কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কিতাবুল ইলম: জ্ঞান অর্জনের স্বরূপ (মিন্নাতুল বারী-১৪ তম পর্ব)

post title will place here

৩য় দলীল: সালাফদের মন্তব্য (মুনাওয়ালা ও মুকাতাবা প্রসঙ্গে): ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,وَرَأَى عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ، وَيَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، وَمَالِكُ بْنُ أَنَسٍ ذَلِكَ جَائِزًا ‘আব্দুল্লাহ ইবনে উমার, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ ও মালেক ইবনে আনাস মুনাওয়ালাকে জায়েয মনে করতেন’।

১ম মন্তব্য: আব্দুল্লাহ ইবনে উমার: আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মন্তব্য বিশ্লেষণের শুরুতেই আমাদের তার পরিচয় নির্ধারণ করা জরুরী। 

হাদীছ বর্ণনার সনদে ‘আব্দুল্লাহ ইবনে উমার’ নামে যে রাবীর উল্লেখ পাওয়া যায়, বিশেষ করে মুনাওয়ালা ও মুকাতাবা সংক্রান্ত রেওয়ায়াতে, তার পরিচয় নির্ধারণে মুহাদ্দিছগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

(ক) আব্দুল্লাহ ইবনে উমার আল-উমরী: একদল মুহাদ্দিছ বলেন, এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছেন, عبد الله بن عمر العمري আব্দুল্লাহ ইবনে উমার আল-উমরী, যার পূর্ণ নাম আব্দুল্লাহ ইবনে উমার ইবনে হাফছ আছিম ইবনে উমার ইবনে খাত্ত্বাব।

ইমাম কিরমানী ও ইমাম আয়নীর মতে, এই মতটিই সঠিক। 

(খ)উবায়দুল্লাহ ইবনে উমার আল-উমরী: একদল মুহাদ্দিছের মতে, এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছেন,عبيد الله بن عمر العمري উবায়দুল্লাহ ইবনে উমার আল-উমরী, যিনি পূর্বোক্ত আব্দুল্লাহ ইবনে উমারের ভাই।

ইমাম রামাহুরমুযী রাহিমাহুল্লাহ তারالمحدث الفاصل بين الراوي والواعي গ্রন্থে মুনাওয়ালা সংক্রান্ত রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন উবায়দুল্লাহ আল-উমরী থেকে।[1]

তদ্রূপ ইমাম ইবনু আব্দিল বার্র রাহিমাহুল্লাহ তার গ্রন্থ جامع بيان العلم وفضله -এ মুনাওয়ালা প্রসঙ্গে বর্ণনা উল্লেখ করেছেন উবায়দুল্লাহ আল-উমরী সূত্রে।[2] 

ইমাম ইবনু মান্দা রাহিমাহুল্লাহ তার গ্রন্থ معرفة الصحابة-এ মুনাওয়ালা জায়েয সংক্রান্ত বর্ণনা ‘আব্দুল্লাহ ইবনে উমার’ নামে উল্লেখ করেছেন।

অনুরূপভাবে আবূ জুরআ আদ-দিমাশকী রাহিমাহুল্লাহ তার ইতিহাস বিষয়ক রচনাসমূহে (যেমন-تاريخ أبي زرعة الدمشقي) এই সংক্রান্ত রেওয়ায়েত عبد الله بن عمر হিসেবে উল্লেখ করেছেন।[3]

(গ) ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু হওয়ার সম্ভাবনা: কেউ কেউ মনে করেন, এটি ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেই। তবে ছাহাবী ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে এই ধরনের ‘মুনাওয়ালা/মুকাতাবা’ সংক্রান্ত বর্ণনা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয়। 

