কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কুরবানীর চামড়া নিয়ে কারসাজি : দরিদ্ররা হক্ব থেকে বঞ্চিত

বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারের ঈদুল আযহার কুরবানীর পশুর চামড়ার দাম স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। দেশের দ্বিতীয় প্রধান রফতানি খাত এই চামড়া শিল্প। পোশাক শিল্পের পর এ খাত থেকে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। এই শিল্পের কাঁচামালের দামে যদি ভয়াবহ রকম ধ্বস নামে, তাহলে এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়বে এটা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।

এবার গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকায় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল, সরকার নির্ধারিত এই কম দামেও চামড়া কিনেনি ব্যবসায়ীরা। বিগত বছরগুলোতে ঈদুল আযহার ছালাতের পরপরই রাজধানীসহ বড় বড় শহরে, বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় অসংখ্য খুচরা ও মওসূমী চামড়া ব্যবসায়ীর ভিড় দেখা গেলেও এবার তাদের তেমনটা দেখা মেলেনি। তাই দাম না পেয়ে অনেকেই কুরবানীর পশুর চামড়া গর্তে বা রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন, মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন। এমন ঘটনা ঘটেছে সাতক্ষীরা, খুলনা, নীলফামারী, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। যদিও তাদের এই কাজটি মোটেই ঠিক হয়নি। কেননা শুধু লবণ দিয়েই তিন মাস পর্যন্ত কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করা যায়।

অনেক ট্যানারি মালিক অর্থ সংকটের কথা বলেছেন। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি চার ব্যাংক এ খাতে প্রায় ৬০০ কোটি এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ খাতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে থাকেন। তাছাড়া মওসূমী ব্যবসায়ীরা এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে থাকেন। এত টাকা যোগানের পরও অর্থ সংকট থাকার কোনো কারণ থাকতে পারে না।

খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘চামড়ার দাম কমে যাওয়ার পেছনে ব্যবসায়িক কারসাজি রয়েছে’। আবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেছেন, ‘চামড়ার দাম নিয়ে সিন্ডিকেটের বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে জানা দরকার’।

এ দিকে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ব্যবসায়ীরা কম দামে চামড়া কিনতে পারায় এবং কাঁচা চামড়া বিদেশে রফতানির অনুমতি মেলায় প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বেশি অতিরিক্ত লাভ যাবে আড়তদার, ট্যানারি মালিক ও ব্যবসায়ীদের পকেটে। শ্লিষ্ট ঈদের পর ১৪ই আগস্ট, ২০১৯ তারিখে ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, কাঁচা চামড়া রফতানির সরকারি সিদ্ধান্তে শতভাগ দেশীয় চামড়া শিল্প হুমকির মুখে পড়বে। এ খাতে সাত হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়বে। কাঁচা মাল না পেলে এ শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত বিপুল জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে যাবে, দেখা দিতে পারে শ্রমিক অসন্তোষও। তাই কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবী জানিয়েছে সংগঠনটি।

আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের চামড়ার চাহিদা বেশি। কেননা এ দেশের প্রতিটি গরু কিংবা পশু যবেহ করার পর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু ভারতে চামড়ার বিশাল একটি অংশ সংগ্রহ করা হয় মৃত গরু থেকে। এতে করে চামড়ার মান খারাপ হয়ে থাকে। তারপরও ভারতের চামড়ার মূল্য আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। কেননা ভারতে প্রতি বর্গফুট কাঁচা চামড়ার দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা হলেও বাংলাদেশে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ টাকা। আর এই ব্যবধান কমিয়ে আনতে না পারলে সে দেশে চামড়া পাচার কোনোভাবে রোধ করাও যাবে না। সবকিছু বিবেচনা করলে দেখা যায়, ভারতের সাথে আমাদের প্রতি পিস চামড়ার মূল্যে পার্থক্য প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। তাহলে প্রশ্ন হল, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম হলে ভারত বেশি দামে চামড়া ক্রয় করে কীভাবে? সত্যিকার অর্থে সিন্ডিকেট ইচ্ছা করেই এ ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছে।

সারা বছরই যবেহ করা গবাদি পশু থেকে চামড়া আসে। তবে মুসলিম প্রধান এই দেশে ঈদুল আযহার সময় প্রায় ৪০ শতাংশ চামড়া আসে। আর কুরবানীর ঈদে যেসব পশু যবেহ হয়, তার চামড়া গরীবদের মধ্যে ছাদাক্বাহ হিসাবে বিলিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব প্রত্যেক কুরবানী দাতার। ইসলামধর্মে বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যেন গরীবের হক্ব নষ্ট না করা হয়। কিন্তু ৫৫-৫৬ জন মানুষের সিন্ডিকেটের হাতে দেশের সমগ্র চামড়া শিল্প কুক্ষিগত থাকায় এবারে দরিদ্র জনগণ তাদের প্রাপ্য হক্ব বা অধিকার থেকে বঞ্চিত হল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এবার চামড়ার বাজারে ধ্বস নামার কারণে দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রায় ৫০০ কোটি টাকা সহায়তা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে। চামড়াশিল্প খাতে এই যে ‘নাটকীয়তা’, তার শেষ কি হবে না?

Magazine