কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কুরবানীর হাট

post title will place here

ইদুল আযহা বছর ঘুরে খুশির ফোয়ারা নিয়ে উপস্থিত হয় প্রতিটি দুয়ারে। ইদুল আযহাকে কেন্দ্র করে আনন্দের সীমা থাকে না। স্বচ্ছ আকাশের মাঝে উল্লাসের ধ্বনি জটলা বেঁধে অনর্থক আলাপ করতে থাকে। মিষ্টি কণ্ঠে জানান দেয় বিহঙ্গের দল। পবনের স্নিগ্ধ সুর মাতাল মনে নেচে নেচে পরিবেশকে আরো মনোহর করে তোলে।

অর্ণব যেন তার বুকে সমস্ত স্ফূর্তি স্থান দিয়ে দাওয়াতের চিঠি পৌঁছে দেয় দূর প্রান্তে, কালের বিবর্তনে চাপা পড়ে থাকা স্বজনদের মাঝে। এই আনন্দে ল্যাম্পপোস্টের নিভু নিভু বাতিরাও পাটি দাঁতের সারি মিলিয়ে হাসতে থাকে। এতে অভিমানীদের গোমড়া মুখে জমে থাকা অভিমানগুলো সেকালেই ভেঙে যায়।

শুরু হয়ে যায় কনিষ্ঠ আঙুলের গিরা ধরে যিলহজ্জ মাসের প্রথমার্ধ গণনা—এক, দুই, তিন… আর মাত্র কয়েকদিন। এভাবেই গাণিতিক নিয়মে গুনতে থাকা হয় অষ্টপ্রহর। মনের মাঝে বিরাজ করে এক মস্ত আনন্দের রাজ্য। অদৃশ্য সেই আনন্দগুলো কতই না মনোহর রূপে সেজে থাকে।

তড়িঘড়ির শেষ আসে না ঈদুল আযহাকে ঘিরে। আমোদের স্রোত নরম স্পর্শকাতর হৃদয়ের প্রান্তভূমির শুষ্ক স্থান ঘেঁষে বইতে থাকে। অজান্তেই লাবণ্যময় বদন ছেয়ে যায় অধরপুটের বাঁকা হাসিতে। নিরস শক্ত মাটির বুক বিদীর্ণ করে অঙ্কুর যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি ক্ষীণ মনেও তীব্র আশার সঞ্চার হয়।

কোষমুক্ত তরবারির সুচালু ধার প্রতিপক্ষকে আঘাত হানার জন্য যেভাবে ক্লান্তিহীন প্রস্তুত থাকে, তারচেয়েও জাঁকজমকপূর্ণভাবে কুরবানী করার ইচ্ছা সতেজভাবে জাগরুক থাকে পরিবারের সদস্যদের মনে। এগুলো ভাবতেই আহ্লাদি মন বাকবাকুম করে ওঠে।

আর যদি কোনো পরিবার ছোট্ট সোনামণিদের দ্বারা আলোকিত হয়ে থাকে, তাহলে তো তার বাঁধভাঙা আনন্দের কথা কলমের নিবে এসে বরফের মতো জমে যায়। তার সীমাহীন আনন্দের কথা যথার্থভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভবপর হয় না। তাই শুধু সাদা কাগজ কালো দাগে ভরাতে চাই না।

মোহাম্মদপুর গ্রামের মোখলেছুর রহমানের ছোট্ট ছেলে মাহিম। বাবার সাথে কুরবানীর পশুহাটে যাওয়ার বিরাট আবদার তার। শহর, শহরতলী ও উল্লেখযোগ্য নির্ধারিত স্থান ছাড়াও ইদুল আযহার আগে কমবেশি সর্বত্র পশুহাটের দেখা পাওয়া যায়। গৃহপালিত পশু নিয়ে যাওয়া হয় বেশি এসব হাটে। আশেপাশের মহল্লার বিভিন্ন রকম ক্রেতা এসে ভিড় জমায়। জনস্রোতের উপচে পড়া ভিড়ের সম্মুখীন হতে হয়। কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে পশু কেনা। মনে হয় দেশের সব মানুষ একত্রিত হয়েছে মহল্লার এ ওয়ান-টাইম ছোট্ট হাটে। পদচিহ্নের মাঝে যদি একটা সুঁই পরিমাণ জায়গা ফাঁকা থাকে, তবুও হাফ ছেড়ে বাঁচা যায়। এসব মানবস্রোতের ভিড়ে একের পর এক পশু দেখে চলছে মোখলেছুর রহমান তার ছোট ছেলেকে নিয়ে। কত ত্রুটিপূর্ণ প্রাণী তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ক্যালকুলেটরও বুঝি হিমশিম খাবে।

বিকেলের রঙহীন ধূসর কুয়াশা অনেক আগেই কেটে গেছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ তার ঝাঁপি থেকে অন্ধকার নামিয়ে দেবে পৃথিবীতে। পরক্ষণেই পুরো পৃথিবী গভীর তমসায় ছেয়ে যাবে। বিশাল আকাশের বুকে ঝুলে থাকতে দেখা যাবে অগণিত ও অসংখ্য তারকারাজি। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফেরার যে ইচ্ছাটুকু ছিল, তা অপূর্ণই রয়ে গেল। কারণ চারপাশ থেকে দিন বিদায়ের চিহ্ন ও রাত আগমনের আলামত দেখা যাচ্ছে। এখন পশুগুলোকেও ইলেকট্রিসিটির আলোতে দেখতে বাধ্য।

