[১]
গ্রামের মাঝ বরাবর ইট বিছানো যে আধাপাকা রাস্তাটা গেছে, সে রাস্তা দিয়ে প্রভাতের মিইয়ে আসা সুনসান আঁধারে হেঁটে চলেছে পাঞ্জাবী-টুপি পরা একদল ছোট হুজুর। পুরো রাত টুপটাপ করে ঝরা শিশিরবিন্দু গাছের পাতায় মাকড়সার জাল হয়ে ছেয়ে আছে। তখনও যেন পুরো গ্রাম ঘুমিয়ে আছে। রাস্তার পাশের বাড়িগুলো থেকে হাঁড়িপাতিলের শব্দ আসছে। হয়তো রান্না বসিয়ে দিয়েছে বাড়ির গৃহিণীরা। বাড়িঘরের বৈদ্যুতিক লাইটের হালকা আলো এসে মিলেছে শেষরাতের চাঁদের আবছা রোশনাইয়ের সাথে। এই নিস্তব্ধতায় হাঁটার আওয়াজ পিছনে ফেলে এগিয়ে চলছে আমিনপুর হাফিযিয়া ইয়াতীমখানা মাদরাসার ছোট বাচ্চারা। তারা যে যার জাইগির বাড়িতে যাচ্ছে। পুরো বছর তারা মাদরাসাতেই খায়। শুধু রামাযানের এই বরকতময় মাসে গ্রামের লোকেরা ছওয়াবের আশায় একেকজন ইয়াতীম ছাত্রকে নিজের বাড়িতে খাওয়ায়। হুযায়ফা তেমনই এক ইয়াতীম বালক। বছর দুয়েক আগে সে এই মাদরাসায় এসেছে। পৃথিবীতে আসার আগেই সে তার বাবাকে হারিয়েছে। অভাগী মায়ের কোলে অভাবের সংসারে বাবার ছায়াহীনতার মাঝেই বড় হয়েছে সে। এরপর তার ঠিকানা হয়েছে এই হাফিযিয়া ইয়াতীমখানা মাদরাসায়। এখানেই তার দিনের পর দিন কাটে, মাসের পর মাস। রামাযান শেষে সে এখানেই তার মতো অসহায়দের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে।
[২]
হুযায়ফা সাহারী খেতে বসেছে। পাশে বসেছেন নিম্নমধ্যবিত্ত এই বাড়ির কর্তা আনোয়ারুল হক। ভাত বেড়ে দিচ্ছেন তার স্ত্রী ছানোয়ারা বেগম। হুযায়ফার পাতে তুলে দিলেন বড় মাছের মাথা। হুযায়ফা তাদেরকে দাদা-দাদি বলে ডাকে। আর তারা হুযায়ফাকে ডাকে ‘বাবা’ বলে। রামাযানের দুই দশকের পরিচয়ে এতটা আপন হয়ে গেছে তারা, মাঝেমধ্যে ইফতারের পর আনোয়ারুল হক তাকে চা খেতে নিয়ে যায় বাজারে। হুযায়ফা রাতের খাবার ও সাহারী খায় এ বাড়িতে আর ইফতার করে গ্রামের মসজিদে। এ গ্রামের মসজিদে রোজ ইফতারির ব্যবস্থা আছে। গ্রামের প্রতিটি পরিবার এই ৩০ দিন পালাক্রমে ইফতারি দেয়। ছোট থেকে বড় সবাই শেষ বিকেলে সারিতে বসে যায় মসজিদের সামনের বারান্দায়। দুয়েকজন ক্ষুধার্ত ভিক্ষুকের ঝুলিতেও খাবার জোটে এখানে। ইফতার বিতরণ শেষে কিছু বৃদ্ধ সেখানেই বসে ইফতারি করেন। ছোটরা ইফতার নিয়ে চলে যায় আপন বাড়িতে। এরপর মা-বোনদের সাথে মিলে ইফতারে বসে। আযানের আগেই চুপিচুপি মুখে পিঁয়াজু নিয়ে চিবাতে থাকে। তরুণরা মসজিদ থেকে ইফতার নিয়ে দলে দলে গোল হয়ে বসে পড়ে বিভিন্ন দোকানের টংয়ে। গ্রামের কিছু মানুষ বাজার করতে গিয়ে সময় শেষ হওয়ায় সেখানেই কোথাও ইফতার সেরে নেয়। বাড়ির মহিলারা প্লেট সাজিয়ে নিয়ে বসে থাকে আযানের অপেক্ষার। মসজিদের মুয়াযযিন সাহেব খেজুর হাতে ঘড়ি দেখেন বারবার। সময় হলে মাইকে ফুঁ দিয়ে শুরু করেন ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’। এরপর সারাদিনের পিপাসার্ত গলা ভিজিয়ে দেয় ইফতারের সুখ। দিনশেষে এতেই তো ছিয়াম পালনকারীর তৃপ্তি। আর সাথে আল্লাহর প্রতিশ্রুত অফুরন্ত প্রতিদান তো আছেই।
