কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ট্রান্স জেন্ডার : এক ভয়াবহ ফেতনা

post title will place here

ট্রান্স জেন্ডার মানে সহজ করে বলা যায়, নারী থেকে পুরুষ হয়ে ওঠা। কিংবা পুরুষ নিজেকে অপারেশনের মাধ্যমে নারী হিসেবে দাবি করা।

বিভিন্ন সময় দেশে দেশে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ ও মতাদর্শ ও চেতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যেসবের লক্ষ্য থাকে মুসলিমদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। ফেতনা ও বিপর্যয়কে উস্কে দেওয়া। সামাজিক স্থিথিশীলতা নষ্ট করা। ঠিক এমন একটি ফেতনা হচ্ছে— নিজের লিঙ্গ পরিচয়কে অস্বীকার করা। কিংবা নিজেকে নারী, না পুরুষ এই পরিচয়ে স্বস্তিবোধ করতে আত্মবিশ্বাসের অভাববোধ করা। নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। 

আর বর্তমানে এ ফেতনার প্রধান টার্গেট হচ্ছে— উঠতি তরুণ-যুবপ্রজন্ম, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে ঢাবি, রাবি ও নর্থ সাউথে এর ভয়াবহ বিস্তারের সংবাদ আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। তবে সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন এ আগ্রাসন আমাদের স্কুল, কলেজ ও মাদরাসাগুলোতেও ঢুকে যেতে পারে। ঘরে ঘরে ঢুকে পড়তে পারে এ ভয়াবহ ফেতনা। গ্রাস করতে পারে আমাদের কোমলতি শিশুদেরকেও। অবাধ অপসংস্কৃতির বিস্তার ও মিডিয়ার নগ্ন ভূমিকা এ কাজটাকে সহজ করে তুলছে। 

এরা হয়তো কখনো মানবতার নামে কখনো অধিকার প্রতিষ্ঠার নাম দিয়ে কিংবা মানবাধিকার বাস্তবায়নের কৌশলে আমাদের তরুণ প্রজন্মের পেছনে কাজ করছে। তাদের মধ্যে ব্রেইন ওয়াশ বা প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে এই ভয়াবহ মানসিক বিকারগ্রস্ত রুচিবোধকে জাগিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এমনকি আজ এরা সফলও বলা যায়, যা বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে। অনেকের আচার-আচরণেও বিরূপ প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

এরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও নেমেছে। সংসদে সংরক্ষিত কোটাও না-কি দাবি করেছে, যা সূক্ষ্মভাবে সমাজে নারী ও পুরুষের সমতার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। নারী পুরুষে রূপান্তরিত হওয়া কিংবা পুরুষ নিজেকে নারী হিসেবে দাবি করা— এ নিছক হীনম্মন্যতা ও রুচির দুর্ভিক্ষ বলা যায়। পুরুষের গুরুত্ব সর্বযুগেই স্বীকৃত। বর্তমানে পুরুষ কীভাবে নিজেকে নারী দাবি করে? 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, অতীতে গোটা বিশ্বে নারীকে পণ্য করে রাখা হয়েছিল। ছিল না ন্যূনতম অধিকার ও মর্যাদা। ইতিহাস বলছে বর্বরতার যুগে নারীদেরকে জীবন্ত হত্যা করা হতো। পুড়িয়ে মারা হতো। শত শত কন্যাসন্তানকে জীবন্ত হত্যা করা হয়েছে। একমাত্র ইসলামই নারীকে সম্মান দিয়েছে। ইযযত-সম্মান-সম্ভ্রমের অধিকার দিয়েছে। বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েছে।

বর্বর মানবসভ্যতার অবক্ষয় লগ্নে আমাদের পাশের দেশ ভারতেও কন্যাসন্তান হবার অপরাধে লাখও ভ্রূণকে যারা হত্যা করেছে, তারা আর যাই হোক, মানবতার বন্ধু হতে পারে না। এরাই নারীর শত্রু। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, এরা এখনো নারীবিদ্বেষ লালন করে। 

আমাদের সমাজে এখনো মানুষ পুত্রসন্তানের জন্য মরিয়া। সবার চাহিদা একটি পুত্রসন্তান। ঠিক তখন কী করে একজন পুরুষ নিজেকে নারী হিসেবে দাবি করে? নারী হিসেবে স্বীকৃতি চায়। নিজেকে নারী মনে করে!

