রূহ বা আত্মা সম্পর্কে মানুষের জানার কৌতূহল পূর্ব থেকেই ছিল, বর্তমানেও আছে ও ভবিষ্যতেও থাকবে। আত্মা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে অনেক মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং নাস্তিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। অনেক মানুষ শরী‘আতের গায়েবী স্পর্শকাতর বিষয়গুলো অস্বীকার করছে। যেমন: কবরের শাস্তি, পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম, পুলসিরাত ইত্যাদি। তাই বিষয়টি নিয়ে সামান্য আলোকপাত করার প্রয়োজন অনুভব করছি।
আত্মা পরিচিতি :
কোনো কোনো দার্শনিক বলেন, ‘আত্মা হলো শ্বাস-প্রশ্বাসের নাম’। তাদের যুক্তি হলো, মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার শ্বাস-প্রশ্বাস চলাচল করে না। আবার কেউ কেউ বলেন, ‘আত্মা হলো রক্তের নাম’। তাদের যুক্তি হলো, মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার রক্ত চলাচল করে না। আবার কেউ বলেন, ‘আত্মা হলো মানুষের শরীরের উত্তাপ’। তাদের যুক্তি হলো, যখন মানুষ মারা যায়, তখন শরীর শীতল হয়ে যায়।[1] আল্লাহ তা‘আলা আত্মার রহস্য সম্পর্কে বলেন,وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِلَّا قَلِيلًا ‘আর তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে আত্মা সম্পর্কে। বলুন, আত্মা হলো আমার প্রতিপালকের আদেশ। আর এ ব্যাপারে তোমাদের খুব সীমিত জ্ঞান দেওয়া হয়েছে’ (বানী ইসরাঈল, ৮৫)।
প্রত্যেকটি বস্তুর একটি আবাসস্থল রয়েছে। আর আত্মার আবাসস্থল হলো মানুষের দেহ। আত্মা ছাড়া দেহ অন্তঃসারশূন্য। দিবা-রাত্রি ঘুমের মাধ্যমে এই আত্মার সাময়িকভাবে মৃত্যু ঘটে। আবার আল্লাহর আদেশে পুনরায় তা দেহে ফিরে আসে। যখন মানুষের আয়ু শেষ হয়ে যায়, তখন আত্মা আর দেহে ফিরে আসে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَى عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَى إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ ‘মৃত্যুর সময় আল্লাহ প্রাণ হরণ করেন এবং যারা জীবিত, তাদেরও চেতনা হরণ করেন- ওরা যখন নিদ্রিত থাকে। অতঃপর যার জন্য মৃত্যু অবধারিত করেছেন, তিনি তার প্রাণ রেখে দেন এবং অপরকে এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চেতনা ফিরিয়ে দেন। এতে নিশ্চয় চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে’ (যুমার, ৪২)।
আত্মার প্রকার :
অনেকে বলে থাকেন যে, আত্মা হলো তিনটি। মূলত আত্মা হলো একটি। কিন্তু তার বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ হলো তিনটি। আর তা হলে- আম্মারাহ, লাওয়ামাহ ও মুতমায়িন্নাহ। যখন কোনো মানুষ পাপের কাজ করে, তখন আত্মার ঐ বৈশিষ্ট্যকে বলা হয়, আম্মারাহ। যেমন আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেন, إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ ‘নিশ্চয় মানুষের আত্মা খারাপ কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকে’ (ইউসুফ, ৫৩)। পাপ কাজের পর