নিয়্যত সংশ্লিষ্ট মাসায়েল :
নিয়্যতের পরিচয় :
শাব্দিক অর্থে নিয়্যত শব্দটি আরবী نوي- ينوي থেকে নির্গত। যার অর্থ মনে মনে সিদ্ধান্ত নেওয়া। শব্দটি খেজুরের বীজ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। বীজ যেমন মাটির ভিতরে রোপন করা হয়, ঠিক তেমনি মানুষ অন্তরের ভিতরে পরিকল্পনা করে। মাটির ভিতরের বীজ যেমন দেখা যায় না, তেমনি মনের ইচ্ছাও মহান আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানতে পারে না। আরবীতে নিয়্যতের শাব্দিক অর্থ করতে গিয়ে তিনটি শব্দের ব্যবহার বেশী পরিলক্ষিত হয় :
(ক) القصد - ক্বাছদ। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে নিয়্যত ও ক্বাছদের মধ্যে অনেকেই পার্থক্য করেছেন। যেমন ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
اَلنِّيَّةُ تَتَعَلَّقُ بِالْمَقْدُوْرِ عَلَيْهِ وَالْمَعْجُوْزِ عَنْهُ بِخِلَافِ الْقَصْدِ وَالْإِرَادَةِ فَإِنَّمَا لَا يَتَعَلَّقَانِ بِالْمَعْجُوْزِ عَنْهُ.
‘মানুষ যা করতে সক্ষম এবং যা করতে অক্ষম সকল ক্ষেত্রে নিয়্যত ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে ক্বাছদ ও ইরাদা শব্দটি শুধু সেই ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, যা মানুষের বাস্তবায়ন ক্ষমতার মধ্যে।[1] যেমন- গরীব ব্যক্তি এই মর্মে নিয়্যত করতে পারে যে, সে কোটিপতি হলে লাখ টাকা আল্লাহ্র রাস্তায় দান করবে। কিন্তু ক্বাছদ বা ইরাদা করতে পারে না। কেননা লাখ টাকা দান করা এখন তার সাধ্যের বাইরে।
(খ) الإرادة - ইরাদা। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ইরাদার সাথেও নিয়্যতের পার্থক্য দেখা যায়। যেমন- নিয়্যত শুধু নিজের কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট। অন্যদিকে ইরাদা অন্যের কাজের ক্ষেত্রেও হতে পারে। আমার বন্ধু আমার সাথে ভাল ব্যবহার করুক এটা আমি ইরাদা করতে পারি কিন্তু নিয়্যত করতে পারি না; কেননা এটা অন্যের কাজ।
(গ) العزم - আযম। অনেকেই আযম ও নিয়্যতের মধ্যেও পার্থক্য করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী নিয়্যত ও আযমের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আর এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন ইমাম নববী ও ইমাম আইনী।
পারিভাষিক অর্থে ফক্বীহগণ নিয়্যতের দু’টি অর্থ করেছেন। যথা :
প্রথম সংজ্ঞা : উছূলবিদ মাওয়ারদী বলেন,قَصَدُ الشَّيْءِ مُقْتَرِنًا بِفِعْلِهِ ‘নিয়্যত হচ্ছে স্বাধীন সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছার সাথে কোন কাজ করা’।[2] এই সংজ্ঞায় শাব্দিক অর্থকে বেশী প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। আর এটি মূলত একটি কাজকে অন্য কাজ থেকে পৃথক করা। এটি দু’ভাবে হয়ে থাকে। প্রথমত, শারঈ আমলকে সাধারণ অভ্যাস থেকে পৃথক করা। যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য বা গরম থেকে বাঁচার জন্য গোসল করা আর অপিত্রতা থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য ফরয গোসল করা এই দুই ধরনের গোসলের মধ্যে পার্থক্য একমাত্র নিয়্যতের দ্বারাই সম্ভব। তেমনি টাকা হাদিয়া হিসাবে দেওয়া আর দান