কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ঈমানের আলো ও মুনাফেক্বীর অন্ধকার (পর্ব-৫)

post title will place here

(আগস্ট’২৩ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর) 

৫. মুমিনদের গুণাবলি :

মুমিনদের জন্য মহৎ গুণাবলি ও মহান কর্মসমূহ আছে। যে সমস্ত গুণে আল্লাহ তাদের গুণান্বিত করেছেন এবং তাদের প্রশংসা করেছেন। তার মধ্য থেকে কিছু গুণ উদাহরণস্বরূপ নিম্নে উল্লেখ করা হলো। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা নয়।

(১) আল্লাহ তাআলা বলেন,وَأَطِيعُوا اللهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ - إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ - الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ ‘আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক। মুমিন তো তারাই, যাদের অন্তরসমূহ কেঁপে উঠে যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয়। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং যারা তাদের প্রতিপালকের উপরই ভরসা করে। যারা ছালাত ক্বায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক্ব দিয়েছি, তা হতে ব্যয় করে’ (আল-আনফাল, ৮/১-৩)। এই আয়াতগুলোতে মুমিনদের গুণাবলি হতে কতগুলো মহান গুণ ফুটে উঠেছে, তা হলো—

(ক) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা।

(খ) আল্লাহর ব্যাপারে ভয়-ভীতি থাকা।

(গ) কুরআন শোনার সময়, কুরআন নিয়ে তাদের গবেষণার কারণে ঈমান বৃদ্ধি পাওয়া।

(ঘ) উপায়-উপকরণ ও মাধ্যম অবলম্বনের পাশাপাশি অল্লাহর উপর নির্ভর ও ভরসা করা।

(ঙ) ফরয ও নফল ছালাত আদায় করা, ছালাতের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আমল সহকারে।

(চ) ওয়াজিব ব্যয় করা। যেমন— যাকাতসমূহ, কাফফারাসমূহ, যার খরচ বহন করা আবশ্যক তার ক্ষেত্রে ব্যয় করা এবং কল্যাণের পথে দান-ছাদাক্বা করা।

(২) আল্লাহ তাআলা বলেন, وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللهُ إِنَّ اللهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ  ‘মুমিন পুরুষ আর মুমিন নারী পরস্পর বন্ধু, তারা সৎ কাজের নির্দেশ দেয়, অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, ছালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। তাদের প্রতিই আল্লাহ করুণা প্রদর্শন করবেন। আল্লাহ তো প্রবল পরাক্রান্ত, মহাপ্রজ্ঞাময়’ (আত-তওবা, ৯/৭১)। এই আয়াতে কতগুলো মহান গুণে মুমিনদের গুণান্বিত করা হয়েছে। তা হলো—

(ক) মুমিনদের পরস্পর বন্ধু হওয়া এবং আল্লাহর জন্য তাদের ভালোবাসা ও তাদের সাহায্য করা।

(খ) সৎ কাজের আদেশ করা। সৎ (মা‘রূফ) কাজ বলতে প্রত্যেক এমন কাজ উদ্দেশ্য, যার সৌন্দর্য ও উৎকৃষ্টতা জানা যায়। যেমন— সুন্দর আক্বীদা বা বিশ্বাস, সৎ আমল ও মহৎ চরিত্রসমূহ।

(গ) অসৎ কাজ হতে বাধা দেওয়া। তা (মুনকার) হলো, ভালো কাজের বিপরীত কাজ। যেমন— বাতিল আক্বীদা বা বিশ্বাস, খারাপ আমল ও নিকৃষ্ট চরিত্রসমূহ।

(ঘ) ছালাতের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আমল সহকারে ফরয ও নফল ছালাত আদায় করা।

(ঙ) আট শ্রেণির মধ্যে যাকাত প্রদান করা।

(চ) আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা এবং সর্বাবস্থায় এর সঙ্গে থাকা।

(৩) আল্লাহ তাআলা বলেন,  إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ - التَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الْآمِرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهُونَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللَّهِ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। অতএব, তারা মারে ও মরে। তাওরাত, ইঞ্জীল ও কুরআনে এ সম্পর্কে সত্য ওয়াদা রয়েছে। আর নিজ ওয়াদা পূরণে আল্লাহর চেয়ে অধিক কে হতে পারে? সুতরাং তোমরা (আল্লাহর সঙ্গে) যে ক্রয়বিক্রয় সম্পন্ন করেছ, তার জন্য আনন্দিত হও, আর এটাই হলো মহান সফলতা। তারা অনুশোচনাভরে (আল্লাহর দিকে) প্রত্যাবর্তনকারী, ইবাদতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, ছিয়াম পালনকারী, রুকূকারী, সিজদাকারী, সৎ কাজের আদেশ দানকারী, অন্যায় কাজ হতে নিষেধকারী, আল্লাহর নির্ধারিত সীমা সংরক্ষণকারী, কাজেই মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিন’ (আত-তওবা, ৯/১১১-১১২)। এই দুই আয়াতের মধ্যে ঈমানদারদের গুণাবলি হতে মহান কিছু গুণ ফুটে উঠেছে। তা নিম্নে আসছে—