যদি মানুষের মাঝে অনুশোচনা আসে এবং নিজেকে নিজেই তিরস্কার করে, তাহলে আত্মার এই বৈশিষ্ট্যকে লাওয়ামাহ বলা হয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ ‘আমি শপথ করছি ভৎর্সনাকারী আত্মার’ (ক্বিয়ামাহ, ২)। মানুষ যখন পাপের কাজ বর্জন করে ভালো কাজ করতে থাকে এবং ভালো কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ করে না- এমনকি আল্লাহর নৈকট্যশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, তখন আত্মার এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় মুতমায়িন্নাহ। এই বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,يَاأَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ - ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَرْضِيَّةً - فَادْخُلِي فِي عِبَادِي - وَادْخُلِي جَنَّتِي ‘হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার রবের কাছে ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। তারপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো’ (ফজর, ২৭-৩০)। এই সমস্ত দলীলের আলোকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, মানুষের আত্মা হলো একটি এবং তার বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ হলো তিনটি।
আত্মার সাথে দেহের সম্পর্ক :
দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে মানুষের শরীর গঠিত। দেহের সাথে আত্মার তিন ধরনের সম্পর্ক রয়েছে-
(১) দুনিয়ার জীবনে দেহের সাথে আত্মার সম্পর্ক : দুনিয়ার জীবনে মানুষের দেহ হলো মূল বিষয় আর আত্মা হলো তার অনুগামী। অর্থাৎ দেহ যদি আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাস করে, তাহলে আত্মাও আরাম-আয়েশ ভোগ করে। দেহ যদি কষ্ট পায়, তাহলে আত্মাও কষ্ট পায়। দেহ যদি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তাহলে আত্মাও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। একটি উদাহরণ দেখুন, আপনার শরীরে যদি জ্বর হয়, তাহলে আপনার মন খারাপ থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, জ্বর তো হয়েছে আপনার শরীরে, তাহলে মন খারাপ হওয়ার কারণ কী? কারণ একটাই, শরীরে জ্বর আসার কারণে আপনার মনও শরীরের অনুগামী হয়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে। আর একথাই বলছে মনোবিজ্ঞানীরা।
(২) বারযাখী (মৃত্যুর পরবর্তী জীবন) জীবনে দেহের সাথে আত্মার সম্পর্ক : ঐ জীবনে মানুষের আত্মা হলো মূল আর দেহ হলো তার অনুগামী। অর্থাৎ আত্মা যদি শান্তি বা শাস্তিপ্রাপ্ত হয়, তাহলে দেহও তার অনুগামী হয়ে শান্তি বা শাস্তিপ্রাপ্ত হবে।
