ইংরেজি ‘ফ্রিডম’ শব্দের অর্থ স্বাধীনতা। আর ‘চয়েস’ অর্থ পছন্দ। সুতরাং ‘ফ্রিডম অব চয়েস’ অর্থ পছন্দের স্বাধীনতা। কর্মের স্বাধীনতা অর্থেও শব্দদ্বয় ব্যবহৃত হয়। ফ্রিডম অব চয়েস বুঝতে হলে তার আগে স্বাধীনতার অর্থ জানা প্রয়োজন। স্বাধীনতা হলো নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী যেকোনো কাজ করা। কিন্তু প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা বলতে এ ধরনের অবাধ স্বাধীনতাকে বোঝায় না। কারণ, সীমাহীন স্বাধীনতা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, কাউকে ইচ্ছামতো সবকিছু করার স্বাধীনতা দিলে সমাজে অন্যদের ক্ষতি হতে পারে, যা অশান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করবে। তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় স্বাধীনতা বলতে অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ বা বাধা সৃষ্টি না করে নিজের ইচ্ছানুযায়ী নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে কাজ করাকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ স্বাধীনতা হলো এমন সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশ, যেখানে কেউ কারও ক্ষতি না করে সকলেই নিজের অধিকার ভোগ করে। এ ধরনের স্বাধীনতা ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়তা করে এবং অধিকার ভোগের বাধা অপসারণ করে। সুতরাং ফ্রিডম অব চয়েস বলতে একথাই বেশি যুক্তিযুক্ত যে, যে কারো কিছু করার বা না করার মধ্যে যেকোনো একটা পছন্দ করার ক্ষমতা।
প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান ফ্রিডম অব চয়েস বলতে কর্মের স্বাধীনতা বুঝিয়েছেন। তার মতে, ব্যক্তি যা করতে চায় সেটা স্বাধীনভাবে করার সামর্থ্য থাকা হলো ফ্রিডম অব চয়েস।
মোটকথা, ফ্রিডম অব চয়েস বলতে কমপক্ষে দুটি বিকল্পের কোনো একটিকে গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তির ইচ্ছার স্বাধীনতাকে বুঝানো হয়।
এখন প্রশ্ন হতে পারে, কোনো কিছু করা বা না করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি কি আসলেই স্বাধীন? এক্ষেত্রে জ্যাঁ জ্যাক রুশোর উক্তিই প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘Man is born free, but everywhere he is in chain’ অর্থাৎ মানুষ এ পৃথিবীতে মুক্তভাবে জন্মগ্রহণ করলেও প্রতিটি পদেই সে শৃঙ্খলিত। হাজারো নিয়মে বাঁধা তার জীবন। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় কিছু নিয়মনীতি, মূল্যবোধ ও আদর্শের প্রতি তাকে অনুগত থাকতেই হয়। তাকে শ্রদ্ধা জানাতে হয় পরিবারের নিয়ম-কানুনের প্রতি, মেনে চলতে হয় সামাজিক রীতি-নীতি, আনুগত্য করতে হয় রাষ্ট্রীয় আইন ও বিধি-বিধানের প্রতি।
প্রকৃত অর্থে ব্যক্তি শর্তসাপেক্ষ কিছু ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করে মাত্র। যেমন, ব্যক্তি ইচ্ছে করলেই কোনো ব্যক্তি তার পছন্দমতো কিছু খেতে পারে না। খাওয়ার আগে তাকে চিন্তা করতে হয়ে সেটি বৈধ, না-কি অবৈধ। ব্যক্তি যা ইচ্ছে তা-ই বলতে পারে না। বলার আগে উচিত কিংবা অনুচিত সম্পর্কে তাকে ভাবতে হয়। সে ইচ্ছামাফিক সব জায়গাতে যেতেও পারে না। তার আগে তার প্রবেশাধিকার সম্পর্কে ভাবতে হয়, অনুমতি নিতে হয়। সে ইচ্ছামতো কোনো পোশাক পরতেও পারে না। পোশাকটি তার আদর্শ, আবহাওয়া এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। ঠিক এমনিভাবে সে ইচ্ছা করলেই নিজেকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে না। নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে বিপজ্জনক কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে না। নিজের জীবনকে শেষ করে ফেলতে পারে না। ইচ্ছে করলেই নিজের মালিকানাধীন সম্পদকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে পারে না। নিজের সন্তানকে মেরে ফেলতে পারে না। সমাজের প্রচলিত নিয়ম-রীতি ভঙ্গ করে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বল্গাহীন