কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রবের পরিচয়

আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ ‘আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছি’ (যারিয়াত, ৫১/৫৬)। যে রব আমাদেরকে তার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন, সে রব সম্পর্কে জানা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। কারণ সৃষ্টিকর্তার পরিচয় যদি বান্দা না জানে, তার ক্ষমতা, শক্তি, ক্রোধ, শাস্তি, রহমত সম্পর্কে যদি না জানে, তাহলে সে কখনই তাকে ভয় করতে পারবে না এবং তার ইবাদতও করবে না। নিম্নে আমরা একটি চমৎকার গল্পের মাধ্যমে রবের পরিচয় সম্পর্কে জানব।

কূফা নগরীতে একজন ভণ্ডপীর ছিল। সে বলত, এই পৃথিবীর কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। এই পৃথিবী নিজ থেকেই এমনি এমনি সৃষ্টি হয়েছে। এই পৃথিবীকে কেউ সৃষ্টি করেনি। সে সময় কূফা নগরীতে তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে বড় আলেম ছিলেন ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ। তাঁর নিকটে যখন ভ-পীরের সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য পৌঁছল, তখন তিনি ভণ্ড পীরের বিরুদ্ধে দ্বীপ্ত কণ্ঠে রুখে দাঁড়ালেন। ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ জোরালো কণ্ঠে জনসম্মুখে বক্তব্য দিলেন। তিনি বললেন, এই পৃথিবী নিজ থেকে সৃষ্টি হয়নি; বরং এর একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন। তিনিই এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্র বাণী,اللهُ الَّذِيْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِيْ سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ ‘আল্লাহ যিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন’ (সাজদাহ, ৩২/৪)

ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর এই জোরালো বক্তব্য যখন সমস্ত কূফা নগরীতে ছড়িয়ে পড়ল, তখন ভণ্ডপীর ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর নিকটে আসল এবং বলল, হে আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ! আমি তোমার সাথে পৃথিবী সৃষ্টি সম্পর্কে ‘বাহাছ’ করতে চাই। ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ অনেক ভাবার পরে বললেন, ঠিক আছে আমি তোমার সাথে তিন দিন পর বাহাছ করব, আজ থেকে তিন দিন পর তুমি আমার নিকট এসো। রীতি মত তিন দিন পর ভণ্ডপীর ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর নিকট আসল। আসার পর দেখল, ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ কী নিয়ে যেন গভীর চিন্তা করছেন। তখন ভণ্ডপীর আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-কে বলল, তুমি কী নিয়ে এত গভীর চিন্তা করছো? পুনরায় পীর বলল, তুমি কি পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে চিন্তা করছো যে পৃথিবী একাই সৃষ্টি হয়েছে? ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ বললেন, না, আমি এমন কিছু ভাবছি না; বরং আমি এটাই ভাবছি যে, ফোরাত নদীর পূর্ব পার্শ্বের ঘাটে একটি জাহাজ রয়েছে, যেই জাহাজের কোন মালিক, শ্রমিক, ড্রাইভার, হেলপার কেউই নেই। এমন অবস্থায় জাহাজটি নিজে থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একশটি আটার বস্তা নিয়ে নদীর পানির বুক চিরে কোন মালিক, শ্রমিক, ড্রাইভার, হেলপার ছাড়াই আপন গতিতে পশ্চিম পার্শ্বের ঘাটে এসে থামল। এমন সময় জাহাজটি শ্রমিক ছাড়াই নিজে থেকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে একশটি বস্তা ঘাটে রেখে আপন গতিতে নদীর বুক চিরে তার নিজ স্থানে ফিরে গেল। আমি এই বিষয়টাই গভীরভাবে চিন্তা করছিলাম। তখন ভণ্ডপীর বলল, আমি আগে মনে করতাম কূফা নগরীতে সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি আপনি, কিন্তু এখন দেখছি কূফা নগরীতে সবচেয়ে মূর্খ, পাগল ব্যক্তি হলেন আপনি। কেননা এমন চিন্তা-ভাবনা কোন পাগল ছাড়া বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কখনই করতে পারে না। অতএব আপনার সাথে আমার বাহাছ করার কোন প্রয়োজন নেই। প্রতি উত্তরে ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ বললেন, পাগল আমি না; বরং পাগল তুমি। কারণ একটা ছোট্ট জাহাজ যদি নিজে এমনি এমনি কাজগুলো না করতে পারে, তাহলে এত সুন্দর পৃথিবী সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কীভাবে একাই সৃষ্টি হতে পারে? যে পৃথিবীর কোথাও উঁচু, কোথাও নিচু, কোথাও পাহাড়, কোথাও সাগর, কোথাও বন আবার কোথাও মরুভূমি দ্বারা সাজানো! এত সুন্দর পৃথিবী একাই সৃষ্টি হয়েছে, যে ব্যক্তি এটা ভাবতে পারে তার চেয়ে বড় পাগল আর কে হতে পারে। অতএব তুমি সবচেয়ে বড় পাগল, সবচেয়ে বড় মূর্খ। এরপর ভণ্ড পীরের মুখের কথা বন্ধ হয়ে গেল। সে আর কোন উত্তর দিতে পারল না। সে ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর দিকে বোকার মত চেয়ে রইল। তারপর সে কোন কথা না বলে মাথা নত করে নিজ স্থান ত্যাগ করে চলে গেল।

উক্ত গল্প হতে আমরা দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় জানতে পারি :

(ক) এই পৃথিবী নিজে থেকে একাই সৃষ্টি হয়নি, বরং পৃথিবীর একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন।

(খ) যিনি এই পৃথিবী অসাধারণ সৌন্দর্যে সাজিয়েছেন, অপার মহিমায় সৃষ্টি করেছেন, তিনিই হলেন আমাদের রব, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ রাববুল আলামীন।

Magazine