায় কিছু এলাকায় মানুষের মধ্যে ভিত্তিহীন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে দেশের কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে খবরও বের হয়। এতে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অপহরণকারী ধারণা করে অনেক মানসিক ভারসাম্যহীনকে মারধর করে পুলিশে হস্তান্তর করার ঘটনাও ঘটে। পরে এ ঘটনাকে গুজব ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে গত ৯ জুলাই ২০১৯ তারিখে সেতু নির্মাণ কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমগুলোতে বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। বিজ্ঞপ্তিতে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া গুজবের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকতে বলা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি মহল সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। সেতুর নির্মাণকাজের অগ্রগতি তুলে ধরে ঐ বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয় যে, ব্রিজ নির্মাণে মানুষের মাথা প্রয়োজন হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি গুজব[3] সফলভাবে ব্রিজ তৈরি করতে পিলারের নিচে মানুষের মাথা দিতে হয়- আবহমানকাল থেকে মানুষের মধ্যে প্রচলিত এই কুসংস্কার বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান থাকায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সরলমনা মানুষ সেগুলো বিশ্বাস করে। আমার মনে হয়, অপরাধীরা এই গুজবে ভর করে পার পেয়ে যাচ্ছে। কারণ, এখন তারা শিশু/পূর্ণ বয়স্ক মানুষকে অপহরণ করলেও তাদের ওপর দায় বর্তাবেনা, বরং দায় বর্তাবে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ ও সরকারের ওপর। যদিচ সাম্প্রতিক সময়ে দৈনিক পত্রিকার পাতা খুললেই অপহরণ, গুম, খুনের খবর অহরহ পাওয়া যাচ্ছে। এখন কেউ যদি এসব ঘটনাকেও পদ্মা সেতুর নির্মাণে এক লক্ষ মাথা লাগার গুজবের সাথে গলিয়ে দেয়, তাহলে তাতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হবে এবং দেশে গুম, অপহরণ বেড়ে যাবে। তাই আমাদেরকে অবশ্যই সতর্ক ও সাবধান হতে হবে এবং যারা গুজব ছড়াতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে, তাদেরকে প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে হবে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ :

জাহেলী আরবে জিনের উদ্দেশ্যে প্রাণী যবেহ-এর রেওয়াজ ছিল, যা আজও বিভিন্ন আঙ্গিকে কোন কোন মুসলিম দেশে চালু আছে। সে সময়ে কেউ বাড়ী ক্রয় করলে কিংবা তৈরি করলে অথবা কূপ খনন করলে তাদের ওপর জিনের উপদ্রব হতে পারে ভেবে পূর্বাহ্নেই তারা সেখানে বা দরজার চৌকাঠের উপরে প্রাণী যবেহ করত। এরূপ যবেহ সম্পূর্ণরূপে হারাম। কেননা, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে যবেহ করে, তার ওপর আল্লাহ্র লানত’।[4] তাই চীনা প্রকৌশলী ও কর্মীরা পদ্মা সেতুর ভিত্তি স্থাপনের সময় যেভাবে পশু বলি দিয়ে নদীতে তাদের রক্ত ঢেলেছে, সেটা মোটেও উচিত হয়নি এবং সম্ভবত তার উপর ভিত্তি করে বর্তমানের গুজবটা ছড়ানো সহজ হচ্ছে।

উপসংহার :

পদ্মা সেতুর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিতর্ক সবসময়ই ছিল। কাজেই এর নির্মাণ কাজ নানাভাবে পণ্ড করার চেষ্টা করে কোন একটি মহল রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের চেষ্টা করতেই পারে; বিশেষ করে যখন আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে সব বিষয়কে কেন্দ্র করেই বাজে রাজনৈতিক লড়াই করার প্রবণতা রয়েছে। তাই কোন মুসলিম এই ধরনের ভূয়া, ভিত্তিহীন ও গুজব কথা প্রচার করতে পারে না। কেননা, মহান আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ ‘হে ঈমানদারগণ! যদি কোন ফাসেক্ব তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশতঃ কোন সম্প্রদায়কে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে’ (হুজুরাত, ৬)


[1]. গুজবের জবাব দিল পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ, দৈনিক প্রথম আলো (অনলাইন সংস্করণ), ৯ জুলাই ২০১৯, ০৫ : ৩৮ পিএম।

[2]. m.bdnews24.com/bn/detail/bangladesh/932635.

[3]. পদ্মা সেতু তৈরিতে মানুষের মাথা লাগার গুজব কেন ছড়ালো? - ঢাকা: বিবিসি বাংলা (নাগিব বাহারের প্রতিবেদন), ১০ জুলাই ২০১৯।

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৭৮; মিশকাত, হা/৪০৭০।

Magazine