কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

শিশুদের মোবাইল আসক্তির কারণ ও প্রতিকার

post title will place here

বর্তমান আধুনিক বিশ্বে মোবাইল আমাদের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার কারণে ছোট বড় সবার হাতে হাতে আজ স্মার্টফোন। কিন্তু এই স্মার্টফোন আমাদের স্মার্ট করলেও বর্তমান সময়ের শিশুদের জন্য আজ তা কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই স্মার্টফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে মোবাইলের ভয়ংকর আসক্তি দেখা দিয়েছে। যা ধর্মীয় ও সুস্থ মানসিক বিকাশের অন্তরায়। তাই শিশুদের মোবাইল আসক্তির কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে আমাদের জানা জরুরী।

শিশুদের মোবাইল আসক্তির কারণ:

শিশুরা মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়ার অনেক কারণ রয়েছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে মোবাইল ফোন ও ট্যাবলেট শিশুদের জন্য খুবই আকর্ষণীয় একটি খেলনা হয়ে উঠেছে। কিন্তু মোবাইলই কেন তাদের খেলার বা বিনোদনের মূল উৎস তা জানা জরুরী।

১. মোবাইলের আকর্ষণ: বর্তমান সময়ে মোবাইলে অনেক চিত্তাকর্ষক উপাদান বিদ্যমান। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের গেমস, নানান ধরনের ভিডিও, সোশ্যাল মিডিয়াসহ শিশুদের আকর্ষণ করে এমন হাজারো বিষয় রয়েছে, যা এখন মোবাইলে পাওয়া যায়। যেকারণে শিশুরা খেলাধুলার পরিবর্তে বিনোদন হিসেবে মোবাইলকে বেছে নিচ্ছে।

২. বাবা-মায়ের ব্যস্ততা: আকর্ষণীয় বিষয়ে শিশুদের আগ্রহ থাকবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের বাবা-মায়েদের ব্যস্ততার কারণেই মূলত শিশুরা মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়ছে বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের ব্যস্ততার কারণে শিশুরা একা থাকে তাই মোবাইলই তাদের একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

৩. সামাজিক চাপ: মোবাইলটা আজকাল ফ্যাশন না হলেও শিশুদের ক্ষেত্রে এটা একধরনের গর্বের বিষয়। তাই সমবয়সি শিশুরা মোবাইল ব্যবহার করলে তা যেকোনো শিশুর কাছে ঈর্ষার বস্তু। তাই বন্ধুদের মধ্যে মোবাইল ব্যবহারের প্রতিযোগিতা শিশুদের মোবাইলে আসক্তি বাড়িয়ে দেয়।

৪. করোনার প্রভাব: শিশুদের বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের হাতে মোবাইল বেশি পৌঁছে গেছে করোনার সময়। ঐ সময় পুরো পৃথিবী স্থবির হয়ে পড়েছিল। পড়াশোনা, চাকরিবাকরি, বাইরে যাওয়া-আসা সবকিছুই একপ্রকার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে পুরো পরিবার যখন ঘরবন্দী হয়ে গেছে, তখন মোবাইল ছাড়া সময় কাটানোর আর কোনো বিকল্প ছিল না। এই করোনাকালীন সময়টি একটি প্রজন্মকে মোবাইলবন্দী করে দিয়ে গেছে। যার প্রভাব এখনো পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ।

৫. পড়াশোনায় তথ্য-প্রযুক্তি: দিনদিন তথ্য-প্রযুক্তির উন্নতির কারণে পড়াশোনায় ব্যাপকভাবে মোবাইলের ব্যবহার বেড়ে গেছে। বিশেষ করে করোনাকালীন এবং করোনা পরবর্তী সময়ে পড়াশোনায় মোবাইল ব্যবহার হচ্ছে। যার ফলে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্টের জন্য প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীকে বাধ্যতামূলক মোবাইল ব্যবহার করতে হচ্ছে। একইসাথে অনলাইন ক্লাসের কারণেও শিক্ষার্থীদের মোবাইল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এছাড়াও স্কুল-কলেজের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের জন্যও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোবাইল ব্যবহার বাধ্যতামূলক হওয়ায় শিশুরা মোবাইলকে শিক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করছে।

৬. পরিবারের অন্যদের মোবাইল ব্যবহার: আজকাল পরিবারের প্রায় প্রতিটি সদস্যদের কাছে মোবাইল রয়েছে। ফলে তারা শিশুদের সময় না দিয়ে মোবাইলে বেশি সময় দেয়। যা শিশুরা অনুকরণ করে এবং তারাও মোবাইল ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