ইমাম ইবনু শিহাব যুহরীর আমল: আব্দুল্লাহ ইবনে উমার আল-উমরী অথবা উবায়দুল্লাহ ইবনে উমার উমরী থেকে যে বর্ণনাটি প্রসিদ্ধ, সেটি মূলত ইবনু শিহাব যুহরীর আমল। লোকেরা ইমাম যুহরীর কাছে আসত এবং তার লেখা কিতাব শনাক্ত করত। তিনি স্বীকার করতেন, ‘হ্যাঁ, এগুলো আমার কিতাব’। এরপর তিনি অনুমতি দিতেন, তোমরা এগুলো থেকে হাদীছ বর্ণনা করতে পার।

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয়: আগন্তুক ব্যক্তিরা ইমাম যুহরী থেকে হাদীছ সরাসরি শোনেননি। আবার সে নিজে সরাসরি পড়েছে আর ইমাম যুহরী শুনেছেন এমনও হয়নি। বরং কিতাব শনাক্ত ও মৌখিক অনুমতির ভিত্তিতে সে ইমাম যুহরী থেকে হাদীছ বর্ণনা করবে। আর এটিই মুনাওয়ালা। 

আর এই মুনাওয়ালা সূত্রেই উবায়দুল্লাহ ইবনে উমার আল-উমরী ইমাম যুহরী থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। 

২য় মন্তব্য: ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ:

كَتَبَ يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ الأَنْصَارِيُّ إِلَى مَالِكِ بْنِ أَنَسٍ لَمَّا أَرَادَ الْخُرُوجَ إِلَى الْعِرَاقِ: التَقِطْ لِي مِائَةَ حَدِيثٍ مِنْ حَدِيثِ ابْنِ شِهَابٍ حَتَّى أَرْوِيَهَا عَنْكَ عَنْهُ. قَالَ مَالِكٌ: فَكَتَبْتُهَا لَهُ ثُمَّ بَعَثْتُ بِهَا إِلَيْهِ. فَقِيلَ لِمَالِكٍ: أَسَمِعَهَا مِنْكَ؟ قَالَ: هُوَ أَفْقَهُ مِنْ ذَلِكَ.

ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-আনছারী রাহিমাহুল্লাহ যখন ইরাকের উদ্দেশ্যে রওনা দেন, তখন তিনি ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ-কে বলেন, আপনি আমার নিকট ইমাম যুহরীর ১০০টি হাদীছ লিখে পাঠাবেন, যাতে আমি সেগুলো আপনার মাধ্যমে ইমাম যুহরী থেকে বর্ণনা করতে পারি।[4] তখন ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ ইমাম যুহরীর ১০০টি হাদীছ লিখে ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-আনছারীর নিকট ইরাকে পাঠান।

পরবর্তীতে ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করা হয়, এই ১০০টি হাদীছ কি ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-আনছারী সরাসরি আপনার থেকে শুনেছেন? তিনি উত্তরে বলেন, ‘সে আমার চেয়েও বড় ফক্বীহ’ অথবা ‘সে আমার চেয়েও বেশি বুঝে’।

এই বক্তব্য থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-আনছারী ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ-এর নিকট থেকে উপরিউক্ত ১০০টি হাদীছ সরাসরি শ্রবণ করেননি, বরং ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ ইমাম যুহরীর সেই ১০০টি হাদীছ লিখিত আকারে তার নিকট প্রেরণ করেছিলেন। আর সেই লিখিত পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতেই ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-আনছারী হাদীছগুলো ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ-এর সনদে বর্ণনা করতেন।

এ কারণেই ছাত্ররা প্রশ্ন করেছিল, যেহেতু তিনি এই হাদীছগুলো সরাসরি আপনার থেকে শোনেননি, তাহলে কীভাবে তিনি আপনার সূত্রে সেগুলো বর্ণনা করতে পারেন? এর উত্তরে ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ-এর বক্তব্যের তাৎপর্য হলো ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-আনছারী এমন একজন জ্ঞানী ও ফক্বীহ, যিনি কেবল লিখিত হাদীছ পেলেই অন্ধভাবে তা বর্ণনা করবেন না; বরং সেখানে কোনো ভুল, অসঙ্গতি বা সমস্যা থাকলে তা অনুধাবন করার মতো গভীর জ্ঞান তার আছে। অর্থাৎ তিনি এতটাই পারদর্শী যে, লিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে বর্ণনা করলেও তার জন্য যথেষ্ট, সরাসরি শ্রবণ অপরিহার্য নয়।

