ইসলামের দৃষ্টিতে ট্রান্সজেন্ডার প্রসঙ্গ:
‘ট্রান্সজেন্ডারবাদ মূলত জেন্ডার বিষয়ক পাশ্চাত্যের একটি ধারণা। ট্রান্সজেন্ডার মানে হল, যার মনস্তাত্ত্বিক লিঙ্গবোধ জন্মগত লিঙ্গ চিহ্ন থেকে ভিন্ন। এ মতবাদ অনুযায়ী শারীরিক গঠনে সুস্থ স্বাভাবিক কোনো পুরুষ যদি নিজেকে নারী বোধ করে, তাহলে সে নারী। অনুরূপভাবে শারীরিক গঠনে সুস্থ স্বাভাবিক কোনো নারী যদি নিজেকে পুরুষ বোধ করে, তাহলে সে পুরুষ। অর্থাৎ জন্মগত লিঙ্গ দিয়ে নারী-পুরুষ চিহ্নিত করা হবে না; বরং নারী-পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার মাধ্যম হবে মনস্তাত্ত্বিক লিঙ্গবোধ। নিজেকে যা মনে করেন তিনি তা। এ মতবাদে ট্রান্সজেন্ডার হওয়ার জন্য সার্জারির মাধ্যমে বা হরমোন থেরাপির মাধ্যমে শারীরিক কাঠামো পরিবর্তন করা আবশ্যক নয়, করতেও পারে, আবার নাও করতে পারে। সর্বাবস্থায়ই সে ট্রান্সজেন্ডার’।[1]
‘ট্রান্সজেন্ডার হলো দুটি ইংরেজি শব্দ Trans ও gender-এর সংমিশ্রণ। Trans অর্থ পরিবর্তন করা এবং gender মানে লিঙ্গ। Transgender এমন একজন পুরুষ বা নারীকে বোঝায়, যাকে আল্লাহ তাআলা একজন পূর্ণ পুরুষ বা নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু তারা এই সৃষ্টিতে অসন্তুষ্ট। তারা আল্লাহর সিদ্ধান্ত ও তাদের জন্মগত লিঙ্গ পরিবর্তন করে পুরুষ থেকে নারী বা নারী থেকে পুরুষ হতে চায়’।[2]
মহান আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ‘আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন’ (আর-রূম, ৩০/৩০)। উক্ত আয়াতের তাফসীরে হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আয়াতে পরিবর্তন দ্বারা উলকি বা ট্যাটু উদ্দেশ্য।[3] কারণ ট্যাটুর মাধ্যমে মহান আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন করা হয়।
বরং আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন সরাসরি শয়তানের নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা বলেন,وَإِنْ يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَرِيدًا (117) لَعَنَهُ اللَّهُ وَقَالَ لَأَتَّخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيبًا مَفْرُوضًا (118) وَلَأُضِلَّنَّهُمْ وَلَأُمَنِّيَنَّهُمْ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُبَتِّكُنَّ آذَانَ الْأَنْعَامِ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ ‘আর তারা কেবল বিদ্রোহী শয়তানেরই পূজা করে। আল্লাহ তাকে (শয়তানকে) অভিশাপ করেছেন এবং সে (শয়তান) বলেছে, আমি তোমার দাসদের এক নির্দিষ্ট অংশকে (নিজের দলে) গ্রহণ করবই, তাদেরকে পথভ্রষ্ট করবই, তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করবই, আমি তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব, ফলে তারা পশুর কর্ণচ্ছেদ করবেই এবং তাদেরকে নিশ্চয় নির্দেশ দেব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবেই’ (আন-নিসা, ৪/১১৭-১১৯)। উক্ত আয়াতের তাফসীরে ইমাম কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন,وَقالَت طائِفَةٌ: الإِشارَةُ بِالتَّغْيِيرِ إِلَى الوَشْمِ وَما جَرَى مَجْرَاهُ مِنَ التَّصَنُّعِ لِلحُسْنِ ‘একদল আলেম বলেছেন, এখানে (আল্লাহর সৃষ্টিকে) পরিবর্তন করার দ্বারা ট্যাটু এবং এর মতো সৌন্দর্য অর্জনের জন্য কৃত্রিমভাবে শরীর পরিবর্তনের অন্য পদ্ধতিগুলোর দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে’।