কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

জ্বলন্ত এক অগ্নিগর্ভ কাশ্মীর

দক্ষিণ এশিয়া তথা উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে হিমালয়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত এক সময়ের ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর বর্তমানে জ্বলন্ত অগ্নিগর্ভ, স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার রণক্ষেত্র। অর্ধশতাব্দীর অধিক কাল ধরে চলছে এই ন্যায়সঙ্গত স্বাধীনতার রাজনৈতিক, আদর্শিক ও সর্বাত্মক সংগ্রাম। একদিকে কাশ্মীরের ব্যাপক জনগোষ্ঠী যখন স্বাধীনতার প্রেরণায় উজ্জীবিত ও সংগ্রামরত, তখন কাশ্মীর প্রসঙ্গে তিনটি রাষ্ট্রীয় শক্তি নিজ নিজ স্বার্থে আগুয়ান। এরা হল- ভারত, পাকিস্তান ও চীন। এ সকল পক্ষ কাশ্মীর বিষয়টিকে নাজুক ও অমীমাংসিত করে রেখেছে। কাশ্মীরের জনগণকে নিজের মুক্তি, স্বাধীনতা ও ভাগ্য উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে বাধা সৃষ্টি করছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ভারত সমগ্র কাশ্মীরের ৪৩ ভাগ এলাকা দখল করে রেখেছে, যার মধ্যে রয়েছে জম্মু-কাশ্মীর উপত্যকা, লাদাখ এবং সিয়াচেন হিমবাহ। পাকিস্তান অধিকার করে রেখেছে কাশ্মীরের ৩৭ ভাগ ভূ-খণ্ড, যার মধ্যে রয়েছে আযাদ কাশ্মীর (রাজধানী মুযাফফরাবাদ) এবং উত্তরাঞ্চলীয় গিলগিট এবং বালতিস্তান (Baltistan)। অন্যদিকে চীনের দখলে রয়েছে কাশ্মীরের ২০ ভাগ এলাকা, যার নাম আকসাই চীন (Aksai Chin)। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের সময় চীন এটা দখল করে নেয়। এছাড়াও চীন ১৯৬৩ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে পায় পার্বত্য ট্রান্স-কারাকোরামের সাকসাম উপত্যকা। অবশ্য ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীরের ভূ-খণ্ড দখল করে রেখেছে ১৯৪৭ সাল থেকে। আর ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক ইংরেজরা উপমহাদেশকে স্বাধীনতা দিয়ে চলে যাবার সময় কাশ্মীরকে সে দেশের জনগণের ইচ্ছা ও স্বাধীনতার অধীনে থাকার ব্যবস্থা না করে সংকটের ঘূর্ণাবর্তে ফেলে রেখে যায়। উপমহাদেশের অনেক সমস্যার মতই কাশ্মীর সমস্যাও ইংরেজ সৃষ্ট এবং ভারত কর্তৃক প্রলম্বিত।

বিভাজন সংকট ও দুর্ভাগ্য বরণ :

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন বিদায় নেয়, তখন তারা ৫৬২ টি প্রিন্সলি স্টেটকে হয় ভারত নয়তো পাকিস্তানে যোগ দিতে বলে। ভারতের স্টেটগুলো ভারতে এবং পাকিস্তানের গুলো পাকিস্তানে যোগ দেয়। কিন্তু ৩ টি স্টেট স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল। হায়দ্রাবাদ, জুনগর এবং জম্মু ও কাশ্মীর। এদের মধ্যে হায়দ্রাবাদ এবং জুনগর ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু তাদের রাজা ছিল মুসলিম। জনগণ বিক্ষোভ করে ভারতে যোগদান করার জন্য, ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী এ্যাকশনে যায় এবং দখল করে নেয়। পরবর্তীতে গণভোটের মাধ্যমে বৈধতা হাছিল করে নেয়।

