ভূমিকা :
ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন সম্প্রতি শেষ হয়েছে। হুজুগের উপরে ভরসা করে এবারের সাধারণ নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি বিপুল ভোটে দ্বিতীয় মেয়াদে পুনরায় বিজয়ী হয়েছে গত ২০১৪ সালের নির্বাচনের চেয়েও আরো বেশি আসন নিয়ে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক জোটকে হারিয়ে ভারতে ক্ষমতাসীন হয় হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি। তাদের পাঁচ বছরের শাসনামলে অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ও নিপীড়নের মুখে পড়ে। গো-রক্ষার নামে মুসলিমদের ওপর বেশ কিছু নিপীড়ন, হামলা ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
গো-রক্ষার নামে মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন, হামলা ও হত্যাকাণ্ড :
ভারতের অনেক প্রদেশে গরুর গোশত বিক্রি করার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে আসামে গরুর গোশত বিক্রি করা আইনত বৈধ। তারপরেও ভারতের নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণের মাত্র কয়েকদিন আগে আসামের উত্তর-পূর্ব এলাকার মুসলিম ব্যবসায়ী শওকত আলী (৪৮)-কে দোকানে গরুর গোশত বিক্রি করার কারণে কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল মানুষ লাঠি দিয়ে মুখ, মাথা ও পাঁজরে আঘাত করে। আবার তাকে ময়লা-কাদার ওপর হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করে। তাকে জোর করে শূকরের গোশত প্রথমে চিবাতে ও পরে গিলে খেতে বাধ্য করে। শওকত আলী মারাত্মকভাবে আহত হয়।[1] গরুর গোশত বিক্রি করার কারণে বা বিক্রির সন্দেহে হামলার ঘটনা ভারতে বেড়েই চলেছে। শওকত আলীর ঘটনা এর সাম্প্রতিক উদাহরণ।
২০১৫ সালে মুহাম্মাদ আখলাক (৫০) নামের এক মুসলিমকে গরু জবাই করার সন্দেহে ইট দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হত্যাকারীদেরকে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নিতে দেখা গেছে। বিতর্কিত ও ইসলাম বিদ্বেষী এই নেতাকে মোদীর সঙ্গে বহুবার একই মঞ্চে দেখা গেছে।
মোদীর কেবিনেটের অন্যতম সদস্য জয়ন্ত সিনহা ২০১৭ সালে একজন মুসলিম গরু ব্যবসায়ীকে হত্যাকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্তদের মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচাতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অর্থ দিয়েছেন। তাই বিজেপি সরকারের সমালোচনায় লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট অরুন্ধতী রায় বলেছেন, একটি গোষ্ঠী এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস পাচ্ছে। কারণ তারা ওপর মহল থেকে সুরক্ষা কবচ পেয়েছে। তারা জানে যে, তাদের কিছুই হবে না।
রাজনৈতিক দল বিজেপির ঔদ্ধত্যপূর্ণ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য :
বিজেপি হিন্দু জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল। এ দলটিতে এমন বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা আছেন, যারা মনে করেন, ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। যদিও দলটির নেতারা বরাবরই সাফাই গেয়েছেন, তারা সংখ্যালঘু বিদ্বেষী নন। দলটির ইশতেহারে বেশ কিছু ধর্মের অনুসারীদের আশ্রয় দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এসব ধর্মের মধ্যে রয়েছে- সনাতন, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, শিখ, পার্সি এবং জৈন ধর্মাবলম্বীরা। তবে লক্ষ্য করার মত ব্যাপার হল, মুসলিমরা এই তালিকায় নেই।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’, পুতিনের ‘মেক রাশিয়া গ্রেট এগেইন’, শী জিন পিংয়ের ‘চীনের মানুষের নতুন করে জেগে ওঠা’র মতো জাতীয়তাবাদের স্নোগান এখন বিশ্বের অনেক দেশেই শুরু হয়েছে। মি. মোদীও নির্বাচনের সময় বলেছেন, রাম ছিলেন একজন আদর্শ রাজা ও তার শাসন ছিল আদর্শ ব্যবস্থা। রাম রাজ্য ছিল আমাদের প্রতিষ্ঠাতা জনক এবং বিজেপি সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে ইত্যাদি।