৭. মস্তিষ্কের বিক্রিয়া: মোবাইলে গেম খেলা বা ভিডিও দেখার সময় মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন নামক একধরনের রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা মানুষকে আনন্দ দেয় এবং আবারো মোবাইল ব্যবহার করার ইচ্ছা জাগায়। ফলে কোনো শিশু একবার মোবাইলে মজা পেয়ে গেলে তা বারবার দেখার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে।

শিশুদের মোবাইল আসক্তির ক্ষতিকর দিক:

শিশুদের মোবাইল আসক্তি একটি গুরুতর সমস্যা, যা তাদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলে। যেমন—

১. চোখের সমস্যা: দীর্ঘক্ষণ মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকানোর ফলে চোখের পেশি ক্লান্ত হয়ে যায়, চোখের আর্দ্রতা কমিয়ে শুষ্ক করে তুলে, ফলে ক্রমান্বয়ে দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। আর তাই বর্তমান সময়ে শিশুদের চোখে অতিরিক্ত চশমা পরার প্রবণতা বেড়ে গেছে।

২. ঘুমের সমস্যা: মোবাইলের আলো এবং নোটিফিকেশন মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে, ফলে শিশুরা ভালো করে ঘুমাতে পারে না। এর ফলে তাদের মনোযোগ কমে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয় এবং শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।

৩. শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: মোবাইলে ব্যস্ত থাকার কারণে শিশুরা খেলাধুলা, বাইরে বের হওয়া ইত্যাদি শারীরিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে। ফলে তাদের শরীর সুস্থ থাকে না এবং মোটা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

৪. মেরুদণ্ডের সমস্যা: দীর্ঘ সময় একই পোজে বসে মোবাইল ব্যবহার করার ফলে মেরুদণ্ডে ব্যথা এবং অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৫. মনোযোগ ঘাটতি: মোবাইলের নানা ধরনের বিজ্ঞাপন এবং নোটিফিকেশন শিশুর মনোযোগ কেড়ে নেয়। একইসাথে নিত্যনতুন গেমস খেলা বা গেমসের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য তাদের মন সবসময়ই উতলা হয়ে থাকে। যারা নিয়মিত ভিডিও দেখে, তারা ভিডিও দেখার জন্য সবসময়ই ছটফট করতে থাকে। এইসব কারণে তারা পড়াশোনা বা অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারে না।

৬. উদ্বেগ ও বিষণ্নতা: যারা অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইন গেম খেলে, তাদের বেশিরভাগই উদ্বিগ্ন ও বিষণ্ন হয়ে পড়ে।

৭. একাকিত্ব: মানুষ সামাজিক জীব। সে তার আশেপাশের মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যারা একাকী বাসায় থাকার কারণে বাস্তব জীবনের বন্ধুদের সাথে সময় কাটানোর পরিবর্তে মোবাইলে ব্যস্ত থাকে, সেইসব শিশু একসময় একাকিত্ব বোধ করে।

৮. আগ্রাসী আচরণ: বর্তমান সময়ের অধিকাংশ গেমই হচ্ছে চ্যালেঞ্জিং, দুর্ধর্ষ এবং ধ্বংসাত্মক। এইসব ভয়ংকর আগ্রাসী ভিডিও গেমস এবং অনলাইন কনটেন্টের প্রভাবে শিশুদের আচরণ ধীরে ধীরে আগ্রাসী হয়ে ওঠে।

৯. খিটখিটে মেজাজ: বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইলে আসক্ত শিশুদের ঘনঘন মেজাজ পরিবর্তন হয়। কোনো কারণ ছাড়াই রেগে যাওয়া, অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত ঘুম, মনোযোগ হারিয়ে ফেলা, ভুলে যাওয়া, পরিপূর্ণ ভাষার দক্ষতা না হওয়া এবং সহোদর ভাইবোন, বাবা-মা, সহপাঠী ও বন্ধুদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাসহ বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি হয়।

১০. অসামাজিক জীবনযাপন: বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগের পরিবর্তে ভার্চুয়াল জগতে সময় ব্যয় করার কারণে শিশুরা সামাজিক দক্ষতা হারিয়ে ফেলে। মোবাইলে সময় দেওয়ার কারণে শিশুরা তাদের সমবয়সিদের সাথে মেলামেশার সুযোগ পায় না। ফলে তারা ছোট বড় সমবয়সি ইত্যাদি পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে তা শিখতে পারে না। এতে শিশুদের মধ্যে অন্যের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে জড়তা দেখা দেয়। আর তাই মোবাইলে সময় দেওয়া শিশুরা দিনদিন অসামাজিক হয়ে বড় হয়।

