(মার্চ’১৯ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
(১৩) তাওহীদ বান্দার কষ্ট ও ব্যথাকে হালকা করে দেয়। অন্তরে তাওহীদের পরিপূর্ণতা অনুযায়ী বান্দা সকল ব্যথা ও কষ্টকে প্রশান্ত হৃদয়ে মেনে নেয় এবং তাক্বদীরের যাবতীয় কঠিন বাস্তবতা সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করে। আর অন্তর প্রশস্ত হওয়ার একটা বড় কারণ হচ্ছে তাওহীদ।
(১৪) তাওহীদ বান্দাকে মানুষের গোলামী, তাদের ধর্না ধরা, তাদের ভয়, তাদের কাছে আশা করা, তাদের উদ্দেশ্যে কাজ করা ইত্যাদি থেকে মুক্তি দেয়। আর এটাই হচ্ছে প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা। সে আল্লাহ ছাড়া কারো নিকট কিছু আশা করে না ও আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় পায় না। আর এর মাধ্যমেই তার সফলতার ষোলকলা পূর্ণ হয়।
(১৫) যখন তাওহীদ বান্দার অন্তরে পূর্ণতা পায় এবং পূর্ণ ইখলাছ বা একনিষ্ঠতা দ্বারা বাস্তবায়িত হয়, তখন এটাই বান্দার অল্প আমলকে অধিক আমলে পরিণত করে দেয় এবং তার সকল ভাল কাজ ও কথার প্রতিদান দ্বিগুণ হয়ে যায়, যার কোন সীমা থাকে না।
(১৬) দুনিয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাওহীদপন্থীদের জন্য সাহায্য-সহযোগিতা, বিজয়, সম্মান-মর্যাদা নির্ধারণ করে দেন এবং হেদায়াতের পথ প্রশস্ত করে দেন। কঠিনকে সহজ করে দেন এবং যাবতীয় অশুদ্ধতাকে সংশোধন করে দেন। কথা ও কাজ সঠিক বলা বা করার সক্ষমতা দেন।
(১৭) আল্লাহ তা‘আলা তাওহীদপন্থীদের দুনিয়াতে ও আখেরাতে সকল অনিষ্ট ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন। আর তাদেরকে উত্তম জীবন দিয়ে তাদের প্রতি করুণা করেন। আল্লামা সা‘দী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,وشواهد هذه الجمل من الكتاب والسنة كثيرة معروفة والله أعلم ‘কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এই ব্যাপারে বহু প্রমাণ রয়েছে, আল্লাহই অধিক অবগত’।[1] ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন,وَلَيْسَ لِلْقُلُوْبِ سُرُوْرٌ وَلَا لَذَّةٌ تَامَّةٌ إلَّا فِي مَحَبَّةِ اللهِ وَالتَّقَرُّبِ إلَيْهِ بِمَا يُحِبُّهُ وَلَا تُمْكِنُ مَحَبَّتُهُ إلَّا بِالْإِعْرَاضِ عَنْ كُلِّ مَحْبُوْبٍ سِوَاهُ وَهَذَا حَقِيقَةُ لَا إلَهَ إلَّا اللهُ ‘বান্দার অন্তরের জন্য কোন আনন্দ ও পরিপূর্ণ স্বাদ নেই একমাত্র আল্লাহ্র ভালবাসা এবং তাঁর নৈকট্য অর্জন করা ব্যতিরেকে। আর তার নৈকট্য অর্জন করা যায় আল্লাহ যা ভালবাসেন কেবল তা করার মাধ্যমে। আর আল্লাহ্র প্রতি ভালবাসা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আল্লাহ ব্যতীত সকল ভালবাসার বস্ত্তকে একমাত্র মহান আল্লাহর ভালবাসার জন্য পরিত্যাগ করে। আর এটা ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’-এর প্রকৃত বাস্তবতা’।[2]
শিরকের অন্ধকার :
শিরকের মর্মার্থ :
الشِّرْكُ ও الشِّرْكَةُ শব্দ দু’টির একই অর্থ। দু’জন পরস্পরে একই কাজে অংশগ্রহণ করা, একজন অন্যজনকে অংশগ্রহণ করানো অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আর আল্লাহ্র সাথে কাউকে অংশীদার স্থাপন করল মানে কুফরী করল। উভয়ের ভেতরে শিরক নামটি রয়েছে। আমরা তোমাদের ‘শিরক’ চাই মানে হচ্ছে, বংশে তোমাদের অংশগ্রহণ চাই’।[3]