ভারতের সাথে চুক্তির মুহূর্তে নেহেরুর সাথে হরি সিং এবং শেখ আব্দুল্লাহ; অপরদিকে জম্মু এবং কাশ্মীরের জনসংখ্যা ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু রাজা ছিল হরি সিং। হরি সিং শুরুতে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন এবং একই সাথে নেহেরু ও জিন্নাহর সাথে দেন-দরবারও করছিলেন। হরি সিং কাশ্মীরকে এশিয়ার সুইজারল্যান্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। কাশ্মীরকে পাকিস্তানের অংশ করতে জিন্নাহ ছিল বেশ আত্নবিশ্বাসী। তিনি কাশ্মীরকে তার পকেটে রাখা ব্লাঙ্ক চেক বলে আখ্যায়িত করেন। রাজা হরি সিং-এর উপর নেহেরুর আস্থা ছিল কম। নেহেরু জেলে বন্দী শেখ আব্দুল্লাহর মুক্তি চাচ্ছিল। স্বাধীন হবার ১৩ দিন পূর্বে রাজা হরি সিং পাকিস্তানের সাথে স্ট্যান্ড স্টিল চুক্তি স্বাক্ষর করে। কিন্তু ভারত এই চুক্তিতে একমত হয়নি।

দু’টি নতুন দেশ জন্ম হবার ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম-শিখ-হিন্দুদের মধ্যে দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। কাশ্মীরেও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মুসলিম উপজাতিরা পাকিস্তানে পলায়ন করতে থাকে। এই ঘটনায় পাকিস্তান ক্ষুব্ধ হয়ে পাহাড়ী নন-স্টেট বাহিনীকে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রেরণ করেন। কারণ চুক্তির কারণে সেনাবাহিনী সরাসরি আক্রান্ত করতে পারেনি। বাহিনীর আক্রমণে কাশ্মীরের অধিকাংশ অঞ্চল রাজার নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে চলে যায়। তারই প্রতিক্রিয়ায় মহারাজা হরি সিং ভারতের সাহায্য প্রার্থনা করেন। শেখ আব্দুল্লাহ (কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী নেতা) পরামর্শক্রমে ভারতের সাথে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু ভারত সরকার তাদের সাথে যুক্ত হবার জন্য শর্ত জুড়ে দেয় এবং রাজা হরি সিং তা মেনে নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাক্ষরিত হয় ইন্সট্রুমেন্ট অব এসেশন।

কাশ্মীরের ইতিহাস :

হিমালয় উপত্যকা এবং পিরপাঞ্জাল রেঞ্জের মধ্যে অবস্থিত এই অঞ্চলটি একসময় শুধুমাত্র কাশ্মীর উপত্যকা নামেই পরিচিত ছিল। ভারতের দু’শ বছরের ইংরেজ শাসনের সময়ও এখানে রাজার স্বশাসন চলত। অর্থাৎ রাজা এখানে নিজের নিয়ম-কানূন টিকিয়ে রাখতেন ব্রিটিশদের খাজনা দিয়ে। সরাসরি ব্রিটিশরাজ এখানে কোনো দিন কায়েম হয়নি। ব্রিটিশরা ভারতকে স্বাধীনতা দানের পর থেকেই যাবতীয় সমস্যা শুরু হয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে একটা ছোট পরিসংখ্যান দিয়ে রাখা ভালো :

(১) বলা হয়, ভূ-স্বর্গ হিসাবে খ্যাত এই অঞ্চলটি একসময় হিন্দু ও বৌদ্ধদের অন্যতম মিলনস্থল হিসাবে পরিচিত ছিল- প্রথম সহস্রাব্দের দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে।

(২) ১৩৩৯ সালে শাহ মীর প্রথম মুসলিম সাম্রাজ্য স্থাপন করেন কাশ্মীরে।

(৩) ১৫৮৬ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত এখানে মোঘল রাজ চলে।

(৪) এর পরবর্তী সময় থেকে ১৮২০ সাল পর্যন্ত এখানে আফগান বংশোদ্ভূত দুররানি সাম্রাজ্যের আধিপত্য ছিল।

(৫) এরপর ১৮২০ সালে রঞ্জিৎ সিংয়ের নেতৃত্বে শিখ বাহিনী কাশ্মীর দখল করে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত নিজেদের জিম্মায় রাখে।

