রামাযান মাস মানেই বরকতময় মাস। পুরো রামাযান মাসকে সাজানো হয়েছে হরেক রকম কাজে। সাহারী থেকে ইফতার, তারপর ক্বিয়ামুল লায়ল সবকিছু বারাকার চাদরে মুড়ানো আছে। রামাযানের আগমনের বার্তা কর্ণকুহরে আসা মাত্রই মনের অলিন্দে ভেসে উঠে হাজারো কাজের প্রতিচ্ছবি। উঁকিঝুঁকি খেলতে থাকে রামাযান মাসের করণীয়গুলো। তৃপ্তির ঢেকুর উঠে ইফতারের বন্দোবস্ত কল্পনার জগতে স্থান পেলে। সাহারীতে ঘুম থেকে জাগার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় রাজ্য জয়ের আনন্দ। ছিয়াম রাখার জন্য আমরা সাহারী করি। সাহারী করতে উৎসাহ দিয়ে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بَرَكَةً ‘তোমরা সাহারী খাও। কেননা সাহারীতে বরকত রয়েছে’।[1]
নিত্যদিনের ন্যায় আজও সাহারীর খাবার প্রস্তুত করা হয়েছে। ঘুমের তীব্রতা যেন চোখ সহ্য করতেই পারছে না। রাজ্যের সব ঘুম যেন আজ তার চোখে। তারপরও একরাশ ঘুম ও আলস্যকে সাথে করে খেয়েই যাচ্ছে ফাহমিদার আদরের ছোট ভাই ফাহিম। এর আগেও আরও কয়েকটি ছিয়াম বিগত হয়ে গেছে। আজ পঞ্চম ছিয়াম। পরিবারের সকলে জাগলেও ফাহিমকে জাগানো হয় না সাহারীতে। সে প্রতিনিয়তই তার মাকে জড়জড় কণ্ঠে ক্লান্তিহীন বলতে থাকে, আম্মু! আমিও ছিয়াম রাখব! আমিও ছিয়াম রাখব! তার আম্মু মাথায় হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলেন, হ্যাঁ, আব্বু! তুমিও ছিয়াম রাখবে, আরেকটু বড় হও।
কিন্তু ফাহিম এমন কথা শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তার আম্মুর এমন সান্ত্বনামূলক কথা শুনে কান্নার হাট বসিয়ে দিল। ছেলের এমন অবিরাম কান্না দেখে মা বললেন, ঠিক আছে, আব্বু! আর কাঁদতে হবে না। ইশ! কেঁদে চোখটা লাল করে ফেলেছে। তোমাকেও আমরা কাল থেকে সাহারীর সময় ঠিকই উঠাব।
ফাহিমের মুখে মিষ্টি হাসি শোভা পেল। কিন্তু ফাহিমের জীবনে কাল সকাল আসতে বহু দেরি হলো। ইতোমধ্যে তার মাকে আরও বেশ কয়েকবার বলা হয়ে গেছে। তার বোনকেও বলতে বাদ রাখেনি। তবুও কেউ কথা দিয়ে কথা রাখে না— এমনটাই মনে করে ফাহিম।
আজ পঞ্চম ছিয়াম। ফাহিমের উঠতে আজ আর দেরি হয়নি। একদম যথাসময়ে ঠিক যেন আজ সে এলার্ম দিয়ে রেখেছিল। এটা দেখে তার পরিবারের সবার চোখ চড়কগাছ হয়ে গেছে।
ফাহিমের এই ছোট্ট বয়সেই ছিয়াম রাখার প্রতি আলাদা একটা ভালোবাসা ছিল। সে ছিয়াম রাখার অশেষ নেকীর কথা জানত। এর ফযীলত আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে দিবেন—এ কথাও তার জানার বাইরে ছিল না। তার শিক্ষকের মুখে রামাযানের আগের দিনই এ কথাগুলো শুনেছে সে। তার সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপের নরম পাপড়ির ন্যায় হৃদয়মূলে বেশ ভালোভাবেই গেঁথে আছে কথাগুলো। সে তার শিক্ষকের কাছে শুনেছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصِّيَامَ، فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ ‘বনূ আদমের (মানুষের) প্রত্যেকটি আমল তার নিজের জন্য, কিন্তু শুধু ছিয়াম আমার জন্য আর আমিই এর প্রতিদান দিব’।[2] তাছাড়া এই হাদীছের শেষের দিকে বলা হয়েছে, ছিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধও আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ، لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِندَ اللَّهِ مِنْ رِيحِ المسك ‘সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! ছিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট কস্তুরির ঘ্রাণ অপেক্ষা অধিক পবিত্র ও প্রিয়’।
ছিয়াম পালনকারীর অগাধ আনন্দ মেলে ইফতারে। ছিয়াম পালনকারীদের ইফতারে আনন্দের সীমা থাকে না। দীর্ঘক্ষণ পদব্রজে চলার পর ধুধু মরুভূমির বুকে এক ফোঁটা পানি যেভাবে পথিকের শুষ্ক বদনে আনন্দের হাসি ফিরিয়ে দেয়, ইফতারে তার চেয়েও বেশি আনন্দ এসে জমা হয় ক্লান্ত হৃদয়ের পাটাতনে। যেন হৃদয়াকাশে মেঘহীন বাদল নামে!