[4] আল্লামা মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীত্বী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَكَذَلِكَ عَلَى الْقَوْلِ بِأَنَّ الْمُرَادَ بِتَغْيِيرِ خَلْقِ اللَّهِ الْوَشْمُ، فَهُوَ يَدُلُّ أَيْضًا عَلَى أَنَّ الْوَشْمَ حَرَامٌ. ‘আর একইভাবে, ‘আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন’ বলতে এখানে ট্যাটু বোঝানো হয়েছে— উক্ত মতের উপর ভিত্তি করে এটিও প্রমাণিত হয় যে, ট্যাটু করা হারাম’।[5]
মূলত যে ব্যক্তি আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন করে, সে আসলে দাবি করে যে, সে আল্লাহর তৈরি জিনিসকে ‘আরও সুন্দর’ করছে! যেহেতু এটি আল্লাহর সিদ্ধান্ত, তাই এটি পরিবর্তন করার চেষ্টা করা একটি বড় অপরাধ ও নিন্দনীয় কাজ। এটি এমন বড় গোনাহ, যার একটি শাস্তি হচ্ছে আল্লাহর লা‘নত। একারণেই আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তনকারীদের উপর মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশাপ করেছেন। আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,لَعَنَ اللَّهُ الوَاصِلَةَ وَالمُسْتَوْصِلَةَ وَالوَاشِمَةَ وَالمُسْتَوْشِمَةَ ‘আল্লাহ ঐ নারীর উপর লা‘নত করেন, যে পরচুলা লাগায় ও অপরকে পরচুলা লাগিয়ে দেয়। আর যে নারী উলকি (ট্যাটু) অঙ্কন করে এবং যে তা করায়’।[6] আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,لَعَنَ اللهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُسْتَوْشِمَاتِ، وَالنَّامِصَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ، وَالْمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللهِ ‘আল্লাহ লা‘নত করেন সেসব নারীর উপর, যারা উলকি অঙ্কন করে এবং যারা তা করায়; সেসব নারীর উপর, যারা ভ্রু প্লাক (আলাইহিস সালামyআলাইহিস সালামbrow রাহিমাহুল্লাহluরাযিয়াল্লাহু আনহুkiরাযিয়াল্লাহু আনহুমরাযিয়াল্লাহু আনহা) করে এবং সেসব নারীর উপর, যারা সৌন্দর্যের জন্য সামনের দাঁত কেটে সরু করে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে পরিবর্তন ঘটায়’।[7] ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, لَعَنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَالوَاصِلَةَ وَالمُسْتَوْصِلَةَ وَالوَاشِمَةَ وَالمُسْتَوْشِمَةَ ‘নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ নারীর উপর লা‘নত করেন, যে পরচুলা লাগায় ও অপরকে পরচুলা লাগিয়ে দেয়। আর যে নারী উলকি (ট্যাটু) অঙ্কন করে এবং যে তা করায়’।[8]