আল্লাহ্র সাথে শিরক করার অর্থ হচ্ছে, তাঁর রাজত্ব বা ইবাদতে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা। অতএব শিরক হল, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, সেই আল্লাহ্র সমকক্ষ বানানো। আর এটা সবচেয়ে বড় গোনাহ। শিরক এমন একটি অপরাধ, যা সমস্ত আমলকে নষ্ট ও বাতিল করে দেয় এবং সৎকর্মের প্রতিদান পাওয়া হতে বঞ্চিত করে।
অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে অন্য কাউকে সম্মান বা ভালবাসার দিক থেকে সমান মনে করবে অথবা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর ধর্মের মৌলিক বিষয়ের বিপরীতে অন্য কারো পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, সে মুশরিক’।[4]
শিরক দু’ প্রকার : বড় শিরক, যা ধর্ম থেকে বের করে দেয়। ছোট শিরক, যা ধর্ম থেকে বের করে দেয় না’।[5] আল্লামা সা‘দী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
أن حد الشرك الأكبر الذي يجمع أنواعه وأفراده أن يصرف العبد نوعًا أو فردًا من أفراد العبادة لغير الله، فكل: اعتقاد، أو قول، أو عمل ثبت أنه مأمور به من الشارع فصرفه لله وحده توحيد وإيمان وإخلاص، وصرفه لغيره شرك وكفر، وهذا ضابط للشرك الأكبر لا يشذ عنه شيء وأما حد الشرك الأصغر فهو: كل وسيلة وذريعة يتطرق منها إلى الشرك الأكبر، من: الإرادات، والأقوال، والأفعال التي لم تبلغ رتبة العبادة.
‘বড় শিরকের সীমারেখা হচ্ছে -এই সীমারেখার মধ্যে বড় শিরকের সব প্রকার অন্তর্ভুক্ত হয়-, বান্দা কর্তৃক ইবাদতের যে কোন শাখা ও প্রকার আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য নিবেদন করা। অতএব, প্রত্যেকটি আক্বীদা, কথা বা কাজ, যা শরী‘আত প্রণেতা আল্লাহ কর্তৃক নির্দেশিত, তা কেবলমাত্র আল্লাহ্র জন্য নিবেদন করাই হচ্ছে তাওহীদ, ঈমান ও ইখলাছ। আর তা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য নিবেদন করাই হচ্ছে শিরক ও কুফর। আর এটা বড় শিরকের সূত্র, যা থেকে কোন বড় শিরক বাদ পড়ে না। আর ছোট শিরকের সীমারেখা হচ্ছে, এমন প্রত্যেক মাধ্যম ও উপায়, যা বড় শিরকের দিকে ধাবিত করে, তাই হচ্ছে ছোট শিরক। যেমন- ইচ্ছা, কামনা-বাসনা, কথা-বার্তা, কাজ-কর্ম, যেগুলো ইবাদতের মর্যাদায় পৌঁছেনি’।[6]
শিরক বাতিল হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণসমূহ :
শিরক বাতিল হওয়া ও শিরককারীর নিন্দা প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট ও অকাট্য অনেক প্রমাণ আছে। যার কিছু নিমেণ উল্লেখ করা হল-
(১) প্রত্যেক এমন ব্যক্তি যে নবী, অলী-আউলিয়া, ফেরেশতা বা জিনকে ডাকে অথবা তাদের উদ্দেশ্যে কোন ইবাদত করে, সে আল্লাহ ব্যতীত তাকেই ইলাহ বা মা‘বূদ হিসাবে গ্রহণ করে।[7] আর এটাই হচ্ছে বড় শিরকের বাস্তবতা, যে প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيْمًا ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। আর তিনি এছাড়া অন্য পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে শিরক করে, নিশ্চয় সে মহাপাপে জড়িয়ে মিথ্যা রচনা করে’ (নিসা, ৪/৪৮)।
(২) যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ইলাহ হিসাবে গ্রহণ করে, তাদের জন্য অকাট্য ও সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসাবে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,
أَمِ اتَّخَذُوْا آلِهَةً مِّنَ الْأَرْضِ هُمْ يُنشِرُوْنَ لَوْ كَانَ فِيْهِمَا آلِهَةٌ إِلا اللهُ لَفَسَدَتَا فَسُبْحَانَ اللهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُوْنَ لا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُوْنَ.