সত্যিই হৃদয়ে প্রশান্তি মেলে যখন দেখি বেলাশেষে সূর্যরশ্মিরও কোনো তেজ নেই, ঢলে পড়েছে পশ্চিম দিগন্তে, কতশত ছিয়াম পালনকারী ইফতারী সামনে নিয়ে বসেছে। নির্দ্বিধায় নিঃসংকোচে হাতের তালুর মতো বিছানো পৃথিবীতে শিকলমুক্ত আকাশের নিচে সারাদিনের ক্লান্তি ঘোঁচাবে। ইফতারে দিনের ক্লান্ত হৃদয় প্রশান্তি পায়। সাদা পানি আর খেজুরে তৃপ্তি আসে অন্তরে। সেই সীমাহীন আনন্দের কথা হাদীছের পাতাতেও মেলে। হাদীছে এসেছে, لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ، فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ، وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ ‘ছিয়াম পালনকারীর জন্য রয়েছে দুটি আনন্দমুহূর্ত— একটি ইফতারের সময়, আরেকটি তার প্রভুর সাথে সাক্ষাতের সময়’।[3]
এগুলো শোনার পরেই ফাহিমের মধ্যে ছিয়াম রাখার স্পৃহা আরও শতগুণ বেড়ে যায়। ফাহিমের সাত সকালে কিছু না খেলে চলেই না। ছোট্ট ছেলে গায়ের হাড্ডিগুলো যেন গুনতে ভুল হবে না। এককথায় সে একটা তালপাতার সেপাই। আজ তার প্রথম ছিয়াম।
দিনের এক-প্রথমাংশ প্রায় কেটেই গেছে। রৌদ্রের তাপটাও একটু প্রখর হয়েছে। তার গলাও এতক্ষণ শুকিয়ে যাওয়া খালের মতো হয়ে গেছে। গতকালের কেনা একটা ক্যান্ডি অবশিষ্ট ছিল তার কাছে। সেটাই খপ করে মুখে পুরে দিল। পরক্ষণেই তার স্মরণে এলো ছিয়ামের কথা। অ্যাঁ! আমি তো ছিয়াম রেখেছি।
সে তার পুরো কাহিনিটা আম্মুকে জানায়। তার আম্মু এই ভুলবশত খেলে ছিয়ামের কোনো কমতি বা ক্ষতি হয় না—এ কথা জানান। হাদীছে এসেছে,مَنْ نَسِيَ وَهُوَ صَائِمٌ فَأَكَلَ أَوْ شَرِبَ فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللَّهُ وَسَقَاهُ ‘যে ব্যক্তি ছিয়াম অবস্থায় ভুল করে কিছু খেয়ে ফেলল বা পান করল, সে যেন তার ছিয়াম পূর্ণ করে নেয়। কারণ নিশ্চয়ই আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন ও পান করিয়েছেন’।[4]
এটা শোনার পর ফাহিমের খুশির আর সীমা থাকে না। তার ছিয়াম ভাঙেনি বলে মিছিল শুরু করে তার বোনের কাছে যায়।
এভাবেই দুপুর গড়িয়ে বিকাল নামে। এদিকে ফাহিম ঘড়ির কাটার দিকে তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সময় যেন দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। কিছুতেই তার ইফতারের সময় হচ্ছে না। এভাবে আর সাত মিনিট, আর পাঁচ মিনিট গুনতে গুনতেই আযানের ধ্বনি এসে পৌঁছে ফাহিমের কানে। অনাবিল আনন্দ আর বুকভরা প্রশান্তি নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে পানি মুখে দেয়। আজ কে দেখবে তার আনন্দ। তার ছোট্ট মুখে মিষ্টি হাসি ধরে রাখার মতো জায়গা নেই। তারপর তার আম্মুর সাথে সাথে এই দু‘আ পাঠ করে,ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللّٰهُ ‘পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং আল্লাহর ইচ্ছায় ছওয়াব ধার্য হলো!’ এভাবেই ফাহিমের প্রথম দিনের ছিয়ামের সমাপ্তি ঘটল।
সুপ্রিয় পাঠকবৃন্দ! আর কতকাল গা ভাসিয়ে সময়ের স্রোতে ভেসে যাবেন? কেন আপনি অবহেলায় কাজের বাহানা দিয়ে ছিয়াম ছেড়ে দিবেন? ছিয়ামের ফযীলত যে অপরিসীম। হাদীছে এসেছে, الصِّيَامُ جُنَّة ‘ছিয়াম ঢালস্বরূপ’।[5] যা মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে।
ছিয়ামের ফযীলতের কথা বলতে গিয়ে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ فِي الجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ لاَ يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ يُقَالُ: أَيْنَ الصَّائِمُونَ؟ فَيَقُومُونَ لاَ يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ فَإِذَا دَخَلُوا أُغْلِقَ فَلَمْ يَدْخُلْ مِنْهُ أَحَدٌ ‘জান্নাতে রাইয়্যান নামক একটি দরজা আছে। এ দরজা দিয়ে ক্বিয়ামতের দিন ছাওম পালনকারীরাই প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা দেওয়া হবে, ছওম পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়াবে। তারা ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। তাদের প্রবেশের পরই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। যাতে এ দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ না করে।[6] সুবহানাল্লাহ!
মহান আল্লাহ আমাদের পরিপূর্ণ গুরুত্ব সহকারে ছিয়াম পালন করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
-আব্দুল হাসিব বিন আব্দুর রহমান
অধ্যয়নরত, আলিম ২য় বর্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯২৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৯৫।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫১।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮০৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫১।
[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৬৬৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৫।
[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫১।
[6]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৯৬।