[৩]
ঈদ মানে আনন্দ-উল্লাসের আমেজ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার মনোনীত এবং মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘোষিত আনন্দের দিন। খুশির আভাসের সু্বাস ছড়িয়ে যায় গ্রাম-গঞ্জের অলিগলিতে। কত আনন্দ, কত প্রস্তুতি আর ছেলেমেয়েদের নতুন পোশাকের বায়না। তাদের আছে চশমা, ঘড়ি, জুতার শখ আর স্বজনদের কাছে সালামীর আবদার। বাসা-বাড়িতে হরেক প্রকারের সেমাই, আত্মীয়দের বাড়িতে দাওয়াত, দূরের মানুষদের আপন ঘরে ফেরা তো আছেই। রামাযান যতই শেষ হয়, ততই বাড়তে থাকে ঈদের কেনাকাটা আর আনন্দের আয়োজন। একদিকে রামাযানের বিদায়ের দুঃখ, অপরদিকে ঈদের সুখ, এ দুই মিলিয়ে মুমিনের মন মিশ্র অনুভূতিতে ভরে ওঠে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা মার্কেট করে ঈদের নতুন চকচকে পোশাকটি লুকিয়ে রাখে, কাউকে দেখায় না। যদি কোনো বন্ধু-বান্ধব তার মতো ডিজাইনের কাপড় কিনে ফেলে! কোনো কোনো পরিবারের সদস্যরা কিংবা বন্ধুরা একই রকম পাঞ্জাবী বানায়। আকাশে-বাতাসে ইসলামের সুখবার্তা ভাসতে থাকে। কিন্তু! কিন্তু নতুন পোশাক তো দূরে থাক, যাদের পরনের কাপড়েই কয়েকটা জোড়াতালি, যাদের রাত কাটে স্টেশনে বস্তা গায়ে জড়িয়ে, ঈদগাহে গিয়েও যাদের পথের পাশে হাত পেতে পড়ে থাকতে হয় দুটো টাকার আশায়— তাদের কাছে ঈদের দিনে চেয়ে পাওয়া এক বাটি সেমাইয়ে-ই ঈদের সুখ। হুযায়ফার আছে দুই বছরের পুরনো দুটো পাঞ্জাবী মাত্র। সে দুটো এখন ছোট হয়ে এসেছে। পকেটের সেলাই সেই কবেই খুলে গেছে। বুকের বোতাম নেই দুই-তিনটা। সাদা পাঞ্জাবী ময়লা লেগে লেগে ধবধবে রং ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। গ্রামের রাস্তার পাশে মাদরাসার যে ভাঙা দেয়ালটা আছে, সেটাতে বসে হুযায়ফা চেয়ে থাকে গ্রামের ছেলেমেয়েরা ঈদের মার্কেট করে বাইকে করে বাড়ি ফিরে। বাবা বেঁচে থাকলে সেও হয়তো বাবার হাত ধরে মার্কেট করতে যেত! তারও তো শখ হয়, ঈদের ছালাতে নতুন পাঞ্জাবী পরবে। মা নিজ হাতে মাথায় পরিয়ে দিবেন সাদা সুন্দর টুপি! দাদি সুরমা লাগিয়ে দিবেন চোখের পাতায়। এরপর সে বাবা ও দাদার সাথে ঈদগাহে যাবে। ছালাত শেষে বাবার থেকে টাকা নিয়ে দানের কৌটায় দিবে! সে এমন ভাবনা ভাবে আর নিভৃতে ব্যথিত হয়। সে জানে, এসব সুখ তার জন্য নয়। গরীবের এসব ভাবতে নেই। তাই সে যা আছে তা দিয়েই ঈদের প্ল্যান করতে থাকে। একটি পাঞ্জাবী ধুয়ে গুছিয়ে রাখে দড়িতে। ঈদের ছালাতে বন্ধুদের সাথে একসাথে হেঁটে যাবে। মাদরাসায় যে সেমাই আসবে সেগুলো সবাই মিলে রান্না করবে। গ্রামের পাশের বনে আর নদীতে বিকেলে ঘুরতে বের হবে। এতেই এই ইয়াতীম ছাত্রদের ঈদ!
