ভূমিকা:
মানবজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ও পবিত্র বন্ধন হলো পিতামাতা ও সন্তানের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক শুধু রক্তের নয়; বরং ভালোবাসা, দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের অমূল্য বন্ধনে গঠিত। ইসলাম এই সম্পর্ককে অত্যন্ত মর্যাদার আসনে আসীন করেছে। পিতামাতা সন্তানের প্রথম শিক্ষক এবং তাদের দ্বারাই সন্তানের ভবিষ্যৎ জীবন গঠিত হয়। তাই ইসলামে সন্তানের প্রতি পিতামাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য শুধু পারিবারিক বা সামাজিক নয়; বরং এটি এক গভীর ধর্মীয় দায়িত্বও বটে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে সন্তানের প্রতি পিতামাতার দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
সন্তানের প্রতি পিতামাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য:
সন্তানকে ইসলামী আদর্শে আদর্শবান করতে পারলে তার মর্যাদা কেমন হতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই হাদীছটি— ‘জনৈক ব্যক্তিকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন করা হলে সে অবাক হয়ে বলবে, এমন মর্যাদা কোন আমলের বিনিময়ে পেলাম? আমি তো এত সৎ আমল করিনি। বলা হবে, তোমার জন্য তোমার সন্তানের দু‘আর কারণেই তোমাকে এ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে’।[1] অন্য আরেকটি হাদীছে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই তোমার সন্তানেরও তোমার উপর হক্ব রয়েছে’।[2]
নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি সন্তানসন্ততিকেও বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَة﴾ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর’ (আত-তাহরীম, ৬৬/৬)।
সন্তানকে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পিতামাতার কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হলো।
তার আগে একটি হাদীছ স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। কারণ আমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তাই আমাদের সন্তানদের হিসাবও আমাদের দিতে হবে।
عَنْ ابْنِ عُمَرَ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِه وَالأَمِيرُ رَاعٍ وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلٰى أَهْلِ بَيْتِه وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلٰى بَيْتِ زَوْجِهَا وَوَلَدِه فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ.
ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন রক্ষক এবং তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। আমীর রক্ষক, একজন ব্যক্তি তার পরিবারের লোকদের রক্ষক, একজন নারী তার স্বামীর গৃহের ও সন্তানদের রক্ষক। এ ব্যাপারে তোমরা প্রত্যেকেই রক্ষক আর তোমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ অধীন লোকদের রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে’।[3] রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,إِذَا مَاتَ ٱلْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَه ‘মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ব্যতীত— চলমান ছাদাক্বা, এমন জ্ঞান যা থেকে উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দু‘আ করে’।[4]
একজন প্রকৃত সন্তান গড়তে হলে বিবাহের পূর্ব থেকেই কিছু বিষয়ের মাধ্যমে তা করতে হবে। সেই বিষয়গুলো আমরা ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করব, ইনশা-আল্লাহ!