(ক) আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করা এবং এক্ষেত্রে চেষ্টা ও পরিশ্রম ব্যয় করা।

(খ) সকল গুনাহ হতে তওবা করা এবং সর্বাবস্থায় তওবা হতে নিরবিচ্ছিন্ন থাকা।

(গ) সকল প্রকার ওয়াজিব ও মুস্তাহাব আমল পালন করার মাধ্যমে আল্লাহর দাসত্ব করা এবং সর্বাবস্থায় সকল প্রকার হারাম ও মাকরূহ কাজ হতে বিরত থাকা। এর মাধ্যমে বান্দা ইবাদতকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

(ঘ) সুখে-দুঃখে আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করা এবং তাঁর নেয়ামতরাজির কারণে তাঁর প্রশংসা করা এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতরাজি স্বীকার করা।

(ঙ) ইলম অর্জন, হজ্জ, উমরা, জিহাদ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও এসব উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা।

(চ) রুকূ ও সিজদাসম্বলিত ছালাত বেশি বেশি আদায় করা।

(ছ) সৎ কাজের আদেশ দেওয়া। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে সকল প্রকার ওয়াজিব ও মুস্তাহাব আমল।

(জ) অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নিষিদ্ধ সবকিছুই এর আওতাভুক্ত।

(ঝ) আল্লাহ তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর যা নাযিল করেছেন তার সীমানাসমূহ শেখা এবং তার মধ্যে কোনটি আদেশ, নিষেধ ও হুকুম-আহকামসমূহে প্রবেশ করে আর কোনটি প্রবেশ করে না তা শেখা। আমল করা ও বর্জন করার দিক থেকে সার্বক্ষণিক এর সাথে থাকা।

(৪) আল্লাহ তাআলা বলেন,  قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ - الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ - إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ - فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ - وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ - أُولَئِكَ هُمُ الْوَارِثُونَ - الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ  ‘অবশ্যই মুমিনগণ সফল হয়েছে, যারা নিজেদের ছালাতে বিনয়াবনত। যারা অনর্থক কথা থেকে বিমুখ। যারা যাকাতের ক্ষেত্রে সক্রিয়। আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাযতকারী; তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসী ব্যতীত। কারণ এক্ষেত্রে তারা নিন্দা থেকে মুক্ত। অতএব, যারা এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করে, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী। আর যারা নিজেদের আমানত ও ওয়াদা পূর্ণ করে। যারা নিজেদের ছালাতের ব্যাপারে যত্নবান। তারাই হলো উত্তরাধিকারী, যারা ফেরদাউসের অধিকারী হবে। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে’ (আল-মুমিনূন, ২৩/১-১১)। এই আয়াতগুলোতে নিম্নবর্ণিত বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান—

(ক) ছালাতে একাগ্র ও বিনম্র হওয়া এবং আল্লাহর সামনে স্বীয় অন্তর উপস্থিত রাখা।

(খ) অনর্থক কথা ও কাজ হতে বিরত থাকা, যার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। আর যে এটা হতে বিরত থাকবে, হারাম হতে বিরত থাকা তার জন্য অধিকতর অনুকূল হবে।

(গ) সম্পদের যাকাত আদায় করা এবং কলুষিত চরিত্র হতে আত্মাকে কলুষমুক্ত করা, কলুষিত চরিত্র ত্যাগ করার মাধ্যমে।

(ঘ) লজ্জাস্থানকে যেনা হতে রক্ষা করা এবং যেনার মাধ্যম হয় তা হতে বিরত থাকা। যেমন— মহিলার দিকে দৃষ্টি দেওয়া, নারী-পুরুষ নির্জনে থাকা এবং স্পর্শ করা।

(ঙ) আমানত রক্ষা করা। চাই তা আল্লাহর অধিকার হোক অথবা বান্দার অধিকার হোক। কারণ আয়াতটি ব্যাপক অর্থবোধক।

(চ) বান্দা ও আল্লাহর মাঝে এবং মানুষ ও মানুষের মাঝে কৃত অঙ্গীকার ও চুক্তিসমূহ রক্ষা করা।

(ছ) ছালাতের রুকন, শর্ত, ওয়াজিব ও মুস্তাহাবসমূহ সহকারে যথারীতি (ছালাত) আদায় করা।

এগুলো ছাড়াও কুরআনে বর্ণিত মুমিনদের আরো গুণ রয়েছে। আল্লাহর নিকট কামনা করি, তিনি যেন আমাকে ও সকল মুসলিমকে এই মহৎগুণাবলির মাধ্যমে গুণান্বিত হওয়ার তাওফীক্ব দান করেন।

(চলবে)


মূল : ড. সাঈদ ইবনু আলী ইবনু ওয়াহাফ আল-ক্বাহত্বানী রহিমাহুল্লাহ

অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
নারায়ণপুর, নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর।

Magazine