জীবনযাপন করতে পারে না। অবৈধ পেশায় জড়িত হতে কিংবা অবৈধ পণ্যের কারবার করতে পারে না। ইচ্ছামাফিক কারো জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে না। কোনো প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচরণ ও মূল্যবোধকে অবজ্ঞা বা কটাক্ষ করতে পারে না। কারো বোধ-বিশ্বাসের দেয়ালে আঘাত করতে পারে না। অন্যায়, অবাধ্যতা কিংবা অশ্লীল কাজে উস্কানি দিতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন-কানুনকে অবহেলা কিংবা অস্বীকার করতে পারে না। পারে না আন্তর্জাতিক আইন-কানুনকে অমান্য করতে। কারণ, এসবের অধিকার তাকে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কেউই দেয়নি। তাহলে কীভাবে একজন ব্যক্তি বলতে পারে যে, দেহ আমার সিদ্ধান্তও আমার, আমি যেমন খুশি তেমন চলব! যেমন খুশি তেমন সাজব! যেমন খুশি তেমন পরব! যখন যা খুশি তা-ই করব! আমাকে কিছু বলার অধিকার কারো নেই! নেই বাধা দেওয়ার অধিকার! এ জাতীয় গর্হিত বক্তব্য ও আচরণ নিঃসন্দেহে মূল্যবোধকে ধ্বংস করে, নৈতিক মানদণ্ডকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে, অপরাধপ্রবণতাকে উৎসাহিত করে এবং নিজের ক্ষতিকেই বৃদ্ধি করে। সর্বোপরি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে তথা সমগ্র জাতিকে ধ্বংস করে। কারণ, প্রথমত, ব্যক্তি একটি পরিবারের সদস্য। তাকে পরিবারের মান-সম্মান, ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হয়, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের প্রতি আনুগত্য করতে হয়। পরিবারের সম্মানহানি হয় এমন কাজ সে করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধভাবে তাকে বসবাস করতে হয়, সমাজের রীতি-নীতি, সংস্কৃতি তাকে মান্য করতে হয়। সমাজবিরোধী কাজের অর্থই হলো গণদুশমনে পরিণত হওয়া, গণ-ধিক্কৃত হওয়া, লাঞ্ছিত হওয়া। তৃতীয়ত, ব্যক্তি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা তথা অধিকার-স্বাধীনতা ভোগ করে। ফলে সে রাষ্ট্রের প্রচলিত রীতি-নীতি, বিধি-বিধান, আইন-কানুন মেনে চলতেও বাধ্য। কেউ কি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তথা দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে গিয়ে আত্মরক্ষা করতে পেরেছে কখনো, না-কি ভবিষ্যতে কখনো পারবে?
এছাড়া, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মের রয়েছে অপরিসীম প্রভাব। ধর্মই মানুষকে প্রকৃত সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথ নির্দেশ করে। পৃথিবীর প্রতিটি সভ্যতাতেই সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থানে ছিল ধর্ম। বর্তমানেও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। পৃথিবীর মানুষের প্রায় সবাই কোনো না কোনো ধর্ম-আদর্শকে বিশ্বাস করে। ধর্মকে কোনো আস্তিক ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারে না। কারণ সে তো ধর্মকে ধারণ করেই বেঁচে থাকে এবং তার জীবনের সকল চিন্তা এবং কর্ম আবর্তিত হয় ধর্মকে কেন্দ্র করেই। আবার, প্রত্যেক ধর্মেরই রয়েছে নিজস্ব নিয়ম-কানুন, আচার-অনুষ্ঠান। একজন আস্তিক ব্যক্তি তার নিজের ধর্মীয় বিধান মেনে চলেন এবং তা মানতে তিনি বাধ্য।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে ইদানীং কিছু অপরিণামদর্শী, অকালপক্ক, রুচিহীন, অসভ্য ব্যক্তিকে তাদের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয় বিধি-বিধান, মূল্যবোধ-বিশ্বাস, সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে দেখা যাচ্ছে। তাদের কেউ বস্ত্রের ওজন কমাতে চাচ্ছেন, কেউ নিজের শরীরকে পণ্য হিসেবে বিক্রির অধিকার চাচ্ছেন, কেউ জন্তু-জানোয়ারের মতো উলঙ্গপনায় মেতে উঠতে চাচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ আবার অর্থ সাশ্রয় এবং জাতীয় অর্থনীতির উপর চাপ কমাতে ছোট ছোট পোশাকের পক্ষে সাফাই গাচ্ছেন। এসবই করা হচ্ছে