হিসাবে দেওয়া এই দু’টির পার্থক্য একমাত্র নিয়্যতই করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ইবাদতের স্তরভেদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টির জন্য নিয়্যতের প্রয়োজন রয়েছে। যেমন ছালাত আদায় করার ক্ষেত্রে সেটি যোহরের ছালাত না আছরের ছালাত এই পৃথকীকরণের জন্য নিয়্যতের প্রয়োজন রয়েছে। তবে অনেকেই বলেছেন, যোহরের ওয়াক্তে ফরয ছালাতের নিয়্যত করলে সেটি যোহরের ছালাত বলেই গণ্য হবে। কেননা সেই সময়ে অন্য কোন ফরয ছালাত চলবে না। তবে নফল না ফরয অন্ততপক্ষে এই পার্থক্য সৃষ্টির জন্য নিয়্যতের প্রয়োজন রয়েছে। উল্লেখ্য, এখানে যোহরের সময় অন্য কোন ফরয ছালাত দ্বারা আদায়ের ছালাত উদ্দেশ্য; ক্বাযার ছালাত নয়। কেননা ক্বাযা ছালাত যখন ইচ্ছা আদায় করা যায়। সুতরাং ক্বাযা ও আদায়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার জন্যও নিয়্যত অপরিহার্য। নিয়্যতের এই পারিভাষিক সংজ্ঞার প্রমাণ কুরআন ও হাদীছে পাওয়া যায়। যেমন :
عن علي عن النبيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ.
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তিনজনের উপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, ঘুমন্ত ব্যক্তির উপর থেকে যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়, শিশুর উপর থেকে যতক্ষণ না সে বালেগ হয় ও পাগলের উপর থেকে যতক্ষণ না তার জ্ঞান ফিরে আসে’।[3]
এই তিন শ্রেণীকে তাদের আমলের জন্য জবাবদিহিতা করা লাগবে না। কেননা তারা ভাল-মন্দ পৃথক করে নিজে থেকে কোন কাজের সংকল্প করতে পারে না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বা নিয়্যত করার জন্য যে জ্ঞানের প্রয়োজন, সে জ্ঞান তাদের নেই। অতএব এই হাদীছ প্রমাণ করে, নিয়্যতবিহীন কোন আমল ধর্তব্য নয়।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم مَنْ أَكَلَ نَاسِيًا وَهُوَ صَائِمٌ فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللهُ وَسَقَاهُ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ছিয়াম অবস্থায় ভুলে কিছু খেয়ে নেয়, সে যেন তার ছিয়াম পূর্ণ করে নেয়। কেননা মহান আল্লাহই তাকে খাওয়ায়েছেন এবং পান করিয়েছেন’।[4]
এই হাদীছও প্রমাণ করে, নিয়্যতবিহীন কোন কাজ শরী‘আতে ধর্তব্য নয়। এজন্য ইসলামী শরী‘আতে জোরপূর্বক কোন কাজ কাউকে করতে বাধ্য করা হলে সেই কাজের জন্য সে দায়ী হবে না। কেননা সেই কাজে তার ইচ্ছা শামিল ছিল না, বরং তাকে বাধ্য করা হয়েছিল। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ ‘তবে যাকে কুফুরী করতে বাধ্য করা হয়েছে কিন্তু তার অন্তরে ঈমান রয়েছে (তার কোন সমস্যা নেই)’ (নাহ্ল, ১০৬)।
দ্বিতীয় সংজ্ঞা : ইমাম বায়যাভী বলেন, وَالشَّرْعُ خَصَّصَهُ بِالْإِرَادَةِ الْمُتَوَجِّهَةِ نَحْوَ الْفِعْلِ لِابْتِغَاءِ رِضَاءِ اللهِ وَامْتِثَال حُكْمه ‘নিয়্যতকে শরী‘আত এমন কাজের ইচ্ছার সাথে খাছ করেছে, যে কাজের ইচ্ছাটা শুধু মহান আল্লাহ্র সন্তুষ্টি হাছিলের জন্য ও তার নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য জাগ্রত হয়’।[5]