১. সন্তানের জন্য একজন ভালো পিতা/মাতা নির্বাচন করা: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,تُنْكَحُ ٱلْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا فَاظْفَرْ بِذَاتِ ٱلدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاك ‘নারীকে চার কারণে বিবাহ করা হয়— সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারিতা। অতএব, তুমি দ্বীনদার নারীকে গ্রহণ করো, এতে তোমার কল্যাণ নিহিত’।[5]
২. দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা না করা: এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা সন্তানকে গর্ভেই নষ্ট করে ফেলেন। এ ধরনের কাজ কোনোভাবেই করা যাবে না। এটি স্পষ্ট হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ مِنْ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُم﴾ ‘দারিদ্র্যের কারণে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমি তোমাদেরকেও এবং তাদেরকেও রিযিক্ব প্রদান করি’ (আল-আনআম, ৬/১৫১)।
৩. সন্তান গর্ভে আসার পর থেকেই তার কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দু‘আকরা উচিত: বাবা-মা বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করবেন, কারণ সন্তান মায়ের গর্ভেই বাবা-মায়ের ভাষা এবং আচার-আচরণের প্রভাব গ্রহণ করতে শুরু করে। তাই এ সময়ে কুরআনের শব্দ ও দু‘আয় পরিবেষ্টিত থাকা সন্তানের জন্য কল্যাণ ও শান্তির কারণ হয়ে ওঠে। গর্ভস্থ সন্তানের কল্যাণের দু‘আ হলো,﴿رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِين﴾ ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে সৎ সন্তান দান করো’ (আছ-ছাফফাত, ৩৭/১০০)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,﴿رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا﴾ ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদেরকে মুত্তাক্বীদের জন্য আদর্শ বানাও’ (আল-ফুরক্বান, ২৫/৭৪)।
৪. নবজাতকেরকানে আযান দেওয়া: সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথেই ডান কানে আযান দিতে হবে।
عَنْ أَبِي رَافِعٍ قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَذَّنَ فِي أُذُنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ حِينَ وَلَدَتْهُ فَاطِمَةُ بِالصَّلاة.
আবূ রাফে‘ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করে বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহু -এর কানে ছালাতের আযানের মতো আযান দিতে দেখেছি, যখন ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহা তাকে জন্ম দেন।[6]
৫. তাহনীক করা: কোনো আলেমের মাধ্যমে তাহনীক করাতে হবে (নবজাতকের মুখে চিবানো খেজুর ঘষে দেওয়া)।
عَنْ أَسْمَاءَ قَالَتْ: أَتَيْتُ بِٱبْنِي إِلَى رَسُولِ ٱللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَضَعَهُ فِي حِجْرِهِ ثُمَّ دَعَا بِتَمْرَةٍ فَمَضَغَهَا ثُمَّ حَنَّكَهُ بِهَا.
আসমা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি আমার শিশুকে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে আনলাম। তিনি তাকে কোলে নিলেন, খেজুর নিয়ে চিবালেন এবং তা দিয়ে শিশুর মুখে তাহনীক করলেন।[7]
৬. সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখা: নামের মধ্যে রয়েছে এক বিশেষ শক্তি— যা মানুষের চরিত্র, মানসিকতা ও জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ইসলাম সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে, কারণ একটি ভালো নাম কেবল একটি পরিচয় নয়; বরং এটি দু‘আ ও ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন। হাদীছে এসেছে,إِنَّ أَحَبَّ أَسْمَائِكُمْ إِلَى ٱللَّهِ عَبْدُ ٱللَّهِ وَعَبْدُ ٱلرَّحْمَٰن ‘তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় নাম হলো আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান’।[8]
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থহীন ও অশুভ নাম পরিবর্তন করতেন। যেমন- ‘আব্দুল উযযা’ নাম পরিবর্তন করে ‘আব্দুল্লাহ’, ‘আছিয়া’ পরিবর্তন করে ‘জামীলা’ এবং ‘বাররা’ পরিবর্তন করে ‘যায়নাব’ রেখেছেন। ইবনুল মুসায়্যাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তার পিতার নাম ছিল ‘হাযন’ (কঠিন)। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামটি পরিবর্তন করে ‘সাহল’ (সহজ) রাখতে চাইলেও তিনি রাজি হননি। পরে তিনি বলেন, আমাদের পরিবারে এরপর থেকে সর্বদা কঠিন অবস্থা ও কষ্ট লেগেই থাকত।[9]