অধিকারের নামে, স্বাধীনতার নামে। অথচ তারা ভুলে যাচ্ছে যে, স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা এক বিষয় নয়। তারা আসলে বিষবাষ্পে গোটা সমাজকে কলুষিত করতে চাচ্ছে। এর বড় প্রমাণ হচ্ছে বর্তমান সময়ের পোশাক বিতর্ক। মাত্র কিছুদিন আগে একটি রেলস্টেশনে প্রায় ২০ জন অর্ধ-উলঙ্গ নারীকে দেখা গেছে তাদের মতোই আরেক অর্ধ-উলঙ্গ নারীর পক্ষে মানববন্ধন করতে। এরপর রাজধানীর একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কয়েক জন শিক্ষার্থীকে অর্ধ-উলঙ্গ অবস্থায় অশালীন পোশাকে প্রতিবাদ সমাবেশ, মানবন্ধনে অংশ নিতে দেখা গেছে। শিক্ষিত নামের এসব পিশাচদের শারীরিক ভাব, ভাষা এবং ভঙ্গী দেখে পুরো জাতির মাথা লজ্জায় নিচু হয়ে গেছে। তারা আমাদের পূর্বসূরী সম্মানিত কন্যা, ভগ্নি, মাতা, ফুফু, নানি, দাদিদেরকে অসম্মানিত করেছে, তাদের চরিত্র হননের চেষ্টা করেছে। তারা আমাদের নারী সমাজকে অশ্লীলতায় এবং অবাধ্যতায় উসকানি দিচ্ছে। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়ার বৃথা প্রয়াস চালাচ্ছে। পাশ্চাত্য থেকে আমদানী করা এসব বেহায়াপনা, অশ্লীলতার ফেরিওয়ালা কথিত নারীবাদীদের এখনই থামাতে হবে। এজন্য পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবাইকে যথাযথ দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর...’ (আত-তাহরীম, ৬৬/৬)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ‘আপনি তাদেরকে আপনার প্রতিপালকের পথে ডাকুন প্রজ্ঞা, সদুপদেশের মাধ্যমে। আর (প্রয়োজনে) তাদের সাথে তর্ক (যুক্তি বিনিময়) করুন উত্তম পন্থায়’ (আন-নাহল, ১৬/১২৫)। অন্যত্র আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল হওয়া উচিত, যারা মানুষকে কল্যাণকর কাজের দিকে আহ্বান জানাবে, মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দিবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। আর তারাই হবে সফলকাম’ (আলে ইমরান, ৩/১০৪)। মহান আল্লাহ বলেন,الَّذِينَ إِنْ مَكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ ‘তারা এমন যাদেরকে আমি জমিনে ক্ষমতা দান করলে তারা ছালাত ক্বায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অন্যায় কাজে নিষেধ করবে; সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারে’ (আল-হজ্জ, ২২/৪১)।
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’।[1] অন্য হাদীছে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কোনো প্রকার খারাপ কাজ হতে দেখে, সে যেন তার হাত দিয়ে তা প্রতিরোধ করে। যদি এ শক্তি তার না থাকে, তাহলে মুখের কথা দিয়ে তা প্রতিহত করে। এতেও যদি সে সক্ষম না হয়, তাহলে মন দিয়ে তা প্রতিহত করার প্রচেষ্টা করে। আর অন্তর দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করা ঈমানের দুর্বলতম এবং সর্বনিম্ন স্তর’।[2]
এ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কুরআনিক ফর্মূলাই হতে পারে সর্বোত্তম ব্যবস্থাপত্র। যেমন আল্লাহ বলেন,يَا بَنِي آدَمَ قَدْ أَنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِبَاسًا يُوَارِي سَوْآتِكُمْ وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذَلِكَ خَيْرٌ ذَلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ لَعَلَّهُمْ يَذَّكَّرُونَ ‘হে আদম সন্তান! তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত ও বেশভূষার জন্য আমি তোমাদেরকে পরিচ্ছদ দিয়েছি এবং সাবধানতার পোশাক, এটিই সর্বোৎকৃষ্ট। এটি আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে’ (আল-আ‘রাফ, ৭/২৬)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ঈমানদার পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের যৌনাঙ্গ সংযত করে, এটিই তাদের জন্য উত্তম। ওরা যা করে আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত। আর ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে... তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও’ (আন-নূর, ২৪/৩০-৩১)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى ‘তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে, প্রাচীন জাহেলী যুগের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়িয়ো না’ (আল-আহযাব, ৩৩/৩৩)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে, আপনার কন্যাদেরকে আর মুমিনদের নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের মুখমণ্ডলের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ অতিক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫৯)।
উপরিউক্ত ব্যবস্থাপনাতেও যদি কাজ না হয়, তাহলে তাদেরকে তাদের ইচ্ছার স্বাধীনতার উপরই ছেড়ে দেওয়া হোক, যা তাদেরকে সীমাহীন এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিতে নিপতিত করবে। যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেছেন,وَهَدَيْنَاهُ النَّجْدَيْنِ ‘আর আমি তাকে (ভালো এবং মন্দ) দু’টি পথই দেখিয়েছি’ (আল-বালাদ, ৯০/১০)। অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন,إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا - إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ سَلَاسِلَ وَأَغْلَالًا وَسَعِيرًا ‘আমি তাকে পথের নির্দেশ দিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে। আমি অকৃতজ্ঞদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি শৃঙ্খল বেড়ি ও লেলিহান অগ্নি’ (আদ-দাহর, ৭৬/৩-৪)। অন্যত্র মহান আল্লাহ আরও বলেন,قُلْ مَا يَعْبَأُ بِكُمْ رَبِّي لَوْلَا دُعَاؤُكُمْ فَقَدْ كَذَّبْتُمْ فَسَوْفَ يَكُونُ لِزَامًا ‘বলুন! তোমরা আমার প্রতিপালককে না ডাকলে তাঁর কিছু আসে যায় না। তোমরা মিথ্যা বলছ, ফলে অনিবার্য শাস্তি নেমে আসবে’ (আল-ফুরক্বান, ২৫/৭৭)। আল্লাহ তাআলা বলেন,وَقُلِ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنْ شَاءَ فَلْيُؤْمِنْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيَكْفُرْ إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلظَّالِمِينَ نَارًا ‘বলুন! সত্য তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে। সুতরাং যার ইচ্ছা বিশ্বাস করুক আর যার ইচ্ছা অস্বীকার করুক। আমি যালেমদের জন্য অগ্নি প্রস্তুত রেখেছি...’ (আল-কাহফ, ১৮/২৯)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,وَمَنْ يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ‘সৎপথ প্রকাশিত হওয়ার পরও কেউ যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের অনুসৃত পথের বিরুদ্ধে চলে, তবে আমি তাকে ওই দিকেই ফিরিয়ে দেব যে দিক সে অবলম্বন করেছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব’ (আন-নিসা, ৪/১১৫)।
হাদীছেও রাসূলুল্লাহ a ওইসব পাপিষ্ঠদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘যে নারী পুরুষের অনুকরণে সাজসজ্জা বা চালচলন করে এবং যে পুরুষ নারীদের অনুকরণে সাজসজ্জা বা চালচলন করে সে আমাদের (মুসলিম সমাজের) মধ্যে গণ্য নয়’।[3]
আল্লাহ তাআলা আমাদের নারীদেরকে পাশ্চাত্য থেকে আমদানী করা অশ্লীল, দুর্গন্ধময় বস্তাপচা নগ্ন অপসংস্কৃতির বিষবাষ্প থেকে আত্মরক্ষা করে প্রকৃত সত্য ও সৌন্দর্যের আধার ইসলামের আলোয় আলোকিত হওয়ার এবং স্বীয় স্রষ্টা, সমাজ এবং স্বজাতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
মো. হাসিম আলী
সহকারী শিক্ষক, পল্লী উন্নয়ন একাডেমী ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজ, বগুড়া।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৩৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮২৯।
[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭৮; মিশকাত, হা/৫১৩৭।
[3]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৮৭৫।