১১. পরিবারের সাথে সম্পর্কের অবনতি: যেসব পরিবারের অভিভাবকরা শিশুদের সময় দিতে পারে না, তারা মোবাইলে ব্যস্ত থাকে। আর মোবাইলে ব্যস্ত থাকার ফলে ঐ শিশুরা পরিবারের সদস্যদের সাথে যথেষ্ট সময় কাটাতে পারে না। এতে ধীরে ধীরে পরিবারের সাথে সন্তানদের পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

১২. শিক্ষায় মনোযোগ কমে যাওয়া: মোবাইলে ব্যস্ত থাকার কারণে শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না। তাদের মধ্যে সারাক্ষণ একধরনের অস্থিরতা কাজ করে। ফলে তারা পড়াশোনায় খারাপ করতে থাকে এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।

১৩. অশ্লীলতা: ছোট বড় সকলেরই অশ্লীলতার প্রতি আগ্রহ থাকবে এটা স্বাভাবিক। স্মার্টফোনে চাইলেই যে কেউ যা ইচ্ছা তাই দেখতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়াগুলো এমনভাবে রোবটিং করা হয়, যাতে যে একবার যা দেখে তা তাকে বার বার দেখায়। ফলে কেউ কোনো কারণে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে একবার অশ্লীল কিছু দেখে, তাহলে সোশ্যাল মিডিয়া তাকে একই রকম কন্টেন্ট বারবার দেখাবে। ফলে শিশুরা একবার অশ্লীলতায় জড়িয়ে গেলে তারা তা বারবার দেখার লোভ সামলাতে পারে না। আর এভাবে কোমলমতি শিশুরা সবার নজর এড়িয়ে নানান অশ্লীল কন্টেন্টে জড়িয়ে যায়।

১৪. চাইল্ড বুলিং এর শিকার: শিশুরা যখন মোবাইল ব্যবহার করে, তখন তারা বুঝে না বুঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় জড়িয়ে যায়। আর এই সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে শিশুরা নানান ধরনের বুলিং এর শিকার হয়। যা তারা বড়দের কাছে বলতে পারে না। একসময় এইসব বুলিং তাদেরকে মানসিক সমস্যার দিকে ঠেলে দেয়।

১৫. যৌনতার দিকে ধাবিত হওয়া: ১২-১৩ বছরের কিশোর-কিশোরীরা যৌবনের প্রারম্ভে সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত হয়ে নারী-পুরুষের সম্পর্কের মেকানিজমের সাথে পরিচিত হয়ে যায়। ফলে তারা নিজেদেরকে প্রাপ্তবয়স্কদের সারিতে তুলনা করে। এতে করে ধীরে ধীরে তারা নিষিদ্ধ যৌনতার বিষয়গুলো নিরীক্ষণ করতে থাকে। যা তাদেরকে এক পর্যায়ে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

১৬. জুয়ার আসক্তি: বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে জুয়ার বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি। গেমস খেলার ছলে শিশুরা না চাইলেও বিভিন্ন ধরনের জুয়ায় জড়িয়ে পড়ে। ফলে তারা ভালো-মন্দ বুঝার আগেই জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে।

১৭. অপরাধ প্রবণতা: শিশুরা মোবাইলে সময় পার করার কারণে নানান ধরনের অপরাধমূলক কন্টেন্টের সাথে পরিচিত হয়। এইসব অপরাধমূলক কন্টেন্টের প্রভাবে শিশুদের মধ্যে ভায়োলেন্সের মানসিকতা তৈরি হয়। যা তাদেরকে কিশোর অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়।

শিশুদের মোবাইল আসক্তি কমানোর উপায়:

আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে চাইলে শিশুদের মোবাইল আসক্তি কমাতে পারি।

১. কারণ নির্ধারণ: শিশু কেন মোবাইল ব্যবহার করে, সেটা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। হয়তো সে একাকিত্ববোধ করছে বা নতুন কিছু শিখতে চায়। কিংবা সে খারাপ কিছুতে জড়িয়ে গেছে ইত্যাদি। আমরা যদি তার মোবাইল ব্যবহারের কারণ উদ্ঘাটন করতে পারি, তাহলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে আমাদের জন্য সহজ হবে।

২. শিশুর সাথে সময় কাটানো: শিশুর সাথে খেলাধুলা, বই পড়া, গল্প করা ইত্যাদি করার মাধ্যমে তাকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। যাতে করে তার মোবাইলের প্রতি আকর্ষণ কমানো যায়।

