গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অমুসলিম চিন্তাবিদদের অমর বাণী :
যারা গণতন্ত্রের স্রষ্টা তাদের অনেকেই এখন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, যখন তার কুফল প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। আর অনেক শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ সবসময়ই গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। যেমন-
(ক) প্রাচীনকালের প্রখ্যাত মনীষী ও দার্শনিকগণ যেমন প্লেটো ও এরিস্টটল গণতন্ত্রকে মুর্খের ও অযোগ্যের শাসন ব্যবস্থা বলে অভিহিত করেছেন।[1]
(খ) এমিল ফ্যাগুয়ে বলেন, ‘গণতন্ত্র অক্ষমতার শাসন প্রণালী’ (The cult of Incompetence).
(গ) লেকির মতে, ‘গণতন্ত্র হচ্ছে সর্বাপেক্ষা দরিদ্র, অজ্ঞ ও অকর্মণ্য ব্যক্তির সরকার। কারণ এ শ্রেণির লোকই সর্বাধিক’।
(ঘ) কার্লাইল উপহাস ছলে গণতন্ত্রকে ‘নির্বোধের রাজত্ব’ বলে অভিহিত করেছেন।[2]
(ঙ) ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশো বলেন, ‘সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করলে বলতে হয়, কোথাও প্রকৃত গণতন্ত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। কারণ এটা প্রাকৃতিক রীতি বিরুদ্ধ। এর নীতি হল, সংখ্যাগরিষ্ঠকে শাসন করতে হবে আর সংখ্যালঘুকে শাসিত হতে হবে’।
(চ) কানাডিয়ান রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক Henri Bourassa বলেন, ‘গণতন্ত্রের কথা বলার চেয়ে বড় প্রতারণা আর কিছুই নেই। এর শুরুটাই মিথ্যা। কোন বৃহৎ বা সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে এটা স্থায়ী হয়নি’।
(ছ) বার্ট্রান্ড রাসেল বলেন, ‘Envy is the Basis of Democracy’ অর্থাৎ ‘হিংসাই গণতন্ত্রের ভিত্তি’।
(জ) উইন্সটন চার্চিল বলেন, ‘পৃথিবীতে গণতন্ত্রই সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসন ব্যবস্থা’।
(ঝ) রাষ্ট্রবিজ্ঞানী টকভেলী বলেন, ‘গণতন্ত্রের প্রধান সমস্যা হল সংখ্যাগুরুর স্বৈরাচার’।[3]
(ঞ) ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যাডাম প্রোজওরস্কি এবং ফার্নাডো লিমেস্কি গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, গড় মাথাপিছু আয় ১৫০০ ডলার না হলে গণতন্ত্র টেকা মুশকিল। এ দু’জন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, ‘দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গণতন্ত্র নয়। রাষ্ট্র নাকি ধনী হয়ে গেলে গণতন্ত্র অমরত্ব লাভ করে’।[4]
(ট) আমেরিকার ‘Public Interest’ পত্রিকার সম্পাদক আর্ভিং ক্রিস্টল বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে গণতন্ত্র বিশ্বজয়ে সক্ষম হবে না। বিশ্ব এ জন্য তৈরি হয়নি। গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত অত্যন্ত জটিল। কিন্তু প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবণতা এ জন্য অপরিহার্য’।
(ঠ) ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট ডাল (Robert Dahl) ১৯৮৪ সালে বলেছিলেন, ‘দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র বিস্তারের যে নীতি অনুসরণ করেছে, তা ভ্রান্ত। এ অঞ্চলের অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে অর্থ সাহায্য, উপদেশ বিতরণ বা হস্তক্ষেপের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রূপে সুসজ্জিত করা সম্ভব নয়’।
(ড) রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট প্যাকেন হাম (Robert Packen ham) বলেন, ‘তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশে অদূর ভবিষ্যতে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের ভবিষ্যত মোটেই উজ্জ্বল নয়’।[5]
