(একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
মাহবুব স্যার শিক্ষকতা করেন একটি বিদ্যালয়ে। ছাত্রদের সাথে বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক। ছাত্ররাও তাকে খুব পসন্দ করে। তবে রেগে গেলে ভয়ে তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারে না। ইংরেজী পড়ান চতুর্থ শ্রেণীতে। প্রতিদিনের ন্যায় আজও তিনি পড়া নিচ্ছেন। নাইম নামের একজন ছাত্র এই শ্রেণীতে পড়ে। শান্তশিষ্ট ও সহজ-সরল প্রকৃতির। নিয়মিত সে পিছনের বেঞ্চে বসে। আজও পিছনের বেঞ্চেই বসেছে। কোনদিন ঠিকমত পড়া করে আসে না। দুর্বল মেধা, তা নয়; বুদ্ধির তীক্ষ্নতা তার চোখেমুখে প্রবলভাবে দীপ্তমান। কিন্তু কেন জানি সে কখনো পড়া করে আসে না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, শুধু তাঁর ক্লাসে নয়; কোন ক্লাসেই সে পড়া করে না। এর জন্য প্রত্যেক স্যারের নিকট প্রতিনিয়ত কড়া শাসনের সম্মুখীন হতে হয়।
মাহবুব স্যার আজও তাকে পড়া জিজ্ঞেস করলে চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী কোন ভনিতা না করে মাথা নিচু করে নিম্নস্বরে বলে, ‘তার পড়া হয়নি’। এ উত্তরে স্যার খুবই রাগান্বিত হয়ে শাস্তি দিতে উদ্যত হন। পরক্ষণে তিনি কিছু না বলে নিজ চেয়ারে ফিরে যান। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন। ছাত্রদের কিছু একটা লিখতে দিয়ে স্যার তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। বিশেষভাবে খেয়াল করে তিনি উপলব্ধি করেন, ছাত্রটি প্রতিদিন পিছনের বেঞ্চেই বসে। চুপচাপ থাকে, কারো সাথে মিশে না, গল্প করে না, কথা বলে না, এমনকি হাসেও না। সর্বদা মনমরা হয়ে উদাস মনে বসে থাকে। কেন সে এমন করে? এর উত্তর জানার জন্য স্যার তাকে লেখা বাদ দিয়ে নিজের কাছে ডাকেন। তাকে খুব কাছে নিয়ে জানতে চান, কেন সে পড়ালেখা করে না? সে কোন উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে থাকে। স্যার আবারো তাকে আদরমাখা স্বরে জিজ্ঞেস করেন, তার কি এই বিদ্যালয়ে পড়তে ভালো লাগে না? সে এবার ক্ষীণকণ্ঠে উত্তর দেয়, ‘না’। আবাসিক হোস্টেলে থাকতে ভালো লাগে না? আবারো উত্তর, না। কেন, বাড়ীর কথা খুব মনে পড়ে? মন খারাপ লাগে? এবারো উত্তর, না। বাড়ী থেকে কিছুদিনের জন্য ঘুরে আসতে চাও? আবারো উত্তর, না। এবার স্যার খুবই আশ্চর্যান্বিত হন। ব্যাপার কী? প্রতিষ্ঠানেও থাকতে ভালো লাগে না, আবার বাড়ীও যেতে চায় না। কৌতুহলী স্যার তাকে আরো কাছে নিয়ে সেণহের পরশ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করেন, কোন সমস্যা আছে কি? আমাকে বলতে পার।