উক্ত কাজগুলো এমন গর্হিত যে, কোনো অবস্থাতেই সেগুলোর অনুমতি নেই। না প্রয়োজনে, না স্বামীর অনুমতিতে, না দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য। আসমা বিনতে আবূ বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন,جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَفَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّ لِي ابْنَةً عُرَيِّسًا أَصَابَتْهَا حَصْبَةٌ فَتَمَرَّقَ شَعْرُهَا أَفَأَصِلُهُ، فَقَالَ: «لَعَنَ اللهُ الْوَاصِلَةَ وَالْمُسْتَوْصِلَةَ» ‘এক মহিলা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার এক নববিবাহিতা মেয়ে হামরোগে আক্রান্ত হয়েছে। তাতে তার চুল পড়ে গেছে। আমি কি তাকে পরচুলা লাগিয়ে দিব? তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা পরচুলা সংযোজনকারিণী ও সংযোজনপ্রার্থিনী নারীদের লা‘নত করেছেন’।[9]
এত নিষেধাজ্ঞা ও অভিশাপ সত্ত্বেও ট্যাটু, ভ্রু প্লাক ইত্যাদি ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত গতিতে। এর ঢেউ বাংলাদেশেও আছড়ে পড়ছে। মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত বহু নারী-পুরুষ এই পাপে জড়িয়ে পড়ছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একটি পশ্চিমা দেশের প্রায় ২০% প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ট্যাটু করে থাকে। এর মধ্যে ৫–৯% খ্রিষ্টান ও মুসলিম, যাদের অধিকাংশের বয়স ১৬ থেকে ৩৮ বছর। তারা একটি ট্যাটু করার জন্য প্রায় ৭,০০০ দিরহাম বা ৯০০ ডলার খরচ করছে; অথচ তাদের সবাই ধনী নয়; বরং তাদের মধ্যে ৫৬% বেকার।[10]
যাহোক, যদি ট্যাটু, ভ্রু প্লাক ইত্যাদি এত মারাত্মক হয়, তাহলে ট্রান্সজেন্ডার (Trছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামরাযিয়াল্লাহু আনহুমsরাযিয়াল্লাহু আনহাআলাইহিস সালামরাযিয়াল্লাহু আনহুমdআলাইহিস সালামr) বা লিঙ্গ পরিবর্তন কতটা মারাত্মক হতে পারে! ইসলামে বিভিন্ন অঙ্গ পরিবর্তনেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তাহলে পুরো লিঙ্গ পরিবর্তন কতটা মারাত্মক হতে পারে! পুরুষকে নারী বানানো অথবা নারীকে পুরুষ বানানো তো দূরের কথা, বরং এর চেয়ে কম পর্যায়ের বিষয়েও নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশাপ দিয়েছেন। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বর্ণনা করেন,لَعَنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَالمُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالِ، وَالمُتَرَجِّلاَتِ مِنَ النِّسَاءِ، وَقَالَ: «أَخْرِجُوهُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ» قَالَ: فَأَخْرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَفُلاَنًا، وَأَخْرَجَ عُمَرُ فُلاَنًا ‘নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীসুলভ আচরণকারী পুরুষ এবং পুরুষসুলভ আচরণকারী নারীর উপর অভিশাপ করেছেন। তিনি বলেছেন, এদেরকে তোমাদের ঘর থেকে বের করে দাও। তিনি নিজে একজনকে বের করে দিলেন এবং উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু আরেকজনকে বের করে দিলেন’।[11] ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা আরো বলেন,لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَالمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ، وَالمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ ‘নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশাপ করেছেন সেই সকল পুরুষকে, যারা নারীদের সাদৃশ্য গ্রহণ করে। তেমনি সেই সব নারীকেও অভিশাপ করেছেন, যারা পুরুষদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে থাকে’।