‘তারা (অর্থাৎ মুশরিকরা) মাটি থেকে (তৈরি) যে সব দেবতা গ্রহণ করেছে, তারা কি (মৃতদেরকে) জীবিত করতে সক্ষম? আসমান ও যমীনে যদি আল্লাহ ব্যতীত আরো অনেক ইলাহ থাকত, তবে (আসমান ও যমীন) উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত। কাজেই আরশের অধিপতি আল্লাহ মহান ও পবিত্র সেসব থেকে, যা তারা তার প্রতি আরোপ করে। তিনি যা করেন, সে ব্যাপারে তিনি জিজ্ঞাসিত হবেন না, বরং তারা জিজ্ঞাসিত হবে (তাদের কর্মের ব্যাপারে)’ (আম্বিয়া, ২১/২১-২৩)।
এখানে আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর কাউকে ইলাহ হিসাবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন, তা পাথর হোক, গাছ হোক কিংবা মূর্তি, আল্লাহ ব্যতীত যার ইবাদত করা হয়। তারা কি মৃতকে জীবিত ও পুনরুত্থান করতে পারবে?
জবাব হচ্ছে, না, কখনই না। তারা তা করতে সক্ষম হবে না। যদি আল্লাহ ব্যতীত আসমান ও যমীনে ইবাদতের (যোগ্য) কোন ইলাহ থাকত তাহলে তারা (উভয় ইলাহ) ধ্বংস হয়ে যেত এবং আসমান যমীনে সমস্ত সৃষ্টিরাজিও ধ্বংস হয়ে যেত। কেননা একাধিক ইলাহদের মাঝে মতানৈক্য, মতবিরোধ, বাধা-বিপত্তি ও বিবাদ সৃষ্টি হত। ফলে ধ্বংস অনিবার্য হয়ে যেত। যদি দুই ইলাহ ধরে নেয়া হয় এবং একজন কোন কিছু সৃষ্টি করতে চায়, কিন্তু অপরজন না চায়; অথবা একজন কাউকে কিছু দিতে চায়, কিন্তু অপরজন না চায়; অথবা একজন কাউকে নাড়াতে চায়, কিন্তু অপরজন স্থির রাখতে চায়, তাহলে জগৎ পরিচালনায় বিঘ্নতা সৃষ্টি হবে এবং জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে। এর কিছু দিক রয়েছে, যেমন-
* একই সাথে দুই ইলাহর ভিন্ন আকাঙ্খা বাস্তবায়ন অসম্ভব। এটা একদমই বাতিল। কেননা দুই ইলাহর বিপরীতমুখী আকাঙ্খা বাস্তবায়ন হওয়া মানে বিপরীতমুখী দু’টি জিনিস একত্রিত হওয়া; একই জিনিস একই সময় জীবিত হওয়া ও মৃত হওয়া, নড়াচড়া করা ও স্থির হওয়া (যা কখনই সম্ভব নয়)।
* যদি একই সাথে দুই ইলাহর লক্ষ্য বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে উভয়ের অক্ষমতা আবশ্যক হয়ে পড়ে, যা রুবূবিয়্যাতের সাথে সাংঘর্ষিক।
* যদি একজনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন হয়, অপরজনের না হয়, তাহলে একজন হবেন শক্তিধর ইলাহ এবং অপরজন হবেন অপারগ, দুর্বল ও লাঞ্ছিত।
* আর একই সাথে সর্ববিষয়ে দুই ইলাহর লক্ষ্য এক হওয়া অসম্ভব।
আর তখনই অবধারিত হয়ে যাবে, যিনি তার কর্মে বিজয়ী, প্রভাবশালী, কেবল তার লক্ষ্যই বাস্তবায়িত হবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। আর তিনিই হচ্ছেন, আল্লাহ, একক সৃষ্টিকর্তা, মা‘বূদ। তিনি ব্যতীত প্রকৃত কোন মা‘বূদ নেই। তিনি ব্যতীত কোন রব নেই। তার সাথে আর কোন ইলাহ না থাকার ব্যাপারে তিনি এরশাদ করেন,
مَا اتَّخَذَ اللهُ مِن وَلَدٍ وَمَا كَانَ مَعَهُ مِنْ إِلَهٍ إِذًا لَّذَهَبَ كُلُّ إِلَهٍ بِمَا خَلَقَ وَلَعَلا بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ سُبْحَانَ اللهِ عَمَّا يَصِفُونَ، عَالِمِ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ فَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُوْنَ.
