কুরবানী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী করতে হয়। ঈদুল আযহার দিন থেকে অর্থাৎ ১০ যিলহজ্জ থেকে ১২ যিলহজ্জ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানীর দিনগুলোতে নির্দিষ্ট ধরনের গৃহপালিত পশু যবেহ করাই হচ্ছে কুরবানী।
ঈদুল আযহার আমেজ আসে কুরবানীর পশুর হাট ঘিরে। পরিবারের সদস্যরা মিলে হাটে যাওয়া, দরদাম করে পশু কিনে বাড়ি ফেরা, পথে মানুষের জিজ্ঞেস করা— এসব আলাদা মাত্রা যোগ করে ঈদের আমেজে।
নিজের পছন্দে নিজেই কিনে আনে বলে কুরবানীর হাট কিংবা বাজার অন্য অনেক বাজার থেকে আলাদা। কাজেই এ বাজারে পুরাতন বিক্রেতার সাথে নতুন ক্রেতার দেখা হয়, পুরাতন দালালের সাথে নতুন ক্রেতার ভণিতার সখ্য হয়। গরু পৌঁছে দেওয়ার সহকারীর কাছে একশ টাকা থেকে হাজার টাকার দফারফায় লক্ষ টাকার গরু বা পশু তুলে দিতে হয়। তাই কানকে খরগোশের মতো খাড়া করে, চোখকে মাছির মতো সচল রেখে বাজারে বা হাটে ঢুকতে হয়। অস্থায়ী মানুষের অস্থায়ী হাট ক্ষণস্থায়ী বলে পদে পদে বিপদ সাথে সাথে ঘুরে। এজন্যই এ বাজারে অধিক সতর্কতার সাথে পশু কিনতে হয়। চোখকে টর্চলাইট, কানকে অ্যান্টেনা, মনকে রাডার বানিয়ে চলতে হয়।
যদিও কুরবানী ভালো ও সুস্থ পশু ছাড়া হয় না। তাই নতুন ক্রেতা পুরাতন বিক্রেতার কাছে যায় এবং ফাঁদ পাতা জালে আটকা পড়ে বেশি। সারা বাংলাদেশে আবার ব্যবসায়ী ক্যাটাগরিতে দুই ধরনের কাস্টমার বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। এর একজন বিদেশ থেকে ডলার, পাউন্ড নিয়ে আগত; আবার অন্যজন ভাই, বোন বা আত্মীয়-পরিজনের টাকায় পশু কিনতে আগত কাস্টমার। বিক্রেতারা এ দুই ধরনের কাস্টমারকে গুরুত্ব বেশি দিয়ে আবার দুই ধরনের দাম হাঁকায়। বিদেশিকে পশুর দাম থেকে ৩ থেকে ৫ গুণ বাড়িয়ে বলে অনড় থাকা। আবার বিদেশি টাকায় দেশি কাস্টমারকে ৩ থেকে ৪ গুণ দাম বাড়িয়ে বলা হয়। দেখা গেছে, যিনি ডলার বা পাউন্ড নিয়ে এসেছেন, তিনি পাউন্ড বা ডলারকে চোখ বুজে টাকায় রূপান্তর করে বেশ সস্তায় কিনতে পারছেন মনে করে বেশি দামে কেনেন। আবার পরের ধনে পোদ্দারি করা কাস্টমার, বেশি দরদাম না করেই পশু কিনে নেন। তারা পশুর দাম যাচ্ছেতাই হাঁকাতে শুরু করে এবং আটকে দেয় তাদের, যারা ঘুষের টাকা গরীব মারার টাকায় কিনতে আসেন না।
বাজারের নিয়মিত পদ্ধতি হচ্ছে আপনি যা কিনতে যাচ্ছেন, তার সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে যাওয়া। এতে যদি কোনো রাস্তা না থাকে, তাহলে একজনের কাছে দাঁড়িয়ে হঠাৎ দাম করে না কিনে বাজারে দরদাম যাচাই করে কেনা। ফলমূল, তরিতরকারি, আসবাব কিংবা জমি কেনার মতো কিনতে কিনতে ক্রেতা হওয়ার মতো বাজারে অভিজ্ঞ ক্রেতা সেজে ঢুকুন, তাহলে ঠকবেন না। ইদানীং বাজারে ‘মোটাতাজা পশু’ কথাটি বেশ প্রচলিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সঠিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশু মোটাতাজা করে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। দেখা গেছে, এভাবে কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশুর মাংস খেয়ে কুরবানীর দিনেই অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই মোটাতাজা পশু কিনতে চাইলে অবশ্যই ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিনুন।