অর্থাৎ শুধু কাজের ইচ্ছাই যথেষ্ট নয়; বরং কী উদ্দেশ্যে কাজটি করা হচ্ছে সেটিই মূলত ধর্তব্য। কাজটির পিছনের কারণ, কী লক্ষ্যে কাজটি সম্পাদন করা হচ্ছে সেই উদ্দেশ্য। কারণ ও লক্ষ্যই হচ্ছে নিয়্যতের শারঈ অর্থ। অতএব যে ইবাদতে মহান আল্লাহ্র সন্তুষ্টি থাকে না, বরং লোক দেখানোর জন্য বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে করা হয়, সে ইবাদত মহান আল্লাহ্র দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে না। এই বিশুদ্ধ নিয়্যতকেই ইখলাছ বলা হয়।
হাদীছে নিয়্যত দ্বারা কোন্ নিয়্যত উদ্দেশ্য? :
উক্ত আলোচনায় আমরা নিয়্যতের পারিভাষিক দু’টি অর্থ দেখলাম। এখন হাদীছে নিয়্যত দ্বারা কোন্্ অর্থ উদ্দেশ্য এই মর্মে ব্যাখ্যাকারগণের মাঝে মতভেদ তৈরি হয়েছে। তন্মধ্যে হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
وَالنِّيَّةُ فِي الْحَدِيثِ مَحْمُولَةٌ عَلَى الْمَعْنَى اللُّغَوِيِّ لِيَحْسُنَ تَطْبِيقُهُ عَلَى مَا بَعْدَهُ وَتَقْسِيمُهُ أَحْوَالَ الْمُهَاجِرِ.
‘এই হাদীছে নিয়্যত দ্বারা শাব্দিক অর্থে নিয়্যত উদ্দেশ্য। যাতে হাদীছের পরের অংশে মুহাজিরগণের দুই অবস্থার উপর নিয়্যতের অর্থকে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়’।[6]
আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ-এর কথা অনুযায়ী যদি শুধু শাব্দিক অর্থ উদ্দেশ্য নেয়া হয় আর শারঈ তথা ইখলাছ বাদ দেয়া হয়, তাহলে গরম থেকে বাঁচার জন্য যদি কেউ গোসল করে তাহলে তার ফরয গোসলও আদায় হয়ে যাবে। কেননা সে গোসলের ইচ্ছা পোষণ করেছিল এটাই যথেষ্ট। কী জন্যে বা কী কারণে করেছিল সেটা ধর্তব্য নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই হানাফী মাযহাবে ওযূর জন্য নিয়্যত শর্ত নয়। তবে তাদের নিকটে এটার বাস্তব রূপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আসবে।
তেমনি কেউ যদি নদীর ধারে বসে থাকে এবং তাকে কেউ ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দেয় আর তার ওযূর অঙ্গগুলো ধৌত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে বিনা ইচ্ছায় তথা বিনা নিয়্যতে হয়ে যাওয়া এই ওযূ, ওযূ হিসাবে গণ্য হবে না। কেননা তার এই ওযূর মধ্যে শাব্দিক অর্থে নিয়্যত অনুপস্থিত ছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তানের বিখ্যাত মুহাদ্দিছ মুহাম্মাদ গোন্দলবী রাহিমাহুল্লাহসহ অনেকের মতে এই হাদীছে নিয়্যত দ্বারা শারঈ অর্থে নিয়্যত তথা ইখলাছ উদ্দেশ্য।[7]
তার দলীল ও মন্তব্যের সার সংক্ষেপ নিমেণ পেশ করা হল :
স্বয়ং হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন,الْأَعْمَالُ الصَّادِرَةُ مِنَ الْمُكَلَّفِينَ وَعَلَى هَذَا هَلْ تَخْرُجُ أَعْمَالُ الْكُفَّارِ ‘এই হাদীছে আমল বা কাজ দ্বারা মুকাল্লাফ বা দায়িত্বপ্রাপ্তগণের কাজ উদ্দেশ্য আর এই কারণে কাফেরের কাজ এই হাদীছের অন্তর্ভুক্ত হবে না’।[8]
আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ-এর একথা প্রমাণ করে যে, এই হাদীছে নিয়্যত দ্বারা ইখলাছ উদ্দেশ্য। কেননা কাফেরের কাজের মধ্যে শাব্দিক অর্থে নিয়্যতের অস্তিত্ব থাকে। তথা কোন কাফের যখন স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে ছালাত আদায় করবে, তখন তার এই কাজের মধ্যে নিয়্যতের শাব্দিক অর্থের অস্তিত্ব থাকবে। যদি হাদীছে শুধু শাব্দিক অর্থ উদ্দেশ্য হত, তাহলে কাফেরের কাজও এই হাদীছের অন্তর্ভুক্ত হত। কিন্তু যেহেতু কাফেরের কাজ হাদীছের অন্তর্ভুক্ত নয়, সেহেতু নিশ্চিত যে, এখানে নিয়্যত দ্বারা ইখলাছ উদ্দেশ্য। তথা কোন কাফের যতই শাব্দিক অর্থে নিয়্যত তথা স্বেচ্ছায় ছালাত আদায় করুক, তা গ্রহণীয় হবে না। কেননা তার এই ছালাতের মধ্যে ইখলাছ নেই। সে তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বিশ্বাসই করে না সুতরাং ইখলাছ আসার কোন প্রশ্নই আসে না। অতএব স্বয়ং আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ-এর এই মন্তব্য তার আগের মন্তব্য ‘নিয়্যতের শাব্দিক অর্থ উদ্দেশ্য’-এর বিপরীত।
আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ নিয়্যত দ্বারা শাব্দিক অর্থ গ্রহণের পিছনে যে দলীল পেশ করেছেন, তাও প্রশ্নমুক্ত নয়। আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ বলতে চাচ্ছেন, যদি আমরা নিয়্যত দ্বারা ইখলাছ উদ্দেশ্য গ্রহণ করি, তাহলে হাদীছে বর্ণিত মুহাজিরের প্রকার দু’টি এই নিয়্যতের মধ্যে আসবে না। তখন শুধু প্রথম প্রকার আসবে। তথা যে শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য হিজরত করেছে, সেই একমাত্র এই নিয়্যতের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যে দুনিয়ার জন্য হিজরত করেছে, সে অন্তর্ভুক্ত হবে না। কিন্তু শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করলে উভয় প্রকার মুহাজিরই নিয়্যতের অন্তর্ভুক্ত হবে। আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ-এর এই যুক্তির জবাবে গোন্দলবী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, বরং হাদীছের পরবর্তী অংশ ‘ইখলাছ উদ্দেশ্য’ হওয়ার মতকে আরো বেশী জোরদার করে। কেননা পরবর্তী অংশে বলে দেয়া হচ্ছে, যে ইখলাছের সাথে হিজরত করবে, তার হিজরত গ্রহণীয় হবে আর যে ইখলাছের সাথে হিজরত করবে না, তার হিজরত গ্রহণীয় হবে না। হাদীছের পরবর্তী এই অংশটি হাদীছের প্রথম অংশের ব্যাখ্যাস্বরূপ। তথা সকল আমল ইখলাছের উপর নির্ভরশীল। ইখলাছ থাকলে আমল শুদ্ধ আর ইখলাছ না থাকলে আমল অশুদ্ধ।
গোন্দলবী রাহিমাহুল্লাহ আরো বলেন, নিয়্যত ছাড়া মানুষের পক্ষে কাজ করাই সম্ভব নয়। একমাত্র পাগল ও ঘুমন্ত ব্যক্তিই নিয়্যত ছাড়া কাজ করতে পারে। সুতরাং শাব্দিক অর্থ নেওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। কেননা শরী‘আত যখন বিধান প্রণয়ন করতে চায়, তখন সেখানে নতুন ও প্রয়োজনীয় কিছু থাকে। যদি শাব্দিক অর্থ নেওয়া হয়, তাহলে নতুন ও প্রয়োজনীয় কিছু পাওয়া যায় না। বরং তখন এটা একটি সর্বস্বীকৃত সাধারণ কথা।
শুধু তাই নয়, নিয়্যত ছাড়া যদি কোন কাজ হয়েই যায়, তাহলে সেটাকে কাজই গণ্য করা হয় না। সেটা সঠিক ও ভুল হওয়া তো অনেক পরে। কাজই নেই তো তার বিশুদ্ধ-অশুদ্ধ আবার কী? যেমন ছিয়াম অবস্থায় ভুল করে খেয়ে ফেললে সেটাকে খাওয়াই গণ্য করা হয় না। সুতরাং ভুল-ঠিক, গ্রহণীয়-অগ্রহণীয়, শুদ্ধ-অশুদ্ধ তখনই আসবে, যখন সেটা কাজ বলে গণ্য হবে। তাই শাব্দিক অর্থে নিয়্যত থাকার কারণে যখন কোন কাজ, কাজ বলে গণ্য হয় তখন সেই কাজ গ্রহণীয় বা অগ্রহণীয় নির্ণয় করার জন্য নিয়্যতের শাব্দিক অর্থের বাইরে অতিরিক্ত কোন শর্ত চাই। আর সেটাই হচ্ছে ইখলাছ। অতএব হাদীছে বর্ণিত নিয়্যত দ্বারা ইখলাছ উদ্দেশ্য।