এ ঘটনা থেকে আরও একটি বিষয় প্রমাণিত হয় যে, হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে যাদের জ্ঞান পরিপক্ক নয়, তাদের জন্য সরাসরি মুহাদ্দিছের নিকট থেকে শ্রবণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর যারা লিখিত পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে বর্ণনা করতে চান, তাদের জন্য হাদীছশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান, পারদর্শিতা এবং যাচাই-বাছাই করার সক্ষমতা থাকা অপরিহার্য।

৩য় মন্তব্য: ইমাম মালেক:

سَأَلْتُ مَالِكًا عَنْ أَصَحِّ السَّمَاعِ، فَقَالَ: قِرَاءَتُكَ عَلَى الْعَالِمِ - أَوْ قَالَ: الْمُحَدِّثِ - قِرَاءَةُ الْمُحَدِّثِ عَلَيْكَ، ثُمَّ أَنْ يَدْفَعَ إِلَيْكَ كِتَابَهُ.

একবার ইমাম মালেক ইবনে আনাস রাহিমাহুল্লাহ-কে ইসমাঈল ইবনু আবী উয়াইস জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাদীছ শ্রবণের সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্ধতি কোনটি?’ তখন ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ বললেন, প্রথম ও সর্বোচ্চ স্তর হলো- قِرَاءَتُكَ عَلَى الْعَالِمِ ‘তুমি আলেম (অথবা মুহাদ্দিছ)-এর সামনে বসে পড়ে শোনাবে’। অর্থাৎ ছাত্র কিতাব থেকে পড়বে, আর শায়খ শুনে সংশোধন করবেন। এটি ইমাম মালেকের নিকট হাদীছ গ্রহণের সর্বশ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। দ্বিতীয় স্তর হলো- قِرَاءَةُ الْمُحَدِّثِ عَلَيْكَ ‘মুহাদ্দিছ তোমাকে পড়ে শোনাবেন, আর তুমি শুনবে’। এখানে শায়খ নিজে পাঠ করবেন, ছাত্র শুনে গ্রহণ করবে। এটি প্রথম স্তরের পরে স্থান পায়। আর তৃতীয় স্তর হলো- ثُمَّ أَنْ يَدْفَعَ إِلَيْكَ كِتَابَهُ ‘তিনি তোমার কাছে তার কিতাব (পাণ্ডুলিপি) হস্তান্তর করবেন’। অর্থাৎ শায়খ তার লিখিত সংকলন ছাত্রের হাতে তুলে দেবেন এবং সেখান থেকে বর্ণনার অনুমতি দেবেন (مناولة مع الإذن)। এটি গ্রহণযোগ্য হলেও প্রথম দুই পদ্ধতির নিচে।[5]

উক্ত মন্তব্য প্রমাণ করে যে, ইমাম মালেকের নিকট মুনাওয়ালা ও মুকাতাবা গ্রহণযোগ্য।

উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সালাফদের অধিকাংশের নিকটেই মুনাওয়ালা ও মুকাতাবা গ্রহণযোগ্য। 

(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)

আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক

ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।


[1]. তাগলীকুত তা‘লীক, ২/৭৩; আল-মুহাদ্দিছুল ফাসিল, পৃ. ৪৩৫।

[2]. জামিউ বায়ানিল ইলম, ২/২১৮।

[3]. তাগলীকুত তা‘লীক, ২/৭৩।

[4]. ফাতহুল বারী, ১/১৫৫।

[5]. ফাতহুল বারী, ১/১৫৫।

Magazine