পশুর হাট বা বাজারের হালচাল ভালো থাকে না। দেখা গেছে বিক্রেতা পশু বিক্রি করে ফেলেছেন, ক্রেতা জাল নোট ধরিয়ে দিলেও দিতে পারে। তাই বিক্রেতার কাছে পশু হস্তান্তরের পূর্বে হাটে কিংবা পশুর বাজারে অবস্থিত ব্যাংকের অস্থায়ী বুথে জাল নোট শনাক্ত করে টাকাগুলো গুনে, বুঝে তারপর পশু হস্তান্তর করুন। মনে রাখবেন, যারা জাল নোট বহন করে, তারা মারাত্মক অপরাধী। এদেরকে পুলিশের হাত ছাড়া কারো হাতে দেবেন না।
অননুমোদিতভাবে রাস্তাঘাট, ফুটপাত, খেলার মাঠ কিংবা রাস্তায় চলমান বিক্রেতার কাছ থেকে পশু কিনবেন না। এতে অবৈধভাবে বর্ডার পার করা, কারো জমি থেকে হারিয়ে যাওয়া, গোয়াল ঘর থেকে খোয়া যাওয়া পশুও কিনে ফেলতে পারেন। কাজেই অনুমোদিত পশুর হাট বা বাজার থেকে পশু কিনুন।
অনেক সময় ক্রেতার সরলতার সুযোগ নিয়ে বিক্রেতারা পশুর শরীরে কৃত্রিম রং মাখিয়ে, বয়স লুকিয়ে, পশুর দাঁত প্রদর্শন না করে, নেশা খাইয়ে পশুর পায়ে প্যারেক গেঁথে, লেজে আলপিন মেরে, অসুস্থ পশুর শরীরে চিরুনি দিয়ে বিক্রি করতে পারে। তাই ত্রুটিগুলো পরখ করে, অসুস্থ কি-না যাচাই করে এবং মলত্যাগের রাস্তা পরখ করে কিনতে হবে।
বাজারের হালচালে আরেকটি বড় অবৈধ উৎপাত হলো দালালদের দৌরাত্ম্য। অনেক সময় পুরো বাজারই যেন তাদের দাপটে চলে। লক্ষ করলে দেখবেন, কোনো একজন লোক কখনো আপনার পক্ষে, আবার কখনো বিক্রেতার পক্ষে কথা বলছে, তখন বুঝে নেবেন সে আসলে কোনো পক্ষের নয়; সে এখানকার দালাল। আবার কখনো কয়েকজনকে ক্রেতা সাজিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যে, আপনার করা দামের চেয়ে বেশি দামে পশু কিনতে হচ্ছে। তখন বুঝে নিতে হবে, এরা আসলে ফড়িয়া বা দালাল চক্রের লোক।
অনেকে কেনা পশু বাসা-বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাহায্যকারী নেন। কিন্তু সাহায্যকারীর কোনো পরিচয় রাখেন না। এক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন হয়তো ফাঁকফোকরে আপনার পশু খোয়া যেতে পারে। তাই সাহায্যকারী নেওয়ার পূর্বে সাহায্যকারীর আসল পরিচয় জানতে তার রেজিস্ট্রেশনকৃত মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদের কপি রাখুন। একান্ত অপারগ হলে হাতে থাকা ক্যামেরাযুক্ত মোবাইলে ছবি তুলে রাখুন। সম্ভব হলে হাঁটুন তার সাথে সাথে।
পশু ক্রয় করতে গেলে সাথে টাকা থাকে, তা অন্ধ চোর বা কানা ছিনতাইকারীও জানে। কাজেই সতর্ক থাকুন। পাশাপাশি না হেঁটে পাশের জনকে নিয়ে ভিড়ে ভিড়ে আগে পিছে করে হাঁটুন। কাউকে সন্দেহ হলে এবং সন্দেহ নিশ্চিত হলে পুলিশ কিংবা ভালো পথিককে জানিয়ে রাখুন। পাশের জন যাকে আপনি সাথে এনেছেন, তাকে আপনার পেছনে গিয়ে আপনাকে চোখে চোখে রাখতে বলুন। সাবধানে টাকা রাখুন। সাধু বেশে চোর, ভদ্রবেশী ছিনতাইকারী, মিষ্টভাষী কপট মানুষ এখন পায়ে পায়ে হাঁটে। পশু কিনে বা ক্রয় করে রশিদ নিন। মনে রাখবেন, রশিদ হচ্ছে নিরাপত্তা পাস। মনে রাখবেন, যে রশিদটি নিচ্ছেন তার মধ্যে ক্রেতার ও বিক্রেতার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদ নম্বর থাকে। আরো থাকে ক্রয়কৃত পশুর বিবরণ ও হাট বা বাজারের নাম। কাজেই চোরাই পশু কেনার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার এটিও এক মোক্ষম সুযোগ। একে হাতছাড়া করতে নেই।