[12] আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَالرَّجُلَ يَلْبَسُ لِبْسَةَ الْمَرْأَةِ، وَالْمَرْأَةَ تَلْبَسُ لِبْسَةَ الرَّجُلِ ‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অভিশাপ করেছেন সেই পুরুষকে, যে নারীর ঢঙে (স্টাইলে) পোশাক পরে এবং সেই নারীকে, যে পুরুষের ঢঙে (স্টাইলে) পোশাক পরে’।[13]
ফলে কারো জন্য নিজের লিঙ্গ পরিবর্তন করে পুরুষ থেকে নারী হওয়া বা নারী থেকে পুরুষ হওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে যেমন অত্যন্ত গর্হিত কাজ, তেমনি চিকিৎসাশাস্ত্রেও এর নানাবিধ স্বাস্থ্যক্ষতি প্রমাণিত।
অতএব, একজন মুসলিমের উচিত, আল্লাহ তাকে যে অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন, তা মেনে নেওয়া। কারণ আল্লাহ যেভাবে তাকে সৃষ্টি করেছেন, সেটিই তার জন্য উপযুক্ত। মানুষ তো জানেই না— যদি সে নারী হতো, তবে হয়তো তা তার জন্য ভালো হতো না। আর যদি নারীটি পুরুষ হতো, তবে হয়তো তা তার জন্য ক্ষতিকর হতো। তিনি আপনাকে যে রূপে সৃষ্টি করেছেন—এভাবেই তিনি আপনাকে বানিয়েছেন এবং এভাবেই তিনি আপনাকে চেয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন,هُوَ الَّذِي يُصَوِّرُكُمْ فِي الْأَرْحَامِ كَيْفَ يَشَاءُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ‘তিনিই মাতৃগর্ভে তোমাদেরকে আকৃতি দান করেন যেভাবে তিনি চান। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই; তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ (আলে ইমরান, ৩/৬)।
পুরুষ হোক বা নারী, শ্বেতাঙ্গ হোক বা কৃষ্ণাঙ্গ—সবই তাঁর সৃষ্টি এবং এটাই তাঁর হুকুম ও ইচ্ছা। মানুষ যদি এ সত্যটা জানত ও মানত, তাহলে তারা স্বস্তিতে থাকত এবং অনেকে আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করার কথা ভাবত না।
আল্লাহর কিছু বান্দা আছে, যাদের জন্য দারিদ্র্যই উপযুক্ত; যদি তারা ধনী হয়ে যেত, তবে তাতে তাদের ক্ষতি হতো। আবার কেউ কেউ আছে, যাদের জন্য সম্পদই উপকারী; যদি তারা গরীব হতো, তবে তাদের ক্ষতি হতো।
কিছু নারী পুরুষ হলে যুদ্ধ করতে পারতেন, এমন ইচ্ছে করেছিলেন— শুধু ইচ্ছা হিসেবেই। তখন আল্লাহ নিষেধ করে বলেন,وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِمَّا اكْتَسَبْنَ ‘আর তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো না সে সবের, যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের একজনকে অন্য জনের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। পুরুষদের জন্য রয়েছে অংশ, তারা যা উপার্জন করে, তা থেকে এবং নারীদের জন্য রয়েছে অংশ, যা তারা উপার্জন করে, তা থেকে’ (আন-নিসা, ৪/৩২)।
বাস্তবতা সম্পর্কে জানেন কি?
