কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ফিলিস্তীনের কান্না

post title will place here

ভোরের আযান তখনো শেষ হয়নি। হঠাৎ আকাশ কেঁপে উঠল বোমার বিকট শব্দে। মুহূর্তের মধ্যে চারদিক ধুলোয় মেঘে ঢেকে গেল। আকাশ-বাতাস অন্ধকার হয়ে এলো। বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠল বাতাস। মানুষের আর্তনাদ, শিশুদের কান্না আর মায়েদের আহাজারি মিলে সৃষ্টি করল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।

ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে বসে আছে সাত বছরের ছোট্ট শিশু আহমাদ। তার চোখে আতঙ্ক, মুখে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার ছাপ। কিন্তু বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে একটি ছেঁড়া স্কুলব্যাগ। সেই ব্যাগে নেই কোনো বই, নেই কোনো খাতা; আছে শুধু একটি ছোট্ট কুরআন মাজীদ। চারদিকে তাকিয়ে সে খুঁজছে তার মা কোথায়? তার ভাই-বোন কোথায়?

হঠাৎ ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একটি ক্ষীণ শব্দ ভেসে এলো আল্লাহ... আল্লাহ... আল্লাহ...। আহমাদ ছুটে গেল। দেখল, তার ছোট বোন মারইয়াম ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। শুধু একটি ছোট্ট হাত বাইরে বেরিয়ে আছে, যা অনবরত কাঁপছে।

আহমাদ তার ছোট্ট হাত দিয়ে ইট-পাথর সরাতে লাগল। চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কাঁপা কণ্ঠে সে বলতে লাগল, মারইয়াম! ভয় পেয়ো না, বোন। আমি আছি তো। আমি তোমাকে একা ছেড়ে যাব না। তোমাকে নিয়ে যাব। তোমার কিছুই হবে না।

কিছু মানুষ ছুটে এলো সাহায্য করতে। অবশেষে অনেক চেষ্টার পর মারইয়ামকে বের করে আনা গেল। কিন্তু সে তখনো অচেতন। আহমাদ বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, মারইয়াম, ওঠো না! কথা বলো! তুমি কেন ঘুমিয়ে আছ? ওঠো, আমি তোমাকে স্কুলে নিয়ে যাব। ছুটি হলে দৌড়ে এসে তোমাকে নিয়ে আসব। ওঠো না, বোন... ওঠো...।

চারপাশে জড়ো হওয়া মানুষগুলো নিঃশব্দে দৃশ্যটি দেখছিল। তাদের চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল। কেউ আর নিজের কান্না আটকে রাখতে পারল না। অনেকেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। শহরে কোনো আলো নেই, আছে শুধু আগুনের লেলিহান শিখা আর ধ্বংসস্তূপ। ছোট্ট আহমাদ বোনকে কোলে নিয়ে বসে আছে। ঠিক তখনই একজন বিদেশি সাংবাদিক এগিয়ে এলেন। তিনি ক্যামেরা তাক করে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী চাও?

আহমাদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর চোখ মুছে ধীরে ধীরে বলল, আমি চাই, আমার মা যেন আর না কাঁদেন। আমার ছোট্ট বোনটা যেন আবার কথা বলতে পারে। আর আমার সহপাঠীরা যেন ভয়-আতঙ্ক ছাড়া স্বাভাবিক জীবন পায়।

একটু থেমে সে আবার বলল, আচ্ছা, আপনি ছবি তুলে কী করবেন? সাংবাদিক কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। আহমাদ বলল, আমি আর আমার বোন সকাল থেকে না খেয়ে বসে আছি। আমরা এক ফোঁটা পানিও পাইনি।

সাংবাদিক দ্রুত কিছু বিস্কুট ও পানি এগিয়ে দিলেন। ক্ষুধার্ত শিশুটি বিস্কুট খেতে খেতে বলল, সাংবাদিক স্যার, আমরা কি কোনো অপরাধ করেছিলাম? আমরা কি কারও কোনো ক্ষতি করেছিলাম? তাহলে কেন? কেন আমাদের মতো অসহায়, অবুঝ, নিষ্পাপ শিশুদের এই অমানবিক নির্যাতন, নিপীড়ন আর গণহত্যার শিকার হতে হচ্ছে? এর কোনো উত্তর কি আপনার কাছে আছে? সাংবাদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন।

পৃথিবীর কোটি কোটি শিশু যেখানে খেলনা, সুস্বাদু খাবার কিংবা সুন্দর বাড়ির স্বপ্ন দেখে, সেখানে এই অবুঝ শিশুটি শুধু চাইল তার মা যেন না কাঁদেন, তার বোন যেন সুস্থ হয়ে কথা বলতে পারে আর তার সহপাঠীরা যেন আতঙ্কমুক্ত জীবন ফিরে পায়।

রাত গভীর হলো। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু আহত মানুষের গোঙানির শব্দ শোনা যাচ্ছে। আহমাদ তখনো জেগে আছে। তার ছোট্ট হাতে ধরা কুরআন মাজীদ। বোনের মাথায় হাত রেখে সে ধীরে ধীরে সূরা ফাতেহা তেলাওয়াত করছে।

হঠাৎ এক বৃদ্ধ এসে তার মাথায় স্নেহের হাত রেখে বললেন, বাছা, ভয় পেয়ো না। আমাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু আমাদের ঈমান কেউ ধ্বংস করতে পারবে না। দুনিয়ার সব শক্তি সীমিত, কিন্তু আল্লাহর দয়া অসীম। তিনি অবশ্যই আমাদের সাহায্য করবেন।

শিশুটির চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল। সে দুই হাত তুলে দু‘আ করতে লাগল, হে আল্লাহ! আমাদের হারানো ঘর ফিরিয়ে না দিলেও চলবে। তবে জান্নাতে আমাদের জন্য আরও সুন্দর ঘর তৈরি করে রাখুন। আর আমাদের একটু শান্তিতে বাঁচার সুযোগ দিন। আমাদের মা-বোনেরা যেন আর কখনো না কাঁদেন।

সেই দু‘আ শুনে উপস্থিত সবাই ভেঙে পড়ল। কারও চোখ শুকনো রইল না। ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত এবং ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছোট্ট শিশুটি সেদিন যেন সবার শিক্ষক হয়ে উঠল।

নৈতিক শিক্ষা:

১. প্রকৃত শক্তি অস্ত্রে নয়; ধৈর্য, সাহস ও ঈমানের মধ্যে নিহিত।

২. ভালোবাসা মানে প্রিয়জনের পাশে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অবিচল থাকা।

৩. মানবতা মানে অন্যের দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করা, সহানুভূতি দেখানো এবং বিপদে পাশে দাঁড়ানো।

৪. অনেক সময় পৃথিবীর শক্তিধররা নীরব থাকলেও একটি নিষ্পাপ শিশুর অশ্রু মানবতার বিবেককে জাগিয়ে তুলতে পারে।

হে আল্লাহ! আমাদের হৃদয়কে কোমল করুন, যেন আমরা অবুঝ শিশুদের কান্না শুনে জেগে উঠতে পারি। আমাদের শিক্ষা দিন যে, নৈতিকতা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা প্রকাশ পায় দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্ত শিশুর অশ্রু মুছে দেওয়া এবং অসহায় মানুষের কষ্ট লাঘব করার মধ্য দিয়ে। আল্লাহ আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল শাসককে সুমতি দিন- আমীন!


দাওরায়ে হাদীছ ফারেগ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী 

Magazine