কেনার পর পশুর গলায় বাঁধা দড়ি পরীক্ষা করবেন, দড়িটি শক্ত কি-না। মাথা থেকে দড়ি বের হয়ে যাচ্ছে কি-না। পাটের দড়ি হলে ভালো। নাইলনের দড়ি হলে টানতে টানতে পশুটি ফাঁস লাগল কি-না নজর দিবেন। তবেই হয়তো দড়িটি নিরাপত্তার কাজে বেশি সহযোগিতা করতে পারে। নতুবা দড়ি ছিঁড়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার মতো পশুর কথাও অনেকে বলে থাকেন।
এবার আসুন, অন্য আরেক কথা বলি— রাস্তার ধারে, অনুপযুক্ত স্থানে, ময়লা ড্রেনের পাশে পশু যবেহ করবেন না। যেখানে সেখানে যবেহকৃত পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ফেলবেন না। রক্ত পরিষ্কার করুন। আবর্জনা মাটির নিচে পুঁতে দিন।
বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এবারও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গবাদিপশু বিক্রয় কার্যক্রম চলবে। এক্ষেত্রে অনলাইনে প্রতারণা রোধে অনলাইনে আপলোড করা পশুর মালিকের নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, পশুর বয়স, ওজন, মূল্য ও ছবি সংযোজন করতে হবে। মনে রাখবেন, কুরবানীর পশু মূলত নিজের পক্ষ থেকে কুরবানী করার জন্য হলেও এর মাংসের প্রতি গরীব-দুঃখী ও আত্মীয়স্বজনেরও প্রত্যাশা থাকে। তাই তাদেরকে এ থেকে বঞ্চিত করা কখনোই উচিত নয়।
পশুর যেসব দোষ থাকলে কুরবানী হবে না:
কুরবানীর পশু বড় ধরনের দোষত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘চার ধরনের পশু, যা দিয়ে কুরবানী জায়েয হবে না— অন্ধ, যেটার অন্ধত্ব স্পষ্ট; রোগাক্রান্ত, যার রোগ স্পষ্ট; পঙ্গু, যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট এবং আহত, যার কোনো অঙ্গ ভেঙে গেছে’।[1]
স্বাস্থ্য পরামর্শ:
হাটে গেলে মাস্ক পরা: হাটে গেলে মাস্ক ব্যবহারের চেষ্টা করুন। হাটে সাধারণত অনেক মানুষের সমাগম হয়, ফলে সেখানে রোগজীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই নিজের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে হাটে যাওয়ার সময় মাস্ক পরার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সঙ্গী হোক স্যানিটাইজার: হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকলে কিছুক্ষণ পরপর হাত ধুয়ে নিন। অন্যথা স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন। হাট থেকে বের হওয়ার সময় হাত জীবাণুমুক্ত করুন। বাসায় ঢুকে অন্যদের সঙ্গে মেলামেশার আগে সাবান মেখে গোসল সেরে ফেলুন।
গরমে পানির বোতল: এবার প্রচণ্ড গরমের মাঝে হাটে যেতে হবে। দীর্ঘ সময় গরমের মাঝে অবস্থান করলে পানিশূন্যতা হতে পারে। সেজন্য হাটে গেলে বোতলে করে প্রয়োজনীয় নিরাপদ পানি সঙ্গে রাখুন। বিক্রেতা হিসেবে যারা দীর্ঘ সময় হাটে অবস্থান করছেন, তাদের অবশ্যই এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
পায়ের যত্ন নিন: গোবর, চোনা, কাদা একাকার হয়ে প্রায়ই হাট নোংরা হয়ে থাকে। হাটে খালি পায়ে হাঁটা অনুচিত। যাদের পায়ের ক্ষত রয়েছে কিংবা যারা ডায়াবেটিস রোগী, তাদের হাটে না যাওয়াই উত্তম। হাটে গিয়ে পা থ্যাঁতলে বা কেটে কাদা, গোবর ইত্যাদি লেগে গেলে অবশ্যই সাবান দিয়ে পা ধুয়ে অ্যান্টিসেপটিক মলম লাগাতে হবে। অবস্থা অনুযায়ী টিটেনাসের ভ্যাকসিন নিতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, কুরবানীর পশুর হাটে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই, এটাই শেষ কথা। সবার জীবনে আনন্দময় ঈদ আসুক এই প্রত্যাশা।
চিকিৎসক, কলামিষ্ট ও গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।
[1]. ইবনু মাজাহ, হা/৩১৪৪।