(৬) ব্রিটিশ যুগে ভারতের প্রথম অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধে শিখদের পরাজয়ের পর তা ব্রিটিশ অধীনে যাওয়ার পরপরই অমৃতসর সন্ধির বদৌলতে জম্মুর রাজা গুলাব সিং ইংরেজদের থেকে কাশ্মীর কিনে নেন আর তারপর থেকেই জম্মু-কাশ্মীর এক অঙ্গ হয়ে ওঠে। সে সময় এটি প্রিন্সলি স্টেট হিসাবে পরিচিত ছিল ব্রিটিশদের কাছে।

(৭) ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা এবং ম্যাকমোহন লাইন টানার সময় জম্মু ও কাশ্মীরের রাজা ছিলেন হরি সিং। পরবর্তীকালে তিনি স্বেচ্ছায় ভারতের সঙ্গে যোগ দেন। আর এভাবেই স্বাধীন ভারতে জম্মু-কাশ্মীর তার গৌরবের মুকুট হয়ে ওঠে। গত শতাব্দীর শেষ দিকে ভারত ও পাকিস্তান দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সময় কাশ্মীরে হিন্দু রাজার রাজত্ব থাকলেও এখানে মূলত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে ওঠে মোঘল আমল থেকে। রাজা হরি সিং বরাবর ভারতের পক্ষে থাকলেও এখানকার জনগণের একাংশ পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পক্ষে ছিল, আর আরেকাংশ চেয়েছিল কাশ্মীরকে স্বাধীন ভূমি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

বর্তমানেও এই দুই দাবীই হল মূল সমস্যার কারণ।

বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক দিক থেকে কাশ্মীর পাঁচটি অংশে বিভক্ত-

১. আকসাই চীন

২. আযাদ কাশ্মীর (পাক অধিকৃত কাশ্মীর)

৩. জম্মু ও কাশ্মীর

৪. গিলগিট-বালতিস্তান

৫. ট্রান্স-কারাকোরাম ট্র্যাক্ট।

কাশ্মীরের পরিচয় :

(ক) ১৯ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কাশ্মীর শব্দটি ভৌগোলিকভাবে শুধু বিশাল হিমালয় এবং পিরপাঞ্জাল পর্বতমালার উপত্যকাকে নির্দেশ করা হতো।

(খ) বর্তমানে কাশ্মীর বলতে বোঝায় একটি বিশাল অঞ্চল।

(গ) ভারত-শাসিত রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর (কাশ্মীরের প্রায় ৪৩% শাসন করে) পাকিস্তান-শাসিত গিলগিট-বালতিস্তান এবং আযাদ কাশ্মীর প্রদেশ (কাশ্মীরের প্রায় ৩৭% শাসন করে) এবং চীন-শাসিত আকসাই চীন এবং ট্রান্স-কারাকোরাম ট্র্যাক্ট অঞ্চলসমূহ নিয়ে গঠিত।

কাশ্মীরের ইতিহাস (সংঘাত পূর্ব সময়) :

(ক) পঞ্চম শতাব্দীর পূর্ববর্তী সময়ে কাশ্মীর প্রথমে হিন্দুধর্মের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

(খ) পঞ্চম শতাব্দীর পরে বৌদ্ধধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।

(গ) পরবর্তীতে নবম শতাব্দীতে কাশ্মীরে শৈব মতবাদের উত্থান ঘটে।

(ঘ) ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটে।

(ঙ) পরবর্তী পাঁচ শতাব্দীব্যাপী কাশ্মীরে মুসলিম শাসন বজায় ছিল।

(চ) এর মধ্যে মোঘল সম্রাটরা এবং আফগান দুররানী সম্রাটরা কাশ্মীর শাসন করেন।

(ছ) ১৮১৯ সালে রঞ্জিত সিংয়ের নেতৃত্বে শিখরা কাশ্মীর দখল করে।

(জ) ১৮৪৬ সালে প্রথম অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধে ইংরেজদের নিকট শিখরা পরাজিত হয়।

(ঝ) ১৮৪৬ সালে বৃটিশ সরকার ৭৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে হিন্দু সর্দার গোলাব সিং-এর নিকট মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর রাজ্যটি বিক্রি করে দেয়।