নিমেণ বিশুদ্ধ নিয়্যত বা ইখলাছ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীছ থেকে কিছু দলীল পেশ করা হল :
মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ ‘আর যিনি জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন এটা পরীক্ষা করার জন্য যে, কে তোমাদের মধ্যে উত্তম আমল করে। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীল’ (মুল্ক, ২)।
লক্ষণীয় যে, মহান আল্লাহ এখানে অত্যধিক আমলের কথা বলেননি; বরং উত্তম আমলের কথা বলেছেন। তেমনি কুরআনের যেখানেই মহান আল্লাহ আমলের কথা বলেছেন, সেখানেই আমলের সাথে সৎ বা উত্তম কথাটি যুক্ত করে দিয়েছেন।[9] তথা শুধু আমল দিয়ে কোন কাজ হবে না, যতক্ষণ না আমলটি সৎ বা উত্তম হয়। আর আমল সৎ বা উত্তম হওয়ার জন্য দু’টি শর্ত লাগে :
(ক) বিশুদ্ধ নিয়্যত বা ইখলাছ।
(খ) রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতের অনুসরণ।
দু’টি শর্তের কোন একটি অনুপস্থিত থাকলে সেই ইবাদত আল্লাহ্র দরবারে কবুল হওয়া তো বহু দূরের কথা; বরং সেই ইবাদত মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। যেমন-
أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: إِنَّ أَوَّلَ النَّاسِ يُقْضَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَلَيْهِ رَجُلٌ اسْتُشْهِدَ، فَأُتِيَ بِهِ، فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ، فَعَرَفَهَا، قَالَ: مَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: قَاتَلْتُ فِيكَ حَتَّى اسْتُشْهِدْتُ، قَالَ كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ قَاتَلْتَ، لِأَنْ يُقَالَ: جَرِيءٌ، فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ، فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ، حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ تَعَلَّمَ الْعِلْمَ وَعَلَّمَهُ، وَقَرَأَ الْقُرْآنَ، فَأُتِيَ بِهِ، فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: تَعَلَّمْتُ الْعِلْمَ وَعَلَّمْتُهُ، وَقَرَأْتُ فِيكَ الْقُرْآنَ. قَالَ كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ تَعَلَّمْتَ الْعِلْمَ، لِيُقَالَ: عَالِمٌ، وَقَرَأْتَ الْقُرْآنَ لِيُقَالَ، قَارِئٌ، فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ، فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَرَجُلٌ وَسَّعَ اللَّهُ عَلَيْهِ، وَأَعْطَاهُ مِنْ أَصْنَافِ الْمَالِ كُلِّهِ، فَأُتِيَ بِهِ، فَعَرَّفَهُ نِعَمَهُ، فَعَرَفَهَا، قَالَ: فَمَا عَمِلْتَ فِيهَا؟ قَالَ: مَا تَرَكْتُ مِنْ سَبِيلٍ تُحِبُّ أَنْ يُنْفَقَ فِيهَا إِلَّا أَنْفَقْتُ فِيهَا لَكَ. قَالَ: كَذَبْتَ، وَلَكِنَّكَ فَعَلْتَ، لِيُقَالَ: هُوَ جَوَادٌ، فَقَدْ قِيلَ، ثُمَّ أُمِرَ بِهِ، فَسُحِبَ عَلَى وَجْهِهِ، حَتَّى أُلْقِيَ فِي النَّارِ.
আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয় ক্বিয়ামতের মাঠে প্রথম যে ব্যক্তির বিচার করা হবে সে হচ্ছে শহীদ। তাকে মহান আল্লাহ্র সামনে পেশ করা হবে। মহান আল্লাহ তার উপর প্রদত্ত নে‘মতগুলো তাকে স্মরণ করাবেন। সে নে‘মত প্রাপ্তির স্বীকৃতি দিবে। তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এটার বিনিময়ে কী করেছ? সে উত্তরে বলবে, আমি আপনার রাস্তায় জিহাদ করে শহীদ হয়েছি। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। বরং তুমি যুদ্ধ করেছ যাতে তোমাকে বীর যোদ্ধা বলা হয়। আর তোমাকে দুনিয়াতে বীর যোদ্ধা বলা হয়ে গেছে। অতঃপর ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়ে তাকে ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এরপরে (২য় ব্যক্তি হিসাবে) একজন আলেমকে পেশ করা হবে যে ইলম অর্জন করেছে ও ইলম শিখিয়েছে এবং কুরআন তিলাওয়াত করেছে। মহান আল্লাহ তার উপর প্রদত্ত নে‘মতগুলো তাকে স্মরণ করাবেন। সে নে‘মত প্রাপ্তির স্বীকৃতি দিবে। তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এটার বিনিময়ে কী করেছ? সে উত্তরে বলবে, আমি জ্ঞান শিখেছি ও শিখিয়েছি এবং তোমার জন্য কুরআন তিলাওয়াত করেছি। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। বরং তুমি এই জন্য জ্ঞান হাছিল করেছ যাতে তোমাকে আলিম বলা হয় আর এই জন্য কুরআন পড়েছ যাতে তোমাকে ক্বারী বলা হয়। আর তোমাকে দুনিয়াতে ক্বারী ও আলেম বলা হয়েছে। অতঃপর ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়ে তাকে ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এরপরে (৩য় ব্যক্তি হিসাবে) একজন দানশীল ব্যক্তিকে পেশ করা হবে যাকে মহান আল্লাহ প্রশস্ত রিযিক্ব ও সবধরণের ধন-সম্পদ দিয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তার উপর প্রদত্ত নে‘মতগুলো তাকে স্মরণ করাবেন। সে নে‘মত প্রাপ্তির স্বীকৃতি দিবে। তখন আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এটার বিনিময়ে কী করেছ? সে উত্তরে বলবে, আমি এমন কোন রাস্তায় ধন-সম্পদ ব্যয় করতে ছাড়িনি যে রাস্তায় ধন-সম্পদ ব্যয় করলে আপনি খুশি হবেন। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলেছ। বরং তুমি এই জন্য ধন-সম্পদ ব্যয় করেছ যাতে মানুষ তোমাকে দানবীর বলে। আর দুনিয়াতে তোমাকে দানবীর বলা হয়েছে। অতঃপর ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়ে তাকে ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’।[10]
উক্ত হাদীছে কোন গুনাহগার ব্যক্তিকে তা গুনাহের জন্য জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হচ্ছে না; বরং শহীদ, আলেম ও দানবীরকে জাহান্নামে নিক্ষেপে করা হচ্ছে তাদের নেকীর কাজের বিনিময়ে। শুধু এজন্য যে, তাদের এই নেক আমলে ইখলাছ বা বিশুদ্ধ নিয়্যত ছিল না। সুতরাং একথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, বিশুদ্ধ নিয়্যত বিহীন সৎ আমল জান্নাতে নিয়ে যাওয়া তো দূরে থাক; উল্টো জাহান্নামে যাওয়ার কারণে পরিণত হবে।
أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللهِ لَا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শারঈ জ্ঞান অর্জন করল দুনিয়া উপার্জনের জন্য, সে ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না’।[11]
أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللهَ لاَ يَنْظُرُ إِلَى أَجْسَادِكُمْ وَلاَ إِلَى صُوَرِكُمْ وَلَكِنْ يَنْظُرُ إِلَى قُلُوبِكُمْ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয় মহান আল্লাহ তোমাদের শরীর ও চেহারার দিকে দেখেন না; বরং তোমাদের অন্তরের দিকে দেখেন’।[12]
قُلْ إِنَّ صَلاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ - لا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ.
‘হে নবী আপনি বলে দিন! আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মৃত্যু সবই মহান রাববুল আলামীনের জন্য। তার কোন অংশীদার নেই। আর এমর্মেই আমি আদিষ্ট হয়েছি আর আমিই প্রথম মুসলিম’ (আন‘আম, ১৬২-১৬৩)।
مَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ وَمَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ نَصِيبٍ.
‘আর যে চায় আখিরাতের ফসল আমরা তার ফসল বাড়িয়ে দেই। আর যে দুনিয়ার ফসল চায় আমরা তাকে তা দুনিয়াতেই দিয়ে দেই আর তার জন্য পরকালে কোন অংশ নেই’ (শূরা, ২)।
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُونَ - أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبَاطِلٌ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ.
‘আর যে চায় দুনিয়ার জীবন ও তার সৌন্দর্য, আমরা তাদের আমলের বদলা দুনিয়াতেই দিয়ে দেই আর তারা দুনিয়াতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আর তাদের জন্য আখিরাতে জাহান্নাম ব্যতীত অন্য কিছু নেই। তারা দুনিয়াতে যা আমল করেছে, সব ধ্বংস হয়ে গেছে আর তারা যা আমল করত তা বাতিল’ (হূদ, ১৫-১৬)।
لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّا سِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاةِ اللهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا.
‘তাদের অধিকাংশ কথোপকথনের মধ্যে কোন কল্যাণ নেই তবে যে ছাদাক্বাহ, ভাল কাজ ও কথা এবং মানুষের মাঝে মীমাংসার নির্দেশ দেয়, তার কথার মধ্যে কল্যাণ আছে। যারা একমাত্র মহান আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য এ ধরনের কল্যাণের কাজ করে, আমি শীঘ্রই তাদেরকে মহা পুরস্কার দিব’ (নিসা, ১১৪)।
উপরের আয়াত ও হাদীছগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ বহন করে যে, ইখলাছবিহীন আমল বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য। উল্লেখ্য, পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলোতে ইখলাছ ও বিশুদ্ধ নিয়্যতের ক্ষেত্রে যে শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে-
(ক) ‘ইবতিগাউ রিযাল্লাহ’- আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা।