স্যার খেয়াল করলেন হঠাৎ ছেলেটির চোখ দু’টি পানিতে টলমল করছে। সেণহের পরশে ছোট্ট হৃদয় জোয়ার ফিরে পায়। মনে হলো অনেকদিন সে এই পরশ পায়নি। স্যার তাকে স্বাভাবিক ও শান্ত করে আবারো প্রশ্ন করতে থাকেন। তোমার বাড়ী কোথায়? ‘বাঘা’ (রাজশাহী জেলার একটি উপজেলা)। তোমরা কয় ভাইবোন? ‘আমি একাই’। তো তুমি বাড়ী যেতে চাও না, তোমার আববু-আম্মু তোমাকে আদর করেন না? জবাব ‘না’ দিয়ে সে চুপ থাকে। তোমার আববু কী করেন, কোথায় থাকেন? ‘বিদেশ’। তোমার আম্মু? ‘আম্মু অন্য আরেকজনের সাথে বিয়ে করে চলে গেছেন’, সাবলীলভাবে জবাব দেয় সে। তুমি কার কাছে থাকো? ‘মামা-মামীর কাছে’। তোমার খরচ কি তোমার মামা বহন করেন? ‘না, আববু’। ও! তোমার আববুর সাথে কথা হয়? ‘অনেক দিন পর পর’। সর্বশেষ কতদিন আগে কথা বলেছ? ‘৩-৪ মাস আগে’। তোমার আম্মু তোমার সাথে দেখা করে না বা কথা বলে না? ‘মাঝে মাঝে কথা বলে’। তোমার মামা-মামি তোমাকে আদর করে? ‘(চুপ)’। তোমার মামা কী করেন? ‘এখন জেলে’। কেন? ‘জঙ্গিবাদের সন্দেহে’। প্রতিষ্ঠান ও বাড়ী দুইয়ের মধ্যে কোথায় বেশী ভালো লাগে? কোন উত্তর দেয় না। চুপচাপ থাকে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে চলে গেলে কোথায় যাবে? ‘(চুপ)’। মামাবাড়ী নাকি মায়ের কাছে? ‘মামাবাড়ী’। তোমার মায়ের দ্বিতীয় স্বামী তোমাকে বাড়ীতে ডাকে না? ‘না’। তোমার আম্মুর ঐ স্বামী কী করেন? ‘জানি না, তার একটি ছেলেও আছে’। স্যার তাকে জিজ্ঞেস করেননি যে, ওর আম্মুর দ্বিতীয় স্বামীর অন্য কোন স্ত্রী ছিল কিনা বা সন্তান আছে নাকি। স্যার তাকে আর কোন প্রশ্ন করলেন না। শুধু বললেন, দেখো বাবা! এখানেই থাকো। মন খারাপ করবে না। হাসিখুশি থাকবে। ভালোমত পড়ালেখা করবে। মানুষের মত মানুষ হতে হবে। আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করবেন। সাথে আরো কিছু পরামর্শ, উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ও সাহস দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
ক্লাস শেষে স্যার অফিসে গিয়ে বসলেন। এক গস্নাস পানি পান করলেন। মনটা তার খারাপ। ছেলেটির মুখ, ওর চাহনী, ওর কথাগুলো বার বার স্যারের হৃদয়কে নাড়া দিচ্ছে। আর ভাবছেন, হায়! মানুষের জীবন কত বিচিত্র। কেউ সুখের রাজ্যে আনন্দ-ফূর্তিতে বসবাস করছে। আবার কেউ দুঃখের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। আসলে মুখ দেখে অনেক সময় বোঝার উপায় নেই, কার মনের ভিতর দিয়ে কী যাচ্ছে। এই ছেলেটির বয়স কত হবে? ৮ থেকে ৯। এসময় তার বাবার আদর, মায়ের সেণহ, ভালোবাসার পরশ পাবার কথা। অথচ পিতা-মাতা থাকা সত্ত্বেও সে তা থেকে বঞ্চিত। ভাবতে শিহরিত হয়, ছোট্ট ছেলেটি মনের গহীনে কত শত সমস্যা, কষ্ট, ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছে। কারো কাছে তার ব্যথা বলতে পারে না, বোঝাতে পারে না। আসলে তাকে কেউ বুঝতে চেষ্টা করে না। ছেলেটি অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছে। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। হৃদয়ে কেবল শূন্যতা আর হাহাকার। কোথায় পাবে একটু সেণহের পরশ, একটু ভালোবাসা? কোথায় যাবে সে?