কাশ্মীর সমস্যার শুরু :

(ক) ১৮৪৬-এর পর থেকে গুলাব সিং শাসন করে এবং পর্যায়ক্রমে হরি সিং-এর সময় উত্তেজনা শুরু হয়।

(খ) ১০০ বছর পর ১৯৪৭ সালে হিন্দু রাজা হরি সিং-এর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কাশ্মীরীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

(গ) অর্থাৎ সমস্যার সূচনা হয় ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময় থেকে।

(ঘ) হরি সিং মুসলিমদের আন্দোলন দমাতে না পেরে ভারতের সহযোগিতা চায়।

(ঙ) তখন হরি সিংকে সহযোগিতার একটি শর্ত জুড়ে দেয় ভারত, আর তা হল কাশ্মীরকে ভারতের সাথে একীভূতকরণ।

(চ) হরি সিং-এর সাথে চুক্তি অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ২৭ অক্টোবর ভারতীয় সামরিক বাহিনী কাশ্মীরে প্রবেশ করে।

(ছ) কাশ্মীরীদের উপর চলে নিপীড়ন। ভারতীয় সামরিক বাহিনী বিরাট অংশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

(জ) সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে কাশ্মীরীরা তাদের অধিকার আদায়ের দাবী জানায়।

(ঝ) তাদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়ায় পাকিস্তান। পাকিস্তান কাশ্মীরীদের পক্ষ হয়ে ভারতের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় ১৯৪৭ সালেই।

১৯৪৭ সালের কাশ্মীর যুদ্ধের ফলাফল কী?

(ক) পাকিস্তান কাশ্মীরীদের নিয়ন্ত্রণে এক-তৃতীয়াংশ ভূ-খণ্ড ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়। এর নাম ‘আযাদ কাশ্মীর’।

(খ) ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়।

ভারতে কাশ্মীর প্রেক্ষাপট :

(ক) ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে ১৯৪৭, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯-এ অন্ততঃ তিনটি যুদ্ধ হয়েছে।

(খ) কাশ্মীরী বিদ্রোহী এবং ভারত সরকারের মধ্যে বিরোধের মূল বিষয়টি হল স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন।

(গ) কাশ্মীরের গণতান্ত্রিক উন্নয়ন ১৯৭০-এর শেষভাগ পর্যন্ত ছিল সীমিত এবং ১৯৮৮ সালের মধ্যে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বহু গণতান্ত্রিক সংস্কার বাতিল হয়ে গিয়েছিল।

(ঘ) অহিংস পথে অসন্তোষ জ্ঞাপন করার আর কোনো রাস্তাই খোলা ছিল না। তাই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য বিদ্রোহীদের সমর্থন নাটকীয়ভাবে বাড়তে থাকে।

(ঙ) ২০০৮ সালের নির্বাচনে বহু সংখ্যক ভোটার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

(চ) জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার এই নির্বাচনকে সাধারণভাবে নিরপেক্ষ হিসাবে গণ্য করে।

(ছ) এই নির্বাচনে জয়লাভ করে ভারতপন্থী জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স রাজ্য সরকার গঠন করে।

(জ) ভয়েস অফ আমেরিকার তথ্য অনুযায়ী, বহু বিশেস্নষকের মতে এই নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ভারতের শাসনকে সমর্থন করার ইঙ্গিত দেয়।

(ঝ) কাশ্মীরের একজন বিশিষ্ট বিচ্ছিনণতাবাদী নেতা সাজ্জাদ লোন যদিও দাবী করেন উচ্চ সংখ্যক ভোটদানের হারকে কখনই কাশ্মীরীরা যে আর স্বাধীনতা চান না তার একটি ইঙ্গিত হিসাবে গ্রহণ না করা হয়।

কাশ্মীরীদের অবস্থান ও চাওয়া-পাওয়া :

(ক) এক বিশাল পক্ষ স্বাধীন কাশ্মীরের স্বপ্ন দেখে।

(খ) আরেক পক্ষ চায় পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে।

কেন পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হতে চায় কাশ্মীর?