‘আল্লাহ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি, আর তার সাথে অন্য কোন ইলাহ নেই, (থাকলে) প্রত্যেক ইলাহ আপন সৃষ্টি নিয়ে অবশ্যই চলে যেত, আর অবশ্যই একে অপরের উপর চড়াও হত। তারা তার প্রতি যা আরোপ করে, তাত্থেকে তিনি কত মহান ও পবিত্র! তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানের অধিকারী, তারা যা তার শরীক বানায়, তাত্থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে’ (মুমিনূন, ২৩/৯১-৯২)।
তিনিই সৃষ্টির শুরু থেকে ঊর্ধব জগত ও নিমণ জগতের ব্যবস্থাপক, পরিচালক ও একজগতের সঙ্গে অপর জগতের সংযোগ স্থাপনকারী। তিনি এরশাদ করেন, مَّا تَرَى فِي خَلْقِ الرَّحْمَنِ مِن تَفَاوُتٍ ‘তোমরা মহা দয়াময়ের সৃষ্টিকার্যে কোনরূপ অসামঞ্জস্য দেখতে পাবে না’ (মুল্ক, ৬৭/৩)। আর এ সবকিছুই তার সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণার্থে নিয়োজিত। যা প্রমাণ করে, এসবকিছুর নিয়ন্ত্রক একজন, এসবের রব ও ইলাহও একজন, তিনি ছাড়া প্রকৃত কোন মা‘বূদ নেই এবং তিনি ব্যতীত কোন স্রষ্টা নেই’।[8]
(৩) প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তিদের নিকট এটি জ্ঞাত যে, আল্লাহ ব্যতীত যারই ইবাদত করা হয়, সে সব দিক থেকে দুর্বল, অক্ষম। এসব ইলাহ নিজের জন্য অথবা অন্যের জন্য কল্যাণ-অকল্যাণ, জীবন-মরণ, দান করা-বিরত রাখা, উচু করা-নীচু করা, সম্মানিত করা-অসম্মানিত করার মালিক নয়। প্রকৃত মা‘বূদ যেসব গুণে গুণান্বিত, তাদের মাঝে সেসবের কোনটিই নেই। তাহলে যার এমন অবস্থা, তার ইবাদত কীভাবে করা হবে? কীভাবে তার নিকট থেকে কল্যাণের আশা ও ভয় করা হবে? কীভাবে তার নিকট কিছু চাওয়া হবে, যে কিছু শুনে না, দেখে না ও জানে না’।[9]
আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করা হয়, আল্লাহ তা‘আলা তাদের দুর্বলতা, অক্ষমতা পূর্ণভাবে কুরআনে উল্লেখ করে বলেন,قُلْ أَتَعْبُدُوْنَ مِن دُوْنِ اللهِ مَا لَا يَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَاللهُ هُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ ‘বলুন, তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কি এমন কিছুর ইবাদত করছ, যাদের না আছে কোন ক্ষতি করার ক্ষমতা, আর না আছে উপকার করার। আর আল্লাহ হলেন সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (মায়েদাহ, ৫/৭৬)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, ‘তারা কি এমন কিছুকে শরীক করে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়েছে। তারা না পারে তাদেরকে (অর্থাৎ তাদের ইবাদতকারীদেরকে) সাহায্য করতে, না পারে তাদেরকে সাহায্য করতে। তোমরা তাদেরকে যদি সত্য পথে চলার জন্য ডাক, তারা তোমাদের অনুসরণ করবে না। তাদেরকে ডাক কিংবা চুপচাপ থাক, তোমাদের জন্য উভয়ই সমান। আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে তোমরা ডাক, তারা তোমাদের মতই বান্দা। তাদেরকে ডাকতে থাক, তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাক, তাহলে তারা তোমাদের ডাকে সাড়া দিক। তাদের কি পা আছে, যা দিয়ে তারা চলাফেরা করে? তাদের কি হাত আছে, যা দিয়ে তারা ধরে? তাদের কি চোখ আছে, যা দিয়ে তারা দেখে? তাদের কি কান আছে, যা দিয়ে তারা শোনে? বলুন, তোমরা যাদেরকে আল্লাহ্র শরীক করছ, তাদেরকে আহবান কর, আর আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কর এবং আমাকে অবকাশ দিও না। আল্লাহই হলেন আমার অভিভাবক, যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, আর তিনিই সৎকর্মশীলদের অভিভাবকত্ব করে থাকেন। তাঁকে (অর্থাৎ আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাক, তারা তোমাদের সাহায্য করার কোন ক্ষমতা রাখে না, পারে না নিজেদেরকেও সাহায্য করতে। তাদেরকে যদি সঠিক পথের দিকে ডাক, তারা শুনে না, তুমি দেখ যে, তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু আসলে তারা কিছুই দেখতে পায় না’ (আ‘রাফ, ৭/১৯১-১৯৮)। তিনি অন্যত্র এরশাদ করেন,
وَاتَّخَذُوْا مِن دُوْنِهِ آلِهَةً لا يَخْلُقُوْنَ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ وَلا يَمْلِكُوْنَ لأَنفُسِهِمْ ضَرًّا وَلا نَفْعًا وَلا يَمْلِكُونَ مَوْتًا وَلا حَيَاةً وَلا نُشُوْرًا.