৭. আক্বীক্বা করা: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,كُلُّ غُلَامٍ رَهِينَةٌ بِعَقِيقَتِهِ تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ سَابِعِهِ وَيُحْلَقُ وَيُسَمَّى ‘প্রত্যেক শিশু তার আক্বীক্বার কারণে বন্ধকস্বরূপ থাকে। সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে পশু কুরবানী করতে হবে, মাথার চুল মুণ্ডন করতে হবে এবং নাম রাখতে হবে’।[10]
৮. খাতনা করানো: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,الْفِطْرَةُ خَمْسٌ: الْخِتَانُ وَالاِسْتِحْدَادُ وَنَتْفُ الإِبِطِ وَتَقْلِيمُ الأَظْفَارِ وَقَصُّ الشَّارِب ‘স্বভাবজাত বিষয় পাঁচটি— খাতনা, গোপনাঙ্গের লোম পরিষ্কার করা, বগলের লোম উপড়ে ফেলা, নখ কাটা এবং গোঁফ ছোট করা’।[11]
৯. তাওহীদ ও রিসালাতের শিক্ষা দেওয়া: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক। সন্তান যখন অল্প অল্প করে কথা শিখতে শুরু করবে, তখনই তার অন্তরে রিসালাত তথা আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো মা‘বূদ নেই— একথা শিক্ষা প্রদান করতে হবে এবং সাথে একথাও শিক্ষা দিতে হবে যে, সকল প্রকার ইবাদত তাঁরই নিমিত্তে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ﴿وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاه﴾ ‘তোমার প্রতিপালক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া কারো ইবাদত করবে না’ (আল-ইসরা, ১৭/২৩)।
১০. কুরআন শিক্ষা দেওয়া: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَه ‘তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সেই, যে কুরআন শিখে এবং তা শিক্ষা দেয়’।[12]
১১. দ্বীন শিক্ষা দেওয়া: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِم ‘প্রত্যেক মুসলিমের উপর জ্ঞান অর্জন করা ফরয’।[13]
১২. ছালাত শিক্ষা দেওয়া: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,مُرُوا أَوْلَادَكُمْ بِالصَّلَاةِ وَهُمْ أَبْنَاءُ سَبْعِ سِنِينَ وَاضْرِبُوهُمْ عَلَيْهَا وَهُمْ أَبْنَاءُ عَشْرِ سِنِينَ وَفَرِّقُوا بَيْنَهُمْ فِي الْمَضَاجِعِ ‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে ছালাতের জন্য নির্দেশ দাও। যখন তাদের বয়স ১০ বছর হয়ে যাবে, তখন (ছালাত আদায় না করলে) এজন্য তাদেরকে প্রহার করো এবং তাদের ঘুমের বিছানা আলাদা করে দাও’।[14]
১৩. উত্তম আদব শিক্ষা দেওয়া: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,مَا نَحَلَ وَالِدٌ وَلَدًا نَحْلًا أَفْضَلَ مِنْ أَدَبٍ حَسَن ‘পিতা তার সন্তানকে উত্তম আদবের চেয়ে উত্তম কিছু দান করেনি’।[15]
১৪. ধৈর্য শিক্ষা দেওয়া: আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَك﴾ ‘হে আমার ছেলে! ছালাত ক্বায়েম করো, সৎকাজের নির্দেশ দাও, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখো এবং যা তোমার উপর আপতিত হয়, তাতে ধৈর্যধারণ করো’ (লুক্বমান, ৩১/১৭)।
১৫. শিরক থেকে দূরে রাখা: কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে, ﴿يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيم﴾ ‘হে আমার ছেলে! আল্লাহর সাথে শিরক করো না। নিশ্চয় শিরক বড় যুলম’ (লুক্বমান, ৩১/১৩)।
১৬. সত্যবাদিতা শিক্ষা দেওয়া: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِر ‘সত্যবাদিতার উপর অটল থাকো, কেননা সত্য নেকীর দিকে পরিচালিত করে’।[16]
১৭. অন্যায় থেকে বিরত রাখা: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,اتَّقُوا الظُّلْمَ فَإِنَّ الظُّلْمَ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَة ‘অন্যায় থেকে বেঁচে থাকো, কেননা অন্যায় ক্বিয়ামতের দিনে অন্ধকারে পরিণত হবে’।[17]
১৮. ভালো বন্ধু নির্বাচন করতে শেখানো: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِل ‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে খেয়াল করুক, সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে’।[18]