কারণ তারা ভাবে, যদি আমরা স্বাধীন হয়েও যাই, তারপরও ভারত যেকোন সময় আগ্রাসন চালাতে পারে। সেজন্য পাকিস্তানের মত একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্টের সাথে থাকাটাই তারা নিরাপদ মনে করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ভারতের ইন্দিরা সরকার কাশ্মীরের জাতীয় নেতা শেখ আব্দুল্লাহর সঙ্গে আপোস করেন। তিনি আবার কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী পদে বসেন। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অনুষ্ঠিত ১৯৬৫ সালের তাসখন্দ চুক্তি এবং ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত সিমলা চুক্তিতে কাশ্মীরে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে দু’পক্ষ সম্মতি জানায়। এই স্থিতাবস্থা হল ভারত-অধিকৃত এবং পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে দুই অংশের সীমান্তে সংঘর্ষ বন্ধ রাখা এবং এই ভাগ মেনে চলা।

কাশ্মীরবাসীর ইচ্ছা ছিল ভারত ও পাকিস্তান এই দুই ডমিনিয়নের কোনোটাতেই যোগ না দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন দেশ হিসাবে থাকার। প্রথম দিকে এই ব্যবস্থায় নেহেরু নিমরাজি ছিলেন। কিন্তু ভারত ভাগ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কাশ্মীর স্বাধীন থাকলে পাকিস্তান সৈন্য পাঠিয়ে কাশ্মীর দখল করে নেবে। শেখ আব্দুল্লাহ এই আশঙ্কায় কাশ্মীরের হিন্দু ডোগরা রাজাকে ভারতে যোগদানের ঘোষণা দিতে সম্মতি দেন। তবে কতিপয় শর্তে। এই শর্তগুলো হল- কাশ্মীর ভারতের অঙ্গরাজ্য হবে না; হবে বিশেষ মর্যাদার বা স্পেশাল স্ট্যাটাস রাজ্য। পররাষ্ট্র, যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা থাকবে ভারতের হাতে। আর সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাজ্যের। কাশ্মীরের আলাদা পতাকা, আলাদা সংবিধান থাকবে এবং রাজ্যের সরকারপ্রধানকে মুখ্যমন্ত্রীর বদলে প্রধানমন্ত্রী বলা হবে। নেহেরু সরকার এসব শর্ত মেনে নেয় এবং কাশ্মীর ভারতে যোগ দেয়। রামচন্দ্র কাকের জায়গায় শেখ আব্দুল্লাহ হন প্রধানমন্ত্রী।

যে শেরে-ই-কাশ্মীর শেখ আব্দুল্লাহ তার বন্ধু নেহেরুকে এত বিশ্বাস করতেন, তিনি এক মধ্যরাতের দিল্লি-নিয়ন্ত্রিত ক্যু দ্বারা ক্ষমতা থেকে উৎখাত হন। বখশি গোলাম মুহাম্মদের অধীনে একটি তাঁবেদার সরকার ক্ষমতায় বসানো হয়। নেহেরু সরকারের পর অন্যান্য কংগ্রেস সরকার একে একে কাশ্মীরের স্পেশাল স্ট্যাটাস, তার আলাদা সংবিধান এবং স্বশাসনের সংবিধানসম্মত অধিকার সবকিছু বাতিল করে এবং রাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদটিকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ বলে ঘোষণা করা হয়। তদুপরি কাশ্মীরকে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো একটি অঙ্গরাজ্য বলেও ঘোষণা করা হয়। এতকাল পর দিল্লির বিজেপি সরকার কাশ্মীরবাসীর অবশিষ্ট অধিকার কেড়ে নেয় এবং অন্যান্য রাজ্যের যে সমমর্যাদা কাশ্মীরের ছিল, তাও বাতিল করে কাশ্মীর সমস্যার শবাধারে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। কাশ্মীরী জনগণের চাওয়া-পাওয়ার অধিকার আছে। তাই জ্বলন্ত এক অগ্নিগর্ভ হতে কাশ্মীরকে বাঁচাতে বর্তমান বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাজ করা উচিত। আল্লাহ তুমি কাশ্মীরবাসীকে রক্ষা কর। আমীন!

Magazine