কোনোভাবেই নারীকে প্রকৃতপক্ষে পুরুষ বানানো বা পুরুষকে প্রকৃতপক্ষে নারী বানানো সম্ভব নয়। এ সম্পর্কে ইসলামওয়েব-এর একটি বক্তব্য আপনাদের খেদমতে পেশ করছি: ‘লিঙ্গ পরিবর্তন বা লিঙ্গ সংশোধন প্রকৃতপক্ষে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বাহ্যিক পরিবর্তন, যাতে তারা বিপরীত লিঙ্গের অঙ্গের মতো দেখায়, কিন্তু এতে প্রকৃত পরিবর্তন হয় না। যেমন একজন পুরুষ নারী হয়ে ঋতুস্রাব বা গর্ভধারণ করতে পারবে না এবং একজন নারীও পুরুষ হয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার সক্ষমতা লাভ করতে পারবে না। সঊদী আরবের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মুহাম্মাদ আলী আল-বার এই ধরনের অপারেশনের (লিঙ্গ পরিবর্তন/Sex Reassignment Surgery/Gender Transition Surgery) প্রকৃতি ও বাস্তবতা সম্পর্কে বলেন,
পুরুষের ক্ষেত্রে: যারা জৈবিকভাবে পুরুষ, তাদের পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষ কেটে ফেলা হয়। ছোট কৃত্রিম ভ্যাজাইনা তৈরি করা হয় বাকি অণ্ডকোষের মাধ্যমে। কখনও কখনও কৃত্রিম স্তন বসানো হয় এবং ঐ ব্যক্তিকে প্রচুর মহিলা-হরমোন দেওয়া হয়, যাতে কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং শরীরের চর্বি বিন্যস্ত হয়ে নারীর মতো হয়। যদিও এমন ব্যক্তির বাহ্যিক চেহারা মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে, সে আসলেই তাকে নারী ভাবতে পারে— অথচ তার জৈবিক কাঠামো অনুযায়ী সে এখনও পুরুষই আছে, যদিও সম্পূর্ণভাবে বিকৃত। সুতরাং তার কোনো ডিম্বাশয় বা জরায়ু নেই এবং এমন ব্যক্তির কখনোই ঋতুস্রাব হয় না। একইভাবে তার পক্ষে গর্ভধারণ করাও মোটেও সম্ভব নয়।
নারীর ক্ষেত্রে: যারা জৈবিকভাবে সম্পূর্ণ নারী, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা তার ইচ্ছা অনুযায়ী বাহ্যিকভাবে পুরুষের মতো একটি নতুন রূপ তৈরি করার চেষ্টা করেন। এতে চিকিৎসকেরা তার জরায়ু ও ডিম্বাশয় অপসারণ করেন, যোনিপথ বন্ধ করেন এবং বাহ্যিকভাবে পুরুষসদৃশ একটি অঙ্গ তৈরি করেন, যা প্রয়োজনের সময় বিশেষ বিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থার সাহায্যে সক্রিয় হতে পারে। এছাড়াও চিকিৎসকরা তার স্তন অপসারণ করেন এবং তাকে প্রচুর পরিমাণে পুরুষ-হরমোন দেন, যার ফলে তার কণ্ঠস্বর ভেঙে যায়—পুরুষের কণ্ঠস্বরের মতো হয়ে যায়। একইভাবে গোঁফ ও দাড়ির চুলও পুরুষদের মতো করে বৃদ্ধি পেতে পারে আর পুরুষ-হরমোন ও ব্যায়ামের প্রভাবে তার পেশী আরও শক্তিশালী হয়। এভাবে একজন সম্পূর্ণ নারী ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে পুরুষের মতো রূপ নেয়। এই ব্যক্তি যৌনসম্পর্ক করতে সক্ষম হলেও নিশ্চিতভাবেই সে বীর্যস্খলন করতে পারে না—কারণ তার বীর্য নেই এবং তার ঔরশে কখনোই সন্তান জন্মদান সম্ভব নয়।[14]
প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে ট্রান্সজেন্ডারের আড়ালে ওরা আসলে কী চায়?
ওরা সমকামিতাকে ছড়িয়ে দিতে চায়। ওরা পৃথিবীকে নষ্ট করতে চায়। ওরা ফাসাদ সৃষ্টি করতে চায়। ওরা পরিবার ও সমাজব্যবস্থাকে নষ্ট করতে চায়। দ্বীন ও ঈমানহীন দেশ ও জাতি বানাতে চায়। ওরা রুগ্ন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ওরা আমাদেরকে মানবরূপী পশু বানাতে চায়। ওরা আমাদের মনুষ্যসমাজকে পশুসমাজে পরিণত করতে চায়। এককথায়, ওরা আমাদের ইহকাল ও পরকাল উভয়ই নষ্ট করতে চায়।
কখন লিঙ্গ সম্পর্কিত চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার জায়েয?