ইহা ছাড়াও অসংখ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছেন।
গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে মুসলিম চিন্তাবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি :
(ক) বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রহঃ) বলেন, ‘ইসলাম ও গণতন্ত্র দু’টো বিপরীতমুখী ব্যবস্থা, যা কখনো এক হওয়ার নয়’।
(খ) মহাকবি ড. আল্লামা ইকবাল বলেছেন, ‘পালাও গণতন্ত্র থেকে, অনুগত হও জনৈক অভিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তির, একজন মানুষের চিন্তা আসে না দু’শ গাধার মস্তিষ্ক থেকে’।
(গ) আল্লামা শানক্বীতী গণতন্ত্র সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনার পর বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নীতিবিরুদ্ধ মানবরচিত বিধি-বিধান অনুসরণ করে যা শয়তান তার অনুসারীদের মাধ্যমে প্রবর্তন করেছে, তারা নিঃসন্দেহে কাফির ও মুশরিক’।[6]
গণতন্ত্র বনাম ইসলামী খিলাফত :
(ক) গণতন্ত্র মানে হল, মানুষের সৃষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা। পক্ষান্তরে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠা মানে হল, আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান প্রতিষ্ঠা করা।
(খ) গণতন্ত্রের মূল থিওরী হল, যেভাবেই হোক মানুষকে সন্তুষ্ট করা। আর ইসলামী খিলাফতের মূল থিউরী হল, আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জনসেবা করা।
(গ) গণতন্ত্র ক্ষণস্থায়ী এবং এর বিধান ও নীতি পরিবর্তনশীল। গণতন্ত্রের আইন-ক্বানূন একেক দেশে একেক রকম। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সংবিধান এ পর্যন্ত ১৬ বার সংশোধন করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলামের বিধান ও নীতি ক্বিয়ামতের আগ পর্যন্ত অপরিবর্তনশীল এবং সকল দেশে একই রকম।
(ঘ) গণতন্ত্রে সত্য-মিথ্যার মানদ- হল, এক শ্রেণির মানুষ। পক্ষান্তরে ইসলামে সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড হলেন, মহান আল্লাহ।
(ঙ) গণতন্ত্রে জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। পক্ষান্তরে ইসলামী খিলাফতে সকল ক্ষমতার উৎস মহান আল্লাহ (বাক্বারাহ ২/১৬৫; আন‘আম ৬/৫৭; ইউসুফ ১২/৪০)।
(চ) গণতন্ত্রে সার্বভৌমত্বের (Sovereignty) মালিক জনগণ। পক্ষান্তরে ইসলামী খিলাফতে সার্বভৌমত্বের মালিক হলেন মহান আল্লাহ (আলে ইমরান ৩/২৬)।
(ছ) গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ তথা অধিকাংশ জনগণের রায়ই চূড়ান্ত। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে ‘(হে নবী) তুমি যদি অধিকাংশ লোকের রায়কে মেনে নাও, তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহ্র পথ হতে বিচ্যুত করে ফেলবে। তারা কেবল কল্পনারই অনুসরণ করে থাকে এবং কেবলমাত্র অনুমানই করে থাকে’ (আন‘আম ৬/১১৬)।
(জ) গণতন্ত্র সূদভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করে। পক্ষান্তরে আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে বৈধ এবং সূদকে হারাম ঘোষণা করেছেন (বাক্বারাহ ২/২৭৫)।
(ঝ) গণতন্ত্রে বেশ্যাবৃত্তিকে লাইসেন্স দিয়ে বৈধ ঘোষণা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ২২ টিরও বেশী সরকারী নিবন্ধনধারী বেশ্যালয় রয়েছে।[7]
পক্ষান্তরে ইসলামী খিলাফতে যেনা-ব্যভিচার শাস্তিযোগ্য অপরাধ (নূর ২৪/০২)।