উল্লেখ্য, অনেকে প্রশ্ন করে থাকে, হাদীছে এসেছে, কবরে দেহে শাস্তি হয়। এখন প্রশ্ন হলো, যে সকল দেহ ভস্মীভূত হয়ে গেছে অথবা জীবজন্তু খেয়ে ফেলেছে অথবা পানিতে ডুবে পচে গলে নিঃশেষ হয়ে গেছে, সে সকল দেহ কীভাবে শান্তি বা শাস্তি প্রাপ্ত হবে? যারা এই প্রশ্নটি করেছে, তারা উপরিউক্ত মূলনীতি না জানার কারণে করেছে। আমরা পূর্বে বলেছি, বারযাখী জীবনে মানুষের আত্মা হলো মূল বিষয় আর দেহ হলো তার অনুগামী। অর্থাৎ বারযাখী জীবনে সুখ-শান্তি বা শাস্তি ভোগ করে মূলত আত্মা আর দেহ তার অনুগামী হয়ে শান্তি বা শাস্তি ভোগ করে। ব্যক্তি যদি দুনিয়াতে সৎকর্ম করে থাকে, তাহলে তার আত্মা ইল্লিয়ীনে (সপ্ত আসমানের উপর) সুখ-শান্তি ভোগ করবে। আর তার দেহও আত্মার অনুগামী হয়ে সুখ-শান্তি ভোগ করবে। চাই ঐ দেহ ভস্মীভূত হয়ে যাক অথবা জীবজন্তু খেয়ে ফেলুক অথবা পচে গলে যাক। এমনিভাবে ব্যক্তি যদি দুনিয়াতে অসৎকর্ম করে, তাহলে তার আত্মা সিজ্জীনে (সপ্ত যমীনের নিচে) শাস্তি ভোগ করবে আর তার দেহও আত্মার অনুগামী হয়ে শাস্তি ভোগ করবে। চাই ঐ দেহ ভস্মীভূত হয়ে যাক অথবা জীবজন্তু খেয়ে ফেলুক অথবা পচে গলে যাক। আল্লাহ তা‘আলা এই বিষয়টি বোঝানোর জন্য আমাদের বাস্তব জীবনে এর একটি দৃষ্টান্ত রেখেছেন। ধরুন, আপনি ঘুমিয়ে আছেন। স্বপ্নে আপনি এক ব্যক্তির সাথে মারামারি করছেন। হঠাৎ আপনার ঘুম ভেঙে গেলো, ঘুম থেকে উঠে দেখছেন, আপনার শরীর ঘর্মাক্ত হয়ে গেছে। এখন কথা হলো আপনার শরীর কেন ঘর্মাক্ত হলো? আপনি তো বিছানায় ছিলেন। এর কারণ হলো, মারামারি করেছে মূলত আপনার আত্মা, শরীর ঘর্মাক্ত হয়েছে আত্মার অনুগামী হয়ে। অনুরূপভাবে বারযাখে মূলত সুখ বা শাস্তি ভোগ করে আত্মা আর দেহ তার অনুগামী হয়ে সুখ বা শাস্তি ভোগ করে।
(৩) পরকালের (মৃত্যুর পর পুনরায় উঠানোর পর) জীবনে দেহের সাথে আত্মার সম্পর্ক : ঐ জীবনে দেহ ও আত্মা উভয়টিই স্বয়ংসম্পূর্ণ। অর্থাৎ একটি আরেকটির অনুগামী নয়। যার কারণে মানুষের শরীর অনেক বড় হবে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জান্নাতে যারা যাবে তাদের উচ্চতা হবে ৬০ হাত’।[2] অর্থাৎ প্রায় আট তলার সমান। জাহানণামীদের শরীরও অনেক বড় হবে। আবু হুরায়রাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,إِنَّ غِلَظَ جِلْدِ الْكَافِرِ اثْنَانِ وَأَرْبَعُونَ ذِرَاعًا وَإِنَّ ضِرْسَهُ مِثْلُ أُحُدٍ وَإِنَّ مَجْلِسَهُ مِنْ جَهَنَّمَ كَمَا بَيْنَ مَكَّةَ وَالْمَدِينَةِ ‘জাহান্নামে কাফের ব্যক্তির গায়ের চামড়া হবে ৪২ হাত মোটা, তার মাড়ির দাঁত হবে উহূদ পাহাড়ের সমান এবং তার বসার জায়গা হবে মক্কা-মদীনার দূরত্বের সমান বিস্তৃত’।[3]
ঐ জীবনে দেহ ও আত্মা একই সাথে সুখ-শান্তি অথবা শাস্তি ভোগ করবে, একটি আরেকটির অনুগামী হবে না। আত্মা কি মৃত্যুবরণ করে? আল্লাহ তা‘আলা বলেন, كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْت ‘প্রত্যেকটি আত্মারই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে’ (আম্বিয়া, ২৫)। আত্মার মৃত্যু বলতে যদি আমরা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বুঝি, তাহলে আত্মা মৃত্যুবরণ করে। আর আত্মার মৃত্যু বলতে যদি দেহ থেকে স্থানান্তর বুঝি, তাহলে আত্মা মৃত্যুবরণ করে না। কারণ আত্মা তো দুনিয়ার জীবন থেকে স্থানান্তর হয়ে পরকালে চলে গেছে। আর এ কথাটাই সর্বাধিক বিশুদ্ধ।
আত্মা কি করে শান্তি বা শাস্তি ভোগ করবে?
আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তার সাথীরা এতটুকু মাত্র দূরে যায় যে, সে তখনো তাদের জুতার আওয়ায শুনতে পায়। এমন সময় দু’জন ফেরেশতা তার নিকট এসে তাকে বসান এবং তারা বলেন, এ ব্যক্তি অর্থাৎ মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তুমি কী বলতে? তখন মুমিন ব্যক্তি বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল। তখন তাকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার অবস্থানস্থলটির দিকে নযর করো, আল্লাহ তোমাকে তার পরিবর্তে জান্নাতের একটি অবস্থানস্থল দান করেছেন। তখন সে দু’টি স্থলের দিকেই দৃষ্টি করে দেখবে। ক্বাতাদাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, সে ব্যক্তির জন্য তার কবর প্রশস্ত করে দেওয়া হবে।...‘আর মুনাফিক্ব বা কাফের ব্যক্তিকেও প্রশ্ন করা হবে, তুমি এ ব্যক্তি সম্পর্কে কী বলতে? সে উত্তরে বলবে, আমি জানি না। লোকেরা যা বলত, আমিও তাই বলতাম। তখন তাকে বলা হবে, তুমি না নিজে জেনেছো, না তেলাওয়াত করে শিখেছো। আর তাকে লোহার মুগুর দ্বারা এমনভাবে আঘাত করা হবে, যার ফলে সে এমন বিকট চিৎকার করে উঠবে যে, দু’জাতি (মানুষ ও জিন) ছাড়া তার আশপাশের সকলেই তা শুনতে পাবে।[4] নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরে প্রশ্নকারী মুনকার ও নাকীরের আকৃতি সম্পর্কে বলেন, ‘তার চোখ হবে বড় বড় নীল পিতলের ডেগের মতো, শরীর হবে কালো বর্ণের, দাঁত গরুর শিংয়ের মতো, আওয়ায হবে বজ্রের ন্যায়, হাতে থাকবে লোহার হাতুড়ি, যার অনেক বেশি ওযন হবে। হাদীছে বলা হয়েছে, মিনার সকল মানুষ যদি একত্রিত হয়, তারপরও তা উত্তোলন করতে পারবে না। এই হাতুড়ি দিয়ে মানুষকে পেটাবে। এই হাতুড়ি দিয়ে যদি পাহাড়কে আঘাত করা হয়, তাহলে পাহাড়ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে’।[5]
এ সকল হাদীছ থেকে বুঝতে পারলাম যে, কবরে আত্মা শান্তি বা শাস্তি ভোগ করে। নাস্তিকরা কবরের শাস্তি অস্বীকার করে। তাদের যুক্তি হলো কোনো কবর যদি খনন করা হয়, তাহলে সে কবরে শাস্তি দেখা যায় না। এমনিভাবে কেউ যদি লাশের কাছে থাকে, তাহলে ঐ ব্যক্তিও শাস্তি দেখতে পায় না। যারা কবরের শাস্তিকে অস্বীকার করে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের বোঝানোর জন্য আমাদের বাস্তব জীবনে এর একটি দৃষ্টান্ত রেখেছেন। ধরুন, আপনি ঘুমিয়ে আছেন। স্বপ্নে দেখছেন সাপ আপনাকে তাড়া করেছে, আর আপনি দৌড়াচ্ছেন আর দৌড়াচ্ছেন। হঠাৎ আপনার ঘুম ভেঙে গেলো, ঘুম থেকে উঠে দেখছেন, আপনার শরীর কাঁপছে। ঐ সময় আপনার ভাই আপনার পাশেই ছিল, কিন্তু তিনি কিছুই বুঝতে পারেননি। ঠিক অনুরূপ কবরে আপনার শাস্তি হলে, আপনার ভাই আপনার পাশে থাকলেও তিনি কিছুই দেখবেন না।
মানুষের আত্মা কতটুকু বড়?
একজন মানুষের আত্মা তার দেহের সমান। অর্থাৎ মানুষ যতটুকু তার আত্মাও ততটুকু। এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায় একটি হাদীছ থেকে। আদম আলাইহিস সালাম-কে সৃষ্টি করে তার মাঝে আত্মা দেওয়া হয়। যখন তার আত্মা নাক বরাবর আসে, তখন তিনি হাঁচি দেন এবং আল-হামদুলিল্লাহ বলেন, আর আল্লাহ উত্তরে ‘ইয়ার হামুকাল্লাহ’ বলেন। আর আত্মা যখন পেট বরাবর আসে, তখন তার ক্ষুধা লাগে। আর আত্মা যখন পা পর্যন্ত আসে, তখন তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন’।[6] এ হাদীছ থেকে বুঝতে পারলাম যে, প্রত্যেকটা মানুষের আত্মা তার দেহের সমান বড়।
মৃত্যুর পর আত্মা কোথায় থাকে?