‘আর তারা তাঁকে বাদ দিয়ে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে অন্য কিছুকে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না, বরং তারা নিজেরাই সৃষ্টি হয়েছে। তারা ক্ষমতা রাখে না নিজেদের ক্ষতি বা উপকার করার এবং ক্ষমতা রাখে না মৃত্যু, জীবন ও পুনরুত্থানের উপর’ (ফুরক্বান, ২৫/৩)। এরূপ ইলাহ তার বান্দাদের বিপদ মুক্তি অথবা কল্যাণের মাধ্যমে পরিবর্তন করার মালিক নয়। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,قُلِ ادْعُواْ الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِهِ فَلاَ يَمْلِكُونَ كَشْفَ الضُّرِّ عَنكُمْ وَلاَ تَحْوِيلاً ‘বলুন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ মনে কর, তাদেরকে ডাক, তারা তোমাদের দুঃখ-বেদনা দূর করতে বা বদলাতে সক্ষম নয়’ (ইসরা, ১৭/৫৬)।
(চলবে)
মূল : ড. সাঈদ ইবনু আলী ইবনে ওয়াহাফ আল-ক্বাহত্বানী
অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হুসাইন
[1]. আল-ক্বাওলুস সাদীদ ফী মাক্বাছিদুত তাওহীদ, পৃঃ ২৫।
[2]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া, ২৮/৩২ পৃঃ।
[3]. আল-কামুসুল মুহীত্ব, ش অধ্যায়, كاف অনুচ্ছেদ, পৃঃ ১২৪০।
[4]. আব্দুর রহমান আদ-দাওসুরী কতৃক আক্বীদা প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর সমূহ, পৃঃ ৪১।
[5]. কাযীয়াতুত তাক্বফীর, পৃঃ ১১৯।
[6]. আব্দুর রহমান আস-সা‘দী রচিত, ‘আল-ক্বাওলুস সাদীদ’, পৃঃ ৩১, ৩২, ৫৪।
[7]. কিতাবুত তাওহীদ-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ, ফাৎহুল মাজীদ, পৃঃ ২৪২।
[8]. ইবনু তায়মিয়াহ, ‘দারউ তা‘আরুযিল আকলি ওয়ান নকলি’ ৯/৩৫২, ৩৫৪, ৩৩৭-৩৮২, ১/৩৫-৩৭ পৃঃ; তাফসীরে বাগাভী, ৩/২৪১, ৩১৬ পৃঃ; ইবনু কাছীর, ৩/২৫৫, ১৭৬ পৃঃ; তাফসীরে ফাৎহুল ক্বাদীর, ৩/৪০২, ৪৯৬ পৃঃ; তাফসীরে আস-সা‘দী, ৫/২২০,৩৭৪ পৃঃ; আইসারুত তাফাসীর, ৩/৯৯ পৃঃ; ড. যাহের বিন এ‘ওয়ায আল-মা‘ই রচিত, ‘মানাহিজুল জাদাল ফিল কুরআনিল কারীম’, পৃঃ ১৫৮-১৬১।
[9]. তাফসীরে ইবনু কাছীর, ২/৮৩, ২১৯, ২৭৭, ৪১৭, ৩/৪৭, ২১১, ৩১০ পৃঃ; তাফসীরে সা‘দী, ২/৩২৭, ৪২০, ৩/২৯০, ৪৫১, ৫/২৭৯, ৪৫৭, ৬/১৫৩ পৃঃ; আযওয়াউল বায়ান, ২/৪৮২, ৩/১০১, ৩২২, ৫৯৮, ৫/৪৪, ৬/২৬৮ পৃঃ)।