(খ) ‘ইরাদা’- দুনিয়া বাদ দিয়ে আখিরাত চাওয়া তথা আখিরাতের জন্য আমল করা।
অতএব কেউ যদি ডায়াট কন্ট্রোল বা খাদ্যসংযম অভ্যাসের নিয়্যতে ছিয়াম রাখে এবং ব্যায়াম মনে করে ছালাত আদায় করে তাহলে তার ছিয়াম ও ছালাত বাতিল বলে গণ্য হবে। যদিও তার ছালাতের মধ্যে শাব্দিক অর্থে নিয়্যতের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ইখলাছ নেই।
সমাধান :
উপরের মতভেদের সমাধান হিসাবে আমরা বলতে পারি, এই হাদীছে নিয়্যত দ্বারা শাব্দিক অর্থে নিয়্যত ও ইখলাছ উভয়টিই উদ্দেশ্য। যখন কাজটি ইবাদত হবে তখন সেখানে এই দুই অর্থই অপরিহার্য। কোন একটি অনুপস্থিত থাকলে সেই ইবাদত গ্রহণযোগ্য হবে না। আর যখন কাজটি ইবাদত হবে না, বরং মু‘আমালাত তথা মানুষের স্বাভাবিক জীবনের বিভিন্ন কাজ হবে, তখন সেখানে শাব্দিক অর্থের উপর ভিত্তি করেই হুকুম আরোপ করা হবে। সেখানে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি যরূরী বা অপরিহার্য নয়। যেমন কেউ যদি কাউকে দাসী ক্রয়ের দায়িত্ব দেয় এবং সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি দাসী ক্রয় করে, তাহলে সেই দাসীর মালিকানা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিটির নিয়্যতের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে। যদি সে নিজের জন্য ক্রয় করার নিয়্যত করে ক্রয় করে থাকে তাহলে তার নিজের দাসী আর যদি ঐ দায়িত্বপ্রদানকারী ব্যক্তির জন্য ক্রয় করে থাকে তাহলে দাসী তার জন্য হারাম। এখানে দাসীর মালিকানা শাব্দিক অর্থে নিয়্যতের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে আর এখানে ইখলাছ থাকা অপরিহার্য নয়। ঠিক তেমনি কেউ যদি জমি নিজের ব্যবহারের নিয়্যতে ক্রয় করে থাকে তাহলে তাকে সেই জমির যাকাত দেয়া লাগবে না আর যদি ভবিষ্যতে বিক্রয়ের নিয়্যতে প্লটের ব্যবসা করার জন্য ক্রয় করে থাকে তাহলে প্রতি বছর জমির মূল্য হিসাব করে যাকাত দিতে হবে। তথা যাকাত নির্ধারিত হচ্ছে ক্রেতার মধ্যে শাব্দিক অর্থের নিয়্যতের উপর ভিত্তি করে। আর এখানে ইখলাছ শর্ত বা অপরিহার্য নয়। ওয়াল্লাহু আ‘লাম!
(চলবে)
[1]. ইবনুল ক্বাইয়িম, বাদাইউল ফাওয়ায়েদ, ৩/১৯০ পৃঃ।
[2]. যারকাশী, আল-মানছূর ফিল ক্বাওয়া‘ইদ আল-ফিক্বহিয়্যাহ, ৩/২৮৪ পৃঃ।
[3]. সুনানে আবু দাঊদ, হা/৪৪০৩; সুনানে তিরমিযী, হা/ ১৪২৩।
[4]. সুনানে ইবনে মাজাহ, হা/ ১৬৭৩।
[5]. ফাতহুল বারী, ১/১৩ পৃঃ।
[6]. ফাতহুল বারী, ১/১৩ পৃঃ।
[7]. মুহাম্মাদ গোন্দলবী, ইরশাদুল ক্বারী ইলা নাক্বদি ফায়যিল বারী, (উর্দূ তরজমা), পৃঃ ৯৩ ও ১১৮।
[8]. ফাতহুল বারী, ১/১৩ পৃঃ।
[9]. কাহ্ফ, ১১০; বাক্বারাহ, ২৫; আলে ইমরান, ৫৭; নিসা, ১২২ এরকম প্রায় ষাটের অধিক জায়গায় রয়েছে।
[10]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯০৫।
[11]. সুনানে আবু দাঊদ, হা/৩৬৬৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হা/২৫২।
[12]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৬৪।