এটা কীভাবে সম্ভব! নিশ্চয়ই এর পেছনে রয়েছে বড় শক্তিশালী একটি এজেন্ট। যাদের এজেন্ডা ও মিশন হচ্ছে মানসিক বিকারগ্রস্ত হীনম্মন্য একটি জাতির আবির্ভাব ঘটানো। যারা না নারী, না পুরুষ! বরং তারা হচ্ছে হিজড়া সম্প্রদায়ের তৃতীয় ভার্সন। আকারে আকৃতিতে অবয়বে নারী বটে, তবে ভেতরে তারা পুরুষ। এমনকি বগুড়ার আলোচিত ট্রান্স জেন্ডার এক নারী, যখন তার চাচা আপন ভাইয়ের সম্পত্তির অংশ দাবি করেছেন, তখনই এই লোক নিজেকে নারী মানতে নারাজ। আবার সে পুরুষ হয়ে উঠতে চায়। এই ক্ষণিকের নারী, আবার স্বার্থের জন্য পুরুষ সাজা এসবের মানে কী? রহস্য ও উদ্দেশ্য কী? আমরা তবে কোন পথে এগিয়ে চলছি? আমাদের কি কোনো হুঁশ-জ্ঞান আছে? 

হাদীছের আলোকে আমরা জানব, কোনো নারী নিজেকে পুরুষ হিসেবে দাবি করা অথবা কোনো পুরুষ নিজেকে নারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার বিধান কী? রাসূলুল্লহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে কী বলেছেন?

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ، وَالْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ ‘নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সকল পুরুষকে অভিশাপ করেছেন, যারা নারীর বেশ ধারণ করে। আর ঐসব নারীকেও অভিশাপ করেছেন, যারা পুরুষের বেশ ধারণ করে’।[1] অপর হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, لَعَنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ المُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالِ، وَالمُتَرَجِّلاَتِ مِنَ النِّسَاءِ، وَقَالَ: «أَخْرِجُوهُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ» ‘নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশাপ করেছেন নারীরূপী পুরুষ ও পুরুষরূপী নারীদের উপর এবং তিনি বলেছেন, তাদেরকে তোমাদের বাড়ি থেকে বের করে দাও’।[2] অন্য এক হাদীছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই দলভুক্ত গণ্য হবে’।[3]

এখান থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, কোনো পুরুষ নিজেকে নারীর সাদৃশ্য অবলম্বন করে প্রকাশ করলে, সে নারী জাতিরই অন্তর্ভুক্ত হবে। ঠিক একই কথা বিপরীতমুখী আচরণের ক্ষেত্রেও।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো জাহান্নামের আগুন থেকে। যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম-হৃদয়, কঠোর-স্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয়, তাই করে’ (আত–তাহরীম, ৬৬/৬)

উপর্যুক্ত আয়াতে মুমিনদের জন্য পালনীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। আর তা হলো নিজেদেরকে সংস্কার ও সংশোধন করার সাথে সাথে নিজ নিজ পরিবারের লোকদেরকেও সংস্কার ও সংশোধন করতে হবে। তাদেরকে ইসলামী শিক্ষা ও তারবিয়্যাত প্রদানের প্রতি যত্নবান হতে হবে- যাতে তারা জাহান্নামের জ্বালানী হওয়া থেকে বেঁচে যায়। আর এই কারণেই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مُرُوا أَوْلاَدَكُمْ بِالصَّلاَةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ ‘শিশুরা যখন সাত বছর বয়সে পৌঁছে যাবে, তখন তাদেরকে ছালাত পড়ার আদেশ দাও। আর ১০ বছর বয়সে পৌঁছে যাওয়ার পর (তারা ছালাতের ব্যাপারে উদাসীন হলে) তাদেরকে (শিক্ষামূলক) প্রহার করো। আর তাদের বিছানা আলাদা করে দাও’।[4]

ঠিক একইভাবে তাদেরকে ছওম পালনেরও আদেশ দিতে হবে এবং অন্যান্য বিধিবিধানের অনুসরণ করার শিক্ষা তাদেরকে দিতে হবে। যাতে সাবালক হওয়ার সাথে সাথে তাদের মধ্যে সত্য দ্বীন মানার অনুভূতি সৃষ্টি হয়ে যায়।

আশা করি, আমরা আমাদের পরিবার-পরিজনদের ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করব। তাদেরকে ইসলামের সঠিক শিক্ষা প্রদান করব। যাতে তারা ইসলামবিদ্বেষী যাবতীয় ফেতনা থেকে বাঁচতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক বিষয়টি অনুধাবন করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

 মীযান মুহাম্মাদ হাসান

নয়নপুর, রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস, গাজীপুর।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৮৫।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৮৬।

[3]. আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১, হাসান।

[4]. আবূ দাঊদ, হা/৪৯৫, হাসান।

Magazine