আমরা এ প্রসঙ্গে উলামায়ে কেরামের মন্তব্য দেখব। সঊদী আরবের বিখ্যাত ফতওয়া বোর্ড আল-লাজনাহ আদ-দায়েমাহ-এর মুফতীগণ একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘…তৃতীয়ত: যদি আপনার পুরুষত্ব নিশ্চিত না হয় এবং কেবল আপনার দেহের বাহ্যিক পুরুষালি গঠন দেখে আপনি নিজেকে পুরুষ মনে করেন—অথচ আপনার মনের ভেতরে নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য অনুভব করেন, পুরুষদের প্রতি আবেগগতভাবে দুর্বল হন এবং তাদের প্রতি যৌনভাবে আকৃষ্ট হন, তবে আপনার সিদ্ধান্তে স্থির থাকুন (তাড়াহুড়ো করবেন না)। আপনি যে অপারেশনের কথা উল্লেখ করেছেন, তা করার জন্য অগ্রসর হবেন না। বরং নিজেকে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে তুলে ধরুন।
যদি চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে, আপনি বাহ্যিকভাবে পুরুষ হলেও প্রকৃতপক্ষে একজন নারী, তবেই তাদের কাছে নিজেকে সোপর্দ করুন— যাতে তারা অপারেশনের মাধ্যমে আপনার নারীত্বের প্রকৃত সত্য উন্মোচন করতে পারেন। এটি আপনাকে পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত করা নয়—কারণ সেটি করার ক্ষমতা তাদের নেই—বরং এটি হলো আপনার প্রকৃত অবস্থাকে প্রকাশ করা এবং আপনার দেহ ও মনের ভেতরে থাকা দ্বিধা ও অস্পষ্টতা দূর করা।
আর যদি অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট না হয়, তবে অপারেশন করার মতো ঝুঁকি নেবেন না। আল্লাহর ফয়সালা মেনে নিন এবং আপনার রবের সন্তুষ্টির আশায় এই পরিস্থিতির ওপর ধৈর্য ধারণ করুন। নিজের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও স্পষ্ট ধারণা ছাড়া অপারেশনের ভয়াবহ পরিণাম থেকে বাঁচতে এটি প্রয়োজন। আল্লাহর দিকে ফিরে যান এবং তাঁর কাছে বিনীতভাবে প্রার্থনা করুন, যাতে তিনি আপনার প্রকৃত সত্য প্রকাশ করে দেন এবং আপনার মানসিক জট খুলে দেন। নিশ্চয়ই তাঁর হাতেই সবকিছুর রাজত্ব এবং তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান’।[15]
বিশ্ববিখ্যাত ও নির্ভরযোগ্য ফতওয়ার ওয়েবসাইট islamqa.info-তে এসেছে, ‘যখন কোনো ব্যক্তি মূলত পুরুষ বা নারী হিসেবেই সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু তার অঙ্গগুলো স্পষ্ট নয়। তখন তার আসল সৃষ্টিগত অঙ্গকে প্রকাশ করার জন্য অস্ত্রোপচার করা বৈধ এবং তাকে এমন ওষুধ বা হরমোন দেওয়া বৈধ, যা আল্লাহ যে স্বভাবের উপর তাকে সৃষ্টি করেছেন, তা শক্তিশালী করে। কিন্তু যে ব্যক্তি নারী ও পুরুষ—উভয় প্রজনন অঙ্গ নিয়ে জন্মায় (হিজড়া), তার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করে কোনো একটিকে অপসারণ করে অন্যটিকে প্রকাশ করা বৈধ নয়। বরং অপেক্ষা করতে হবে, যতক্ষণ না আল্লাহ তার জন্য যা নির্ধারিত করেছেন, তা স্পষ্ট হয়ে যায়; তার জীবনের কিছু সময় পেরোনোর পর সেটি প্রকাশও পেতে পারে’।[16]
আরেকটি বিখ্যাত ওয়েবসাইট islamweb.net-এ বলা হয়েছে, ‘যদি বিশ্বস্ত চিকিৎসকদের প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয় যে, এই যুবকের মধ্যে নারীত্বের বৈশিষ্ট্যগুলোই প্রাধান্য পাচ্ছে, তাহলে ইনশাআল্লাহ তার জন্য লিঙ্গ-সংশোধনের (অর্থাৎ সৃষ্টিগত বাস্তব লিঙ্গকে স্পষ্ট করা) অপারেশন করাতে কোনো দোষ নেই। আর তার পরিবারকেও এতে আপত্তি করা উচিত নয়। কারণ তাকে বর্তমান অবস্থায় রেখে দিলে যে কষ্ট ও দুর্ভোগ সৃষ্টি হবে, তা সহ্যসাধ্য নয়’।[17]