বিজেপির ভয়ে পালাচ্ছে মুসলিমরা :
২০১৭ সালে যোগী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সেখানকার পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপ হতে থাকে। সেখানকার মাদরাসা কেন্দ্রিক একটি মসজিদে আযান পর্যন্ত বন্ধ করে দেয় কট্টরপন্থহী হিন্দুরা। কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আর রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ আবারো ক্ষমতায় আসায় ভারতের উত্তর প্রদেশের কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের আধিপত্য চরমে। এদের নানাবিধ প্রভাবে ঘর-বাড়ী ছেড়ে পালাচ্ছে অনেক মুসলিম। উত্তর প্রদেশের নয়াবান গ্রামে মোট চার হাজার মানুষের মধ্যে ৪০০ জন মুসলিম। গত দুই বছরে তাদের মধ্যে প্রায় এক ডজন ঘর-বাড়ী ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। আরো অনেকে গ্রাম ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন। তবে সামর্থ্যের অভাবে অনেকে যেতে পারছেন না।
মুসলিম তাড়ানোর ওয়াদা, ফন্দি ও কূটকৌশল :
সাম্প্রতিক বছরে ভারতের আসাম রাজ্যে নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় বলা হয়েছে যে, ৪০ লাখ মানুষ অবৈধভাবে সেখানে বসবাস করছে, যাদের বেশিরভাগ মুসলিম। নির্বাচনের আগে বিজেপি জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে আগ্রাসী প্রচারণা চালিয়েছে। কেননা নির্বাচনের প্রচারণার সময় বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, ‘আসামের মতো নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজ পশ্চিমবঙ্গেও তারা করতে আগ্রহী’। এমনিতেই আমাদের পূর্বে ও উত্তরে বিজেপি ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। পশ্চিমবঙ্গে ভালোভাবেই থাবা বসিয়েছে তারা। বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া ‘মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের’ তাড়াবে এই ওয়াদা তাদের। এই তালিকায় আছে প্রায় ৫০ লাখ থেকে এক কোটি মানুষ। সবচেয়ে বড় বিপদ হিসাবে দেখা দেওয়ার আশঙ্কা হল, আসামের মতো পশ্চিমবঙ্গ ও অন্যান্য প্রদেশে এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স)-এর মাধ্যমে কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা। তারা যদি সত্যি সত্যিই এই বোঝা বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়, তাহলে বাংলাদেশ চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। আমাদের মনে হয়, এই বিপদটি বাংলাদেশের একার বিপদ হয়ে আসবে না; বরং গোটা উপমহাদেশ জুড়ে এর একটি ধারাবাহিক অভিঘাতের সৃষ্টি হবে ।
অভিবাসীদের যখন ‘পশু’ বলে বর্ণনা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, তখন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ (বর্তমানে যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন) বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মুসলিম অভিবাসীদের বর্ণনা করেছেন ‘উইপোকা’, ‘তেলাপোকা’, ‘সন্ত্রাসী’ বলে এবং তাদেরকে বঙ্গোপসাগরে ছুঁড়ে ফেলার অঙ্গীকার করেছেন। পাশাপাশি তিনি হিন্দু আর বৌদ্ধ শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন।
এবারের নির্বাচনের বিশেষ দিক হচ্ছে, উদার হিন্দুত্ববাদের পথে চলা সেকুলার পার্টিগুলো মুসলিমদের অচ্ছুৎ বানিয়ে রেখেছিল। এর দ্বারা অনুমান করা যেতে পারে, ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোন সেকুলার পার্টির নির্বাচনী ইশতেহারে মুসলিমদের জন্য কোন বিষয়ই ছিল না। এমনকি কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি ও রাষ্ট্রীয় জনতা দলের মতো পার্টিগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে মুসলিমদের জন্য কোন ওয়াদা করেনি। অথচ নির্বাচনী ওয়াদার বাস্তবতা সবাই জানেন।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে বিজেপি ভারতে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রাসাদটি যেদিন ধসিয়ে দিয়েছে, সেদিন থেকেই দেশটি তার ধর্মনিরপেক্ষতার রঙিন মুখোশ ঝেড়ে ফেলেছে। হয়ে উঠেছে ধর্মনির্ভর প্রগতিশীলদের ভাষায় একটি সাম্প্রদায়িক ভারত। আর এই রূপান্তরের পথে শামিল হয়েছে তথাকথিত প্রগতিশীলসহ সর্বস্তরের ভারতবাসী।