[৪]
হুযায়ফা খেতে বসলে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন ছানোয়ারা বেগম। নিজ পেটের বাচ্চাটার কথা মনে পড়ে যায় তখন, যে কলিজার টুকরা জন্মের পরেই মারা গিয়েছিল। হুযায়ফার চেহারায় যেন তিনি হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে খুঁজে পান। ভীষণ মায়া হয় তার জন্য। মুনাজাতে হুযায়ফার জন্য দু‘আ চলে আসে আনমনেই। হাতের নতুন সাদা সুন্দর পাঞ্জাবীটা হুযায়ফার জন্যই। আনোয়ারুল হক ঈদের মার্কেট করতে গিয়েছিলেন। ছানোয়ারা বেগম ড্রয়ার খুলে নিজের জমানো কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়েছিলেন স্বামীর হাতে।
-হুযায়ফার জন্য একখান পাঞ্জাবী লই আইও। বাচ্চাটার ভালা পাঞ্জাবী নাই!
-(মুখে হাসি নিয়ে আনোয়ার বলেন) মনের কথা কইছো। মুইও তো হেইডা ভাবতাসিলাম। এই ট্যাকা রাখো। মুই নিমু, ইনশা-আল্লাহ!
-না। এইডাই দিয়া নিও। আমার ভালা লাগবো। আর শোনো, সাদা রঙের পাঞ্জাবী নিও।
আনোয়ারুল হক মার্কেটে গিয়ে সবার আগে হুযায়ফার জন্য পছন্দ করে পাঞ্জাবী কিনলেন। এরপর নিজের একটা লুঙ্গি আর স্ত্রীর জন্য কাপড় কিনে বাড়িতে ফিরলেন। ছানোয়ারা বেগম পাঞ্জাবীটি গুছিয়ে আলনাতে সাজিয়ে রাখলেন। ঈদের এখনও পাঁচদিন বাকি। এখন না, বরং চাঁদরাতে পাঞ্জাবীটা হুযায়ফার হাতে দিবেন তিনি। এতে সে অনেক বেশি অবাক হবে। হাতে নতুন পাঞ্জাবী পেয়ে মুচকি হাসি খেলে যাবে তার চোখেমুখে। এই হাসিটাই তো ছানোয়ারা বেগম দেখতে চান।
[৫]
শেষ ছিয়ামের মাগরিব পর মসজিদ থেকে বের হয়ে গ্রামের সবাই চতুর দৃষ্টিতে তাকায় পশ্চিম দিগন্তে। ঈদের চাঁদ বাঁকা ঠোঁটে হেসে ওঠে সবুজ পাতার আড়ালে। যে প্রথমে দেখতে পায়, হাতের ইশারায় দেখাতে চেষ্টা করে বাকিদের। ছোটরা তাদের দীপ্তিময় চোখের তারায় চাঁদ দেখে খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। জ্যোতি কমে যাওয়া বৃদ্ধরাও চোখের উপরে হাত দিয়ে চাঁদের দেখা পেতে উদগ্রীব হন। ছেলেরা দল ধরে বেরিয়ে পড়ে চাঁদরাতের আলোতে। মেয়েরা মেহেদীতে রাঙিয়ে তোলে নিজের হাত। আকাশে-বাতাসে শুধু আনন্দের সমারোহ। হুযায়ফার জন্যও হয়তো এবারের ঈদ আনন্দের হবে। ছানোয়ারা বেগম যখন তার হাতে নতুন সাদা পাঞ্জাবী তুলে দিবেন, তখন হয়তো সে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে। ঈদের দিন হয়তো তাকে এ বাড়িতেই খাওয়াবেন আনোয়ারুল হক। সাদা পাঞ্জাবীটা সে বারবার ভাঁজ খুলে খুলে দেখবে। ঈদের ছালাতে নতুন এই জামা পরে মুছল্লায় যাবে। তারপরও কোথাও যেন একটা চাপা শূন্যতা থেকে যাবে তার। চাঁদরাতে উঠানে বসে মরা বাপ আর অভাগিনী মায়ের কথা মনে পড়বে তার। সাময়িক সুখে কি চিরন্তন দুঃখ ঢাকা যায়? আর তার মতো যারা আছে এই ইয়াতীমখানা মাদরাসায়, তাদের ঈদ হয়তো আগের মতোই পুরাতন ছেঁড়া পাঞ্জাবীতেই কাটবে। যাদের রাত কাটে পথের পাশে, তাদের ঈদ হয়তো সেখানেই হবে খোলা আসমানের নিচে ভিজে! যেসব পথশিশু বোতল কুড়িয়ে বেড়ায়, তাদের ঈদ কত অসুখে কাটবে! এই পৃথিবীতে সুখের হাওয়া বইলেও কোথাও কেউ নিদারুণভাবে থেকে যায় ভীষণ অসুখে। ঈদের চাঁদ সারা পৃথিবীতে আলো ছড়িয়ে দিলেও সবার ঈদ পূর্ণতা পায় না আর সবার ঘরে ঈদও আসে না!
মাজহারুল ইসলাম আবির
শিক্ষার্থী, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।