(ঞ) গণতন্ত্রে মানুষ মানুষের দাসত্ব করতে বাধ্য। পক্ষান্তরে ইসলামে মানুষ কেবল আল্লাহ্র দাসত্ব করতে বাধ্য। সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা! এখানে একটি ছোট্ট কথা বলে রাখি, যদি কোন অমুসলিম ব্যক্তি ইসলাম সম্বন্ধে জানতে চেয়ে আপনাকে প্রশ্ন করেন যে, ‘মুহাম্মদ (ছাঃ)-এর মিশনে কী এমন ছিল যে শেষ পর্যন্ত মক্কার সমাজপতিরা তাঁকে হত্যা করতে চাইল? অথচ প্রচলিত ধারণামতে তো ইসলাম শান্তির ধর্ম!’ তখন আপনার কাঙ্ক্ষিত ও সঙ্গত জবাব কী হবে? তবে আমার জবাব হবে- ‘মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্বের অবসান বা মানুষের দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়াই ছিল তাঁর মিশনের প্রধান ও ব্যাপক লক্ষ্য’।
(ট) গণতন্ত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রার্থী নিজের সুনাম এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর কুৎসা রটায়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা পাপ ও বাড়াবাড়িতে একে অন্যের সহযোগিতা কর না’ (মায়েদাহ ৫/০২)।
(ঠ) গণতন্ত্র মানুষকে দলে দলে বিভক্ত করে দেয় অর্থাৎ মানুষের মধ্যে অনেকগুলো দল তৈরি করে দেয়। পক্ষান্তরে ইসলামে দলে দলে বিভক্ত হওয়া হারাম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সকলে আল্লাহ্র রজ্জুকে সুদৃঢ় হসেত্ম ধারণ কর এবং দলে দলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেওনা’ (আলে ইমরান ৩/১০৩)।
তাইতো মহাকবি ড. আল্লামা ইকবাল বলেছেন, ‘দলীয় বিভক্তি ও অনৈক্যের ভিত্তি গুঁড়িয়ে দাও, রসম-রেওয়াজের সিলসিলাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দাও। কারণ এটাই দ্বীনের নির্দেশ; এখানেই রয়েছে বিজয়ের দরজা, যার ফলে সমগ্র পৃথিবীতে তাওহীদের বার্তা চির উন্মুক্ত হবে’।[8]
(ড) গণতন্ত্রে মত প্রকাশে, ভোট দানে ও নির্বাচনে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার। পক্ষান্তরে ইসলামে মানুষ হিসাবে সকলে সাধারণভাবে মৌলিক অধিকার ভোগ করবে কিন্তু যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও তাক্বওয়ার ভিত্তিতে গুণীজনেরা বিশেষ মূল্যায়িত হন।
(ঢ) গণতান্ত্রিক বিশ্বাসে ধর্ম অবশ্যই রাজনীতি বিবর্জিত অর্থাৎ ধর্মীয় রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে আলাদা। পক্ষান্তরে ইসলামী বিধি-বিধান দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা ইসলামী খিলাফতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
(ণ) সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পনের নাম গণতন্ত্র। পক্ষান্তরে আল্লাহ্র প্রতি আত্মসমর্পনের নাম হল ইসলাম।
ইহা ছাড়াও গণতন্ত্র ও ইসলামী খিলাফতের মধ্যে এরকম লাখো পার্থক্য রয়েছে, যা জ্ঞানী পাঠক মাত্রই বুঝতে পেরেছেন।
একটি যরূরী জ্ঞাতব্য :
আল্লাহ্র দেয়া নির্ধারিত পথ খিলাফত প্রতিষ্ঠা ছাড়া মানুষের গড়া মতবাদ গণতন্ত্র দিয়ে কস্মিনকালেও ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র ছাড়া ইসলামের বিজয় সম্ভব নয়, এটা গ- মূর্খ ও মাতালদের বক্তব্য। তাদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে ইসলাম এইমাত্র নাযিল হল। তাই মেরুদ-হীন গণতন্ত্রের কাছে ধর্ণা দিতে হবে। অথচ গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছে কিছুদিন আগে। আর এই সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কিতাব মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাযিল হয়েছে প্রায় দেড় হাযার বছর আগে। আল্লাহ বলেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম আর তোমাদের উপর আমার নে‘মত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীনরূপে (জীবন ব্যবস্থা রূপে) ইসলামকেই মনোনীত করলাম’ (আলে মায়েদাহ ৫/৩)।
সুতরাং, আজ যারা খিলাফত ব্যবস্থার পরিবর্তে গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারা কি তাহলে খিলাফত ব্যবস্থাকে বর্তমান বিশ্বের জন্য বেমানান মনে করে না?