অবশেষে তারা একটা পশু ক্রয় করল। হাটের যাবতীয় কাজ তথা ছাড়পত্র এতক্ষণে শেষের পথে। বাবা-ছেলে পৃথিবীর বিছানো পথ ও আকাশের গালিচার নিচ দিয়ে হাঁটা শুরু করেছে। রাতের নির্জনতা ও ছমছমে পরিবেশ আজ বোঝা মুশকিল। ফিরতি মানুষের ঢল আর পশুর হাঁটাচলার কারণে রাস্তাঘাটসহ পরিবেশ ভারী করে তুলেছে। তবে জোছনাময় চাঁদের আলো মাহিমের মুখে গলে গলে পড়ছে। সে যে আজ কী ভীষণ আনন্দ পাচ্ছে, অন্য হৃদয় দিয়ে সবটুকু বোঝা যাবে না। এই নিখুঁত কালো কুচকুচে রাতকে চাঁদ যে কী ভীষণ পরম আলো দিয়ে আগলে রেখেছে, এটা পথচারীরা খুব ভালোই টের পাচ্ছে। অতি সহজেই এগোনো যাচ্ছে। বাড়ির পথটাও যেন এগিয়ে আসছে আস্তে আস্তে। পরিশেষে আনন্দচিত্তে বাবা-ছেলে বাড়িতে ফিরল।

আর মাত্র দুদিন বাকি সেই মাহেন্দ্রক্ষণের। যথারীতি মোখলেছুর রহমান তার বাড়ির সামনের আঙিনায় কুরবানীর জন্য ক্রয়কৃত পশুটি বেঁধে রেখেছে। যোহরের ছালাত শেষ করে ওই পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন পাশের গ্রামের আলেম সোলায়মান সাহেব। মোখলেছুর রহমানকে তার পশুর খেয়াল রাখতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী মোখলেছুর রহমান? পশু তো কেনা হয়ে গেছে, তো কয় দাঁতের?’

সোলায়মান সাহেবের মুখে এ প্রশ্ন শুনে মোখলেছুর রহমান বিস্মিত হলো। মনে হচ্ছে, যেন আকাশ থেকে সবেমাত্র ধপাস করে পড়ল। তার সাথে সাথে অসীম চিন্তাধারা তার পুরো মুখাবয়বে জাপটে ধরে বসেছে। এই ভরদুপুরেও তার চারপাশে যে কালবৈশাখীর ঝড় তীব্র বেগে বয়ে চলছে, এটা যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবে। আর এতক্ষণে কষ্টগুলো বিনা দলীলে দুই চোখ দখল করে নিয়েছে। একটু হলেই হুমড়ি খেয়ে পড়বে। শুধু হতভম্ব ও পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সোলায়মান সাহেবের দিকে।

কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে মিইয়ে যাওয়া গলায় উত্তর দিল, ‘সোলায়মান সাব, দাঁত তো এখনো ওঠেনি’।

সোলায়মান বললেন, দাঁতবিহীন প্রাণীকে তো রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানী দিতে নিষেধ করেছেন। একটি হাদীছে এসেছে,

وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً، إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ، فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْنِ.

জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা মুসিন্না জন্তু ছাড়া কুরবানী করবে না। যদি তা তোমাদের জন্য সহজসাধ্য না হয়, তবে জায‘আ (ছয় মাসের ভেড়া) কুরবানী করবে’।[1]

সোলায়মান সাহেবের কথা মোখলেছুর রহমানের কাছে আকাশ ভেঙে পড়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর শোনাল। মানুষ এত হতচকিয়ে যেতে পারে এটা মোখলেছুর রহমানকে না দেখলে অনুমান করা মুশকিল।

তার সাথে সাথে সোলায়মান সাহেব এটাও জানিয়ে দিলেন যে, আর কয় ধরনের ত্রুটিপূর্ণ প্রাণী কুরবানী দিতে নিষেধ করা হয়েছে। অতঃপর নিম্নবর্ণিত হাদীছটি পাঠ করে শোনালেন।

عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رضي الله عنهما قَالَ: قَامَ فِينَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «أَرْبَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الْأَضَاحِي: الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا، وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا، وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلْعُهَا، وَالْكَسِيرَةُ الَّتِي لَا تُنْقِي.

বারা ইবনু আযিব রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, ‘চার প্রকার জন্তুর কুরবানী বৈধ হবে না— অন্ধ, যার অন্ধত্ব হওয়া স্পষ্ট; রুগ্ন, যার রোগ প্রকাশ্য; খোঁড়া, যার খোঁড়াভাব সুস্পষ্ট এবং অতি দুর্বল’।[2]

তবে এগুলো মোখলেছুর রহমানের জানা ছিল। কিন্তু দাঁতবিহীন প্রাণী কুরবানী দেওয়া যাবে না, সেটা তার জানার বাইরেই ছিল। যেন কোনোদিন তার জানার পৃষ্ঠায় লেখা হয়নি। এমনই অনেক কিছু জানা-অজানা আমাদের মাঝে রয়ে যায়। এমনকি অনেক সময় মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকে। ফলত অদেখাতেই দিগন্তের মতো দূরে চলে যাই। তফাৎ সৃষ্টি হয় যোজন যোজন। ঝলমলে দুপুরেও পথহারা পথিকের ন্যায় অজানার চৌকাঠ পেরোতে হোঁচট খাই। আর এভাবেই খেই হারিয়ে যাই।

* কুল্লিয়্যাহ ১ম বর্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৬৩; নাসাঈ, হা/৪৩৭৮; আবূ দাঊদ, হা/২৭৯৭।

[2]. আবূ দাঊদ, হা/২৮০২; নাসাঈ, হা/৪৩৬৯; তিরমিযী, হা/১৪৯৭।

Magazine