তবে সবকিছুই একটা ছক ধরে চলছে। আর তা হল- সংস্কৃতি, শিক্ষা, জ্ঞান, ঐতিহ্য সবকিছুকে দুমড়ে-মুচড়ে দাও। সবাইকে বাঁধো একটাই মতে- হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান। বিজেপির গত পাঁচ বছরের শাসন বৃহত্তর ভারতবাসীর কল্যাণ করতে পুরোটাই ব্যর্থ হয়েছে, এটি এখন স্পষ্ট। তাই বিগত নির্বাচনে তারা তাদের গত পাঁচ বছরের সাফল্যের কোন কাহিনী তুলে ধরেনি, বরং ভারতের কথিত শত্রুর মোকাবেলা করার ক্ষমতা কেবল মোদিরই আছে এই সেস্নাগান দিয়েই ক্ষমতার মসনদ পুনর্দখল করতে সক্ষম হয়েছে বিজেপি। ভারতীয়দের এই আবেগ নিঃসন্দেহে থিতিয়ে যাবে। কারণ লোকরঞ্জনবাদী স্লোগানের চটক বেশিদিন থাকে না, সেটা সবাই জানে।
মুসলিম বিদ্বেষী তৎপরতার হার বৃদ্ধি :
সম্প্রতি ভারতে মুসলিম বিদ্বেষী তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। কয়েক বছরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ‘হেট ক্রাইম’ বা ঘৃণামূলক অপরাধের পরিমাণ বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকের মতে, ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর শাসনামলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশটি মুসলিম নাগরিকদের বসবাসের জন্য ক্রমশই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। মৌলবাদী হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর শাসনামলে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রটি (?) মারাত্মক অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। চলতি ২০১৯ বর্ষের গত ফেব্রম্নয়ারি মাসের হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর প্রতিবেদন সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, ২০১৫ সালের মে থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ভারতের ১২টি প্রদেশে ৪৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬ জনই মুসলিম।
গত বছরের জানুয়ারিতে কাশ্মীর অংশের কঠুয়া জেলার আট বছর বয়সী এক মুসলিম মেয়েকে অপহরণ করে একটি মন্দিরের ভেতর আটকে রেখে এক সপ্তাহ ধরে গণধর্ষণ করা হয়। অতঃপর চেতনানাশক ঔষধ প্রয়োগ করা হয় ও শেষে তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা বলেছিল, ‘এটা মুসলমানের মেয়ে, একে মেরে ফেল, তাহলে ওরা ভয় পাবে আর এই এলাকা ছেড়ে চলে যাবে’। আট বছর বয়সী এই শিশুর হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে হাজারো লোক রাস্তায় নেমেছিল, প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় লোকজন মেয়েটি ও তার অসহায় পরিবারের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করার বদলে প্রমাণিত হওয়া ঐ ৮ জন হত্যাকারী হিন্দুর পক্ষ নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। হত্যাকারীদের পক্ষে যারা রাস্তায় নেমেছিল, তাদের মধ্যে চৌধুরী লাল সিং ও চন্দর প্রকাশ নামের ক্ষমতাসীন বিজেপির দুই মন্ত্রীও ছিলেন।
একটি প্রশ্ন সব সময়ই বিবেকে আন্দোলিত হয় যে, পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ গণতান্ত্রিক (?) দেশ ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় যাদের সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ২০ লাখ, তাদের অধিকার এখানে ঠিক কতটা সমুন্নত আছে?
উপসংহার :
হিন্দু ও মুসলিম ছাড়াও শিখ, খ্রীস্টান, বৌদ্ধ, পারসি, জৈনসহ বিভিন্ন ধর্মের প্রায় ১২৫ কোটি মানুষ ভারতে বাস করছেন। এ বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর ঐক্যই শক্তিশালী ভারত গঠনের মূল হাতিয়ার। আগামী দিনে ভারতের সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করবে, মানবদরদি মহলের সেটাই কাম্য। ভবিষ্যতের কথা আপাতত তোলা থাক। আমরা আগামী পাঁচ বছর মোদী শাসন একটু দেখি!
[1]. মাসিক আল-ইতিছাম : ৩য় বর্ষ, ৭ম সংখ্যা: মে-২০১৯, পৃঃ ৪৩-৪৪।
