২১ হিজরীতে ইয়াসার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রীর গর্ভে এক ফুটফুটে সন্তান জন্মগ্রহণ করেন, যিনি পরবর্তীকালে হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ নামে সর্বমহলে পরিচিত হন। হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ জন্মগ্রহণ করার পর তাকে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আনলে তিনি নবজাতক শিশুকে দেখে কোলে তুলে নিয়ে দো‘আ করলেন এবং ইয়াসার রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন, ‘ভাই ইয়াসার! তোমার পুত্রের সৌন্দর্যের প্রতি লক্ষ্য রেখে আমি তার নাম রাখলাম হাসান, যার অর্থ সুন্দর। সে মতেই তার নাম রাখা হয় হাসান। উম্মে সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহাও শৈশবে তাকে যত্নের সাথে প্রতিপালন ও দো‘আ করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি হাসানের প্রতি দয়া কর, তুমি তাকে তোমার হাবীব মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যোগ্যতর উত্তরসূরী হিসাবে গ্রহণ কর। আর তুমি তাকে মুসলিম মিল্লাতের ইমাম বা নেতা বানিয়ে দাও। তার মাধ্যমে দ্বীনের ঝাণ্ডাকে আরো দূর-দূরান্তে পৌঁছিয়ে দেয়ার তাওফীক্ব দান কর। তার দো‘আর ফলেই হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ তদানীন্তনকালে বিখ্যাত ব্যক্তি হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ অনেক ছাহাবায়ে কেরাম n-এর সাহচর্য লাভ করে তাদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। তিনি রাসূলে করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনেক হাদীছ মুখস্থ করেন। তবে তিনি সামগ্রিকভাবে হাসান ইবনে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছ থেকে বিদ্যা অর্জন করেছিলেন। রাসূলে করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনাদর্শ শৈশবে তার চরিত্রের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। তার মধুর ব্যবহার সবার জন্য ছিল অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। গরীব-দুঃখী মানুষদের সাহায্য-সহযোগিতা এবং অত্যাচারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাই ছিল তার পবিত্র ধর্ম। নিজে না খেয়ে অপরকে খাওয়ানো, নিজে কষ্ট ভোগ করে অন্যকে সুখ দেয়াই ছিল তার চির ব্রত। যৌবনের সূচনালগ্নে হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ মণি-মুক্তার ব্যবসায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। এজন্য বিভিন্ন দেশে তাকে ব্যবসায়িক সফরে বের হতে হয় এবং বিভিন্ন ধরনের মানুষের সাথে তার মেলামেশার সুযোগ আসে। সবাই তার সুমিষ্ট আচরণে মুগ্ধ হয়ে পড়ত এবং অনেকের সাথেই তার গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠত। নিজেকে সবসময় তিনি হেয় ও অপরাধী মনে করতেন এবং তিনি বলতেন, যে ছালাত মনকে সংযত করে, সে ধরনের ছালাতে আল্লাহ তা‘আলার মাগফিরাতের সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে। হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার ব্যাপারে মানুষদের নছীহত করতেন। তেমনি একদিনের ঘটনা: হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ মজলিসে বসা ছিলেন। একজন লোক এসে বললেন, জনাব! আমি জীবনে অনেক গুনাহ করেছি, কীভাবে আমার জীবনের সব গুনাহ মাফ করাতে পারব? তিনি বললেন, যাও এবং ইস্তিগফার (আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা) কর।
একজন লোক এসে বলল, অনেকদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে না, এমন কোন আমল বলে দিন যা করলে আল্লাহ বৃষ্টি দিবেন। তিনি বললেন, যাও এবং ইস্তিগফার কর। আরো একজন লোক এসে বলল, আমি ঋণে জর্জরিত। আমি কাজ করছি, আপনি আল্লাহ্র কাছে দো‘আ করুন যেন তিনি আমাকে সম্পদ দান করেন এবং আমি ঋণমুক্ত হতে পারি। তিনি বললেন, যাও এবং ইস্তিগফার কর। একজন লোক এসে বলল, আমি চাই আল্লাহ যেন আমাকে সন্তান দান করেন। আপনি দু‘আ করুন। তিনি বললেন, যাও এবং ইস্তিগফার কর। একজন লোক এসে বলল, আমার একটি বাগান আছে। আপনি দো‘আ করুন যেন আমার বাগানে আল্লাহ ফল বেশি করে দেন। তিনি বললেন, যাও এবং ইস্তিগফার কর। একজন লোক এসে বলল, আমার ঘরে যদি পানি থাকতো তাহলে খুব ভালো হত। তিনি বললেন, যাও এবং ইস্তিগফার কর।
হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ-এর এক ছাত্র পাশেই বসা ছিলেন। তিনি এসব দেখে চিন্তা করতে লাগলেন কেন সবাইকেই তিনি বিভিন্ন সমস্যার একই সমাধান বলছেন!