মৃত্যুর পর আত্মা কোথায় থাকে, সে ব্যাপারে বিদ্বানদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। নিমেণ আমরা সারসংক্ষেপ আলোচনা করব:
বারযাখী (মৃত্যুর পরের জীবন) জগতে বনী আদমের আত্মার বিরাট স্তরভেদ রয়েছে। সেখানে নবীদের আত্মা থাকবে ঊর্ধ্ব জগতের ফেরেশতাদের সাথে, যা ইল্লিয়ীনের সর্বোচ্চ স্তর। শহীদদের আত্মা থাকবে সবুজ রঙের পাখির মধ্যে। হাদীছে এসেছে, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আব্দুল্লাহ (ইবনে মাসঊদ) রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে এ আয়াতটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম যাতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছে, তাদেরকে কখনো তোমরা মৃত মনে করো না, বরং তারা জীবিত, তাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে তারা জীবিকাপ্রাপ্ত’ (আলে ইমরান, ১৬৯)। আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা এই আয়াত সম্পর্কে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তখন তিনি বললেন, তাদের রূহসমূহ সবুজ পাখির উদরে রক্ষিত থাকে, যা আরশের সাথে ঝুলন্ত দীপাধারে বাস করে। জান্নাতে সর্বক্ষণ তারা যেখানে চায়, সেখানে বিচরণ করবে। অবশেষে সে দীপাধারগুলোতে ফিরে আসে। একবার তাদের প্রভু তাদের দিকে পরিপূর্ণভাবে তাকালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কি কোনো কামনা আছে? জবাবে তারা বলল, আমাদের আর কী কামনা থাকতে পারে, আমরা তো যেভাবে ইচ্ছা জান্নাতে ঘোরাফেরা করছি। আল্লাহ তা‘আলা তাদের সাথে এরূপ তিন তিনবার করলেন। যখন তারা দেখল জবাব না দিয়ে প্রশ্ন থেকে রেহাই পাচ্ছে না, তখন তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের কামনা হয় যদি আমাদের রূহগুলোকে আমাদের দেহসমূহে ফিরিয়ে দিতেন আর পুনরায় আমরা আপনারই পথে নিহত হতে পারতাম। অতঃপর মহান আল্লাহ যখন দেখলেন, তাদের আর কোনো প্রয়োজনই নেই, তখন তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হলো’।[7]
তবে যে সকল শহীদ ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মারা গেছেন, তাদের আত্মা জান্নাতের দরজায় আটকে রাখা হয়। ব্যভিচারী নারী-পুরুষের আত্মা একই অগ্নি-গহবর মাঝে শাস্তি পেতে থাকবে। সূদখোরের আত্মা একটি রক্তের নদীতে সাঁতার কাটতে থাকবে আর একজন ফেরেশতা তার মুখে পাথর নিক্ষেপ করতে থাকবে। সাধারণ মুসলিমদের আত্মা ইল্লিয়ীনে শান্তি ভোগ করবে। সাধারণ কাফেরদের আত্মা সিজ্জীনে শাস্তি ভোগ করবে। যে সকল মানুষ মিথ্যা কথা বলত, তাদের চোয়াল বারবার কেটে ফেলা হবে। যে সকল মানুষ কুরআন শিখে আমল না করে ঘুমিয়ে থাকত, তাদের মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হবে। যে সকল আলেম নিজ কথার বিপরীত কাজ করত, তারা তাদের ভুঁড়িসহ ঘুরতে থাকবে। কিছু মানুষের আত্মা কবরে আটকে রাখা হয়। এ সকল কথা ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত।[8] অতএব যারা ধারণা করে যে, মৃত্যুর পর আত্মা বিভিন্ন প্রাণীর রূপ ধারণ করে বাড়িতে আসে, তাদের এই ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন- আমীন!
[1]. সূরা বানী ইসরাঈল, ৮৫; তুহফাতুল আহওয়াযী, হা/৩১৪০, ৮/১১৯।
[2]. বুখারী, হা/৩৩২৭; মুসলিম, হা/২৮৩৪; মিশকাত, হা/৪৬২৮।
[3]. তিরমিযী, হা/২৫৭৭; সিলসিলা ছহীহা, হা/১১০৫; মিশকাত, হা/৫৬৭৫।
[4]. বুখারী, হা/১৩৭৪; মুসলিম, হা/২৮৭০; মিশকাত, হা/১২৬।
[5]. ফাতহুল বারী, হা/১৩৭৪, ‘কবরের শাস্তি’ অধ্যায়।
[6]. ফাতহুল বারী, নবীদের আলোচনা ও ইসলামী ওয়েবসাইট।
[7]. মুসলিম, হা/১৮৮৭; আবুদাঊদ, হা/২৫২০; মিশকাত, হা/৩৮৫৩।
[8]. বুখারী, হা/১৩৮৬; বঙ্গানুবাদ আক্বীদাহ ত্বহাবিয়া, ‘কবরের শাস্তি’ অধ্যায়, পৃ. ২৪৬-৪৯।