৩. মোবাইল ব্যবহারের সময় নির্ধারণ: অভিভাবকদের অবশ্যই একটি রুটিন ফলো করতে হবে। যেখানে খাওয়া-দাওয়া, পড়া-শোনা, খেলাধুলাসহ মোবাইল ব্যবহারেরও নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ থাকবে। অর্থাৎ শিশু কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া।

৪. মোবাইলে উপযুক্ত কনটেন্ট: শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক হচ্ছে অনুপযুক্ত কন্টেন্ট। শিশুরা তাদের বয়সের উপযুক্ত কন্টেন্ট দেখলে তাতে শেখার অনেক কিছুই থাকবে। তাই তাদেরকে মোবাইল আসক্তি থেকে কমানোর জন্য তাদের উপযুক্ত কন্টেন্টের ব্যবস্থা করতে হবে। একইসাথে শিশুদের বয়সের উপযোগী শিক্ষামূলক অ্যাপস ব্যবহার করে শিশুর শেখার প্রক্রিয়াকে মজাদার করে তুলতে হবে।

৫. সৃজনশীল কাজে উৎসাহ: দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততায় আমাদের কাছে মোবাইলের বিকল্প কিছু থাকে না বলেই শিশুরা মোবাইল ব্যবহার করে। তাই আমাদের অবশ্যই মোবাইলের বিকল্প সৃজনশীল নানান কাজে তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যাতে তারা সৃজনশীল কাজের মধ্যে আনন্দ পেয়ে তাতে ব্যস্ত থাকে।

৬. ধর্মীয় অনুশাসন: ইসলামে রয়েছে শান্তি, অর্থাৎ পরিবারে সঠিকভাবে ইসলাম পালন করলে অবশ্যই সেখানে শান্তি আসবে। তাই আমরা যদি পরিবারগুলোতে ইসলামের সঠিক চর্চা করি, তাহলে শিশুরা অবশ্যই ইসলামিক পরিবেশে বেড়ে উঠবে। যেখানে অহেতুক অপ্রয়োজনে বিনোদনের জন্য মোবাইল ব্যবহার করা হবে না। সুন্দর ধর্মীয় অনুশাসনে পরিবার চললে সেখানে শিশুরা মোবাইলে আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

৭. পরিবারে মোবাইল ব্যবহার কমানো: একটি পরিবারে ছোট বড় সবাই যদি মোবাইল ব্যবহার কমিয়ে দেয়, তাহলে শিশুরা মোবাইল ব্যবহারে উৎসাহী হবে না। যদি একটা নিয়মের মধ্যে সবাই মোবাইল ব্যবহার করে, তাহলে শিশুরা মোবাইলে অতিরিক্ত আসক্ত হতে পারবে না।

৮. মোবাইল ফ্রি জোন: খাবারের সময়, ঘুমের আগে এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানোর সময় মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে। কেননা আমরা সবাই এই সময়গুলোতে বেশি মোবাইল ব্যবহার করি।

৯. পড়াশোনার চাপ কমানো: বর্তমান প্রতিযোগিতার বিশ্বে আমরা সবাই প্রতিযোগিতা নিয়েই ব্যস্ত। আর এই প্রতিযোগিতার মধ্যে আমরা আমাদের সন্তানদেরও জোর অংশগ্রহণ করাচ্ছি। ফলে তাদেরকে পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে শিশু বয়স থেকেই চাপে রাখছি। যা তাদেরকে রোবটিক জীবনে নিয়ে যাচ্ছে। এতে করে শিশুরা পড়াশোনার বাইরে সৃজনশীল কাজ কিংবা খেলাধুলা করার সময় পাচ্ছে না। ফলে তারা যে অল্প সময় পায়, তাতেই ওরা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই আমরা যদি শিশুদের পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে সৃজনশীল কাজে তাদের উদ্বুদ্ধ করি, তাহলে তাদের মোবাইল আসক্তি কমে আসবে।

১০. পুরস্কার দিন: পড়াশোনা এবং সুন্দর জীবনচর্চার জন্য শিশুদের নানান সময়ে পুরস্কৃত করতে হবে। তাই যখন শিশু মোবাইল ব্যবহার কম করে, তখন তাকে পুরস্কার দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে।

১১. ধৈর্য ধরা: আমরা হাজারো চাইলে বর্তমান তথ্য প্রযুক্তিকে এড়িয়ে যেতে পারি না। তাছাড়া পরিবেশ পরিস্থিতিও সবসময় অনুকূলে থাকে না। তাই চাইলেই হুট করে শিশুদের মোবাইল আসক্তি কমানো যাবে না। শিশুদের মোবাইল আসক্তি কমানোর জন্য সময় লাগতে পারে। তাই এক্ষেত্রে ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