ছাত্রটি হাসান বাছরীকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন আপনি সকল সমস্যার একটাই সমাধান দিচ্ছেন?
হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ মুচকি হেসে বললেন, কেন, তুমি কি আল্লাহ তা‘আলার এই বাণী পড়নি?
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا - يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا - وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِيْنَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا.
‘অতঃপর বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তো অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ হতে প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন। তিনি তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য বাগানসমূহ তৈরি করবেন ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা’ (নূহ, ১০-১২)।
মুসলিম আন্দালুসের (স্পেনের) প্রসিদ্ধ মুফাসসির ইমাম কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ তার তাফসীর ‘আল জামি‘ লি-আহকামিল কুরআন’-এ উক্ত ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন।
শাইখুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ইস্তিগফার (আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা) হল সবচেয়ে বড় নেক কাজগুলোর অন্যতম, এর ব্যাপ্তি এতো বেশি যে, যখনই কেউ নিজের ইবাদত, কথা ও কাজে ত্রুটি খুঁজে পায় অথবা তার রিযিকে স্বল্পতা পায় কিংবা তার হৃদয় থাকে অশান্ত, তার উচিত তৎক্ষণাৎ ইস্তিগফারে লেগে যাওয়া।১
ইস্তিগফার এভাবে করতে পারেন, اللّٰهَ اَسْتَغْفِرُ ‘আমি আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি’। বেশি পরিমাণে বলতে থাকা।
اَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ الْعَظِيْمَ الَّذِىْ لَا اِلٰهَ اِلَّا هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّوْمُ وَاَتُوْبُ اِلَيْهِ-
‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। যিনি ছাড়া ইবাদতের যোগ্য কোন মা‘বূদ নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী, আর আমি তারই কাছে তওবা করছি।২
اَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ وَاَتُوْبُ اِلَيْه
‘আমি আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আর আমি তারই কাছে তওবা করছি’।
সর্বোত্তম ইস্তিগফার হল, সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার। আর তা হল-
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي، لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَىَّ وَأَبُوءُ بِذَنْبِي، اغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلاَّ أَنْتَ"قَالَ"وَمَنْ قَالَهَا مِنَ النَّهَارِ مُوقِنًا بِهَا، فَمَاتَ مِنْ يَوْمِهِ قَبْلَ أَنْ يُمْسِيَ، فَهُوَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، وَمَنْ قَالَهَا مِنَ اللَّيْلِ وَهْوَ مُوقِنٌ بِهَا، فَمَاتَ قَبْلَ أَنْ يُصْبِحَ، فَهْوَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ
‘হে আল্লাহ! তুমিই আমার পালনকর্তা। তুমি ব্যতীত আর কোন মা‘বূদ নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমার গোলাম। আমি যথাসাধ্য তোমার সাথে কৃত ওয়াদা-অঙ্গীকারের উপর দৃঢ় থাকব। আমার কৃতকর্মের কুফল ও মন্দ পরিণাম থেকে তোমার নিকট মুক্তি চাই। তুমি আমাকে যেসব নে‘মত দিয়েছ আমি সেসব নে‘মতের কথা স্বীকার করছি আর স্বীকার করছি আমার গুনাহের কথাও। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। কেননা, তুমি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার আর কেউ নেই। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি একথাগুলো দিনের বেলায় দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলে আর সন্ধ্যা হওয়ার আগেই মারা যায়, সে জান্নাতবাসী। আর যে ব্যক্তি রাত্রিবেলায় আন্তরিকতার সাথে বলে আর সকাল হওয়ার আগেই মারা যায়, সেও জান্নাতবাসী’।৩
শিক্ষা : সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র কাছে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।
১. মাজমূ‘আ ফাতাওয়া, ১১/৬৯৮।
২. আবুদাঊদ, ২/৮৫, তিরমিযী, ৫/৫৬৯, ৩৯০।
৩. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩০৬।