ট্রান্সজেন্ডার ও হিজড়া এক নয়: ট্রান্সজেন্ডার ও হিজড়ার মধ্যকার পার্থক্য জানা জরুরী। এই পার্থক্য না জানার কারণে ট্রান্সজেন্ডারবাদের কথা শুনলে অনেকেই মনে করে, এটা হয়তো হিজড়াদের অধিকার নিয়ে কোনো আন্দোলন। কিন্তু এটা আসলে মারাত্মক ভুল ধারণা। হিজড়া আর ট্রান্সজেন্ডার কোনোভাবেই এক নয়। এই দুই শ্রেণির মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
আমরা আগে ট্রান্সজেন্ডার সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। হিজড়ার সংজ্ঞায় এসেছে,مَنْ لَهُ آلَتَا الرِّجَال وَالنِّسَاءِ، أَوْ مَنْ لَيْسَ لَهُ شَيْءٌ مِنْهُمَا أَصْلاً، وَلَهُ ثُقْبٌ يَخْرُجُ مِنْهُ الْبَوْل ‘যার কাছে পুরুষ ও নারী উভয় ধরনের অঙ্গ রয়েছে অথবা যার কাছে এ দুটির কোনোটি নেই, তবে এমন একটি ছিদ্র আছে, যেখান দিয়ে প্রস্রাব বের হয়’।[18] মানুষ হয় সম্পূর্ণ পুরুষ অথবা নারী। যাদের দেহ শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য তৈরি, তারা পুরুষ। আর যাদের দেহ ডিম্বাণু উৎপাদনের জন্য তৈরি, তারা নারী। এটা শুধু বাহ্যিক যন্ত্রপাতির বিষয় নয়, পুরো প্রজননব্যবস্থার বিষয়। সুতরাং এখন যারা জন্মগতভাবে অস্বাভাবিক এবং কিছু যৌন ত্রুটি বা জটিলতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যাকে আমরা হিজড়া বলি, ইংরেজিতে তাদের বলা হয়, ইন্টারসেক্স (Intersex)। পক্ষান্তরে ট্রান্সজেন্ডাররা ইন্টারসেক্স নয়, তারা সম্পূর্ণরূপে পুরুষ বা নারী হিসেবে জন্মগ্রহণ করে এবং পরে লিঙ্গ পরিবর্তন করে। মূলত: বর্তমানে যারা নিজেদের ট্রান্সজেন্ডার দাবি করছে, তাদের বেশিরভাগই ইন্টারসেক্স নয়।[19]
হে আল্লাহর বান্দা ও বান্দীরা! পরাক্রমশালী মহান আল্লাহকে ভয় করুন এবং তাঁর গযব থেকে সাবধান হোন।
(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)
আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী
* বিএ (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এমএ এবং এমফিল, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,
সঊদী আরব; অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।
[1]. https://www.alkawsar.com/bn/article/3633/
[2]. https://www.somoynews.tv/news/2024-06-19/TwUv98Iz
[3]. সুয়ূতী, আদ-দুর্রুল মানছূর, ২/৬৯০।
[4]. তাফসীর কুরতুবী, ৫/৩৯২।
[5]. মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানক্বীত্বী, আযওয়াউল বায়ান ফী ঈযাহিল কুরআন বিলকুরআন, ৫/৩৯২।
[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৩৩।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৮৮৬।
[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৪০; ছহীহ মুসলিম, হা/২১২৪।
[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১২২।
[10]. দ্রষ্টব্য: https://www.alukah.net/social/0/128674/الوشم-في-الإسلام/
[11]. দ্রষ্টব্য: https://www.alukah.net/social/0/128674/الوشم-في-الإسلام/
[12]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৮৫।
[13]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৮৫।
[14]. https://www.islamweb.net/ar/fatwa/204994/عمليات-تحويل-الجنس-حقيقتها-وحكمها
[15]. ফাতাওয়াল-লাজনাহ আদ-দায়েমাহ, ২৫/৪৮-৪৯।
[16]. https://islamqa.info/ar/answers/138451/متى-يجوز-اجراء-عملية-تحويل-الجنس-من-ذكر-لانثى-والعكس
[17]. https://www.islamweb.net/ar/fatwa/55744/متى-يباح-تحويل-الجنس
[18]. আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাতুল কুয়েতিয়্যাহ, ২০/২১।
[19].https://teachers.gov.bd/index.php/blog/details/772336