আবার, আরেকদল লোক নামে-বেনামে জিহাদের অপব্যাখ্যা করে জঙ্গীবাদী রাজনীতি শুরু করেছে সুকৌশলে দুনিয়া থেকে ইসলামকে মিটিয়ে ফেলার জন্য। তাদের বক্তব্য হল, ‘রাষ্ট্রক্ষমতা ছাড়া ইসলামের বিজয় সম্ভব নয়। সুতরাং, যেকোনভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে হবে। অতঃপর ইসলামের বিজয় আনতে হবে’। অথচ ইসলাম তা কখনোই সমর্থন করে না। নবী-রাসূলগণের নীতি হল, আক্বীদা ও আমল সংশোধনের মাধ্যমে আল্লাহ্র বান্দাকে মুওয়াহ্হিদ বা খাঁটি তাওহীদপন্থী হিসাবে গড়ে তোলা। এই প্রক্রিয়ায় আল্লাহ চাইলে তাঁর দ্বীনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা দান করবেন। যেমন- দাওয়াতী কাজের সূচনালগ্নেই মক্কার কাফির-মুশরিক নেতৃবৃন্দ মুহাম্মদ (ছাঃ)-এর উপর রাষ্ট্রক্ষমতা অর্পণ করতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছিলেন। পরে দাওয়াতী কাজের মাধ্যমে মানুষের আক্বীদা ও আমল সংশোধন করে মদীনায় গিয়ে পূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মূলকথা, আক্বীদা ও আমল সংস্কারের মৌলিক পথের অনুসরণ করেই নবী-রাসূলগণ দ্বীন ক্বায়েমের দায়িত্ব পালন করেছেন।
সুপ্রিয় পাঠক-পাঠিকা! ‘উপনিবেশোত্তর মুসলিম দেশগুলোর স্বৈরাচার, ইসলাম বিরোধী আচরণ ও বিধি-বিধান, ধার্মিক মানুষের প্রতি অত্যাচার ইত্যাদির প্রেক্ষাপটে অনেক আবেগী মুসলিমই অনুভব করেন যে, তার দেশটি একটি অনৈসলামিক দেশ এবং এদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবী। আবেগ তাড়িত মতামত বা কর্ম জাগতিক ফল বা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক নয়। আবেগ যাই বলুক না কেন, আমাদেরকে আবেগমুক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কুরআন-হাদীছের সামগ্রিক নির্দেশনা, ইসলামের ইতিহাসের সকল যুগের রাষ্ট্রগুলির ব্যবস্থা, তাবেঈ ও তৎপরবর্তী আলিমগণের মতামতের আলোকে আমরা সুনিশ্চিত বুঝতে পারি যে, সমকালীন মুসলিম দেশগুলোকে কাফির রাষ্ট্র বলে গণ্য করার কোন সুযোগ নেই। সমকালীন কোন কোন গবেষক মুসলিম রাষ্ট্র ও ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। এ পার্থক্য একান্তই গবেষণা। ইসলামী শরী‘আতের বিধান প্রদানের ক্ষেত্রে এ পার্থক্যের কোনই গুরুত্ব নেই। শরী‘আতের বিধানের আলোকে এগুলো সবই দারুল ইসলাম। আল্লাহ্র পথে দাওয়াত বা ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধের অংশ হিসাবে মুমিন এ সকল রাষ্ট্রের অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন; সংশোধনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন, কিন্তু কখনোই রাষ্ট্রীয় আনুগত্য পরিত্যাগ করবেন না বা রাষ্ট্রদ্রোহীতায় লিপ্ত হবেন না’।[9]
অতএব, মুসলিম জাতি কথিত আইএস, তালেবান, বোকো হারাম প্রভৃতি ভ্রান্ত দল থেকে সাবধানতা অবলম্বন করুন- এখনই সময়।
জাতির আমল ও আক্বীদা সংশোধন না করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় গিয়ে যে ইসলাম ক্বায়েম করা সম্ভব নয়-তার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছেন মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। আর সাম্প্রতিককালের এ উদাহরণ আমাদের সামনে আরও স্পষ্ট করে দিলেন বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র জনাব আবু তাহের। গত ১৫ অক্টোবর ২০১৭ রবিবার সন্ধ্যায় লক্ষ্মীপুর পৌর মেয়র জনাব আবু তাহের প্রতি ওয়াক্ত ছালাতের সময় শহরের সকল দোকানপাট বন্ধ রাখার কড়া নির্দেশ দিয়ে মাইকিং