১২. শাস্তি না দেওয়া: সবকিছু শাস্তি দিয়ে বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই শিশুদের মোবাইল আসক্তি কমাতে হলে তাকে শাস্তি না দিয়ে বুঝিয়ে বলতে হবে কেন মোবাইল ব্যবহার কমানো জরুরী। অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারে কী কী ক্ষতি, তা বুঝিয়ে বলে তাকে মোবাইল থেকে সরিয়ে আনতে হবে।

১৩. ঘরোয়া কাজ করানো: আগের দিনের মায়েরা ছোট থেকেই সন্তানদের ঘরোয়া নানান কাজ করাতেন। ফলে তারা ছোট থেকেই কর্মঠ হয়ে উঠত। কিন্তু আধুনিক সময়ের বাবা-মারা আদর করে সন্তানদের ঘরোয়া কাজে লাগান না। যদি তাদেরকে ঘরোয়া কাজে লাগানো যায়, তাহলে তারা মোবাইল আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।

১৪. প্রকৃতির সাথে যোগাযোগ: শিশুর মন-মানসিকতা ফ্রেশ রাখার জন্য তাকে বাইরের প্রকৃতির সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে হবে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শিশুদের নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়া তার একটি কার্যকরী উপায়। আমরা চাইলে পার্ক, চিড়িয়াখানা ইত্যাদি জায়গায় শিশুদের নিয়ে যেতে পারি।

১৫. খেলাধুলায় উৎসাহ: একসময় যখন মোবাইল ছিল না, তখন সকলেই খেলাধুলা করে সময় পার করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে চরম বাস্তবতায় আধুনিক জীবনে আমরা খেলাধুলা থেকে সরে এসেছি। ফলে শিশুরা আগের মতো খেলাধুলা না করে ভার্চ্যুয়াল জগতে খেলাধুলা করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই শিশুদের মোবাইল আসক্তি কমাতে হলে তাদেরকে আগের মতো মাঠের খেলাধুলায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

১৬. পর্যাপ্ত মাঠের ব্যবস্থা করা: শিশুরা মোবাইলমুখী হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে খেলার মাঠ কমে যাওয়া। তাই সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে শিশুদের জন্য মাঠের ব্যবস্থা করতে হবে।

১৭. উচ্চ বিলাসিতা পরিহার: শিশুদের প্রকৃত মঙ্গল চাইলে অবশ্যই অভিভাবকদের উচ্চ বিলাসিতা কমাতে হবে। বাজারে নিত্যনতুন মোবাইল আসার সাথে সাথে তা ক্রয় করা, কিংবা হাই কোয়ালিটি ফিচারযুক্ত মোবাইল ব্যবহার একধরনের উচ্চ বিলাসিতা। শিশুরা নিত্যনতুন আপডেট মোবাইল হাতে পেলে অবশ্যই তারা তা ব্যবহার করতে উৎসাহী হবে। তাই পরিবারে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুর মোবাইল ব্যবহার করা উচিত।

১৮. শিশু বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা: ইট পাথরের শহরে আমরা সবাই যান্ত্রিক হয়ে পড়েছি। ফলে দিনদিন শিশুদের জন্য খোলা জায়গা কমে যাচ্ছে। যে হারে খেলার মাঠ কমে গেছে, সেই হারে শিশুদের জন্য উপযুক্ত বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠেনি। তাই শিশুদের সময় কাটানোর জন্য হাতের নাগালে সাশ্রয়ী শিশু বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা উচিত।

১৯. শহুরে জীবন পরিহার: এটা চরম সত্য যে গ্রামের তুলনায় শহরের শিশুরা বেশি মোবাইল আসক্ত। এর কারণ শহরে শিশুদের বিনোদন ও খেলার জায়গার অভাব। তাই সন্তানকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হলে শৃঙ্খলিত শহুরে জীবন পরিহার করে গ্রাম কিংবা মফস্বলে বসবাস করা জরুরী।

শেষ কথা:

মোবাইলে আসক্ত শিশুদের হঠাৎ করে মোবাইল ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা যাবে না। তবে মোবাইল ব্যবহারের উপর নজর রাখতে হবে এবং তাকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ও ধর্মীয় অনুশাসনের শিক্ষা দ্বারা মোবাইল থেকে বের করে আনতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক্ব দান করুন।

পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম।

Magazine