১৯. হালাল উপার্জন শেখানো: আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُم﴾ ‘তোমাদেরকে আমি যে উত্তম বস্তু দ্বারা রিযিক্ব দিয়েছি, তা থেকে খাও’ (আল-বাক্বারা, ২/১৭২)।
২০. নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاق ‘আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্র পরিপূর্ণ করার জন্য’।[19]
২১. কন্যাসন্তানকে হিজাব শিক্ষা দেওয়া: আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿يَا أَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ ٱلْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِن﴾ ‘হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদর নিজেদের উপর টেনে নেন’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫৯)।
২২. খেলাধুলায় উৎসাহ দেওয়া: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,كُلُّ مَا لَهْوٍ يَلْعَبُ بِهِ الرَّجُلُ بَاطِلٌ إِلَّا رَمْيُهُ بِقَوْسِهِ، وَتَأْدِيبُهُ فَرَسَهُ، وَمُلَاعَبَتُهُ أَهْلَه ‘মানুষের সব ধরনের খেলাধুলা অর্থহীন; তবে তির-ধনুক চালনা, ঘোড়া প্রশিক্ষণ এবং পরিবারের সাথে খেলা ব্যতীত’।[20]
২৩. দু‘আ শিক্ষা দেওয়া: আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُم﴾ ‘আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’ (গাফির, ৪০/৬০)।
২৪. গীবত থেকে বিরত রাখা: আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا﴾ ‘তোমাদের কেউ যেন অন্য কারো গীবত না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?’ (আল-হুজুরাত, ৪৯/১২)।
২৫. আল্লাহভীতি শিক্ষা দেওয়া: আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿فَاتَّقُوا ٱللَّهَ مَا ٱسْتَطَعْتُم﴾ ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো যতটুকু পার’ (আত-তাগাবুন, ৬৪/১৬)।
২৬. সন্তানের জন্য দু‘আ করা: আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ ٱلصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي﴾ ‘হে আমার রব! আমাকে ছালাত ক্বায়েমকারী করো এবং আমার সন্তানের মধ্য থেকেও’ (ইবরাহীম, ১৪/৪০)।
উপসংহার:
সন্তান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক আমানত। তাদেরকে সঠিকভাবে লালনপালন করা, দ্বীন ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া, চরিত্রবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা— এগুলো পিতামাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শুধু খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয় প্রদান নয়; বরং তাদের হৃদয়ে ঈমান, তাক্বওয়া ও সৎচরিত্রের বীজ রোপণ করাই প্রকৃত দায়িত্ব পালন।
যদি পিতামাতা সন্তানের ইহকাল ও পরকাল উভয়ের কল্যাণের প্রতি যত্নবান হন, তবে সেটিই তাদের জন্য ছওয়াব ও দুনিয়া-আখেরাতের সাফল্যের পথ খুলে দেয়। তাই আমাদের উচিত সন্তানকে দুনিয়ায় নয়, আখেরাতের সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সেই তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
আব্দুল মোমিন তাজেমুল হক
শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।
[1]. মুসনাদে আহমদ, হা/১০৬১৮; ইবনু মাজাহ, হা/৩৬৬০।
[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৯।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৫২০০।
[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৩১।
[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৮০২।
[6]. তিরমিযী, হা/১৫৫৩।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৪৬৭।
[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১৩২।
[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৯০।
[10]. আবূ দাঊদ, হা/২৮৩৮।
[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৮৯।
[12]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০২৭।
[13]. ইবনু মাজাহ, হা/২২৪।
[14]. আবূ দাঊদ, হা/৪৯৫।
[15]. তিরমিযী, হা/১৯৫২।
[16]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৯৪।
[17]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৭৮।
[18]. তিরমিযী, হা/২৩৭৮।
[19]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/১৬১৪।
[20]. তিরমিযী, হা/১৬৩৭।