করান। এর পরেই চলতে থাকে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেই একে দ্বিতীয় সঊদী আরব বলেও অভিহিত করেছেন। কিন্তু ভিন্ন ধর্মাবলম্বীসহ অনেক মুসলিম ব্যবসায়ী মেয়রের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। সিদ্ধান্তটি নিয়ে ব্যাপক গণঅসন্তোষ দেখা দিলে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) হোমায়রা বেগম ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ১৬ অক্টোবর ২০১৭ সোমবার রাতে মেয়র আবু তাহেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেন। নোটিশের জবাবে মেয়র তাঁর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেন এবং মঙ্গলবার আবারও মাইকিং করে দোকান খোলা রাখতে বলেন।[10]
সম্মানিত পাঠক-পাঠিকা!
জনাব মেয়র ছাহেব এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে, জনগণের আক্বীদা পরিবর্তন ব্যতিরেকে মানবরচিত মতবাদ ‘জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস’ এই নীতিতে অর্থাৎ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের ভোট লুফে নিয়ে ক্ষমতায় বসে জনগণের ওপর জোর করে ইসলামী বিধান চাপিয়ে দিলে তার ফল শুভ হয় না।
উলেস্নখ্য, ‘কোন মুসলিম যখন অমুসলিম দেশে বসবাস করবে, তখন সে দেশের সরকারের কাছ থেকে নিজের ধর্মীয় অধিকার আদায়ের জন্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে চেষ্টা করবে। না পারলে ছবর (ধৈর্যধারণ) করবে ও আল্লাহ্র নিকট এর বদলা কামনা করবে। পক্ষান্তরে মুসলিম দেশে বাস করেও কোন মুসলিম সরকার যদি ইসলামী বিধান মোতাবেক দেশ শাসন না করে, তবে উক্ত সরকারকে যেমন সৎ পরামর্শ দিতে হবে ও নছীহত করতে হবে, তেমনি সাধারণ জনগণকে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার পক্ষে উদ্বু্দ্ধ ও সচেতন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজেও পথভ্রষ্ট দাউস গোত্রের ও তাদের নেতার হেদায়াতের জন্য দো’আ করেছিলেন’।[11]
‘তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শাসকদের কাছে পত্র ও দূত প্রেরণ করেছেন’।[12]
স্মরণীয় যে, ‘অত্যাচারী শাসক যতদিন পর্যন্ত ছালাত আদায় করবে, ততদিন তার আনুগত্য করা যাবে। অত্যাচারী শাসক যদি অন্যায়ভাবে প্রহার করে কিংবা অর্থ-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়, তবুও তার আনুগত্য করতে হবে। হরতাল করে, গাড়ী ভাঙচুর করে, বিভিন্নভাবে ধর্মঘট করে, দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে কোন সরকারকে অপসারণ করা শরী‘আতে আদৌ জায়েয নয়’।[13]
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! আমি এই মুহূর্তে দু’জন অমুসলিম পণ্ডিতের বাণী উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারলাম না। তা হল- সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছেন, ‘একমাত্র কুরআনই সত্য এবং মানবকে সুখ ও শান্তির পথে পরিচালিত করতে সক্ষম’। আর গুরুনানক বলেছেন, ‘বেদ ও পুরাণের যুগ শেষ হয়ে গেছে; এখন দুনিয়াকে পরিচালনা করার জন্য কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ’।[14]
অতএব, আসুন! প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ও জঙ্গীবাদী রাজনীতিকে পাত্তা না দিয়ে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পেছনে ব্যর্থ পরিশ্রম না দিয়ে আগে জাতির আমল ও আকবীদা সংশোধনে ব্রতী হই। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!!
