নরেশ বাবু একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী ব্যক্তি। তাঁর মনের বিশালতা ছিল বিস্তৃত আকাশ সমতুল্য। তাঁর জ্ঞানত তিনি কখনো কারও সাথে অন্যায় করেননি। মানুষকে তিনি মানুষ হিসেবে মূল্য দিতেন। তার কাছে মানুষের শ্রেণিবৈষম্য বা ধর্ম বিভেদ ছিল না, তিনি নিজে ও তার পরিবার ধার্মিক ছিলেন।
তার পরিবারে তিন কন্যা ও দুই পুত্রসন্তান ছিল। কর্মজীবনে তিনি নিষ্ঠার সাথে সৎ পথে কাজ করে গেছেন। অবশ্য সত্যের পথে থাকার জন্য তাকে অনেক লাঞ্ছনা ও অপমান সহ্য করতে হয়েছে। তারপরও সৎ পথে অর্থ উপার্জন করে তিনি তার পাঁচ সন্তানকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন। কিন্তু তিনি তার শেষ বয়সে এসে তার বড় মেয়েকে নিয়ে বিস্তর চিন্তায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। নরেশ বাবুর বাকি চার সন্তান অনেক ভালো আছেন। ভালো নেই শুধু তার বড় মেয়ে তুলসী।
পিতার ঘাড়ে যে কন্যা সম্প্রদানের গুরু দায়িত্ব, তা তিনি আজও পালন করতে পারেননি। কারণ মেয়ে একজন জন্ম থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধি। তার উপর মেয়ের বয়সও প্রায় ৩০ ছুঁইছুঁই। এমতাবস্থায় কোনো পাত্রপক্ষ তাকে ঘরে নিতে চান না। তুলসী শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও সে অনেক বেশি সাংসারিক। পড়াশোনা জানা শিক্ষিত ভদ্র মেয়ে। যেহেতু বিয়ে হচ্ছে না তার, সেহেতু সে একটা ছোটোখাটো চাকরি করছে আর অবসরপ্রাপ্ত পিতার সেবা-যত্ন করছে।
তুলসীকে অনেক পাত্র দেখতে এসেছিল যখন তার বয়স ১৮ বছরের কাছাকাছি ছিল। কিন্তু কোনো সুস্থ পাত্র কোনো অসুস্থ পাত্রীকে বিয়ে করতে চায়নি। অনেক পাত্র তাকে জীবনসঙ্গী করতে অস্বীকৃতি জানালে সে আর বিয়ে করবে না বলে দেয় পিতাকে এবং পাত্র দেখা বন্ধ করে দেয়। তার পিতাকে সে বলে যেন তার ছোট ভাই-বোনের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। আর সে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করবে।
নরেশ বাবু তাই করলেন। তার বাকি চার সন্তানকে বিয়ে করিয়ে দিলেন। শুধু বিয়ে দিতে পারছেন না চির দুঃখিনী তুলসীকে। তুলসী পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরিও করছে তবুও তার জন্য সুযোগ্য পাত্র মেলানো বড় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন শারীরিক অসুস্থতা ও বয়স বেশি হওয়ার কারণে পাত্রপক্ষ পছন্দ করেন না তুলসীকে। তুলসীর মা গত হয়েছে, তাই তাকে তার মেয়ের জন্য দগ্ধ হতে হচ্ছে না, কিন্তু নরেশ বাবু আর কন্যাকে পাত্রস্থ করতে না পাওয়ার কষ্ট সহ্য করতে পারছেন না। মেয়ে ম্লান মুখপানে তিনি তাকাতে পারেন না। তার বুক ফেটে যায়।
একদিন চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন নরেশ বাবু। আর দোকানদারের সাথে নিজের দুঃখিনী মেয়ে তুলসীকে নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। তিনি অনেক কষ্ট প্রকাশ করে বলেন যে, ‘সৃষ্টিকর্তা সবার জন্য জোড়া রাখলেও আমার তুলসীর জন্য মহৎ মনের মানুষকে তৈরি করেননি? যে আমাকে কন্যা সম্প্রদানের দায় থেকে মুক্ত করাতে পারে?’
দোকানদার বললেন, দ্যাখেন দাদা, ‘তুলসী অনেক ভালো মেয়ে; হ্যাঁ, তার একটু শারীরিক সমস্যা আছে ঠিকই, এজন্য আপনার উচিত ছিল মেয়েকে কম বয়সে বিয়ে দেওয়া। জানেন তো মেয়েদের বয়স বেড়ে গেলে তাদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, চেহারার লাবণ্য কমে যায়। তার চেয়ে বড় কথা সে শারীরিকভাবে অসুস্থ। এজন্য তাকে অনেক আগে বিয়ে দিতে হত দাদা’।
এখন সে চাকরি করছে কিন্তু তার শারীরিক অনেক অবনতি ঘটেছে। চিন্তায় চিন্তায় শরীর ও মন দারুণভাবে ভারাক্রান্ত তার। দোকানদারের কথা শুনে নরেশ বাবু উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে উঠলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, তুলসীর বিয়ে অনেক আগে দেওয়া উচিত ছিল। মেয়ে পড়াশোনা শেষ করবে, চাকরি করবে এতে করে বুঝি পাত্রপক্ষ অমত করবে না বিয়েতে এই ভেবে ছিলেন তখন নরেশ বাবু। কিন্তু মেয়ের মন ও শরীরের এত বেশি অবনতি ঘটবে, আর চাকরি পাওয়ার পরে যে তিনি মেয়েকে পাত্রস্থ করতে পারবেন না! এটা কল্পনা করতে পারেননি কখনো।
নরেশ বাবু তার কন্যার দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তির পথ পেলেন না। হঠাৎ একদিন তিনিও মারা গেলেন তার দুঃখিনী তুলসীকে একেবারে একা করে দিয়ে।
সাদিয়া আফরোজ
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