উপসংহার :
গণতন্ত্রের নামে দুনিয়ায় যত শোরগোল উঠেছে, মানুষের জীবনে দুঃখ ও দৈন্য ততই বেড়েছে। এমনকি সত্য কথা এই যে, গণতন্ত্রের হোতারাই মানুষকে দুঃখ ও দৈন্যের মুখে ঠেলে দিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। আর হতভাগ্য মানুষ একেই স্বাধীনতা ও স্বাধিকার ভেবে গণতন্ত্রের জন্য প্রাণপাত করছে। অথচ কাঙ্খিত সুখ ও শান্তির মুখ তারা কোনদিনই দেখতে পাচ্ছেন না, তা চিরকাল শুধু সোনার হরিণ রূপে ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। তাই আলোচনার শেষ বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে বলছি- রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও ‘গণতন্ত্র আমার ভালো লাগে না’।
[1]. দাখিল বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়: নবম-দশম শ্রেণি, পুনর্মুদ্রণ: সেপ্টেম্বর ২০১৬, অষ্টম অধ্যায়, পৃঃ ১১৯।
[2]. (খ, গ ও ঘ) পৌরনীতি ও সুশাসন- প্রথম পত্র (প্রফেসর মো: মোজাম্মেল হক): একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি, হাসান বুক হাউস- ঢাকা, চতুর্থ সংস্করণ: জুন ২০১৬, সপ্তম অধ্যায়, পৃঃ ২২৯।
[3]. (ঙ-ঝ) মুযাফফর বিন মুহসিন, ভ্রান্তির বেড়াজালে ইক্বামতে দ্বীন (প্রকাশক: বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, দ্বিতীয় সংস্করণ: জুলাই ২০১৪), পৃঃ ২১৮-২১৯।
[4].Link:m.banglatribune.com/columns/opinion/76995.
[5]. (ট-ড) দৈনিক নয়াদিগমত্ম, ১ নভেম্বর ২০১৫, (গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ- এমাজউদ্দীন আহমদ)।
[6]. (ক-গ) শায়খ মুযাফফর বিন মুহসিন, ভ্রান্তির বেড়াজালে ইক্বামতে দ্বীন (প্রকাশক: বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ, দ্বিতীয় সংস্করণ: জুলাই ২০১৪), পৃঃ ২২০-২২২।
[7]. মাসিক আল-ইতিছাম, ১ম বর্ষ, ৯ম সংখ্যা (জুলাই ২০১৭), পৃঃ ৩৩।
[8]. মুযাফফর বিন মুহসিন, আহলেহাদীছদের সংগ্রামী চেতনা (আছ-ছিরাত কম্পিউটার্স, রাজশাহী, দ্বিতীয় সংস্করণ: মাঘ ১৪১৭), পৃঃ ২৪।
[9]. ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, ২য় সংস্করণ: ফেব্রুয়ারী ২০০৯), পৃঃ ৯৩।
[10]. Link: www.globalvision24.com/34311/141; বিবিসি বাংলা: রাতের (১০:৩০ মিনিট) অধিবেশন-পরিক্রমা, ১৭-১০-২০১৭ ইং।
[11]. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, ইসলামী খিলাফত ও নেতৃত্ব নির্বাচন (রাজশাহী: হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: মুহাররম ১৪২৪ হিজরী), পৃঃ ২০-২১ ।
[12]. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৪র্থ খ-, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, প্রথম প্রকাশ: আষাঢ় ১৪১১, পৃঃ ৪৫৪।
[13]. আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ, কে বড় লাভবান (দ্বিতীয় প্রকাশ: পৌষ ১৪১৮ বঙ্গাব্দ), পৃঃ ১৮৮।
[14]. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর, ইসলামের বিরুদ্ধে তথ্য সন্ত্রাস (রাজশাহী: আছ-ছিরাত প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ: ফেব্রম্নয়ারী ২০১৪ ঈসায়ী), পৃঃ ৭৮-৭৯।
